• সম্পর্কে
  • উপন্যাস
  • ঐতিহাসিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • আত্মজীবন
  • সন্মাননা স্মারক
  • ছবি
    • সম্মাননা
    • পারিবারিক
    • একক ছবি
    • ছাত্রজীবন
    • নাবিক জীবন
    • বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে
    • বই সংক্রান্ত
    • বিবিধ কর্মজীবন
  • ভিডিও
No Result
View All Result
  • সম্পর্কে
  • উপন্যাস
  • ঐতিহাসিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • আত্মজীবন
  • সন্মাননা স্মারক
  • ছবি
    • সম্মাননা
    • পারিবারিক
    • একক ছবি
    • ছাত্রজীবন
    • নাবিক জীবন
    • বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে
    • বই সংক্রান্ত
    • বিবিধ কর্মজীবন
  • ভিডিও
No Result
View All Result
Commander Abdur Rouf
No Result
View All Result

কাটপকটপাক

593
SHARES
Share on FacebookShare on Twitter

 

 

 

ক র্ব ট  ক ন্যা

 

 

 

একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস

সম্রাট কুমার গুপ্তের রাজত্বের শেষকাল- আনুমানিক ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে

 

 

 

 

 

 

 

আবদুর রউফ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বই পরিচিতি

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে আর্যব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রবাহ গঙ্গার পশ্চিম তীর পর্যন্ত বেগমান ছিল, কিন্তু পূর্ব ও উত্তর তীরে সে-প্রবাহ ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে। বহুদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি আর্যমানসের একটা উন্নাসিকতা, ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাব সক্রিয় ছিল। বাংলার আদিম কৌমবদ্ধ মানব-সমাজ বহুদিন পর্যন্ত আর্যধর্ম-সংস্কৃতির সক্রিয় বিরোধিতা করেছে; বোঝাপড়া করে একটা সমন্বয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। এই বোঝাপড়ার ফলশ্র“তিতে বৈদিকযুগ, বৌদ্ধযুগ অতিক্রম করে হিন্দুযুগে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির চূড়ান্তরূপ হিসাবে প্রচলিত হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আর্যব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম, জন্মান্তরবাদ ও ধর্মসংস্কৃতির বিজয়াভিযান বিনা প্রতিরোধ ও বিনা সংঘর্ষে সম্পন্ন হয় নাই। সেই সংঘাত, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের অব্যাহত সংগ্রামে আমাদের পূর্ব-পুরুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে লালন করার ঐকান্তিক নিষ্ঠায় নিম্নকোটি মানুষের যে অদম্য প্রাণশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় তাকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে কর্বট কন্যা। এ উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে তৎকালীন ঐতিহাসিক পটভূমিতে। উপন্যাসের ঘটনাবলি ও আখ্যান কুমার গুপ্তের রাজত্বকালের শেষাংশ, আনুমানিক ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আট-দশ বৎসরকাল ব্যাপ্ত। ঘটনার স্থান গুপ্ত সাম্রাজ্যের বহিঃপ্রান্তীয় দেশ সম্ভার রাজ্য এবং তার অন্তর্গত মধুপুর, ভাওয়াল, শিবপুর, পলাশতলী, পঞ্চবটি ও বন্দর-নগরী ঢবাকা অঞ্চলসমূহ। উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রসমূহ কল্পনায় নির্মিত, তবে অবশ্যই অনৈতিহাসিক নয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এই ভূ‚-ভাগের নির্যাতিত ও অপমানিত নিম্নবর্গের মানবকুলের কল্যাণে

যুগে যুগে যত মহামানব জীবনপাত করেছেন

শুনিয়েছেন মুক্তির অভয়বাণী- তাঁদের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূচি

 

কর্বট কন্যা  ০৪ – ২১১

 

পরি-কথন         ২১১ – ২১৮

 

সহায়ক গ্রন্থ         ২১৮ – ২১৯

 

শব্দসংকেত         ২১৯ – ২২০

 

 

 

 

 

 

 

 

এক.

 

গৈরিক মাটির উচ্চভূমি ক্রমে ঢালু হয়ে কয়রা নদীতটে মিশে গেছে। শরতের প্রারম্ভ। ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীটি এখন ভরাট, শান্ত ও নিমগ্ন। আপন মনে পশ্চিম দিকে বহমান- কালিনদী বেয়ে লক্ষ্যানদীর সঙ্গে মিলনের আশায়। শরৎ-হেমন্ত পেরিয়ে শীত ঋতু সমীপবর্তী হলে কয়রা নদী হবে শীর্ণকায়া। সে-সময়ে এলাকার নারী-পুরুষ পদব্রজে অনায়াসে এ-পার ও-পার যাতায়াত করবে জীবন-জীবিকার নানা কর্ম উপলক্ষে, উৎসবে আনন্দে। পশ্চাতে বিস্তৃত উচ্চভূমি বন-বনান্তরে ছায়াচ্ছন্ন। নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি ঊর্ধ্বলোকে মাথা তুলে ধরেছে- শাল, বিল্ব, পিপ্পলী, শমী, পনস, মাকন্দ, কদম, কিংশুক, আরো কত! নিজেদেরকে মেলে ধরেছে যেন দেবদিবাকরের উজ্জ্বল আলোতে অবগাহন করার প্রত্যাশায়। বন-মধ্যে কোথাও কোথাও অপরিসর-সুপরিসর উন্মুক্ত স্থান। সেখানে শস্যদাত্রী স্বল্পজীবী তৃণগুল্ম, ভেষজ বিড়ঙ্গ, পর্ণতরু ও বেণুবন; সন্নিকটে মনুষ্যবসতি।

রাত্রির অন্ধকার ক্ষীয়মান। নীড়ত্যাগী পক্ষীদলের কলক‚জনে বনভূমি জেগে উঠছে। হরিদ্রাভ সূর্যরশ্মি তার স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে জাগিয়ে তুলছে ঘুমন্ত চরাচর, বন-বনান্তর। একটি প্রভাত সমাসন্ন।

এমন অমল-ধবল-স্নিগ্ধ-প্রভাতে বনাভ্যন্তরের পায়ে চলার গোপাট ধরে শুকদেরের গৃহপ্রাঙ্গণে সমুপস্থিত হলেন কর্বট গোত্রের প্রধান পুরুষ প্রদোষ দেব। সঙ্গে কিশোর অনুচর অর্কদাস ও দুজন শস্ত্রধারী দেহরক্ষী। ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিমে কয়রা নদীর উত্তর-পাড় ধরে যোজনব্যাপী ভূমিতে বসতি গড়ে তুলেছে কর্বট কৌমের মনুষ্যকুল প্রায় পাঁচ পুরুষ ধরে। এরা কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী। বর্ধিষ্ণু এ জনপদে বাস্তুভিটা স্থাপন করেছে অহোম ও কোচ গোত্রের কয়েকটি যোদ্ধৃ পরিবার। কালক্রমে ওরা মিশে গেছে কৃষিজীবী সমাজে। গড়ে উঠেছে নাতিবৃহৎ সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী, পলাশতলী জনপদ। কর্বট কৌমের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলে অনেকে কয়রা নদীর দক্ষিণে বটেশ্বরেও বসতি স্থাপন করেছে, এবং সেখানকার বনবাসীদের সঙ্গে মিলেমিশে জীবনযাপন করছে শান্তিপূর্ণভাবে।

কবাট বক্ষ, দীর্ঘ উন্নত অসিতকান্তি, প্রখরদৃষ্টি, সঘন অর্ধ-শুভ্র কেশদাম সমন্বিত প্রৌঢ় পুরুষ প্রদোষ দেব; সে জনগোষ্ঠীর গোত্রপতি। পঞ্চবর্ষ পূর্বে গ্রামের প্রবীণদের সভায় শলাকা-গ্রহাপকের শলাকা বিতরণ ও গ্রহণের মাধ্যমে গোত্রপতি পদে বরণ করে নেয়া হয় প্রদোষ দেবকে। স্বাধীন কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, ভাগচাষী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা; বিষ্ণুপন্থী, শৈবধর্মী, তান্ত্রিক বৌদ্ধ ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন মত-পথের মানবকুলে পরমত সহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা; সার্বজনীন চারণভূমি, জলাভূমি এবং ধর্মগোলা সংরক্ষণ করা- এ সকল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদোষ দেব ছাড়া আর কে পালন করতে পারবে? প্রদোষ দেব সদাচারী, ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী স্বাধীন কৃষক; প্রভূত জলা-জমি ও ভূসম্পত্তির মালিক। শিবপুর বীথির আগ্রাসী রাজভক্ত সামন্তদেরকে ঠেকিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পলাশতলী-বটেশ্বর এলাকার জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে প্রদোষ দেব একমাত্র যোগ্য পুরুষ। শিবপুর বীথির সামরিক-গুল্মের গুল্মিককে ন্যায়-নিয়মের নিয়ন্ত্রণে বেঁধে রেখে জনপদের আরক্ষা-ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সক্ষম এমন আর কে আছেন? প্রদোষ দেব বিগত বৎসরগুলোতে তার যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে।

শুকদেবের গৃহ-প্রাঙ্গণটি সুবিস্তৃত। গৈরিক উচ্চভূমির উৎসঙ্গ প্রদেশে তার বসতবাটি মৃত্তিকা-নির্মিত। দুটি বিশাল শয়ন-গৃহের সন্নিকটে অপরিসর একটি উটজগৃহ। শুকদেবের প্রার্থনাস্থল। পূর্বপার্শ্বের দাওয়ায় আসন পেতে তিনি সূর্যস্তব করছিলেন তন্ময় হয়ে-

     – বিষ্ণুবে নমোঃ,- সূর্যায় নমোঃ

     – জবা কুসুম সঙ্কাশং প্রাণ তোস্মি দিবাকরম

     – নমোঃ ব্রাহ্মণ্যদেবা য়, গো ব্রাহ্মণ হিতায় চ 

 

পূর্বদিকচক্রবালে নিবদ্ধ অর্ধনিমীলিত দৃষ্টি, শ্বেতশুভ্র কেশদাম সযত্নে স্কন্ধ পর্যন্ত বিন্যস্ত; পরিধানে কষায় বস্ত্র, ঊর্ধ্বাঙ্গ গৈরিক বর্ণের হালকা উত্তরীয় দিয়ে আবৃত; শুকদেব অস্ফুটস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন নিমগ্নচিত্তে। গৃহপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করে দূর থেকে প্রার্থনারত শুকদেবকে লক্ষ করে প্রদোষ দেব ধীর পদে, নীরবে সম্মুখপানে অগ্রসর হলেন।

আগন্তুকদের লক্ষ করল শুকদেবের একাদশ-বর্ষীয়া কন্যা মায়াবতী। কর্বট গোত্রপতিকে মায়াবতী বিলক্ষণ চেনে। জ্ঞাতি সম্পর্কে তিনি তার ভ্রাতা। কিন্তু অনুচর ও দেহরক্ষীদের কাউকেই ইতোপূর্বে সে দেখেনি। গৌরকান্তি এক সুদর্শন কিশোর। গোত্রপতির মতো তারও ভব্য পরিচ্ছদ। ঊর্ধ্বাঙ্গ শুভ্র বস্ত্রখণ্ডে আবৃত। দেহরক্ষী দুজন অর্ধনগ্ন; কটিদেশ ও নিম্নাঙ্গ একখণ্ড বস্ত্রে আচ্ছাদিত- সেটি এতই অপ্রশস্ত যে লিঙ্গপট্ট বলে ভ্রম হয়। দুজনেরই বিরাট বপু, তামাটে বর্ণ এবং শস্ত্রধারী।

প্রত্যুষে গোশালা পরিচ্ছন্ন করা, গোধনগুলোকে জলপান করানো মায়াবতীর প্রাত্যহিক কর্ম। গোধনগুলোকে গভীর মমতায় বাসগৃহের অদূরে চারণভূমিতে সে নিজে ছেড়ে আসে। আজ আর সেদিকে যাওয়া হলো না। ওদের বন্ধনমুক্ত করে দ্রুত সে অতিথি অভ্যর্থনায় অগ্রসর হলো। 

গৃহপ্রাঙ্গণের মাঝপথে এগিয়ে এসে সে গোত্রপতির পদধূলি নিল, সহাস্যে কুশল জিজ্ঞেস করল। গোত্রপতিও দূর-সম্পর্কীয় এই চঞ্চলমতি ভগ্নীটির মস্তকে হস্ত স্থাপন করে আশীর্বাদ করলেন। অতঃপর মায়াবতী সহাস্যে অর্কদাসকে নমস্কার করে বলল- আপনাদেরকে স্বাগতম। কোনো তিথি বিচার না করেই যারা সমুপস্থিত হন তারাই তো অতিথি।

গুরুজনেরা বলেন, অতিথি নারায়ণ। ওঁরা বিলক্ষণ আদর-যত্নের অধিকারী। আমি বাবার প্রার্থনাগৃহের সম্মুখের দাওয়ায় আসন পেতে দিচ্ছি, আপনারা দুজনে উপবেশন করুন। এক্ষুনি বাবা তার সূর্যস্তব সমাপ্ত করবেন। শস্ত্রধারী দুজনকে লক্ষ্য করে মায়াবতী পুনরায় বলল- তোমরা ও-দিকটায় ঐ বৃক্ষতলে বিশ্রাম করো। অতঃপর অতি দ্রুতপদে সে অন্দরমহলে প্রস্থান করল।

বৎসরের এই সময়টিতে কৃষিজীবী সংসারে তেমন ব্যস্ততা নেই। তবুও নিত্যদিনের অভ্যাসমত প্রত্যুষেই শয্যাত্যাগ করেছে ভ্রাতৃজায়া মদনিকা। অতিথি আগমনের সংবাদটি বউদিদি মণিকে জানিয়ে মায়াবতী এগিয়ে গেল অগ্রজের সন্ধানে। গোত্রপতি গৃহে পদার্পণ করেছেন। তাকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের জন্য পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসাবে তার উপস্থিতিও বিশেষ প্রয়োজন। শয়নগৃহে তাকে না পেয়ে ফিরে এল মায়াবতী। একজন পরিচারিকা সমভিব্যাহারে ভাড়ার গৃহে যচ্ছিল মদনিকা। মুখ তুলে সহাস্যে বলল- ঠাকুর ঝিয়ের বুঝি তার দাদার অভ্যাস জানা নেই। তিনি তো প্রত্যুষেই প্রতিদিনকার মতো বেরিয়ে গেছেন। হয়তো কদম্বঘাট গ্রামে যাওয়ার গোপাট ধরে হাঁটছেন। আর হিসাব কষছেন কর্ষণের জন্য কৃষিক্ষেত্রগুলো প্রস্তুত কি না। এসো, আমার সঙ্গে হাত লাগাও। মান্যবর অতিথিদের জন্য ফলাহারের ব্যবস্থা করতে হবে। তোমার দাদা ফিরে এলে আমি তাকে পাঠিয়ে দেব খন।

সূর্যস্তব সমাপ্ত করে গাত্রোত্থান করতেই প্রদোষ দেব ভক্তিভরে শুকদেবের পদধূলি গ্রহণ করলেন। শুকদেব তার মস্তকে হস্তস্থাপন করে আশীর্বাদ করলেন- শতায়ু হও, কল্যাণময় হোক তোমার জীবন। অর্কদাসও পদধূলি গ্রহণ করল। বিস্মিত হয়ে শুকদেব প্রশ্ন করলেন- এ কিশোরকে তো চিনতে পারছি না। সে কি আমাদের পরিবারের কেউ? প্রদোষ দেব জবাব দিলেন- ঠিক তা নয় তাত, আমার দুঃসাহসী রক্ষীপ্রধান অভয় কোচ, যে পলাশতলী অঞ্চলের কর-আদায়-সংক্রান্ত যথেচ্ছাচারে বাধা দিতে গেলে শিবপুর বীথির গুল্মিক-রক্ষীদের অস্ত্রাঘাতে গুরুতর আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ করে, তার একমাত্র পুত্র। অভয় কোচের বিধবা স্ত্রীর প্রার্থনায় আমি তার পরিবারকে আমার পরিবারে কুলস্থ করে নিয়েছি। অভয় কোচের বিধবা পত্নী আমাকে পিতা বলে সম্বোধন করে। তার পুত্র ও কন্যা আমাকে সম্বোধন করে দাদাঠাকুর বলে। আমি ওদের নামকরণ করেছি অর্কদাস দেব ও সুজাতা দেবী। অর্কদাসের প্রশিক্ষণ প্রায় সমাপ্ত; বৎসরান্তে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের রক্ষীদলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শুকদেব গভীর মনোযোগ সহকারে অর্কদাসকে নিরীক্ষণ করলেন। দীর্ঘকায় গৌরকান্তি এ কিশোর সুদর্শন বটে। প্রশস্ত বক্ষ, ক্ষীণ কটিদেশ, ঋজু সুগঠিত দেহ, খর্বনাসা, দৃষ্টি অচঞ্চল এবং আকর্ষণীয় মুখশ্রী। কিঞ্চিৎ হেসে প্রশ্ন করলেন শুকদেব

– এ তো দেখছি দুগ্ধপোষ্য শিশুমাত্র, তাকে রক্ষীদলে অন্তর্ভুক্ত করবে কীভাবে?

আশ্বস্ত করে প্রদোষ দেব বললেন- আপনি বিস্মিত হবেন পিতৃব্য। দেখতে কিশোর হলেও সর্ব অস্ত্রবিদ্যায় সে অতিশয় পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তার নিষ্ঠা ও সাহস সর্বজন প্রশংসিত। তার বয়স পঞ্চদশ পূর্ণ হলেই আমার রক্ষীদলের অন্যতম পরিচালক হিসাবে তাকে অভিষিক্ত করব।

তখন দুই ঘটি জল নিয়ে উপস্থিত হলো মায়াবতী। দাওয়ার একপার্শ্বে ঘটি দুটি রেখে বলল- বাবা, অতিথিদের হস্ত-মুখাদি প্রক্ষালনের জল রেখে গেলাম। আমি ফলাহার নিয়ে আসছি। ফলাহার গ্রহণ করতে করতে আপনারা আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পারবেন। বলতে বলতে প্রভাতকালীন বাতাসে কম্পন তুলে মায়াবতী নিষ্ক্রান্ত হলো ঝড়ের গতিতে।

প্রদোষ দেব নিজ আসনে উপবিষ্ট। কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকলেন। কীভাবে তার বক্তব্যের অবতারণা করবেন তাই নিয়ে যেন দ্বিধাগ্রস্ত।

শুকদেবের গৃহে প্রদোষ দেবের উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত। পার্বণ কিংবা কোনো উৎসব ব্যতীত তারা পরস্পরের গৃহে পদার্পণ করেছে বিগত বৎসরগুলোতে তেমন দৃষ্টান্ত নেই। পঞ্চবর্ষ পূর্বে যখন কর্বট গোত্রের কুলপ্রবীণেরা গোত্রপতি বরণসভায় মিলিত হন তখন শুকদেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গোত্রপতি হিসাবে তারও বৃত হওয়ার বাসনা ছিল। প্রদোষ দেবের তুল্য না হলেও শুকদেবও প্রভূত ভূসম্পত্তির মালিক। গোত্রমধ্যে সদাচারী ও বিচক্ষণ বলে তার পরিচিতি আছে। তাছাড়া বয়সে সে প্রদোষ দেব থেকে সাত/আট বৎসরের অগ্রজ। শলাকা-গ্রহাপক ফলাফল ঘোষণা করলে অন্য সকলের সঙ্গে প্রদোষ দেবকে তিনিও উচ্ছ¡সিত অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। প্রদোষ দেব দূরের তো কেউ নন। তার পিতামহের আপন ভ্রাতার বংশধর; জ্ঞাতি সম্পর্কে ভ্রাতুষ্পুত্র। কিন্তু অন্তরে তিনি কিছুমাত্র ক্ষুণ্ন হন নাই, একথা নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করা যায় না। গোত্রপতির অভিষেক অনুষ্ঠানে শুকদেবও সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। দুই সন্তান ও এক পুত্রবধূসহ সস্ত্রীক তিনি সে-উৎসবের নৃত্যগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কনিষ্ঠ সন্তান মায়াবতী তখন ছয় বৎসরের শিশুমাত্র। কী কারণে প্রবীণেরা তাকে বরণ না করে প্রদোষ দেবকে বরণ করলেন সে-সম্পর্কে সন্ধান করে তিনি জ্ঞাত হয়েছেন যে সকলের বিবেচনায় শিবপুর বীথির আগ্রাসী তৎপরতা থেকে পলাশতলী-বটেশ্বর জনপদবাসীর স্বার্থরক্ষায় যে দুঃসাহসী ভূমিকা প্রয়োজন শুকদেবের চরিত্রে তা অনুপস্থিত। তাছাড়া শুকদেব বিষ্ণুভক্ত। সংখ্যার বিবেচনায় এই জনপদে বিষ্ণুভক্তদের অবস্থান নিতান্তই নগণ্য।

 

শুকদেব প্রদোষ দেবের দ্বিধাগ্রস্ত ভাব লক্ষ করলেন এবং নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন- আমার প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র! বয়ঃকনিষ্ঠ হলেও এ গৃহে তুমি সম্মানিত অতিথি। আমার সন্নিকটে তোমার কোনো বক্তব্য থাকলে অসংকোচে তা ব্যক্ত করতে পারো। তুমি আমাদের গোত্রপতিও বটে। অঙ্গীকার করছি, যে কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা আমার মান্যতা পাবে।

 

শশব্যস্ত হয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রদোষ দেব জবাব দিলেন- মান্যবর পিতৃব্য! আপনার মান্যতা পাবার মতো কোনো বক্তব্যই আমার নেই। প্রকৃতপক্ষে জনান্তিকে একটি বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। বিষয়টি সঠিক কি না সেটা জানবার আগ্রহ নিয়ে আপনার সমীপে উপস্থিত হয়েছি।

জিজ্ঞাসু নেত্রে বিস্ময়ের সঙ্গে শুকদেব উচ্চারণ করলেন- সেটা কী, বৎস?

কিঞ্চিৎ দ্বিধার সঙ্গেই প্রদোষ দেব জবাব দিলেন- আমরা অবগত হয়েছি যে আপনি বটেশ্বরে শিব মন্দিরের অদূরেই একটি বিষ্ণুমন্দির স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আপনার মালিকানাধীন দেড় কুল্যবাপ ভূমি মন্দিরের জন্য চিহ্নিত করে ফেলেছেন; মন্দিরগৃহ, প্রার্থনামণ্ডপ, আশ্রম ও অন্যান্য গৃহাদী নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করার জন্য সম্ভার মহারাজের কুলগুরু আচার্য অহিরুদ্র দেবের সহায়তার আবেদন করেছেন।

প্রদোষ দেব আরো কিছু ব্যক্ত করছিলেন। বাধা দিয়ে শুকদেব প্রশ্ন করলেন- মন্দির নির্মাণে তোমাদের কি কোনো আপত্তির কারণ আছে?

– অবশ্যই নয়। দ্রুত প্রত্যুত্তর দিলেন গোত্রপতি- আমরা আমাদের আয়ত্তাধীন সর্বত্র সকল ধর্মমতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আগ্রহী। তবে কালী নদীর পশ্চিম পাড়ের বিষ্ণু ধর্মাবলম্বীরা আগ্রাসী। শাসকপুরুষকে বিষ্ণুর অবতার আখ্যা দিয়ে কুটিল ব্রাহ্মণগণ নিজের প্রাধান্য ও স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। এলাকায় বিষ্ণুমন্দির স্থাপনকে উপলক্ষ করে ব্রাহ্মণ্য আগ্রাসনের আশঙ্কা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। অবশ্য আপনি নিজে যেখানে বিদ্যমান সেখানে আমরা নিঃশঙ্ক থাকতেই পারি। সকল সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি, জাত, বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জাগতিক কল্যাণ আমাদের প্রাথমিক আরাধ্য।

শুকদেবের উথাল-পাথাল দুশ্চিন্তা সব দূরীভূত হলো প্রদোষ দেবের বক্তব্য শুনে। সে গোত্রপতি। একটি বিষ্ণুমন্দির গড়ে উঠলে সেখানে কুটিল ব্রাহ্মণেরা সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করে গোব্রাহ্মণ রক্ষার্থে বর্ণাশ্রমের কঠোর বিধান দিয়ে কয়রা নদীর উত্তরে পলাশতলী এবং দক্ষিণে বটেশ্বর- এই উভয় জনপদের শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে এ-আশঙ্কা তার অমূলক নয়। সুতরাং গোত্রপতি হিসাবে প্রাসঙ্গিক সমূদয় বিষয় সুস্পষ্টভাবে জ্ঞাত হওয়া তার কর্তব্য বৈ কি। পরিবারের গুরুজন হিসাবে শুকদেবকে যথেষ্ট মান্যতা প্রদর্শন করেছে প্রদোষ দেব। গোত্রপতির দুর্ভাবনা লাঘব করার লক্ষ্যে শুকদেব তাকে আশ্বস্ত করে বললেন- প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি নিশ্চিত থেকো। আমি ইতোমধ্যে মন্দির স্থাপনে আমার অভিপ্রায়ের বিষয়টি নিয়ে বটেশ্বর শিবমন্দিরের প্রধান পুরোহিত গুরু ভবদেবের সঙ্গে আলোচনা করেছি। গুরুজন হিসাবে তিনি বটেশ্বর ও তার পার্শ্ববতী অঞ্চলে বসবাসরত শবর, ডোম, চণ্ডাল, মল্ল, রাজবংশী, কোচসহ সকল আদি বনবাসী জনগোষ্ঠী এবং তান্ত্রিক বৌদ্ধ ও প্রকৃতিপূজারী বিভিন্ন মত-পথের অনুসারী নারী-পুরুষ সকলের শ্রদ্ধাভাজন। সকলে ভবদেবকে গুরুদেব হিসাবে মান্য করে; তাকে গুরু প্রণাম করে, ভজনা করে, অর্চনা করে। তার অভিমত হলো- ওঁ ব্রহ্মাতৃপ্যতাম, ওঁ বিষ্ণুস্তৃপ্যতাম, ওঁ রুদ্রস্তৃপ্যতাম বলে যতই

 

 

বিভিন্ন নামে দেবতা তর্পণ করি না কেন ভগবান একমেবাদ্বীতীয়ম। ভিন্ন ভিন্ন মন্দির স্থাপনে বাধা কোথায়, যদি আমরা জ্ঞানের দ্বার বর্ণ-গোত্র-ধর্মবিশ্বাস ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মূক্ত করে দিতে পারি? সকল মানবকুলকে সহোদরের মতো ভালোবাসতে পারি?

তাদের আলোচনায় ছেদ পড়ে মায়াবতীর কপট-কুপিত কণ্ঠস্বরে। কাষ্ঠ নির্মিত প্রকাণ্ড এক ধামায় বিভিন্ন পদের ফলাহার অতিথিদের সম্মুখে ইতোমধ্যে যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই অক্ষত আছে প্রত্যক্ষ করে সে প্রদোষ দেবকে বলল- ভ্রাতঃ, কিছুই তো মুখে তুলছেন না! অতঃপর কুণ্ঠিত অর্কদাসকে লক্ষ করে প্রশ্ন করল- আর, তুমি কি পশ্চিমমুল্লুক থেকে আগত? সযত্নে দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছো? ফলমূলগুলো স্পর্শও করোনি? তুমি কি আর্যবংশোদ্ভূত নাকি গো, এত স্পর্শ বাঁচিয়ে থাকতে হয়?  

অর্কদাস অপাঙ্গে দৃষ্টিপাত করে নীরবে হাসল। মৃদুস্বরে প্রত্যুত্তর করল- আর্যপুত্র হতে যাব কেন?

চকিতে বলে উঠল মায়াবতী- তা না হলে পশ্চিমা আর্যপুত্রদের মতো এত গৌরবর্ণ কেন?     

পূর্ণ গাম্ভীর্য বজায় রেখে অর্কদাস জবাব দিল- আমি দুঃসাহসী-যোদ্ধা অভয় কোচের একমাত্র পুত্র। বোঁচা নাসিকা দর্শনে কি বুঝতে পারছ না যে আমি কোচ কুলোদ্ভব? বলতে বলতে ক্রমে অর্কদাসের কৃত্রিম গাম্ভীর্য তিরোহিত হয়ে পড়ল।

    

 

 

 

দুই.

 

আজ ভাদ্রপূর্ণিমা- মধুপূর্ণিমা। এ দিনে পারিলেষৎ বনে ভগবান বুদ্ধ এক ভক্ত বানর প্রদত্ত মধু এবং হস্তীরাজের সেবা গ্রহণ করেছিলেন। তারই স্মরণে বটেশ্বর ও তৎসংলগ্ন এলাকার বৌদ্ধরা মত্ত হয়ে উঠেছে। আর অতীব আগ্রহের সঙ্গে এতে অংশগ্রহণ করছে ডোম, চণ্ডাল, মল্ল ও কোচসহ সকল বনবাসী জনগোষ্ঠী এবং তান্ত্রিক বৌদ্ধ ও প্রকৃতিপূজারী বিভিন্ন মত-পথ অনুসারী নারী-পুরুষ।

শিবমন্দিরের প্রধান পুরোহিত গুরু ভবদেবের আশ্রমে দ্বিপ্রহরের পূর্ব থেকেই নানান ব্যস্ততা। আলপনা অঙ্কণ, কদলী বৃক্ষকাণ্ড ও বিবিধ লতাগুল্ম সহযোগে অস্থায়ী নাট্যমঞ্চ নির্মাণ, নৃত্যগীতের অনুশীলন, দীপাধার প্রস্তুতকরণ এবং সর্বশেষে অতিথি আপ্যায়নের জন্য মিষ্টান্ন ও ফলাহারের ব্যবস্থাকরণ- বিশাল কর্মযোগ।

অনিঃশেষ আনন্দ-কোলাহল। বটেশ্বর জনপদের বনবাসী গোষ্ঠীর নানা বয়সের নারী-পুরুষ দলে দলে আসছে যাচ্ছে, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসছে।

ভবদেবের ভক্ত ও শিষ্যবৃন্দ বচনামৃত সভার আয়োজন করছে। গুরুদেবের আশ্রমগৃহের সম্মুখে প্রশস্ত দাওয়া। অতঃপর নাতিবৃহৎ খোলা চত্বর। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে গুরুদেব দাওয়ায় উপবেশন করবেন এবং চত্বরে সমবেত ভক্তকুলের উদ্দেশে বচনামৃত দান করবেন। অতঃপর তিনি শোতৃমণ্ডলের নিকট থেকে কোনো প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর প্রদান করবেন। এভাবেই তিনি প্রতিবার মানব-জন্ম, ধর্ম-দর্শন ও জীবনানন্দ নিয়ে আলোচনা করেন- ভক্তকুলকে দীক্ষাদান করেন।

আশ্রমে স্থায়ীভাবে বসবাস করে গুরুদেবের কয়েকজন ভক্ত। একজন বনবাসী পৌঢ়া রমণী- ইসিদাসী। সকলে তাকে জ্যেষ্ঠাভগ্নী বলে জানে। তিনি আশ্রমের ব্যবস্থাপনা তদারক করেন; গুরুদেবের যে কোনো প্রয়োজনে সর্বদা অপেক্ষমান থাকেন। আর আছে কলিঙ্গা, লহনা এবং লহনার স্বামী সুপন। ওরাও স্থানীয় অরণ্যাচারী বনবাসী পরিবারের সদস্য। বয়স অপেক্ষাকৃত কম। ভাড়ার সংরক্ষণ, রন্ধনকর্ম ও আশ্রম এলাকার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা ওদের প্রধান দায়িত্ব। তাছাড়া প্রয়োজনে জ্যেষ্ঠাভগ্নীকে সঙ্গ দেওয়া এবং সহায়তা করাকেও তারা নিজ কর্তব্য বলে মানে।

আজকের দিনের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও সুপন জোড়হাতে নমস্কার করে ইসিদাসী সমীপে এসে উপস্থিত হলো।

চোখ তুলে ইসিদাসী বললেন- কিছু বলবে মনে হচ্ছে; কোনো সমস্যা না কি?

না না, কোনো সমস্যা নয়। তবে শুকদেব মহাশয়ের কন্যা এসেছেন। ইনি গুরুদেবের সাক্ষাৎপ্রার্থী।

সে কী! আজকের দিনে আবার আলাদা সাক্ষাৎ কেন? কিঞ্চিৎ বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন ইসিদাসী। অপরাহ্নে তো সর্বজনের সাক্ষাতেই তিনি উপস্থিত থাকবেন। কথাও বলবেন। সেটাই হবে সাক্ষাতের উত্তম সময়।

ইসিদাসীর বক্তব্য শেষ হতে পারে নি। সুপনের পেছনে লহনা ও কলিঙ্গা এসে উপস্থিত হলো মায়াবতীকে সঙ্গে নিয়ে। সহাস্যে মায়াবতীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে লহনা বলল- এটি হলো নাছোড়বান্দা মায়াবতী, শুকদেব মহাশয়ের একমাত্র কন্যা। গুরুদেবের সেবার জন্য একঘটি দুধ নিয়ে এসেছে।

ইসিদাসী ভাড়ার ঘরের নানা কাজ থেকে মাথা তুললেন। মায়াবতীর দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ হাসলেন। অতঃপর লহনাকে লক্ষ করে মন্তব্য করলেন- ভক্তি করে ভালোবেসে কিছু দিলে আমরা সর্বদা তা গ্রহণ করি। রেখে দাও।

মায়াবতী দুই হাত জোড় করে ইসিদাসীকে সসম্ভ্রমে নমস্কার জানিয়ে বলল- জ্যেষ্ঠা ভগ্নীর কাছে আমার কিছু বলার আছে। এ দুধটুকু গুরুদেবের সেবায় নিবেদন করব বলে গতকাল পিতা-মহাশয়ের অনুমতি নিয়েছি। আমাদের দুধালো গাভী ধবলীর দুধ আজ সকালে আমি নিজ হাতে দোহন করেছি। উৎসবে সমাগত অতিথিদের মিষ্টান্নের জন্য এই দুধ নয়। আমার প্রার্থনা, গুরুদেব যদি আমার এই নগণ্য ভক্তির দান নিজে সেবন করেন …। কথা শেষ না করেই মায়াবতী নীরব হয়ে ইসিদাসীর মুখপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

 ইসিদাসীও চোখ তুলে ঐ অপাপবিদ্ধ সহজ-সরল কিশোরীকে দেখলেন। ছিপছিপে লম্বাটে গড়ন, অপূর্ব লাবণ্য। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। স্বাধীন সম্মানীয় কর্বট গৃহস্থের সন্তান হওয়া সত্তে¡ও তার অভিব্যক্তিতে কোনো আত্মম্ভরিতা ছিল না। আচরণে, চলনে-বলনে বিনম্র, আন্তরিক। ইসিদাসী এতদিন দেখে এসেছেন যে, যাপিত-জীবনের বিচিত্র নিগ্রহ ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় বনবাসী ও শূদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য-পীড়িত নরনারী গুরু ভবদেবের শরণাপন্ন হয়েছে। কিন্তু বিত্তশালী কুলজাত সুখে-সোহাগে লালিত কোনো নারী ইতোপূর্বে এত আন্তরিক ভক্তি-সহকারে গুরুদেব সমীপে উপস্থিত হয়েছে তেমন দৃষ্টান্ত নেই। ভাবনাটি ইসিদাসীর মাতৃহৃদয়কে কোমল করে তুলল। তিনি মায়াবতীর প্রতি স্নেহার্দ্র হয়ে পড়লেন। হাতের কাজ ফেলে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- দ্যাখো, আমরা নীচকুলোদ্ভব মানুষ। গুরুদেব বলেন, উঁচু-নীচু ভেদাভেদ মনুষ্যসৃষ্ট। ভগবান সকল মানুষকে সমান রেখেই সৃষ্টি করেছেন। আমি দুধটুকু রাখলাম। তোমার প্রার্থনার কথা গুরুদেবকে বলব। তুমি অপরাহ্নে বচনামৃত-সভায় উপস্থিত থেকো। কথাগুলো বলতে বলতে ইসিদাসী কেমন যেন অন্যমনস্ক হলেন, চোখ দুটো তার ছলছল করে উঠল।

 

ব্রহ্মপুত্র পাড়ের ঘন বনে আচ্ছাদিত উচ্চভ‚মিতে সৃষ্ট কয়রা নদী ডানে পলাশতলী এবং বাঁয়ে বটেশ্বরকে রেখে পশ্চিমমুখী হয়ে বয়ে গেছে। পলাশতলীর ভূমি সমতল, যোজনব্যাপী বিস্তৃত। সংলগ্ন পশ্চিম পার্শ্বে বিল্বগ্রাম, অসমতল উচ্চভূমি। উত্তর-পশ্চিমে কিয়দ্দুর এগিয়ে গেলে ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় এবং পাহাড়ী এলাকা। বিল্বগ্রামের প্রবেশমুখে কয়রা নদী বামে বাঁক নিয়ে ডানে বিল্বগ্রাম এবং বামে বনাচ্ছাদিত ঘাগড়াগ্রাম অতিক্রম করে দক্ষিণ-পশ্চিমে সমৃদ্ধ জনপদ শিবপুরের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এখানে এসে সে লক্ষ্যা নদীর সাথে মিলিত হয়ে দক্ষিণমুখী ব্রহ্মপুত্রের শাখা আড়িয়ল খাঁ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

শিবপুরের গৈরিক উচ্চভূমি বিস্তৃত হয়ে দক্ষিণে বৈকালমারী পাহাড়ী বনাঞ্চল স্পর্শ করে আছে। এরপর শুরু হয়েছে বিস্তীর্ণ সমতল। দক্ষিণ-পশ্চিমে লক্ষ্যানদী এবং দক্ষিণ-পূর্বে মেঘনা পর্যন্ত ভূমি নিম্নশায়ী। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল আর খাল-বিল জলাভূমি আচ্ছাদিত। এলাকাটি কালীগঞ্জ, মহেশপুর, বাউলবাড়ি ও কদম্বঘাট গ্রামসমূহের উর্বর কৃষিক্ষেত্র। বর্ষায় কুলপ্লাবী জলস্ফীতিতে ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার বিশাল বিস্তৃতি। এর মধ্যে সবুজ বৃক্ষলতা শোভিত গ্রাম্য বসতিগুলো ছোট ছোট দ্বীপ বলে প্রতীয়মান হয়। কর্বটসহ বিভিন্ন কৌমের বহু গোত্র সেখানে বসতি স্থাপন করে একটি সমৃদ্ধ কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। আছে কয়েকটি তীবর, মৎস্যজীবী ও তন্তুবায় গোত্রও।

 

পলাশতলীর সন্নিকটে কয়রা নদীর বাম পাড়ে বটেশ্বর গ্রাম, ব্রহ্মপুত্র যেখানে মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে পদব্রজে এক প্রহর দূরত্বে অবস্থিত। গ্রামটি বনজঙ্গলে আচ্ছাদিত অসমতল উচ্চভূমি। গৈরিক তার বর্ণ, খানাখন্দের সঞ্চিত জল অস্বচ্ছ। স্মরণাতীত কাল থেকে এর বনাভ্যন্তরে বসবাস করছিল গুটিকয় ছোট ছোট জনগোষ্ঠী। এদের সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। নিজ নিজ গৃহের আশেপাশে ওরা পশুপক্ষী পালন করত। পুরুষেরা আদিম আয়ুধ সজ্জিত হয়ে বনাভ্যন্তরে জীবজন্তু এবং অদূরবর্তী খালবিল-জলাশয়ে মৎস্য শিকার করত পরিবারের ভরণপোষণের নিমিত্তে। এরা তখনও লৌহ-নির্মিত লাঙ্গলের ব্যবহার আয়ত্ত¡ করতে পারে নি। ফলে কৃষিকর্ম তাদের প্রধান জীবিকা হতে পারে নি। তবে নিজ গৃহের সন্নিকটে এক প্রকার ক্ষুদ্র হস্ত-নিড়ানির সাহায্যে পরিবারের নারী সদস্যরা ধান, সবজি ও গবেধুক নামে এক প্রকার ভুট্টা উৎপাদন করত। রোগ-শোক ও চরম দারিদ্রের মধ্যে কাটত ওদের জীবন। তবুও প্রকৃতির কোলে নিশ্চিত নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টির সঙ্গে ওরা জীবনযাপন করত। প্রায়শ সন্ধ্যার পর নানা উপলক্ষে ওরা বিভিন্ন পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ মিলে আসব পান করত; নাচে-গানে মত্ত হয়ে আনন্দ-স্ফুর্তি করত। এমনি কোনো এক বনবাসী পরিবারে জন্ম হয়েছিল ইসিদাসীর। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে সেই সমাজেরই এক তরুণের সঙ্গে সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে পারে নি বলে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর আরো দু বার সে বিবাহ করলেও সন্তান জন্ম দিতে না পারায় পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসঙ্গ অবহেলিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। ইসিদাসীর যৌবনে ততদিনে ভাটার টান। দুঃসহ নিঃসঙ্গ জীবনের যাতনা থেকে মুক্তির নানা উপায় খুঁজতে গিয়ে একদিন কয়রা নদীতটে প্রাচীন বটবৃক্ষ তলে এক গৃহত্যাগী জটাবল্কলধারী তাপসের সন্ধান পান। ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর পদতলে হত্যা দিয়ে পড়ে সে আশ্রয় প্রার্থনা করে। সেই থেকে শুরু। ইসিদাসী বেঁচে থাকার পথের সন্ধান পেয়ে যায়।

প্রাচীন বটবৃক্ষটির সন্নিকটে এসে আকস্মিক ডানে বাঁক খেয়ে আবার ঘুরে এসে পশ্চিমদিকে প্রবাহিত হয়েছে কয়রা নদী। ফলে তিন দিক নদীজলে ঘেরা উপদ্বীপের মতো সুন্দর একটি উচ্চভূমির সৃষ্টি হয়েছে। আশেপাশে আরো বৃক্ষতরুর মাঝে প্রকাণ্ড প্রাচীন বটবৃক্ষটি দাঁড়িয়ে আকাশ বিদীর্ণ করে, সুবিশাল ছায়া বিস্তার করে। এ স্থানটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বটেশ্বর। একদিনে নয়, দিনে দিনে। বহু বৎসরে।

ইসিদাসীর সেবা-শুশ্রূষার এক পর্যায়ে সন্ন্যাসীপ্রবর আকস্মিকভাবে হেসে উঠে তার মস্তকোপরি নোংরা মলিন হস্ত স্থাপন করে আশীর্বাদ করেন। গ্রাম থেকে ইসিদাসী দুধ, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্য এনে পরিবেশন করতে থাকেন। কিছুদিন পরে দেখা যায় দীর্ঘদিনের ধূলিধূসরিত নগ্ন দেহ আর লিঙ্গপট্টের স্থলে ভব্য পোশাক; মলিন জটার স্থলে পরিচ্ছন্ন কেশবিন্যাস; শয়নের জন্য গৃহ, মাদুর, শয্যা, উপাধান; ভক্তজনকে সাক্ষাৎদানের জন্য সুপরিসর পরিপাটি ছায়াঘেরা দাওয়া। সন্নিকটে আরো একটি কুঁড়েঘর; ভাঁড়ার ঘর, রন্ধনশালা এবং এক কোণে ইসিদাসীর বিশ্রামের ব্যবস্থা।

এভাবেই বটেশ্বরে গড়ে ওঠে গুরুদেবের আশ্রম। প্রকাণ্ড বটবৃক্ষটি যেমন ঝড়ঝঞ্ঝা তাড়িত শত শত পক্ষীকুলকে দিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজে ব্রাত্য ও অন্ত্যজ-ঘোষিত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অরণ্যাচারী নারী-পুরুষকেও তেমন এই আশ্রম দিয়েছে মানবিক মর্যাদা ও মুক্তির আস্বাদ। আশ্রমকে ঘিরে এলাকায় অনেক নতুন বসতি স্থাপিত হয়েছে।

বৌদ্ধ সম্রাটগণের পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের হাতে পড়ে তারা সম্ভারের মহারাজাদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথার কঠোরতা সহিংস রূপ নেয়। কর্মফল-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদ এবং ব্রাহ্মণদের একছত্র প্রাধান্য যারা মানতে অনীহা প্রকাশ করে তাদের ওপর চলে অশেষ নির্যাতন। অসুর, অনার্য এবং অন্ত্যজ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে বাস্তচ্যূত করা হয়। এসব কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমের শিবপুর থেকে এবং তারও পশ্চিমে পঞ্চবটি এলাকার বহু বৌদ্ধ, তান্ত্রিক, প্রকৃতি-পূজারি ও শিবভক্ত পরিবার আশ্রয় নেয় বটেশ্বরের বনে-জঙ্গলে। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের বিধান মতে প্রজাকুল অরণ্যভূমি কেটে যেটুকু কৃষিজমি আবাদ করতে পারত সেটার মালিকানা-স্বত্ব ছিল সে-প্রজাদেরই। রাজন্যবর্গের প্রাপ্য ছিল উৎপাদিত ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ মাত্র। রাজন্যবর্গের করবৃদ্ধির লক্ষ্যে এরূপ অরণ্য-আবাদ করাকে সামন্ত, মহাসামন্তগণ উৎসাহ দিতেন। যজমানী পেশার শ্রীবৃদ্ধি হবে ভেবে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণও তেমন বাধা দিতেন না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বটেশ্বর এলাকায় কৃষিজীবী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এ সময়ে কয়রা নদীর ও-পার থেকে কয়েক ঘর কর্বট কৃষক পরিবারও এ-পারে এসে বসতি স্থাপন করে। প্রদোষ দেব পলাশতলীর গোত্রপতি নির্বাচিত হবার দ্বিতীয় বৎসরে শুকদেবও তার পরিবার নিয়ে বটতলার সন্নিকটে নগদমূল্যে ভূমি ক্রয় করে বর্তমান বাসগৃহটি নির্মাণ করেন।

আত্মার মুক্তির জন্য নবাগত এসব মানবকুল সমাবিষ্ট হতে থাকে নদীতটের এই বিশাল বটবৃক্ষ তলে। প্রথমে আসে প্রকৃতি-পূজারী, সঙ্গে আসে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ও শিবভক্তগণ। বটমূলে নির্মিত হয় সুন্দর করে বাঁধানো বেদী।

শাক্যসিংহ গৌতম নীরঞ্জনা নদী-তীরে বটবৃক্ষমূলে ধ্যানস্থ থেকে যেহেতু বোধিলাভ করেছিলেন সে-কারণে কয়রা নদীর তীরবর্তী এই বিশাল বটবৃক্ষমূলকেও পূতপবিত্র বিবেচনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা পরম ভক্তি সহকারে এখানে বেদীটি নির্মাণ করে। পূজা-অনুষ্ঠানে, উৎসবে-আনন্দে এরা এখানেই সমবেত হয়। বেদীটি পুণ্যস্থান বিবেচিত হলেও এটা কোনো মন্দির নয়। বটেশ্বরে অনেক বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসতি থাকলেও তখনো এ অঞ্চলে কোনো বৌদ্ধমন্দির গড়ে ওঠে নাই। তাই এখানে বৌদ্ধদের কোনো মন্দির নেই, কোনো পুরোহিতও নেই।

বনবাসী জনগোষ্ঠী পূর্ব থেকে পশুর দেবতা রুদ্রের ভক্ত। রুদ্রই শিব। অতএব শিবমন্দির নির্মিত হতে পারে। তাই শিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে নির্মাণ করা হলো শিবমন্দির। একই বটবৃক্ষ মূলে, পুণ্যবেদীর এক পার্শ্বে।

মন্দির নির্মাণ নিয়ে কোনো সংকট সৃষ্টি হয় নি। সংকট সৃষ্টি হয়েছিল সেবায়েত পুরোহিত নিয়োগ নিয়ে। কাকে দেওয়া হবে এই পবিত্র দায়িত্ব? সর্বজনমান্য সেই সজ্জন মানুষটি কোথায় পাওয়া যাবে? এই নিয়ে সৃষ্ট হয়েছিল জটিল বিতর্ক। প্রবীণ শিবভক্তগণ গ্রাম-গ্রামান্তরের মহত্তর প্রবীণদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন। কয়েকজন উদ্যোগী হয়ে শিবপুর বীথির ধর্মপ্রবক্তা ও বিদ্বজনের সঙ্গে আলোচনাও করেন। তারা অবগত হন যে যদি কোনো মন্দিরের পৌরোহিত্য করার দায়িত্ব নেবার মতো যথোপযুক্ত কোনো ব্রাহ্মণ পাওয়া না যায় তাহলে অন্যকোনো দ্বিজ মহত্তর ব্যক্তিকে সেই দায়িত্ব প্রদান করা যায়। তবে শিবমন্দিরের ক্ষেত্রে দ্বিজ হওয়ার শর্তও আবশ্যিক নয়। শিব যেহেতু আদিম জনগোষ্ঠীর দেবতা, অব্রাহ্মণ তো বটেই, তাই এমনকি শূদ্রজনও শিবমন্দিরের পৌরোহিত্য করতে পারেন। শাস্ত্রের এরূপ বিধান সম্পর্কে অবগত হয়ে শিবভক্তগণ ছুটে এসেছিলেন গুরু ভবদেব সন্নিকটে। সমুপস্থিত হয়ে নব প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরের সেবায়েতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তাকে অনুরোধ করেছিলেন।

গুরু ভবদেব ম্লান হাস্য করে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন- আমি আদিম জনগোষ্ঠী শবর গোত্রে জাত। কৈশোরোত্তীর্ণ জীবনে দীর্ঘ প্রব্রজ্যা শেষে একদিন সম্ভার বিষ্ণুমন্দিরে আশ্রয় গ্রহণ করি। পুরোহিত আমাকে আশ্রয় দেন, দীক্ষা দেন। কিন্তু আজও জানি না, আমি প্রকৃত বিষ্ণুভক্ত হতে পেরেছি কি না। আমি শিবভক্ত, তান্ত্রিক, বৌদ্ধ কিংবা প্রকৃতি-পূজারী হতে পেরেছি কি না তাও জানি না। অতঃপর কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন- যে নামেই ভগবানকে মানুষ ভজনা করুন, তিনি তো একই। সুতরাং এক মন্দিরগৃহেই সকল ধর্মমতের পূজাঅর্চনা চলতে পারে। সেই থেকে ভবদেব শুধু গুরুদেবই নন, প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরেরও সেবায়েত পুরোহিত। আর এভাবেই ইসিদাসীর জীবনও আশ্রম ও শিবমন্দিরের সাথে গ্রথিত হয়ে গেছে।

 

অপরাহ্নে গুরুদেবের আশ্রমগৃহের সম্মুখে খোলা চত্বরে সমবেত হতে থাকে ভক্ত শ্রোতাবৃন্দ। এদের অধিকাংশই নারী এবং বয়সে নবীন। শুকদেব দুহিতা মায়াবতীও আসে কয়েকজন বনবাসী প্রতিবেশীর সঙ্গে। তার কৌতূহলের সীমা-পরিসীমা নেই। অস্থির হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কখন আসবেন গুরুদেব। দৃষ্টি চঞ্চল। কী যেন খুঁজে বেড়ায়, কাকে যেন প্রত্যাশা করে উৎসুক তরুণ্যের এই মেলায়।

সমুপস্থিত নারী-পুরুষের মাঝে আকস্মিক চাঞ্চল্য দেখা দিল। ইসিদাসী গৃহাভ্যন্তর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে দাওয়ায় একটা আসন পেতে দিলেন। ধীর পদক্ষেপে গুরুদেব অগ্রসর হয়ে ঈষৎ হাস্যবদনে সকলের সম্মুখে ক্ষণকাল দণ্ডায়মান থাকলেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ভক্তবৃন্দ দণ্ডায়মান হয়ে জোড়হস্তে নমস্কার জানাল। কেউ কেউ মুখেও উচ্চারণ করল ‘নমস্কার গুরুদেব’। আশ্রমের সেবক-সেবিকাদের কেউ কেউ গুরুদেবের পদপ্রান্তে সম্ভ্রমে স্থাপন করল পুষ্পগুচ্ছ, বিল্বপত্র, হরিদ্রাপত্র কিংবা ধান্যদূর্বা। প্রত্যেকের মস্তকোপরি দক্ষিণহস্ত স্থাপন করে মৃদু স্বরে গুরুদেব আশীর্বাদ করলেন- কল্যাণ হোক, অন্তরের অশান্তি দূর হোক, সুখী হও।

মায়াবতী ইতোপূর্বে এরূপ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে নি। সে কেমন যেন আবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। ঘন শ্যাম গুরুদেবের গাত্রবর্ণ, দীর্ঘ শ্বেতশুভ্র কেশ সুন্দর করে স্কন্ধোপরি বিন্যস্ত। মুখে স্মিত হাসি, ঊর্ধ্ব পাটিতে শ্বেতশুভ্র দন্তের আভাস লক্ষ করা যায়। সৌম্য স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল, কিন্তু দৃষ্টি সুগভীর, তীব্র ও প্রখর। মনে হয় ভেতর-সুদ্ধ তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। প্রস্তরখণ্ডে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে যেন তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়বে। নিকটে উপবিষ্ট এক রমণী অঞ্চল আকর্ষণ করলে মায়াবতী লক্ষ করে যে ইতোমধ্যে সকলেই স্থির হয়ে আসন গ্রহণ করেছে। করেছেন গুরুদেবও।

সহাস্য বদনে তিনি ভক্তবৃন্দের সমাবেশটি দেখে নিলেন, অতঃপর শুরু করলেন তার অমৃতবচন। প্রিয় ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ। আমার শুভাশিস জানবে। ক্ষণকাল নীরব থাকলেন গুরুদেব এবং পুনরায় আরম্ভ করলেন- আমি নিজের কথা বলছি। শিশু বয়স থেকেই লক্ষ করেছি মানুষ মানুষকে কী রকম নির্যাতন করতে পারে, অপমান করতে পারে, অবনমিত থাকতে বাধ্য করতে পারে। ব্যক্তিজীবনে নিজেও ভুক্তভোগী হয়ে ক্লিষ্ট হয়েছি। মনে হয়েছে অবস্থাটি অন্যায্য, এর প্রতিকার প্রয়োজন, এর থেকে মুক্তি প্রয়োজন। উপায় জানা ছিল না, পথের সন্ধান তখন পাই নি। দুঃসহ অস্থিরতায় কেটেছে আমার জীবনের কৈশোরোত্তীর্ণ সে-দিনগুলো। একদিন এক সন্ন্যাসীর দর্শন পেলাম। আমার সদ্যমৃত পিতার শবদেহের পাশে উপবিষ্ট শোককাতরা মাতাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কী যেন অভয়বাণী শোনালেন। আমি মুগ্ধ হলাম, বোধহয় হিতাহিত জ্ঞান রহিত হলো। আমি সে-সন্ন্যাসীর পেছনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। সে-সন্ন্যাসীর অনুগমন করে ঘুরেছি বনে-জঙ্গলে, লোকালয়ে, নদীতটে, বন্দরে, রাজপুরুষদের কারা-প্রকোষ্ঠে, মঠে-মন্দিরে এবং পবিত্র তীর্থভূমিতে। সন্ন্যাসীর স্নেহাশীর্বাদে আমি জয় করতে সক্ষম হয়েছিলাম ক্ষুৎ-পিপাসার ক্লান্তি, রোগ-বালাইয়ের অসহায়ত্ব, খরতাপ, বর্ষণ কিংবা প্রচণ্ড শীতের দৈহিক যন্ত্রণা। ঘুরেছি পশ্চিমে গয়া, রাজগৃহ, বিক্রমশীল, নবদ্বীপ, কর্ণসুবর্ণ, কটিবর্ষ। দীর্ঘ ছয় বৎসর নানা স্থানে প্রব্রজ্যা সমাপ্ত করে সোমপুর বিহারে পৌঁছালে আমি সে সন্ন্যাসীকে হারিয়ে ফেলি। কিন্তু তৎস্থানেও পুনরায় গুরুভাগ্য লাভ করি। আরো কেটে যায় কয়েক বৎসর। অবশেষে সম্ভারের বিষয়পতি মহারাজ শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেনের বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত আমাকে আশ্রয় দেন, দীক্ষা দেন। তারই আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়ে একদিন এই বটমূলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তাও প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত।

 

এ পর্যায়ে গুরুদেব একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্ষণকাল নিশ্চুপ থাকলেন। অতঃপর পুনরায় বললেন- নিজের সম্বন্ধে এত দীর্ঘ বক্তব্য রাখলাম এই কারণে যে দীর্ঘজীবনে, গুরুজনদের হিতোপদেশ শ্রবণ করে, নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার ঘাত-প্রতিঘাতে যে সত্যটি আবিষ্কার করেছি, নিজের অন্তরে উপলব্ধি করেছি এবং ভক্তবৃন্দকে বলার চেষ্টা করেছি সেটা অতি স্পষ্ট এবং সংক্ষিপ্ত। ভগবানের স্বরূপকে খণ্ডিত করে যে নামেই আমরা তার ভজনা করি না কেন তিনি একমেবাদ্বীতিয়াম। তিনি মানবজাতিকে সমমর্যাদা দান করে সৃষ্টি করেছেন। বর্ণ, গোত্র, ধনী-দরিদ্র  ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করার অধিকার দিয়েছেন। অতএব জ্ঞানের দ্বার প্রত্যেক মানুষের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকতে হবে। উন্মুক্ত থাকবে তপস্যার দ্বার, কর্মের দ্বার।

ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ। আমি মনে করি বিষ্ণুভক্ত, শিবভক্ত, বৌদ্ধ-তান্ত্রিক এবং প্রকৃতি-পূজারী সকলের প্রধান ধর্ম হবে কৃষিকর্ম। যে ভূমিতে আমরা বাস করি, যে ভূমি কর্ষণ করে আমরা খাদ্য উৎপাদন করি, যে ভূমিপৃষ্ঠে আশ্রয় নিয়ে জীবিকার নানা উপকরণ নির্মাণ করি সে-ভূমি আমাদের মাতৃতুল্য। অতএব মায়ের কোল-নিবাসী সকল মানুষকে সহোদরসম ভালোবাসতে হবে। দৃঢ় হস্তে পরস্পরকে ধারণ করে আনন্দের মধ্যে বাঁচতে হবে। এ জীবন আনন্দের।

থামলেন গুরুদেব। পুনরায় একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, অতঃপর অনেকটা আত্মগতের মতো উচ্চারণ করলেন- আনন্দেই সৃষ্টি, আনন্দেই জীবনযাপন, আনন্দে মৃত্যু, এবং পুনর্জন্মে আনন্দের অন্তহীন প্রবাহ স্পন্দনশীল। আনন্দাদ্ব্যেব খল্বিমানি ভূতানী জায়ন্তে। যদিদং কিঞ্চি সর্বং প্রাণ এজতি নিসৃতম। আনন্দ থেকেই সবকিছুর সৃষ্টি। যা কিছু অস্তিত্ববান সমস্তই প্রাণ থেকে নিসৃত হয়ে প্রাণে স্পন্দনশীল।

তখন দেব দিবাকর অস্তাচলগামী। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে স্বর্গীয় হিরন্ময় আভা। পক্ষীকুল কুলায় ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধুপূর্ণিমার পূর্ণশশী উদয়ের অপেক্ষায় ব্যাকুল ভক্তজনেরা। দীপাধারে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে ওরা ধীরপদে অগ্রসরমান। বটমূলে পুণ্যবেদীতে স্থাপিত ভগবান বুদ্ধের মৃন্ময় মূর্তির সম্মুখে অর্ধবৃত্তাকারে বেষ্টন করে মন্ত্রোচ্চারণ করছে ভক্ত নারী-পুরুষ। সম্মুখ সারিতে কতিপয় মুণ্ডিতমস্তক শ্রমণ উপস্থিত। তাদের সমবেত কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণ সুধ্বনিময় সঙ্গীতের মুখরতা সৃষ্টি করছে- বুদ্ধং শরণং গচ্ছামী, ধর্ম্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামী . . . অকস্মাৎ সমবেত নারীকণ্ঠে উলুধ্বনি উচ্চারিত হলো। চতুর্দিক মুখরিত হলো, আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সর্বত্র। হয়তো চন্দ্রোদয় দৃশ্যমান হয়েছে। স্নিগ্ধ স্বর্ণালী আলো বৃক্ষপত্রের ফাঁক গলিয়ে লুটিয়ে পড়ছে ধরিত্রীর বুকে- আনন্দে উদ্বেল প্রতিটি নরনারীর অন্তর।

গুরুদেবের অমৃতবচন সমাপ্ত হলে কিয়ৎক্ষণ বিমূঢ়ের মতো বসেছিল মায়াবতী। এরূপ অন্তর স্পর্শ করা বক্তব্য সে ইতোপূর্বে কখনো শোনে নি। ভগবান যদি সত্যিই একমেবাদ্বীতিয়াম হবে, তাহলে ধর্মে-ধর্মে এত বিভেদ কেন? সকল মানুষকে ভগবান যদি সমমর্যাদার অধিকারী করে থাকেন তা হলে উঁচুনীচু এত ভেদ কেন? জীবন যদি আনন্দেই যাপন করার হয় তাহলে সমাজসংসারে এত বাধার প্রাচীর কেন? আনন্দময় মানবজীবনকে ধ্বংস করেছে কারা, কোন পাপাত্মা?

লহনা সম্মুখে এসে দাঁড়ালে মায়াবতীর তন্ময়তা কেটে গেল। সে নিঃশব্দে হেসে বলল- ভগ্নী মায়াবতী মনে হয় সম্মোহিত হয়ে পড়েছ। ওঠো, উৎসবের অন্যান্য অনুষ্ঠানে যোগদানের সময় হয়ে গেছে।

চোখ তুলে সলজ্জ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে মায়াবতী বলল- হ্যাঁ, মন্দিরের দিক থেকে উলুধ্বনির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর শুনতে পাচ্ছি পূজারীগণের সুমধুর মন্ত্রোচ্চারণ।

সেদিকে যাওয়ার পূর্বে এসো তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই আমার ভাই ও তার সতীর্থ বন্ধুর- বলে লহনা তাকে নিয়ে গেল আশ্রমগৃহের দাওয়ার সন্নিকটে। ভক্তজনের মধ্য থেকে বেরিয়ে কলিঙ্গাও এসে যোগ দিল ওদের সঙ্গে। অমৃতবচন সমাপ্ত হলে ভক্ত নারী-পুরুষের অনেকেই গুরুদেবের পদপ্রান্তে গড় হয়ে প্রণাম করে বিদায় নিচ্ছিল। এমনি প্রণামান্তে মাথা তুলে দাঁড়াল এক সুগঠিত তরুণ। খর্বাকৃতির দেহগঠন, ঘনকৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, মুণ্ডিত মস্তক, হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী। লহনা তাকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল- এটা আমার ভাই হিঙ্গল। বর্ষপূর্বে একদিন নিরুদ্দিষ্ট হয়ে পড়েছিল আশ্রম থেকে। আকস্মিকভাবে আজকে উৎসবের দিনে হাজির, সঙ্গে এক সতীর্থ বন্ধুকে নিয়ে। আমাদের কী যে আনন্দ হচ্ছে! আর সর্বাধিক আনন্দিত হয়েছে এই দুগ্ধমুখি কলিঙ্গা। বলে কলিঙ্গার গণ্ডদেশে তর্জনী স্পর্শ করে মুখ টিপে হাসল। বলল- তাই না কলিঙ্গা?

মায়াবতীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে হিঙ্গল নমস্কার করে হাসল শ্বেতশুভ্র দন্ত বিকশিত করে। হিঙ্গলের বন্ধুটির সঙ্গেও লহনা তাকে পরিচয় করিয়ে দিল। বলল- এটি আমাদের প্রতিবেশী বান্ধবী, মান্যবর শুকদেব মহাশয়ের কন্যা মায়াবতী।

মায়াবতী যুক্ত-করে নমস্কার জানাল। ভ্র“বলণ্ঢীর কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করল- দীর্ঘকান্তি মহাশয় কি এ অঞ্চলে নবাগত? মহাশয়কে কী নামে সম্বোধন করা হয়?

– আমি উদয়মান, হিঙ্গলের সতীর্থ। সম্ভার মহারাজের কুলগুরু আচার্য অহিরুদ্রদেব মহাশয়ের আশ্রমে আমরা উভয়ে একই সঙ্গে শিক্ষাব্রতী ছিলাম। আজ প্রথম দিবসে আমি এখানে নবাগত বৈ কি। তবে বাসনা রাখি, এ আশ্রমেই স্থিত হব। বলে অচঞ্চল দৃষ্টিস্থাপন করল মায়াবতীর মুখোপরি। বিমুগ্ধ, আবিষ্ট। দুই চক্ষুর আকুল আক্ষেপ আকস্মিক হাস্যায়িত হলো ক্ষণকাল পরে নিঃশব্দে।

অচিরেই মায়াবতী নব-পরিচিত সঙ্গী সমভিব্যাহারে মন্দিরমণ্ডপের দিকে অগ্রসর হতে থাকল। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন- মায়াবতী যেন প্রগলভ হয়ে উঠল। অফুরন্ত বাক্যালাপ, উচ্ছ¡সিত হাস্যধ্বনি। মণ্ডপের নিকটবর্তী হলে মঙ্গলপ্রদীপের অর্চনাধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তকুলের কলগুঞ্জনের মাঝে তাদের উচ্ছ¡সিত কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেল।

মন্দির-প্রাঙ্গণ পেরিয়ে অদূরে একটি উন্মুক্ত চত্বর। চন্দ্রালোকিত। এখানে-সেখানে দুয়েকটি মশাল প্রজ্জ্বলিত আছে। বেশ কয়েক বৎসর ধরে এই চত্বরে নানা উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হয়। বেলা দ্বিপ্রহর থেকেই শুরু হয় মেলার ক্রয়-বিক্রয়। স্থানীয় কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল, কারিগরের উৎপাদিত পণ্য, তন্তুবায়ের নির্মিত নানা রঙের সুতিবস্ত্র, কষায় ও পট্টবস্ত্র, বাঁশ-বেতের গৃহাস্থলীর সৌখিন দ্রব্যাদি, শিশুদের খেলনাসামগ্রী, কুম্ভকারের হস্তনির্মিত নানাবিধ মৃন্ময় পাত্র, মূর্তি ও পুতুল, আরো কত কিছুর পসার সাজিয়ে বসে আছে হাস্যোজ্জ্বল, উচ্ছ্বল রমণীকুল ও সুরসিক বিক্রেতাবৃন্দ! এদেরই একপার্শে¦ শৌণ্ডিক তার মৃন্ময়ভাণ্ড থেকে কড়ির বিনিময়ে পানীয় বিক্রয়রত। মেলাপ্রাঙ্গণে ঘুরে দেখতে দেখতে ঢোলকের শব্দ শুনতে পেল মায়াবতী। পূজা-অর্চনা সমাপ্ত হয়েছে। এক্ষুনি নৃত্যগীতসহ নাট্যকলা পরিবেশিত হবে। আনন্দে প্রায় হাততালি দিয়ে উঠল সে। বলল- দেব উদয়মান, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুবই আহ্লাদিত হয়েছি। আপনি জ্ঞানী এবং সুদর্শনও বটে। আমি আমোদিত, কিন্তু রাত্রির প্রথম প্রহর সমাপ্ত হবার পূর্বে আমাকে গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আসুন নাট্যমঞ্চে কী কী কলা প্রদর্শিত হয় তা কিছুক্ষণ উপভোগ করি। অতঃপর আমি বিদায় নেব।

মুগ্ধবিস্ময়ে উদয়মান দেখছিল এই চপলমতি গ্রাম্য কিশোরীকে। কী অপরূপ মুখশ্রী! উদ্ভিন্ন-যৌবনা এই কিশোরীর তামাটে গাত্রবর্ণ, চঞ্চল চাহনি, আর সুমধুর হাস্যধ্বনিতে প্রচণ্ড আকর্ষণবোধ করল উদয়মান। সে বলল- অবশ্যই আপনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন। তবে এই নির্জন রজনীতে আপনাকে নিঃসঙ্গ যেতে দেওয়া আমার পক্ষে অধর্ম হবে। আমার পৌরুষ আহত হবে।

– নিজের পৌরুষ নিয়ে মহাশয়কে খুবই সচেতন মনে হচ্ছে। চোখ পাকিয়ে দৃষ্টিপাত করল মায়াবতী; আবার খিলখিলিয়ে হেসেও উঠল।

ইতোমধ্যে অস্থায়ী নাট্যমঞ্চে নৃত্যগীত আরম্ভ হয়েছে। নারী-পুরুষ সকল শিল্পীর গাত্রবর্ণ ঘনকৃষ্ণ। সন্দেহ নেই এরা বটেশ্বর এলাকার বনবাদাড়ের আদিবাসী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সন্তান। ভগবান বুদ্ধের প্রতি ভক্তিতে এরা আজ একীভূত হয়ে পড়েছে। উচ্ছ¡সিত আনন্দে প্রায় উন্মত্তের মতো কাঠি চালাচ্ছে দোহারনট। ঘনকৃষ্ণ ঝাঁকড়া চুল মস্তক আন্দোলনে উড়ছে, পড়ছে। নানা অঙ্গভঙ্গী করে ঢোলকের তালে নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে সেও নেচে চলছে। নগ্নদেহ ঘর্মাক্ত। মঞ্চের পাশে মাটিতে উপবিষ্ট দুজন বংশীবাদক। বাঁশের বাঁশিতে সুর তুলছে গভীর নিবিষ্টতায়।

কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হিঙ্গল প্রস্তাব দিল- আরো দীর্ঘক্ষণ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে হলে মঞ্চের সম্মুখে অন্যান্যের সঙ্গে আমাদের মাটিতে আসন পেতে উপবেশন করা উচিত। অন্যথায় এখানেই ক্ষান্ত দিয়ে চলুন অন্যত্র যাত্রা করি।

উদয়মান লক্ষ করল মায়াবতী গভীর মনোযোগ সহকারে শিল্পীদের কলাকৌশল উপভোগ করছে। দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কিছুটা উচ্চস্বরেই তাকে ডাকল- সুচিস্মিতা মায়াবতী! আপনি কি গৃহে প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবছেন? তাহলে চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

মায়াবতী যেন ঘুম থেকে অকস্মাৎ জেগে উঠল। অতিব্যস্ত হয়ে বলল- হ্যাঁ, তাই ভালো।

অনুষ্ঠানের ভিড় কাটিয়ে বৃক্ষলতায় ছায়াচ্ছন্ন পায়েচলার পথের পানে এগিয়ে গেল মায়াবতী, উদয়মান এবং হিঙ্গল। তখন চন্দ্রালোক বৃক্ষছায়ায় অপরূপ আলো-আঁধারী খেলায়- কাঁপছে, দুলছে; মনে হচ্ছে বাদ্যের তালে তালে এরাও নৃত্যপ্রয়াসী। এত সুন্দর জ্যোৎস্না যেন মাযাবতী আর দেখে নি। কেমন যেন অনাস্বাদিত এক ভালোলাগা অনুভব। ইচ্ছে হলো জ্যোৎস্নার আলো আঁচল ভরে তুলে চোখে-মুখে মেখে নেবে। ভ্রূ তুলে উদয়মানের প্রতি তাকিয়ে সে বলল- চলুন, এগিয়ে দেওয়ার পৌরুষপূর্ণ কর্মে বাধা দিয়ে আপনার আত্মমর্যাদায় আঘাত করতে চাই না। চলুন। আমাদের গৃহাঙ্গন কিন্তু মোটেও দূরে নয়।

নিঃশব্দে হাসল উদয়মান। দুই ভ্রূবলণ্ঢীর বিলোল লজ্জায় আরো সুন্দর হয়ে উঠল মায়াবতী।

এমনি সময়ে বৃক্ষতলের খণ্ড খণ্ড ঘন অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে এল এক কান্তিমান যুবা। নমস্কারের ভঙ্গিতে করযুগল যুক্ত করে বলল- শুকদেব তনয়া, দেবী কর্বটকন্যা, আপনাকে নমস্কার। কেমন আছেন? আমাকে কি স্মরণ করতে পারছেন?

চোখ তুলে তাকাল মায়াবতী। বিস্মিত, হতচকিত। মনোযোগ দিয়ে দেখল হিঙ্গল এবং উদয়মানও। এসময়ে এরূপ আগন্তুক অপ্রত্যাশিত। মিটমিট করে হাসছিল। মুহূর্তে একটু দূরত্ব রেখে তার পশ্চাতে এসে দণ্ডায়মান হলো প্রায় লিঙ্গপট্ট পরিহিত শস্ত্রধারী দুই ভুঁড়িষ্মান সহচর। মায়াবতীর স্মরণ করতে আর কোনো কষ্ট হলো না। প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল- হ্যাঁ, বীরপ্রবর অর্কদাসকে দেখতে পাচ্ছি। আমরা অতিশয় ভালো আছি। কিন্তু এ সময়ে এখানে আপনার উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত।

অপ্রত্যাশিত হলে ক্ষতি নেই, অনাকাক্সিক্ষত না হলেই বেঁচেবর্তে যাই। হাস্যোজ্জ্বল মুখে, কৌতুকের স্বরে মন্তব্য করল অর্কদাস। উদয়মান ও হিঙ্গলের প্রতি দৃকপাত করে পুনরায় বলল- তা, এ সময়ে আপনার এই সহ-গামীদ্বয় কারা? এদের পরিচয় জানতে পারি কি?

 

– হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। জবাব দিল মায়াবতী। ইনি হিঙ্গল। বটেশ্বরেরই এক মল­ গোত্রের তরুণ যুবক। সন্ন্যাস গ্রহণ করে ইনি গুরুদেবের আশ্রমে স্থিত। সঙ্গীজন শ্রীমান উদয়মান। হিঙ্গলের বন্ধু। পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগত। দেহগঠন আর গাত্রবর্ণ দেখেই হয়তো বুঝে থাকবেন যে ইনি আর্য কুলোদ্ভব।

পরস্পর পরস্পরকে নমস্কার বিনিময়ের পর মায়াবতী পুনরায় বলল- এরা আমাকে এগিয়ে দেবার জন্য এসেছিলেন। চলুন, আপনিও আমাদের সঙ্গে। আপনি থাকলে আমাদের পথিমধ্যেকার নিরাপত্তা আরও সুনিশ্চিত হবে। সঙ্গে শস্ত্রধারী অনুচর আছে যে!

বিদ্রূপের খোঁচা খেয়ে প্রত্যুত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল অর্কদাস। বলল- কর্বট গোত্রের গোত্রপতির রক্ষীদলের অন্যতম সদস্য হিসাবে সর্বত্র আরক্ষা-ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও আমার কর্তব্য বিবেচনা করি। তাছাড়া মধুপূর্ণিমার মেলা অনুষ্ঠানের মতো কর্মকাণ্ডে কতই না অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে পারে। হাজার হোক, বটেশ্বর তো আমাদের গোত্রপতির দায়িত্বাধীন এলাকাই বটে।

কৈফিয়তের স্বরে বললেও অর্কদাসের বক্তব্যে একটা দৃঢ়তা ও গৌরবের ভাব ফুটে উঠল। অর্কদাসের গাম্ভীর্য ও দৃঢ়তায় কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে মায়াবতী বলল- হ্যাঁ, আপনাদের আরক্ষা-ব্যবস্থা কার্যকর থাকার অবশ্য প্রয়োজন আছে। কিন্তু দুজন মাত্র রক্ষী নিয়ে এত বড় মেলাপ্রাঙ্গণে কোথায় কী ঘটছে কী করে নিয়ন্ত্রণ করবেন? তাছাড়া রক্ষী দুজনও তো সর্বদা আপনার কুক্ষি-সংলগ্ন থেকে আপনারই দেহ-নিরাপত্তায় ব্যস্ত?

সশব্দে হেসে উঠল অর্কদাস। অতঃপর দুই কর যুক্ত করে নাটকীয় ভঙ্গীতে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে বলল- দেবী মায়াবতীর নিকট সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই যে সামন্ত, মহা-সামন্ত, রাজা-মহারাজাদের গণপ্রশাসন এবং আরক্ষা-ব্যবস্থাকে এত সহজ মনে করলে ভুল করা হবে। শস্ত্রধারী রক্ষী মাত্র দুজন হলেও সমগ্র মেলাপ্রাঙ্গণ জুড়ে আমাদের যথেষ্ট সংখ্যক গূঢ়-পুরুষ ও গূঢ়-নারী কর্মরত আছে। ওদের পরিচয় গোপন। লোকজনের সঙ্গে মিশে আছে, কর্মসাধন করছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। তথ্য সংগ্রহ করা ওদের কাজ। যথাসময়ে আমাদেরকে জ্ঞাত করবে। গোত্রপতি প্রদোষ দেবের আরক্ষা-ব্যবস্থার কার্যকারিতার ত্র“টি নেই।

মায়াবতীর হাসিহাসি মুখ আরো উজ্জ্বল হলো। বলল- বীরযোদ্ধা অভয় কোচের পুত্রবর বুঝি এতদিনে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে ফেলেছেন। আপনার বক্তব্য ও আচরণে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস লক্ষ করে সত্যিই স্বস্তিবোধ করছি। এবার নিশ্চিন্তে বনাভ্যন্তরের অন্ধকার অতিক্রম করা যায়, চলুন।

শুকদেবের গৃহপ্রাঙ্গণের উৎরাই পেরিয়ে অগ্রসর হতেই সকলে লক্ষ করল যে তিনি প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় আসন পেতে উপবিষ্ট। কন্যার জন্য উদ্বিগ্ন না হলেও প্রতীক্ষারত। কয়েকজন তরুণ যুবাকে মায়াবতীর অনুগামী হতে দেখে শুকদেব কিঞ্চিৎ বিস্ময়বোধ করলেন। মায়াবতীর উৎফুল­ মুখমণ্ডল এবং স্বচ্ছন্দ পদচারণ দেখে তিনি নিশ্চিত হলেন, উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। উঠে দাঁড়ালেন। মায়াবতী প্রায় ছুটে এসে পিতাকে জড়িয়ে ধরল। উচ্ছল আনন্দ প্রকাশ করে বলল- কী যে আনন্দ করলাম মেলার অনুষ্ঠানে। আর, বাবা! তুমি যদি শুনতে গুরুদেবের অমৃতভাষণ। সত্যিই অমৃত। গুরুদেবের কাছে আরো যাব, বারে বারে যাব- আমি জানব জীবনের সত্যিকারের আনন্দের কথা।

শুকদেব কন্যার আনন্দোচ্ছ্বাস দেখে চোখের জল মুছলেন। বৎসরাধিক পূর্বে পত্নী গতায়ু হলে কন্যা মায়াবতী যেন অকস্মাৎ পরিণত বয়স্ক হয়ে পড়েছে। শুকদেবের পরিচর্যায় নিয়োজিত আছে মাতৃস্নেহ নিয়ে, গভীর মমতায়। কন্যার মাথায় মুখে আদর করে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন- শান্ত হ মা। দেখি গৃহপ্রাঙ্গণে অভ্যাগত কারা; ওদেরকে তো সসম্মানে অভ্যর্থনা করতে হবে।  

অসময়ে এত লোকের উপস্থিতিতে কৌতূহলী হয়ে গৃহাভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে এল মদনিকা। সঙ্গে ভানুপ্রসাদও। মায়াবতী দাওয়া থেকে দ্রুত নিচে নেমে সকলকে পুনরায় অভ্যর্থনা করল। বলল- ইনি আমার পিতা। আর এই যে, এখন এসে উপস্থিত হয়েছেন আমার অগ্রজ, পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান ভানুপ্রসাদ এবং ভ্রাতৃজায়া মদনিকা দেবী।

দাওয়া থেকে নেমে এলেন শুকদেব। সকলকে সাদরে আহ্বান করলেন- এসো এসো। অর্কদাসের দিকে তাকিয়ে বললেন- তুমি তো রক্ষীদলে প্রশিক্ষণরত। কুশলে আছেন তো গোত্রপতি প্রদোষ দেব? উদয়মান ও হিঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বললেন- এদেরকে তো আগে দেখি নি?

মায়াবতী এগিয়ে এসে বলল- এ হলো হিঙ্গল। বটেশ্বর এলাকার বনাভ্যন্তরে বসবাসরত এক মল­ গোত্রের যুবক। সন্ন্যাস গ্রহণ করে সম্ভারের আচার্য মহাশয়ের আশ্রমে শিক্ষার্থী ছিল বৎসরাধিককাল। আর ইনি হচ্ছেন শ্রী উদয়মান। আচার্যের আশ্রমে হিঙ্গল মল্লের অগ্রজ সতীর্থ।

সকলে সসম্ভ্রমে শুকদেবকে নমস্কার করল। শুকদেব কষ্ট স্বীকার করে গৃহ-প্রাঙ্গণে পদার্পণ করায় সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং আতিথ্য গ্রহণ করার অনুরোধ করলেন।

উদয়মান এবং হিঙ্গলকে লক্ষ করে শুকদেব জানালেন- দ্যাখো, বৎসগণ। আমি বিষ্ণুভক্ত এবং তোমাদের গুরুদেব আচার্য অহিরুদ্র দেবের বিশেষ অনুরাগী। প্রতি বৎসর অন্তত একবার করে ওখানকার বিষ্ণুমন্দিরে পূজা দিতে যাই, আচার্যদেব মহাশয়কে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসি। তোমরা সকলে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করো। এক্ষণে বিশ্রাম নাও, আমার মা-লক্ষী মায়াবতী স্বল্পক্ষণেই তোমাদের ভোজনের ব্যবস্থা করতে পারবে।

উদয়মান বলল- মান্যবর! আপনার সমাদরে আমরা গর্ববোধ করছি। আপনাকে ধন্যবাদ। হিঙ্গলের সঙ্গে আমিও গুরু ভবদেবের আশ্রমে আশ্রয় নেব। ভবিষ্যতে কোনদিন আপনার গৃহে উপস্থিত হয়ে আতিথ্য গ্রহণ করে ধন্য হব।

উদয়মানের বক্তব্যে সকলে তাকে সমর্থন করল। অবশেষে বিদায়কালে শুকদেব হাত তুলে সকলকে আশীর্বাদ করলেন। মায়াবতী সুযোগমতো কোনো একদিন অতিথি হওয়ার আবেদন জানিয়ে গৃহপ্রাঙ্গণের কিছু দূর অগ্রসর হয়ে তাদেরকে বিদায় জানাল।

 

 

 

তিন.

 

বটেশ্বর শিবমন্দিরে বর্ষব্যাপী চলে নানা পূজা-অর্চনার আয়োজন, উৎসব, মেলা। শিবপূজা, যোনীপূজা, দেবদেবীকে ভোগদান, পূর্ণিমা উৎসব …। মল­, ডোম, চণ্ডাল, হাজং, কোচসহ বিভিন্ন কৌমের প্রবীণেরা পিতৃপুরুষ তর্পণ করেন। আনন্দোৎসব জমে ওঠে নবান্নে, বসন্তে, মাঘী-পূর্ণিমায়, নববর্ষে এবং বৈশাখী-পূর্ণিমায়। গুরু ভবদেব প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষার্থী ভক্তদেরকে নিয়ে তত্ত্বালোচনায় বসেন। জীবনকে আরো সুন্দর ও আনন্দময় করে গড়ে তোলার নানা পথ নিয়ে তর্কের সূত্রপাত করেন, মতামত গ্রহণ করেন। পুরাকালের শাস্ত্রকার ও বিদগ্ধজন কোন বিষয়ে কী মতামত দিয়েছেন তার ব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীদেরকে তা নিজ বিবেচনায় গ্রহণ কিংবা বর্জন করার পরামর্শ দেন। প্রাচীনকালের ধর্মসূত্র, নবঘোষিত মনুর বিধান নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দেন যে, জ্ঞানের দ্বার বর্ণ-গোত্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত। সকলে যদি নিজ নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আন্তরিকভাবে মত-বিনিময় ও আলোচনায় নিবিষ্ট থাকে তাহলে মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত এই চার স্তর মিলে যে অন্তর-ইন্দ্রিয় তা অবশ্যই জাগরূক হবে। অবশ্যই সত্যের সন্ধান মিলবে। জীবন আনন্দের- পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধই আনন্দের মূল উৎস।

মায়াবতী নিয়মিত তত্ত্বালোচনায় উপস্থিত থাকে। গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সে তত্ত্বালোচনা শ্রবণ করে। কেবল গুরুদেবের বক্তব্য নয়, অন্যদের মতামতও। উদয়মানও কথা বলে। তার কথা শুনে মায়াবতীর এই ধারণা জন্মে যে, সে রীতিদ্রোহী এবং সাহসী। সে বক্তব্য দেয় ধীর স্থির লয়ে, কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে। তার জ্ঞানের বিস্তৃতি অনেক। বহু শাস্ত্রকার-পণ্ডিতের উদ্বৃতি দিয়ে সে যুক্তির বিস্তার করে। এই নিরহঙ্কারী, জ্ঞানী ও সুদর্শন যুবকের প্রতি মায়াবতী কেমন যেন আকর্ষণ বোধ করে। সে তার সান্নিধ্য কামনা করে, তার সঙ্গে আলোচনা কিংবা বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে আনন্দবোধ করে। অনেক জ্ঞানের কথা তার থেকে সে গ্রহণ করে- নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝে নেবার চেষ্টা করে।

কথা বলে হিঙ্গল মলণ্ঢও। তবে সে কিঞ্চিৎ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। কথায় কথায় ছড়া কাটে, কণ্ঠে সুর তোলে, কখনো কখনো হেঁটে যায় নৃত্যের তালে এবং যখন-তখন হেসে ওঠে সশব্দে। দু-তিন বৎসর পূর্বে একবার শৈবসন্তের একটি চারণ দল আশ্রমে এলে তাদের সঙ্গে জুটে পড়েছিল বালক হিঙ্গল মল­। চারণ দল বিদায় নিলে সে আশ্রম ছেড়ে তাদের সঙ্গেই পালিয়ে যায়। অবশেষে একসময়ে সম্ভারের আচার্যের আশ্রমে ঠাঁই পেয়ে যায়। সেখান থেকেই সে উদয়মানের স্নেহধন্য অনুসারি। তার যত জ্ঞানের কথা, সব উদয়মান থেকেই পাওয়া বলে মায়াবতীর ধারণা।  

প্রত্যুষে শুকদেব সূর্যস্তব সমাপ্ত করে প্রার্থনা-কুটিরের দাওয়ায় বসে কী যেন ভাবছিলেন তন্ময় হয়ে। মায়াবতী প্রতিদিনের মতো প্রত্যুষকালীন গৃহকার্যাদি সম্পন্ন করে মিষ্টান্ন ও ফলাহারসহ পিতার সমীপে উপস্থিত হলো। পিতৃদেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল- বাবা! বিগত কয়েকদিন থেকে লক্ষ করছি আপনি চিন্তাক্লিষ্ট ও বিষণ্ন। বিষ্ণুমন্দির স্থাপন-সংক্রান্ত জটিলতা ছাড়া আরো কোনো নতুন সমস্যার কি সৃষ্টি হয়েছে?

শুকদেবের চমক ভাঙ্গল। বললেন- না, তেমন কিছু নয়। আমার সন্নিকটে উপবিষ্ট হও। এসো একযোগে ফলাহার গ্রহণ করি এবং তৎসঙ্গে কয়েকটা কথা বলে নেই। শুকদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন- আচ্ছা মা-মণি, তোমার ভ্রাতা ও ভ্রাতৃবধূ তো দিনক্ষণ তাদের দুটি সন্তান আর জমি-জিরাতের নানা কর্মে ব্যস্ত থাকে। ক্ষেত্রকর্মকার ও গৃহদাসদাসীদের তত্ব নিয়েই তাদের দিনমান কেটে যায়। তোমার মাতা গতায়ু হয়েছেন কতদিন আগে তোমার কি স্মরণ আছে?

মায়াবতী নভোমণ্ডলে দৃষ্টি মেলে ধরে মাতার মৃত্যুর কথা স্মরণ করার চেষ্টা করল। মনে মনে হিসাব-নিকাশ করে বলল- সম্ভবত তিন বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এমনি পৌষ-পার্বণের কোনো উৎসবে দিনব্যাপী পরিশ্রম করে আমাদের সকলকে আদর-আপ্যায়ন করে রাত্রিতে বিশ্রাম নিতে গেলেন। আর উঠলেন না। শুকদেবের বিষণ্ন মুখমণ্ডলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মায়াবতী ছলছল চোখে পিতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল- জানো তো বাবা! প্রাণ অনিঃশেষ। যা কিছু অস্তিত্ববান সমস্তই প্রাণ থেকে নিসৃত হয়ে প্রাণে স্পন্দনশীল থাকে। গুরুদেব প্রায়শ এ কথাটি বলে থাকেন।

শুকদেব কন্যার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভবদেবের তত্ত্বালোচনায় অংশগ্রহণ করে কন্যা তার জ্ঞান-বুদ্ধিতে পরিণত হয়ে উঠছে। মায়াবতীকে কাছে টেনে নিয়ে মস্তকোপরি হস্ত স্থাপন করে আবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়ে পড়লেন শুকদেব। বললেন- জানো মা-মণি! এই দিনে তোমার মাতা আমাদের মায়া ছেড়ে দেহত্যাগ করে অনন্তলোকে প্রস্থান করেছিলেন। আমাদের বদ্যি আনার সময়টুকুও দেন নাই। রাত্রিশেষে আমার পাশ থেকেই শয্যা ছেড়ে উঠে বলেছিলেন- আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আমি প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত। কণ্ঠতালু বিশুষ্ক, আমাকে একটু জল দিতে পারেন? জল এনে দিলে এক গণ্ডূষ পান করেই আমার কাঁধে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠল। মায়াবতীও বিষণ্ন হয়ে পড়ল। তবুও পিতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল- বাবা, তুমি কি মৃত আত্মার তর্পণে বিশ্বাস করো? মাতার তর্পণ করে আমরা ভোগ দিতে পারি, যেমন এখানকার অনেক জনগোষ্ঠী করে থাকে।

শুকদেব নিশ্চুপ রইলেন। মায়াবতীর প্রস্তাব সম্পর্কে কোনো মতামত দিলেন না।

শুকদেবকে এমন বিমর্ষ দেখে মায়াবতী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল- বিষ্ণুমন্দির স্থাপনের উদ্যোগ ছাড়াও নতুন কোনো গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে কি?

হ্যাঁ, দিয়েছে বৈ কি। শুকদেব কিয়ৎক্ষণ আনমনে ভাবলেন।

সমস্যাটি দীর্ঘদিনের এবং জটিল। মায়াবতী যখন নবম বর্ষে পা রাখল তখন থেকেই শুকদেব কন্যাকে পাত্রস্থ করার চিন্তায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। প্রাচীন ধর্মসূত্রের বিধান থেকে শুরু করে সমকালীন মনুসংহিতার বিধান সর্বত্রই কন্যাকে যত শীঘ্র সম্ভব পাত্রস্থ করার তাগিদ রয়েছে। কর্বটগোত্রের গৃহস্থ-সমাজের রীতিও তাই। সপ্তম বর্ষীয়াকে গৌরীদান, নবম বর্ষীয়াকে রোহিনীদান এবং সর্ব্বোচ্চ একাদশ বর্ষীয়াকে কন্যাদান একান্ত আবশ্যক। কেননা বিষ্ণু বলেছেন- প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কোনো বালিকার বিবাহ না হলে তাকে বৃষলী বলে গণ্য করা উচিত। মায়াবতীর মাতার জীবিতাবস্থায় কন্যার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা প্রায় সমাপ্তির পথে ছিল। পাত্র ছিল শিবপুর নিবাসী কৃষক; স্বচ্ছল ও স্বাস্থ্যবান। মায়াবতী কিছুতেই বিবাহে সম্মত হয় নাই। পাত্রের বয়স কিছুটা বেশি হওয়ায় শুকদেবের স্বর্গত স্ত্রী শান্তাদেবীও সম্মতি দেন নাই। তিনি বলেছিলেন- যে বালিকা বিবাহের অর্থই বোঝে না, যে একেবারেই অপরিণত, তাকে পূর্ণবয়স্ক অপরিচিত একজন পুরুষের ঘরে পাঠিয়ে আমি কিছুতেই শান্তিতে থাকতে পারব না, বলে দিলাম।

শুকদেব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। বলেছিলেন যে, কন্যাকে দ্রুত পাত্রস্থ করার বিষয়ে সকল শাস্ত্রই তাগিদ দিয়েছে। কিয়ৎক্ষণ বিষণ্ন মুখে নীরব থেকে শান্তিদেবী জবাব দিয়েছিলেন- হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে প্রাপ্তবয়স্কা না হতেই বিবাহ দিতে হবে এ কথা কিন্তু ভগবান বিষ্ণুও বলেন নি। তাছাড়া ছেলেবেলা থেকেই তো রাত জেগে কত রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনেছি। বিবরণ-ব্যাখ্যা শুনেছি বিজ্ঞ পণ্ডিত ও শাস্ত্রপাঠকদের মুখে। মহাভারতের মহিয়সী নারীগণ- শকুন্তলা, সাবিত্রী, সত্যবতী, কুন্তি, দ্রৌপদী এদের বিবাহ বয়োঃপ্রাপ্তির পূর্বেই হয়েছিল এ কথা তো কেউ বলেন নি। হিড়িম্বা যে ভীমকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করল তখন কি সে অপ্রাপ্তবয়স্কা ছিল? তবে? কলিযুগের শাস্ত্রকারগণ এ কথা কেন বলছেন তাও ভেবে দেখার বিষয়। কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আবার বলেছিলেন- আমার কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করব না, এ কথা বলে রাখলাম। তাছাড়া বিবাহের ব্যাপারে কন্যার মতামতেরও প্রয়োজন বৈ কি।

শুকদেবের দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে সেটাই ছিল প্রথম মতান্তর। মতান্তর থেকে মনান্তর। মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্ব থেকেই শান্তাদেবী স্বামীসেবা করেছেন নিজ কন্যা মায়াবতীর মাধ্যমে। শুকদেব জানতেন না যে তাদের সেই দাম্পত্য-কলহ এরূপ নির্মম পরিণতি ডেকে আনবে।

দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ থেকে শুকদেব কন্যার মুখটি তুলে ধরলেন। উত্তরীয়ের খুঁটে মায়াবতীর অশ্র“ মোচন করলেন এবং নিজের শোকাতুর মুখমণ্ডলে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে বললেন- হ্যাঁ, মা-মণি! তুমি গুরু ভবদেবের সঙ্গে পরামর্শ করে তোমার সতীর্থ কোনো ঘনিষ্ট বন্ধুজনকে নিয়ে মাতৃতর্পণ করার ব্যবস্থা করতে পারো। আমি নিজে সেখানে যেতে পারব না, তবে তোমাকে দ্বিধাহীন চিত্তে সম্মতি জ্ঞাপন করছি। তুমি কখনো অরক্ষণীয়া হবে না, তোমার স্বর্গত মাতার আশীর্বাদ তোমার জীবনে সর্বদা মাঙ্গল্য হয়ে বিরাজ করবে।

মায়াবতী অরক্ষণীয়া হবে না বলে যতই অভয়বাণী শোনান না কেন শুকদেব তাকে পাত্রস্থ করা নিয়ে প্রকৃতই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন। সমগ্র দিবস নানা কর্মের মধ্যেও সে-ভাবনার অবসান হলো না। শিবপুরের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পুলিন ভট্টের সাম্প্রতিক ক্রিয়াকলাপে বিষয়টি তার কাছে একটি গুরুতর সমস্যা হিসাবে প্রতিভাত হচ্ছিল। সমস্যাটির মুখোমুখি কীভাবে হবেন সেটাই ছিল ভাবনার বিষয়। গত সপ্তাহে বিষ্ণুমন্দির স্থাপন-সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য শিবপুরের বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পুলিন ভট্টসহ আরো কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সমাজপতি শুকদেবের গৃহে আগমন করেছিলেন। মায়াবতীকে তখন ওরা দেখে থাকবে। মায়াবতী এখনও অনূঢ়া লক্ষ করে ওরা কেবল বিস্মিত নয়, বিচলিতও হয়েছিলেন। গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়েও শুকদেব তার কন্যাকে এখনও পর্যন্ত পাত্রস্থ করেন নাই- এটা তাদের কাছে ছিল বিলক্ষণ নিন্দার বিষয়। পুলিন ভট্ট বিদায় গ্রহণের প্রাক্কালে শুকদেবকে পৃথকভাবে করে ডেকে নিয়ে সমস্যাটির সত্বর সমাধানের পরামর্শ দিয়ে গেছেন। এর অন্যথা হলে সমাজপতিরা শাস্ত্রমতে বিধান দিতে অগ্রসর হতে পারেন- এমন কথা তিনি ভদ্রভাবে বললেও এর মধ্যে রূঢ় একটা হুমকি লুক্বায়িত ছিল। সেটা ভেবেই শুকদেব কদিন ধরে বিশেষ চিন্তিত। স্বর্গত স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা ও জীবন সম্পর্কে কন্যার সাম্প্রতিক মনোভাব বিবেচনায় হুট করে অপরিচিত কোনো পাত্রের সঙ্গে মায়াবতীর বিবাহদান যে সম্ভব না এ কথাটি মর্মে মর্মে তিনি উপলব্ধি করেছেন। সুতরাং সমাজপতিগণ অনভিপ্রেত কোনো পদক্ষেপ নিতে অগ্রসর হলে কীভাবে তার মুখোমুখি হবেন সেটাই ছিল তার ভাবনার বিষয়।

বিষ্ণুমন্দির স্থাপনের ব্যাপারে স্থানীয় গোত্রপ্রধানদের উৎসাহ না থাকলেও কোনো আপত্তি ছিল না। শিবপুর বীথির সামন্তগণের উদ্যোগে লোহার লাঙ্গল দ্বারা চাষ করে ফসল বৃদ্ধির প্রচারণাকে জনগোষ্ঠীর সকলে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছে। বটেশ্বর শিবমন্দিরের পুরোহিত এবং আশ্রমের গুরু ভবদেব এ ব্যাপারে ইতিবাচক বক্তব্য রাখছেন গত এক বৎসর ধরে। ফলে লাঙ্গলের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে বটেশ্বরের কৃষিক্ষেত্রে। এ সকল প্রচারণায় সবচেয়ে উৎসাহী প্রবক্তা সম্ভার থেকে আগত তরুণ বৌদ্ধ শ্রমণ শ্রী উদয়মান এবং তার ঘনিষ্ট বন্ধু শ্রীমান হিঙ্গল মল­। কিন্তু একটি বিষয়ে তারা দুজনই বিশেষভাবে সতর্ক। গুরুদেবের তত্ত্বালোচনায় ওরা মনু-সংহিতার বিধানের কঠোর সমালোচক। শূদ্র নারী ও অন্ত্যজ গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি মনু-সংহিতায় যে সকল বৈষম্যমূলক বিধান আছে সেগুলোকে কোনো অবস্থাতেই সমাজের মান্যতা দেওয়া উচিত নয়- এই মত তারা যথেষ্ট দৃঢ়তা ও সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করছে। শোনা যায় শিবপুর বীথির সামন্তদের নিয়োজিত গূঢ় নারী-পুরুষ এ সকল তথ্য যথাস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। কদিন পূর্বে কর্বট গোত্রপতির রক্ষীদলের অন্যতম পরিচালক অর্কদাস এসেছিল এসব ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে। মায়াবতীর নিকট থেকে শুকদেব জানতে পেরেছে যে অর্কদাস সেদিন উদয়মান ও হিঙ্গলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছে। মায়াবতীও ওদের আলোচনায় উপস্থিত ছিল এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। সামন্তশাসক ও তাদের অনুসারী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের চতুর্বর্ণ-ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগের বিরোধিতা করার বিষয়ে সকলে একমত হয়েছে। তবে গোত্রপতি প্রদোষ দেবের মতামত এখনো জ্ঞাত নয় বলে অর্কদাস তার মতামত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করছে না।

অপরাহ্নে মায়াবতী আশ্রমে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে পিতাকে জানাতে এল। শুকদেব কন্যাকে ডেকে নিজের কাছে বসালেন। বললেন- আচ্ছা মা-মণি, তুমি তো আশ্রমগুরু ও অন্যান্যের সান্নিধ্যে অনেক বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছ। আমাদের বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে একজন বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত পুরোহিতের দায়িত্ব নেবেন। হয়তো শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যাপীঠও গড়ে তুলবেন। তোমাকে যদি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারি তুমি কি সেখানে যাবে?

-শিক্ষাগ্রহণে আমার বিলক্ষণ আগ্রহ আছে। কিন্তু শুনতে পাই, ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাব্যবস্থা তো শুধু ব্রাহ্মণ পুত্রদের জন্য উন্মুক্ত। ওদের বিধানমতে অন্যান্য বর্ণের সন্তানদের ক্ষেত্রে সে-সুযোগ সীমিত। শূদ্র, অন্ত্যজ ও নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগ্রহণের তো প্রশ্নই ওঠে না। খুব দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পিতৃসমীপে মায়াবতী তার এই বক্তব্যটি উত্থাপন করল।

শুকদেব গম্ভীর হলেন, বললেন- কথাগুলো তুমি সঠিক বলেছ। তবে সম্ভারের বিষ্ণুমন্দিরের প্রধান পুরোহিত আচার্য অহিরুদ্র দেব বিশেষ উদার দৃষ্টিভঙ্গীর মানুষ। সমাজের বিভিন্ন ধর্মমত ও শ্রেণীসমূহের মধ্যে সমন্বয়-সাধনকে তিনি কল্যাণের পথ বলে মনে করেন। তিনি বিষ্ণুমন্দিরে যাকে পাঠাবেন তিনিও উদার দৃষ্টিভঙ্গীর ব্রাহ্মণ হওয়াই সম্ভব।

পিতার মুখমণ্ডল গভীর মনোযোগ সহকারে কিয়ৎক্ষণ নিরীক্ষণ করল মায়াবতী। কী যেন বোঝার চেষ্টা করল। তারপর প্রশ্ন করল- আচ্ছা বাবা! আমি আশ্রমে তত্ত্বালোচনায় অংশগ্রহণ করে যেসব বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছি তাকে কি তুমি ভুল শিক্ষা মনে করছ?

 

-না, তা কেন হবে? তড়িৎ জবাব দিলেন শুকদেব।

-তাহলে বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিতের নিকট আমাকে পাঠানোর কথা কেন ভাবছ? 

-আমি তো বিষ্ণুভক্ত। ওখানে গেলে তোমার অন্তরেও বিষ্ণুভক্তি জন্ম নিতে পারে- এ প্রত্যাশা করে তোমাকে ওখানে পাঠানোর কথা ভাবছি। শুকদেব কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আবার বললেন- দেখো মা-মণি! আমাদের সমগ্র কর্বট গোত্রের অধিকাংশ মানুষ শিবের পূজারি। আমি আচার্য অহিরুদ্র দেবের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেছি। তিনি সম্ভারের অন্তর্গত যত মণ্ডল ও বীথি আছে সেখানে বসবাসকারী সকল মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে বিষ্ণু ও শিবের পূজারিদের মধ্যে একটি সমন্বয় সৃষ্টির প্রয়াসে রত। আমার গুরু আচার্য অহিরুদ্র দেবের অনুপ্রেরণাতেই আমি এ অঞ্চলে একটি বিষ্ণুমন্দির করার উদ্যোগ নিয়েছি। আচ্ছা, তুমি এখন যাও। উদয়মানকে আমার পক্ষ থেকে অনুরোধ করো আগামীকল্য দ্বিপ্রহরের পূর্বে সে যেন হিঙ্গলকে নিয়ে আমাদের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করে। তাকে বলবে, তার সঙ্গে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমি আলোচনা করতে চাই।

 

 

 

 

 

চার.

 

পৌষের হিম কণ্টকিত সকাল। সূর্যতাপে শীতের তীব্রতা হ্রাস পেলে উদয়মান সতীর্থ হিঙ্গল সমভিব্যাহারে শুকদেবের গৃহপ্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলো। নমস্কার করে উদয়মান শুকদেবকে বলল- প্রভাতকালীন কার্যাদি সব গুছিয়ে গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে এসেছি। প্রয়োজনে সময় নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনায় নিমগ্ন থাকতে পারব।

শুকদেব প্রার্থনা-কুটিরের দাওয়ায় ওদের আসন পেতে দিয়ে নিজেও উপবিষ্ট হলেন। মনে হলো, একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি তিনি নিয়ে রেখেছেন। কিছুটা ইতস্তত করে শুকদেব বললেন- তোমরা তো ভবদেবের আশ্রমে স্থিত আছ বৎসরাধিককাল হলো। ইতোমধ্যে সম্ভারের বিষ্ণুমন্দির, কিংবা আচার্য অহিরুদ্র দেবের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছে?- না, জ্যেষ্ঠতাতঃ। এখানে আসা অবধি আর কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করি নি। জবাবে উদয়মান বলল। তবে আসার পূর্বে আমাদেরকে তিনি যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

হিঙ্গল মাঝখানে প্রশ্ন করল- ক্ষমা করবেন জ্যেষ্ঠতাতঃ। আপনার কাছে কি সম্ভারের কোনো সংবাদ আছে?

শুকদেব উভয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ থাকলেন। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন- হ্যাঁ, বৎস। সংবাদ আছে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ। সে-বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্যই তোমাদেরকে ডেকে এনেছি।

উদয়মান ও হিঙ্গল উভয়েই বিস্ময়াবিষ্ট ঔৎসুক্য নিয়ে শুকদেবের প্রতি তাকিয়ে রইল।

কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে শুকদেব বলতে আরম্ভ করলেন- এ মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি সম্ভার গিয়েছিলাম। গুরু অহিরুদ্র দেবের আতিথ্য নিয়ে সেখানে তিন দিন অবস্থান করেছি। সে-সময়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। সে-কথাটিই তোমাদেরকে জানাব এবং পরবর্তীকালে এ ব্যাপারে আমাদের কী করণীয় থাকতে পারে তা নিয়ে পরামর্শ করব।

শ্রোতৃদ্বয়ের কৌতূহল বাড়ল। ওরা অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকল পরবর্তী বক্তব্য শ্রবণের জন্য। ইতোমধ্যে মায়াবতী দাওয়ার এক প্রান্তে হস্তমুখাদি প্রক্ষালনের জন্য দুই ঘটি জল রাখতে গিয়ে পিতার মুখে সম্ভারে ঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা শুনে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পারল না। দুজনের মাঝখানে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

তোমরা নিশ্চয় জানো যে আমরা যে এলাকায় বসবাস করি এটা সম্ভার নামক একটা ছোট্ট বিষয় বা রাজ্যের অন্তর্গত। সম্ভার নামক বিষয়টি মগধে প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্ব-প্রান্তীয় বহিঃসীমানায় অবস্থিত। সম্ভার রাজ্যের পূর্বে বিশাল বিস্তৃত জলাভূমি। বর্ষব্যাপী প্রায় সমগ্র এলাকা জলমগ্ন থাকে। লোকে বলে সায়র। ব্রহ্মপুত্র নদ, যার অপর নাম লৌহিত্য, প্রাগজ্যোতিষ ও হৈরম্ব দেশ থেকে নিচে নেমে সম্ভার রাজ্যের মধ্য দিয়ে পূর্ব-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বটেশ্বরের অদূরে এই সায়রে মিশে গেছে। আমরা এই রাজ্য সম্ভারের অধিবাসী। সম্ভারের কল্যাণ-অকল্যাণের সঙ্গে আমাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এদিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে নানা ধর্মের নানা মতের প্রচারে প্রজাদের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সংঘাতেরও সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অসহিষ্ণু আচরণে বিরক্ত হয়ে বর্তমান গুপ্ত সম্রাট কুমারদেব তার রাজত্বকালের শেষ দিকে এসে শৈব ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন। তিনি সকল ধর্মমতের প্রতি সহিষ্ণু আচরণের জন্য সামন্ত-মহাসামন্ত, রাজকর্মচারী, ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের নির্দেশ দিয়েছেন। এই অবস্থায় সম্ভারের বিষয়পতি শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। গত সপ্তাহে একটি শাস্ত্রার্থ পরিষদ আহ্বান করে তিনি মহারাজ পরম ভট্টারক উপাধি গ্রহণ করে নিজেকে সম্ভারের স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা করেন। শাস্ত্রার্থ পরিষদে উপস্থিত সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকুল, বৌদ্ধ আচার্যগণ, সকল মন্দির-মঠের পুরোহিতগণ এবং সম্ভারের অধীনস্ত শিবপুর বীথি, মধুপুর বীথি, ঢবাকা বীথির সামন্ত-মহাসামন্ত ও শ্রেষ্ঠীগণ আনন্দের সঙ্গে অবনত মস্তকে এই ঘোষণা মেনে নেন। এই পর্যায়ে সকলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহারাজ পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেনের প্রতি আনুগত্য পোষণ করার শপথ গ্রহণ করেন। আচার্য-সিদ্ধাচার্যদের প্রতিনিধি হিসাবে সম্ভার মহারাজের কুলগুরু বিষ্ণুমন্দিরের প্রধান পুরোহিত আচার্য অহিরুদ্র দেব ঘোষণা করেন যে, মর্তলোকে রাজন্যবর্গ ভগবান বিষ্ণুর অবতার বলে গণ্য। অতএব তিনি তার রাজ্যের অধীনস্থ প্রত্যেক প্রজার থেকে মান্যতা দাবি করতে পারেন। রাজাকে মান্য করা প্রজাকুলের অবশ্য পালনীয় ধর্মাচারের অংশ। এটাই শাস্ত্রের বিধান।

তার বক্তব্য উপস্থিত সকলে উচ্চস্বরে হর্ষধ্বনি তুলে সমর্থন করেন। আমিও করি। অতঃপর মহারাজ পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেন তার প্রজাদের উদ্দেশে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন যে, তিনি অতিশয় গর্বিত ও আনন্দিত এই জন্য যে তিনি এমন একটি রাজ্যের স্বাধীন শাসক হয়েছেন যেখানে ত্রেতা যুগে রাজা হরিশচন্দ্রের বিশাল প্রাচ্যরাজ্যের রাজধানী ছিল। তাছাড়া তিনি নিজেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বঙ্গরাজ সমুদ্র সেন ও চন্দ্র সেনের বংশধর বলে দাবি করেন। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, নিজে বৈষ্ণব ধর্মে বিশ্বাসী হলেও তিনি বৌদ্ধ, শিবভক্ত, তান্ত্রিক, অজীবিকসহ সকল ধর্মমতের প্রতি অতিশয় উদার ও সহিষ্ণু মনোভাব পোষণ করবেন। রাজ্যের কোষাগার থেকে তিনি বিষ্ণুমন্দির, শিবমন্দির, বৌদ্ধস্তূপসহ সকল প্রার্থনাস্থল ও শিক্ষাআশ্রমে সমভাবে অর্থ-সাহায্য অব্যাহত রাখবেন।

পরবর্তী দুই দিবস সম্ভারে উৎসব-আনন্দের ব্যবস্থা করা হয়। সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য ভোজের আয়োজন করা হয়। দান-দক্ষিণা, যাগযজ্ঞ ও প্রার্থনার মাধ্যমে নগরের সকল প্রজাকুলকে সন্তুষ্ট করা হয়। এইভাবে তিনি ব্রাহ্মণ পুরোহিত, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, ধর্ম-সামন্ত, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সকল রাজকর্মচারীর নিরঙ্কুশ সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হন।

এক্ষণে তিনি তার নব প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে সকল ধর্মমতের সমন্বয় বিধান করে এবং সকল প্রজার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চান। এ ব্যপারে তিনি সকল সচেতন প্রজাকুলের সহযোগিতা প্রার্থনা করেছেন।

শুকদেবের বিবরণটি গভীর মনোযোগের সঙ্গে তারা শ্রবণ করল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে মায়াবতী প্রশ্ন করল- মহারাজের ধর্ম-সমন্বয় ও প্রজাদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা নিঃসন্দেহে অতিশয় মহৎ। তোমার গুরু আচার্য অহিরুদ্র দেব মহাশয়ের আদর্শেই হয়তো মহারাজ অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কিন্তু বাবা, চতুর্বর্ণভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য-ব্যবস্থায় কি ন্যায়বিচার সম্ভব? সকল মানুষকে সহোদরের মতো ভালোবাসা কি সম্ভব? গো-ব্রাহ্মণকে রক্ষা করাই যে ব্যবস্থার মূলকথা সে-ব্যবস্থায় মানব-কল্যাণ কী করে সম্ভবপর হবে, ন্যায়বিচার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? সামাজিক শান্তিই বা কীভাবে বজায় থাকবে?

মায়াবতীর প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উদয়মান ও হিঙ্গল দুজনে উৎসুক হয়ে শুকদেবের মুখপানে তাকিয়ে রইল- কী উত্তর দেবেন শুকদেব?

কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন- আমার গুরু আচার্য অহিরুদ্র দেবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা দুরূহ হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়। তিনি মনে করেন যে ব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণ সমাজব্যবস্থার অপপ্রভাব থেকে সমাজকে রক্ষা করার প্রধান পন্থা হবে শিক্ষার দ্বার বর্ণ, গোত্র, ধর্মবিশ্বাস, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময়কাল ধরে তিনি সেই আদর্শ নিজের জীবনে নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করে চলেছেন। সম্ভার বিষ্ণুমন্দিরের আশ্রমে বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে আগ্রহী শিক্ষার্থীকে গ্রহণ করে এসেছেন। তোমরা দুজন, এমনকি, গুরু ভবদেব এ ঘটনার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। অতটুকু বলে তিনি সকলের মুখপানে দৃষ্টিপাত করে সামান্য হাসলেন এবং বললেন- তোমরা কী বলো, কথাটা ঠিক কি না!

ওরা কেউই কোনো প্রত্যুত্তর করল না। মনে হলো সকলে স্বীকার করছে যে কাজটি দুরূহ হলেও অসম্ভব নয়।

শুকদেব পুনরায় বললেন- দেখো! আমি কিন্তু বটেশ্বরে একটা বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই একই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। এবার তোমরা বলো, বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার কাজটি ত্বরান্বিত করার জন্য আমাদের কীভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত।

এবার মুখ খুলল উদয়মান। বলল- আমার মনে হয়, বিষ্ণুমন্দির স্থাপনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবেন গোত্রপতি প্রদোষ দেব। চক্ষুলজ্জার খাতিরে আপনাকে প্রকাশ্যে একথা না বললেও তিনি বিষ্ণুমন্দির স্থাপনের বিপক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পলাশতলীর কর্বটেরা এর বিপক্ষে তো বটেই, সাম্প্রতিককালে বটেশ্বরের লোকজনও ভাবতে শুরু করেছে যে বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্য উৎপীড়ন বাড়বে, সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি হবে এবং বর্ণপ্রথা-ভিত্তিক আর্যীকরণ কঠোর ও উৎপীড়নমূলক হয়ে দাঁড়াবে।

শুকদেব বিস্মিত হলেন। বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে বৎসরাধিককাল পূর্বে। গুরু ভবদেব সম্মতি দিয়েছেন। প্রদোষ দেব তার গৃহে এসেও এ বিষয়ে কথা বলে নিজের শঙ্কা দূর হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। তাহলে এত বাধা কেন? তাছাড়া উদয়মানও এত কথা কোথা হতে জানতে পারল? শুকদেব প্রশ্ন করলেন- তুমি এত কথা জানলে কী করে বৎস?

প্রদোষ দেবের রক্ষীদলের পরিচালক অর্কদাসের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। আমাদের প্রায়শ দেখাসাক্ষাৎ হয়। সে প্রায়ই বটেশ্বরে আসে। অর্কদাসের কথা থেকে মনে হয় যে প্রদোষ দেব কর্বট গোত্রের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিন্তিত। তিনি মনে করেন তার বিরুদ্ধে কেউ একটা যড়যন্ত্রে লিপ্ত। শিবপুরের সামন্তদেরও এতে যোগসাজস আছে। বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব হয়তো তারই অংশ।

কথাগুলো শুনে হিঙ্গল মাথা দুলাল। উদয়মানের বক্তব্যে এটা সমর্থন-সূচক। এটা নিরীক্ষণ করে শুকদেব এবার আকাশ থেকে পড়লেন। এত কিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ তিনি ধারণা করতে পারেন নি। ব্রাহ্মণ্য উৎপীড়নে শিবপুর ও পঞ্চবটি থেকে যারা এসে বটেশ্বরে বসতি স্থাপন করেছে বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের অনীহার কার্যকারণ এবার স্পষ্ট হলো। কিন্তু প্রদোষ দেবের মন্দির-বিরোধী সক্রিয়তার কারণ কী? সে কি অদ্যাবধি শুকদেবকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে?

মায়াবতীও বিস্মিত হলো। তার সঙ্গে অর্কদাসের সখ্য রয়েছে বলে সে মনে করে। অর্কদাস বটেশ্বরে এলে মায়াবতীর সঙ্গেও দেখাসাক্ষাৎ হয়। কিন্তু এসব কথাতো অর্কদাস মায়াবতীকে কখনও বলে নি। তবে কি মায়াবতীকে অর্কদাস পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছে না? উদয়মান ও অর্কদাস দুজনকেই মায়াবতী বন্ধু বলে জানে। দুজনকেই তার ভালো লাগে। তাহলে উদয়মানই-বা তাকে কেন বিষয়টি অবহিত করে নি? সম্পর্কের ক্ষেত্রে এরূপ দূরত্বের কারণটা কী?

মায়াবতী ও উদয়মান দুজনেই অস্বস্তিতে আক্রান্ত হলো। শুকদেব উপলব্ধি করলেন যে শিবপুর বীথির কুলীন ব্রাহ্মণ পুলিন ভট্ট বা অন্যান্য সমাজপতি নয়, বরং পলাশতলী ও বটেশ্বরের প্রবীণদের সঙ্গে, এবং বিশেষ করে গোত্রপতি প্রদোষ দেবের সঙ্গে যথাশীঘ্র খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন করলেন- আচ্ছা মন্দির প্রতিষ্ঠাকে এগিয়ে নিতে আমরা কি বটেশ্বরে একটা শাস্ত্রার্থ পরিষদ আহ্বান করতে পারি? তেমন ভাবনাই আমার মনে উদয় হচ্ছে। তোমরা একটু ভেবে দেখো।

 

 

পাঁচ.

 

প্রচণ্ড অস্থিরতায় অতিক্রান্ত হলো মায়াবতীর দ্বিপ্রহর। অর্কদাস তাকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারে নি- এ ভাবনাটা তাকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। উদয়মানকে যদি অতটা তথ্য দেওয়া যায় তাহলে মায়াবতীকে নয় কেন? সে কি নারী বলে অনির্ভরযোগ্য? তার বয়স কিঞ্চিত কম বলে সে কি বিশ্বস্ত হতে পারে না?

 

অর্কদাস এলে তার কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর জ্ঞাত হতে হবে। কিন্তু সে তো এপারে প্রত্যেহ আসে না। আজকেও যদি না আসে? অস্থির লাগে মায়াবতীর, অসহ্য বোধ হয়। বহুবিধ ভাবনান্তে সিদ্ধান্ত নেয়, অপরাহ্নে সে আশ্রমে যাবে। যদি সেখানে দর্শন মেলে, ভালো; আর যদি না মেলে তবে আগামীকল্য প্রত্যুষে সে কয়রা নদী পার হয়ে কর্বটপতির বাসগৃহে যাবে। সেখানে পৌঁছাতে পারলে অবশ্যই দর্শন মিলবে অর্কদাসের। কিন্তু কী কারণে অকস্মাৎ পোত্রপতির গৃহে উপস্থিত হয়েছে একথা কেউ জানতে চাইলে সে কী কৈফিয়ত দেবে? কর্বট গোত্রপতির স্ত্রী কিংবা অন্য মহিলাগণ নিশ্চয় কৌতূহলী হয়ে পড়বে তার আকস্মিক উপস্থিতির কার্যকারণ নিয়ে। মায়াবতী কী করে সামাল দেবে সে-পরিস্থিতি? সহজ কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়ে সে।

শীতের অপরাহ্ন। দেখতে দেখতে সূর্য অস্তাচলে যাবে। অন্ধকার নেমে আসবে; কুয়াশার পর্দা পড়ে দৃশ্যমান সবকিছুকেই রহস্যময় করে তুলবে। মায়াবতী প্রস্তুতি নিচ্ছিল আশ্রমে যাওয়ার। প্রতিবার যাওয়ার পূর্বে চঞ্চল পদে সে শুকদেবের সম্মুখে এসে দণ্ডায়মান হয়। হাসিমুখে অনুমতি প্রার্থনা করে, অতঃপর প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে। কিন্তু আজকে মায়াবতীর চলাফেরায় যেন কোনো গতি নেই, কোনো চাঞ্চল্য নেই। কন্যার এহেন ভাবান্তর শুকদেবের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি উদ্বিগ্ন হন। যে কন্যাকে তিনি সর্বদা লক্ষ করেছেন কর্মচঞ্চল ও উৎফুল­, অকস্মাৎ তাকে বিমর্ষ দেখালে উদ্বিগ্ন হওয়ারই কথা। শুকদেব তাকে নিকটে আহ্বান করলেন, তার পার্শ্বে  বসতে বললেন। 

মায়াবতী পিতৃদেবের কাছে এসে বসল। সন্তর্পণে, একটু দূরত্ব রেখে। শুকদেব দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে কন্যাকে কাছে টেনে নিলেন। মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী হয়েছে আমার মা-মণির? এত বিমর্ষ ও নিরানন্দ তো তোমাকে দেখি না কোনোদিন। কোনো বড় সমস্যা হয়েছে কি?

-আমি জানি না বাবা। আমার কিছু ভালো লাগছে না। বলে অকস্মাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল মায়াবতী। শুকদেবকে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

শুকদেব মায়াবতীর মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে আদর করলেন দীর্ঘক্ষণ। অবশেষে জিজ্ঞেস করলেন- তোমাকে কি কেউ কোন কটুকথা বলেছে? বলো মা-মণি, আমাকে তো বলতে হবে। আমি তোমার বুড়ো ছেলে। তোমার কষ্টের কথা আমাকে না বললে আর কাকে বলবে? মায়াবতী নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে মাথা তুলল। বাবাকে আশ্বস্ত করে বলল- আমার কিছুই হয় নি। কেউ কোনো কটুকথাও বলে নি। এখন আমি আশ্রম থেকে ঘুরে আসি; ফিরে এসে তোমার সঙ্গে আলোচনা করব।

অতঃপর মায়াবতী আশ্রম অভিমুখে যাত্রা করল- উদ্ভ্রান্ত, আনমনা। পথিমধ্যে যারা অন্যান্য দিনের মতো কুশল প্রশ্ন করল, তারা বিস্মিত হলো। বটবৃক্ষ তলে পৌঁছাতেই হিঙ্গল মল­ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল- শ্রীমতি মায়াবতীকে অদ্য বড়ই উন্মনা প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ কোনো কার্যকারণ আছে কি?

সম্বিৎ ফিরে পেল মায়াবতী। হাস্য প্রচেষ্টায় মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত করবার চেষ্টা করল।

হিঙ্গল কিছু একটা বুঝে নিকটে এগিয়ে এল। বলল- দেখো! তোমার সঙ্গে এতদিনে আমারও কথঞ্চিৎ সখ্যতা গড়ে উঠেছে বলে আমি ধারণা করি। সমস্যাটি গুরুতর হলে সমাধানের জন্য চলো গুরুদেব সমীপে। আর যদি লঘুতর হয় তাহলে আমার নিকট বিবৃত করতে পারো, সমাধান করে দেব।

হিঙ্গল তার শ্বেতশুভ্র দন্তপাটি বিকশিত করে হেসে উঠল। হাসলে তার ঘনকৃষ্ণ মুখমণ্ডল খুবই আকর্ষণীয় প্রতিভাত হয়। মুখ তুলে মায়াবতীও হাসল। বলল- তোমার অন্য বন্ধুরা কোথায়?

-বন্ধুরা বলতে কাকে কাকে বোঝাতে চাও? উদয়মান আশ্রমেই আছে, হয়তো কোনো কাজে। অন্য আর কে কে আমার বন্ধু হতে পারে? হিঙ্গল বলতে থাকল- কলিঙ্গা? সে তো এখানে সেবিকামাত্র। লহনা? সে তো আমার ভগ্নী, বন্ধু নয়। তবে কি সুপন? সেও তো কুটুম্ব। তবে? অর্কদাস? চোখ টিপে হাসল হিঙ্গল।

মায়াবতী ঘাড় ফিরিয়ে চোখ পাকাল। বলল- হ্যাঁ, গোত্রপতির রক্ষীদলের সেই কর্ণধারকেই আমার প্রয়োজন। কোথায় আছে সে?

-মন্দিরের পশ্চাতে ঐ যে বিশাল পনসবৃক্ষটি দণ্ডায়মান, তার ছায়াতলে নিশ্চিন্তে বসে সময় কাটানোর সুন্দর একটা স্থান আছে। তৃণাচ্ছাদিত উঁচুভূমি, কয়রা নদীর পাড়ে। নির্জন, মনোরম; দুই বন্ধুতে সময় পেলে ওখানেই বসে থাকে। অনেক সময় আমিও থাকি বৈ কি; অবসর অপরাহ্নে এবং গোধূলীলগ্নে পৃথিবীর রূপ দর্শন করতে এর থেকে উত্তম স্থান হতে পারে না। যাবে নাকি ওদিকে একবার? হিঙ্গল পুনরায় রহস্যপূর্ণভাবে হাসল এবং নৃত্যভঙ্গীতে শরীর দুলিয়ে মন্দিরের পশ্চাৎদিকে অগ্রসর হতে থাকল। কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিতভাবে মায়াবতী তাকে অনুসরণ করল।

পনসবৃক্ষ তলে হিঙ্গল-বর্ণিত স্থানটি নির্জন ও মনোহর; আয়াস করে বিশ্রাম নেওয়ার মতো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে সে-মুহূর্তে কেউ ছিল না। না অর্কদাস, না উদয়মান।

হিঙ্গল মাটিতে পড়ে থাকা একটা মৃত বৃক্ষকাণ্ডে আয়াস করে বসে চিৎকার করে বলল- চমৎকার, আরামদায়ক। আজ ওরা কেউ নেই, তাতে কী! চলো, আমরাই বসে পড়ি; দেখবে সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত কীরূপ অপূর্ব দেখাবে- মনটা দিগন্ত ছাড়িয়ে অনন্তে উড়ে যাবে।

স্থানটি মায়াবতীর ভালো লাগল। নিকটেই কয়রা নদী। যদিও শীতে শীর্ণ, তবুও ভালো লাগে। বৎসরাধিক কাল ধরে প্রতি সপ্তাহে আশ্রমে আসছে মায়াবতী। বটবৃক্ষের সম্মুখপার্শ্বে পূজা-অর্চনার পুণ্যবেদী, অদূরে গুরুদেবের তত্ত্বালোচনার পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ, মেলাপ্রাঙ্গণ, নাট্যমঞ্চ ও উৎসব অনুষ্ঠানের অন্যান্য অঞ্চল; সর্বত্রই ঘুরে বেড়িয়েছে মায়াবতী। কিন্তু আশ্চর্য! মন্দিরের পশ্চাতে একদিনের জন্যও সে আসে নি। জায়গাটি সত্যিই আকর্ষণীয়। মায়াবতীর ভাবান্তর হলো, কিন্তু অনিশ্চিতভাবে তেমনি দাঁড়িয়ে থাকল। ক্ষণকাল প্রতীক্ষা করে হিঙ্গল উঠে পড়ল। হাসতে হাসতে উচ্চস্বরে বলল- মায়াবতী, তোমাকে যখন কোনোভাবেই এখানে বসতে প্ররোচিত করতে পারলাম না, তাহলে চলো ফিরে যাই।

ঠিক এমনি সময়ে বৃক্ষান্তরাল থেকে আবির্ভূত হলো উদয়মান। বলল- ফিরে যাবে কেন? এই যে আমরাও এসে গেছি। উদয়মানের পশ্চাতে অর্কদাসও দৃশ্যমান হলো।

অকস্মাৎ মায়াবতীর মনটা প্রফুল­ হয়ে উঠল। সমগ্র পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপট এক মুহূর্তে তার নিকট ভিন্নরূপ প্রতিভাত হলো। সহাস্যে সে উচ্চারণ করল- আসতে আজ্ঞা হয়। আমরা আপনাদের জন্যই অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করছি।

বয়সে কিছুটা কম হলেও মায়াবতীর সঙ্গে ওই তিন আশ্রমিকের সম্বোধন আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে বেশ আগেই; পরস্পরের কাছে ওদের নামও সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। গুরুদেবের তত্ত্বালোচনায় ওরাই সবচেয়ে সরব। উপবেশন করে পরস্পরের নিকটবর্তী হয়ে। খুবই মনোসংযোগের সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ করে বলে গুরুদেব ওদেরকে বিশেষ স্নেহ করেন। আশ্রমে সকলেই সে-কারণে ওদেরকে গুরুত্ব দেয়, প্রশ্রয় দেয়।

লাফিয়ে অগ্রবর্তী হয়ে অর্কদাসের মুখোমুখি দণ্ডায়মান হলো মায়াবতী। অতঃপর মুখের ওপর তর্জনী উত্তোলিত করে সক্রোধে কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করল। বলল- দেখো অর্ক, তোমরা যে তোমাদের আচরণে আমার প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছ সেটা আমি গ্রহণ করতে পারছি না। আমি অতিশয় ক্ষুব্ধ। এ কথাটা তোমাদেরকে জ্ঞাত করানোর জন্যই অদ্য আশ্রমে উপস্থিত হয়েছি।

স্তম্ভিত হয়ে অর্কদাস করজোড়ে বলল- কী অপরাধ করেছি আমি বুঝে উঠতে পারছি না। অজান্তে যদি করেও থাকি তজ্জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে আরেকটা কথা, তোমাকে জ্ঞাত করার লোভ সামলাতে পারছি না। তুমি এমনিতেই সুন্দরী, আকর্ষণীয়া। আর কুপিত হলে তোমাকে আরো আকর্ষণীয় লাগে।

মায়াবতী কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পূর্বেই হিঙ্গল মন্তব্য ছুড়ে দিল- স্তুতিবাক্য বর্ষণ করা হচ্ছে!

-এটা কোনো অপরাধ নয়। সকৌতুকে কৃত্রিম গাম্ভীর্য সহকারে বলল উদয়মান। সুখশ্রাব্য স্তুতিবাক্য প্রয়োগ করে রাগান্বিত নারীকে বশে আনার কৌশলটি শাস্ত্রে অনুমোদিত। স্তুতিবাক্য থেকে বিশ্রম্ভালাপে উন্নীত হলেও ক্ষতি নেই। তবে আরো অধিক অগ্রসর হতে গেলে পারস্পরিক সম্মতি ও দায়িত্ব গ্রহণ আবশ্যিক হয়ে পড়ে।

হিঙ্গল উঠে পড়ে ঘোষণা করল- এবং সেক্ষেত্রে তৃতীয় ও চতুর্থ ব্যক্তির উপস্থিতি অবশ্যই কাম্য নয়। উদয়মান, চলো আমরা নিষ্ক্রান্ত হই।

কোথায় যাবে?- কিঞ্চিৎ সলজ্জ হয়ে মৃত বৃক্ষকাণ্ডটির ওপর বসে পড়ল মায়াবতী। তার জমাটবদ্ধ রাগের যেন কিঞ্চিত উপশম ঘটল। একে একে বাকি তিন বন্ধুও বসে পড়ল মায়াবতীকে ঘিরে।

শীতের অপরাহ্ন। সূর্যরশ্মি কুয়াশায় আচ্ছন্ন, স্তিমিত। কনকনে বায়ু উত্তর থেকে আসছে কয়রা নদী পার হয়ে। মায়াবতী ঊর্ধ্বাঙ্গ আবৃত রাখার বস্ত্রখণ্ডটি দিয়ে নিজেকে উত্তমরূপে জড়িয়ে নিল।

কিয়ৎক্ষণ সকলেই নিশ্চুপ। মায়াবতী নিজের পদপাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে উসখুস করছিল। সর্বপ্রথম নীরবতা ভঙ্গ করল উদয়মান। বলল- বন্ধুগণ, আমাদের আলোচনায় পারস্পরিক সম্মতি ও দায়িত্ব গ্রহণের কথা উঠেছিল। বন্ধুদেরকে এক্ষণে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে আমরা এখানে উপস্থিত সতীর্থ চতুষ্টয় একমত হয়ে একটি ব্রত গ্রহণ করেছিলাম। সেটা করেছিলাম নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে গুরুদেবের সম্মতি নিয়ে। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, আন্তরিকতার সঙ্গে ব্রত পালন করব এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য এককভাবে এবং যৌথভাবে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব।

আকস্মিকভাবে সপ্রতিভ এবং সরব হয়ে উঠল মায়াবতী। বলল- সেজন্যই এই যৌথতার ব্যত্যয় কেন করা হলো সেটা আজ প্রথমে জানতে চেষ্টা করছিলাম।

আলোচনা পুনরায় গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে লক্ষ করে সকলে সচেতন হলো। মায়াবতীর পরবর্তী বক্তব্য শ্রবণের জন্য তিনজনে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করল।

মায়াবতী বলল, বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠা বিষয়ে গোত্রপতি প্রদোষ দেব কী অবস্থান নিয়েছেন এবং তিনি মনে করছেন আমার পিতা শুকদেব শিবপুরের সামন্তদের যোগসাজসে ষড়যন্ত্র করছেন- এসব কথা অর্ক যদি তোমাদেরকে বলতে পারল তাহলে আমাকে নয় কেন? আমি কেন অবহেলার পাত্র? আমি কি অবিশ্বস্ত হবার মতো কোনো কাজ করেছি? আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল মায়াবতী। কিন্তু তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল- ক্ষোভে, আবেগে ও উদ্গত কান্নায়।

এবার সকলের হতভম্ব হবার পালা। কিয়ৎক্ষণ নীরবে কেটে গেল। উদয়মান পূর্বাপর সমগ্র বিষয় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করল। অবশেষে বলল- দেখো মায়া! তোমার নিকট থেকে তথ্য গোপন রাখার সচেতন প্রয়াস কারো ছিল না। তোমাদের গৃহে যেদিন তোমার পিতৃদেবের সঙ্গে আমরা আলোচনা করতে যাই এর দিনকয়েক আগে অর্ক বাড়ি ফেরার পথে আশ্রমে এসেছিল প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে। শিবপুরে উত্তেজনাকর কী ঘটেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমাদের দুজনকে জানিয়েছিল। পরে তোমার সঙ্গে আমাদের কিংবা অর্কের কোনো সাক্ষাৎ ঘটে নি। ফলে শিবপুর বীথির সামন্ত রুহীদত্তের সমীপে গোত্রপতির পক্ষ থেকে কী বক্তব্য নিয়ে অর্কের যেতে হয়েছিল, গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষের সঙ্গে কী নিয়ে বাদানুবাদ হয়েছিল সেসব বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনার সুযোগও ঘটে নি। তুমি কিছুই জানতে পারো নি। অর্ক তো তোমাকে অবহেলা করতেই পারে না, অবিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। তার আচরণে আমরা তো তোমার প্রতি বাড়াবাড়ি রকম পক্ষপাতিত্ব লক্ষ করি। তোমার আজকের এই অভিমান একান্তই বাস্তব ভিত্তি বর্জিত।

হিঙ্গল উৎসাহে আকস্মিকভাবে তিনজনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল- এসব কথার এখানে সমাপ্তি টানা হোক। এসো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের করণীয় কী হবে তারই পরিকল্পনা করি।

মায়াবতী সলজ্জ মুখ তুলে অর্কদাসের দিকে তাকাল। অর্কদাসও অপাঙ্গে দেখে নিল মায়াবতীকে। হিঙ্গল সশব্দে হেসে উঠে পরিবেশটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করল। অতঃপর চার সতীর্থ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নিমগ্ন থাকল দীর্ঘক্ষণ।

 

শিবপুর বীথির সামন্ত রুহীদত্তের ওপর প্রদোষ দেব যৎপরোনাস্তি ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ। মাস তিনেক পূর্বে যে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গিয়েছিল তাতে পলাশতলীর পূর্বপাড়ায় কয়েকঘর ক্ষেত্রকরের গৃহাদি উড়ে গিয়েছিল। প্রদোষ দেব ধর্মগোলা থেকে তাদের সাহায্যদান ন্যায়সঙ্গত মনে করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে সেই মর্মে রুহীদত্তের নিকট আবেদন করেন। সামন্ত মহাশয় বিনা ওজরে তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। কেবল তা-ই নয়, প্রদোষ দেবকে রীতিমতো অসৌজন্যমূলক আচরণ করে তার গৃহ ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। শিবপুরের গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষ, সে নাকি প্রদোষ দেবকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করারও হুমকি প্রদান করে। চরম অপমানিত গোত্রপতি মুখ কালো করে ফিরে আসেন। অর্কদাসের বক্তব্য থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে এর দুদিন পরই গোত্রপতি পলাশতলীর সকল কর্বট প্রাচীনদের সঙ্গে পরামর্শে বসেছিলেন। সে-পরামর্শসভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, পলাশতলীতে গোত্রপতির তত্ত্বাবধানে একটি পৃথক ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিবপুরের ধর্মগোলার জন্য ফসলের কোনো ভাগ আর প্রদান করা হবে না। শুধু তা-ই নয়, সামন্ত মহাশয় ও গুল্মিক প্রবর গোত্রপতির নিকট তাদের কৃত আচরণের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা না করা পর্যন্ত পলাশতলী থেকে রাজস্ব প্রদান করা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। সামন্তের নেতৃত্বে রাজশক্তি পলাশতলীর ওপর আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করলে কী করণীয় তারও নানা প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নিয়েছেন প্রদোষ দেব। অবশেষে অর্কদাসকে গোত্রপতির পক্ষ থেকে এই বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যই গত সপ্তাহে শিবপুর প্রেরণ করা হয়েছিল। অর্কদাসের বক্তব্য শ্রবণ করে পলাশতলীর গোত্রপতিকে চরম পরিণামের হুঁশিয়ারী দিয়ে তাকেও অপমান করা হয়। মুখোপরি দুই হস্ত উৎক্ষিপ্ত করে পৃষধ্র ঘোষ অশ্রাব্য গালাগাল করে অর্কদাসকে বিদায় করে। অর্কদাস বহু কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে পলাশতলীতে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। পথিমধ্যে উত্তেজিত অর্কদাস বিষয়টি নিয়ে উদয়মানের সঙ্গে আলোচনা করে যায়।

অর্কদাস যখন এসব ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিল উদ্বিগ্ন মায়াবতী তখন জিজ্ঞাসা করল, কর্বট প্রাচীনদের সভায় তার পিতা শুকদেবকে আহ্বান করা হয়েছিল কি না। অর্ক জবাব দিল, প্রদোষ দেব তাকে আহ্বান করেন নাই। তিনি মনে করেন শুকদেব মহাশয়ের সঙ্গে সামন্ত রুহীদত্তের একটি যোগসাজস থাকতে পারে।

দীর্ঘ আলোচনা সূর্যাস্তের পরও অব্যাহত থাকল। অবশেষে রাত্রি প্রথম যাম প্রায় শেষ করে তিনজনে মিলে মায়াবতীকে তার গৃহে পৌঁছে দিয়ে এল।

গৃহে প্রত্যাবর্তন করে শুকদেবের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল মায়াবতী। রাত্রিকালীন ভোজনপর্ব সমাধার পর নিদ্রা যাওয়ার প্রাক্কালে এ ব্যাপারে আলোচনা করা সঙ্গত হবে বলে মায়াবতী স্থির করল।

পিতৃদেবের সঙ্গে মায়াবতী একই গৃহে রাত্রিযাপন করে। সুপরিসর বাসগৃহের এক পার্শ্বে মাদুর পেতে শয্যা গ্রহণ করেন শুকদেব। মাতা জীবিত থাকতে মায়াবতী তার সঙ্গে অন্য পার্শ্বে আরেকটি মাদুরে শয্যা গ্রহণ করত। মাতৃবিয়োগের পরও ব্যবস্থাটি তেমনি আছে। যথাসময়ে মায়াবতী উভয়ের শয্যা প্রস্তুত করল। শুকদেব চিন্তিত মনে শয্যাতে উপবেশন করলেন। আকাশ-পাতাল ভেবেও কিছুতেই বুঝতে পারলেন না সদা চঞ্চল, সদানন্দ কন্যাটি গতকাল থেকে কেন এত বিমর্ষ, চিন্তাক্লিষ্ট। পত্নী বিয়োগের পর বিগত তিন বছর ধরে মায়ের মতো গভীর মমতা দিয়ে সে শুকদেবের যত্নী করে এসেছে। কোনোদিন কোনো অভিযোগ করে নি। কোনোদিন বিষণ্ন   হয় নি। এর মধ্যে ধীরে ধীরে সে বেড়ে উঠেছে। দেহে নারীত্বের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কটিভঙ্গ, পদচ্ছন্দ, লাবণ্য ও দেহসৌষ্ঠবে ক্রমেই যেন সে তার পরলোকগত মাতার প্রতিরূপ ধারণ করছে। কিন্তু কোথায় সে আঘাত পেল? শুকদেব কি তাকে কোনো কষ্ট দিয়েছে? বাড়ন্ত কন্যা, এখনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নয় বলে কেউ কি কোনো কটুকথা বলে তাকে বিড়ম্বিত করেছে? কোনো যুবা পুরুষকে কি তার ভালো লেগেছে? কন্যার দ্বিধাগ্রস্ত মুখপানে দীর্ঘক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে শেষে বললেন- কী এত ভাবছ বিমর্ষ হয়ে? আমার নিকটে এসে বসো তো মা-মণি!

মায়াবতী ভাবছিল কী করে জিজ্ঞেস করবে বাবাকে। প্রদোষ দেবকে অপমানিত করার ব্যাপারে বাবার কি কোনো মন্ত্রণা থাকতে পারে? থাকতে পারে যোগসাজস সামন্ত রুহীদত্তের সঙ্গে? তার বাবা, যিনি ধর্মকর্মে এত নিষ্ঠাবান, যিনি প্রতি মুহূর্তে নির্যাতিত দরিদ্র মানবগোষ্ঠীর কল্যাণে নিবেদিত, তিনি কি নিজ গোত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারেন, বিশেষ করে যিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্র এবং স্নেহভাজন? যদি কিছুই তিনি না করে থাকবেন তাহলে প্রদোষ দেবই-বা কেন তার পিতৃব্যকে এরূপ সন্দেহের চোখে দেখবেন? শুকদেবের পার্শ্বে বসে কিছুক্ষণ উসখুস করল মায়াবতী।

 

 

অবশেষে দম নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল- বাবা তুমি কি জানো আমাদের গোত্রপতি প্রদোষ দেবকে কিছুকাল পূর্বে শিবপুর বীথির সামন্ত মহাশয় চরমভাবে অপমান করেছেন?

মায়াবতী এসব বিষয় নিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকবে সেটা শুকদেবের নিকট একান্তই অপ্রত্যাশিত ছিল। প্রশ্ন শুনে তিনি বিস্মিত হলেন। বললেন- না তো! এমন কোনো কথা তো আমার কানে আসে নি!

মায়াবতী পুনরায় জিজ্ঞেস করল- গোত্রপতির এহেন অবমাননার প্রতিকার বিবেচনা করার জন্য কর্বট গোত্রের প্রবীণদের যে আলোচনাসভা হয়েছে সেখানে কি তুমি নিমন্ত্রিত হয়েছিলে?

এবার শুকদেব একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। মায়াবতীর বিবরণ শ্রবণ করে তিনি উপলব্ধি করলেন যে কয়রা নদীর এপারে অর্থাৎ বটেশ্বর এলাকার কোনো প্রাচীনকেই সে আলোচনা-সভায় ডাকা হয় নাই। প্রদোষ দেব হয়তো সত্যিই বিশ্বাস করে যে শুকদেব এবং বটেশ্বরে বসতিস্থাপনকারী, যাদের অধিকাংশই বিষ্ণুমন্দির স্থাপনে আগ্রহী, তারা সকলে প্রদোষ দেবের প্রতিপক্ষ, এবং সে-কারণে রুহীদত্তের সঙ্গে যোগসাজসে রত। কী ভয়াবহ ভাবনা! এ ভাবনা খণ্ডন করা প্রয়োজন। অতীব প্রয়োজন, আশু প্রয়োজন। রুহীদত্তের অসদাচরণ বটেশ্বরের কোনো সুস্থ মানুষই সমর্থন করতে পারে না। বিষ্ণুভক্তি কিংবা বিষ্ণুমন্দির স্থাপনের আকাক্সক্ষার সঙ্গে প্রদোষ দেবের প্রতি আনুগত্যের কোনোই সম্পর্ক নেই। কী ভয়াবহ কথা! শুকদেব অস্থির হয়ে পড়লেন। বললেন- কাল প্রত্যুষেই যাব প্রদোষ দেবের গৃহে। একটু থেমে আবার বললেন- তুমিও যাবে আমার সঙ্গে, প্রস্তুত হয়ে থেকো।

 

 

ছয়.

সূর্যোদয়ের পূর্বে চারিদণ্ডকাল দিবাভাগের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম দুই দণ্ডকাল ব্রাহ্ম-মুহূর্ত। পরবর্তী দুই দণ্ডকাল রৌদ্র-মুহূর্ত। শুকদেব ব্রাহ্ম-মুহূর্তের প্রারম্ভে শয্যায় পূর্বমুখি হয়ে উপবিষ্ট হলেন এবং অস্ফুট স্বরে কিয়ৎক্ষণ বিষ্ণু জপ করলেন। অতঃপর মায়াবতী সমভিব্যাহারে গোত্রপতির গৃহ উদ্দেশে পলাশতলী যাত্রা করলেন।

হিমকণ্টকিত শীত বায়ু থেকে আত্মরক্ষার নিমিত্তে উভয়েরই মস্তক ও স্কন্ধ পট্টবস্ত্রে আবৃত। কয়রা নদী অগভীর, নগ্নপদে পার হওয়া দুরূহ নয়। নদীর জল অস্বচ্ছ। তবে কনকনে ঠাণ্ডা। দ্রুত পার হয়ে দুজনে পথ পরিক্রমায় ব্যস্ত। প্রদোষ দেবের গৃহের দূরত্ব বেশি নয়। অল্পক্ষণেই তারা গন্তব্যে পৌঁছালেন।

এমন প্রত্যুষকালে এরূপ দুজন অতিথিকে গোত্রপতির গৃহের কেউ প্রত্যাশা করে নি। শুকদেবকে প্রায় সকলেই চেনে, অনেকে মায়াবতীকেও। নানাকর্মে ব্যস্ত ক্ষেত্রকর্মকরবৃন্দ তাদেরকে সশ্রদ্ধ নমস্কার করল। দাসীদের কেউ কেউ ছুটে গেল অন্দরমহলে অভ্যাগতের আগমন-সংবাদ পৌঁছানোর জন্য। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাইরে বের হয়ে এলেন প্রদোষ দেব। পদস্পর্শ করে শুকদেবের কুশল জানতে চাইলেন। রমণীগণ অন্দরমহল থেকে এগিয়ে এল। এতদিন পরে পরিবারের গুরুজন শুকদেবকে নিজগৃহে অভ্যাগত হিসাবে পেয়ে সকলে বাহ্যত আনন্দিত, ও যুগপৎ বিস্মিত। প্রদোষ দেব হাঁকডাক করলেন। আসনের ব্যবস্থা হলো। মহিলারা মায়াবতীকে ঘিরে ফেলল।

-ওমা, কত বড় হয়ে গেছ তুমি!

-আহা, কী সুন্দর মুখশ্রী, একদম কাকিমার মতো!

-ওমা, সিঁদুর কই? এখনও আইবুড়ো!

-থাম মুখপুড়ি! জানিস, মায়াবতী শাস্ত্রজ্ঞান আহরণ করছে? গুরু ভবদেবের আশ্রমে নিয়মিত অধ্যয়ন করছে?

-ওমা, সে কী কথা! স্ত্রীলোক শাস্ত্রশিক্ষা করছে!

শেষ সংলাপটি কর্ণকুহর ভেদ করে মস্তিস্কে প্রতিঘাত সৃষ্টি করল মায়াবতীর। মন্তব্যকারী মহিলার প্রতি চোখ তুলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে। মধ্যবয়স অতিক্রান্ত সাদাসিধে গ্রাম্য গৃহবধূ। সহজ, সরল। আক্ষেপ নেই, অভিযোগ নেই, প্রতিবাদ নেই। পুত্র, কন্যা, স্বামী-র সংসার ও গৃহস্থালির উদয়াস্ত পরিশ্রমের মধ্যেও জীবনের যতটুকু আনন্দ আছে তাতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। বংশানুক্রমে যে নীতিকথা শুনে এসেছে গুরুজনের কাছে, শাস্ত্রের দোহাই পেড়ে ব্রাহ্মণ শাস্ত্রজ্ঞগণ যে সকল তত্ত¡কথা শিখিয়েছেন তা মেনে নিয়েছে নির্দ্বিধায়, অবনত মস্তকে। সুতরাং স্ত্রীলোকের শাস্ত্রজ্ঞান আহরণ প্রচেষ্টায় তার অপরাধবোধ লক্ষ করে বিস্মিত হবার কিছু নেই। এজন্য এদেরকে দোষারোপ করার কোনো যু্ক্তি ও নেই। এরা তো আর গুরুদেবের বচনামৃত শ্রবণ করে নি! তার তত্ত্বালোচনায়ও অংশগ্রহণ করে নি! গুরুদেব বহুবার বলেছেন- বর্ণ, গোত্র, ধনী, দরিদ্র, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানব-সন্তানের পূর্ণ আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করার অধিকার আছে। সুতরাং জ্ঞানের দ্বার সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। উন্মুক্ত করতে হবে তপস্যার দ্বার এবং কর্মের দ্বার।

একদিন তত্ত্বালোচনার পর উদয়মান মায়াবতীকে পুরাণশাস্ত্রের অনেক অকথিত কাহিনী শুনিয়েছিল। মন্দিরের পশ্চাতে পনসবৃক্ষতলে বসে অনেক কথা বলেছিল। আজ থেকে সহস্র বর্ষ পূর্বে কুরুপাঞ্চালের তরুণ রাজা প্রবাহন জৈবলি উদ্ভাবন করেন ব্রহ্মের ধারণা। ইতোপূর্বে সকল দেবতাগণ ছিল সাকার, কিন্তু কখনও তাদেরকে কেউ চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করে নি। তাদের সংখ্যাও ছিল বহু এবং জীবনাচার ছিল মানবকুলের অনুরূপ। সুতরাং তাদের অস্তিত্বকে বিশ্বাসভাজন করতে ব্রাহ্মণ পুরোহিত যতই যাগযজ্ঞ করুক, যতই অর্থ ব্যয় করুক, তীক্ষè বুদ্ধিমানেরা সন্দেহ করতে শুরু করে। অনেকেই ঋষি চার্বাকের মতামতে বিশ্বাস স্থাপন করতে থাকে। এ অবস্থায় নিজ রাজ্যে শাসনকে নিরুপদ্রব করার লক্ষ্যে রাজা প্রবাহন সৃষ্টি করেন সকল দেবতার স্রষ্টা ব্রহ্মকে। ব্রহ্ম আবার নিরাকার, সর্বত্র বিরাজমান, তিনি আদি এবং একক। ব্রহ্মের সঙ্গে তিনি আবার যুক্ত করেন কর্মফল-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদ। স্বর্গে গিয়ে কেউ মৃত জীবকে সুখ ভোগ করতে দেখে নি। কিন্তু পুনর্জন্মবাদী তত্ত্বের ভিত্তিতে এ জগতে উঁচু-নীচু, ছোট-বড় জাতি, ধনী-নির্ধনের যে প্রভেদ তা হলো পুনর্জন্মের কর্মফল। এ জগতে জীবন্ত মানুষ তার দৃষ্টান্ত। সুতরাং ব্রাহ্মণ ও রাজন্যকে মান্য করো, শাস্ত্রের এ বিধান মেনে চলো, পরজন্মে উন্নত পর্যায়ে জন্ম নেবে- যেমন এ সংসারে এখন যাদেরকে উন্নত দেখছ। ব্রহ্মজ্ঞান ও কর্মফল-ভিত্তিক পুনর্জন্মবাদ প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ব্রহ্মবাদী পরিষদ। রাজন্য ও ব্রাহ্মণকুলের সহায়তায় অব্যাহত প্রচার চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।

কথা শুনতে শুনতে গম্ভীর হয়ে পড়েছিল মায়াবতী। জানতে চেয়েছিল ব্রাহ্মণদের প্রচারের ফলে এসব নতুন তত্ত¡ কি সকলে নির্বিবাদে মেনে নিয়েছিল? উদয়মান ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে, না। নির্বিবাদে মেনে নেয় নি। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল; তবে বংশপরম্পরায় এসব তত্ত¡ মানুষের মর্মমূলে গ্রথিত করার লক্ষ্যে তারা মানব-সমাজে প্রবর্তন করেছিল নিপীড়নমূলক চতুর্বর্ণ-ব্যবস্থা। দেবতা ব্রহ্মার মস্তক থেকে উদ্ভূত উচ্চতম বর্ণ ব্রাহ্মণ যার কাজ শাস্ত্রীয় বিধান দান ও যাগযজ্ঞে পৌরোহিত্য করা, বাহু থেকে উদ্ভূত ক্ষত্রিয় যার দায়িত্ব যুদ্ধাস্ত্র ধারণ ও প্রজাশাসন। প্রজাকুলের কোনো ব্যক্তি যদি চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা অবনত মস্তকে মেনে না নেয় কিংবা কোনো কারণে ব্রাহ্মণের সন্তুষ্টি অর্জন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণ তার কথিত পুতপবিত্র পৈতা স্পর্শ করে অভিসম্পাৎ দিলে অচিরেই বাস্তবে তা কার্যকর হয়। প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণের ইঙ্গিতে নিয়োজিত অস্ত্রধারী উগ্রপুরুষ ঘাতক সে-অভিসম্পাৎ সকলের অলক্ষ্যে কার্যকর করে দিত। সেরূপ সুচারু ব্যবস্থা ছিল। ফলশ্রুতিতে মানুষ কেবল সন্ত্রস্তই থাকত না, ক্রমে অভিসম্পাতের কার্যকারিতায় বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছিল।

ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন কুরুপাঞ্চাল রাজ্যের সেই ধূর্ত রাজা প্রবাহনের উপযুক্ত প্রশিষ্য। প্রবাহনের মৃত্যুর শতাব্দীকাল পরে যাজ্ঞবল্ক্য বিভিন্ন রাজন্যবর্গের আয়োজনে ব্রহ্মবাদী পরিষদের শাস্ত্রীয় বিতর্কসভা করতেন। ব্রহ্মবাদীদের এরূপ জয়জয়কার যুগে রাজা জনকের রাজসভায় ঋষি গার্গ্য মুনির কন্যা শাস্ত্রজ্ঞ গার্গী নিজে নারী হওয়া সত্ত্বেও যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে সূ² ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক বিতর্কে অবতীর্ণ হন। এক পর্যায়ে তর্কযুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় ঠেকানোর জন্য সুচতুর যাজ্ঞবল্ক্য ব্রাহ্মণ্য অভিসম্পাতের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি গার্গীকে ভীতি প্রদর্শন করার জন্য বলেন- আর অধিক কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করলে তোমার শিরচ্ছেদ ঘটবে। বিতর্ক-বেদীর সন্নিকটেই নেপথ্যে উগ্রপুরুষ ঘাতক অস্ত্রহাতে অভিসম্পাৎ কার্যকর করতে অপেক্ষমান থাকতে পারে ভেবে শাস্ত্রজ্ঞ গার্গী পরাজয় মেনে নিশ্চুপ থেকে যান। এরূপ প্রতারণা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ব্রহ্মবাদী পুনর্জন্মবাদীরা জয়লাভ করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।

শুনতে শুনতে সেদিন মায়াবতী প্রচণ্ড ক্ষোভে উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। উদয়মানের সম্মুখে এসে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হয়ে বলেছিল- এই অন্যায্য বর্ণব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলতে হবে; জ্ঞানের দ্বার, কর্মের দ্বার ও শিক্ষার দ্বার সকলের নিকট উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং আমরা জোটবদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণ্য অভিসম্পাতের ত্রাস থেকে মানুষকে নির্ভয় করে তুলব। হঠাৎ অধিক উত্তেজিত হয়ে উদয়মানের স্কন্ধে সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠেছিল- এসো, আমরা এই শপথ নেই; করব, অবশ্যই করব, জীবনপাত করেও করব। মুক্ত মানুষের সমাজ গড়ে তুলব।

সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে বিষণ্ন ও উন্মনা হলো মায়াবতী। সে-মুহূর্তে এক বর্ষীয়ান নারী মায়াবতীকে আদর করে টেনে নিলেন। বললেন- এসো এসো, লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বসো, সুস্থির হয়ে বসে বিশ্রাম নাও। অতদূর পথ হেঁটে এসেছ!

বিশ্রামের সযতন ব্যবস্থা হলো। হস্তমুখাদি প্রক্ষালনপূর্বক কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করতে করতে আলোচনা শুরু করলেন শুকদেব। প্রাতঃরাশের রাজকীয় আয়োজন দেখে শুকদেবের চক্ষু স্থির। পিতৃব্য হিসাবে যেটুকু সম্মান তার প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক বেশি করলেন প্রদোষ দেব ও তার পত্নী। অভয় কোচের স্ত্রী, কন্যা এবং অর্কদাসও যথাসময়ে উপস্থিত হলো।

পিতৃব্যের ওপর যথেষ্ট আস্থা না রাখা এবং কোনো সন্দেহ করার মতো ঘটনা ঘটলে অনুমান-ভিত্তিক একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্বে তার সঙ্গে অসঙ্কোচ আলোচনা না করাকে শুকদেব দুঃখজনক বলে অভিহিত করলেন এবং এজন্য প্রদোষ দেবকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। সর্বশেষে তিনি বললেন- দেখো, অপমানের প্রতিবিধান করার যে সকল প্রস্তুতি তুমি নিয়েছ সেটুকু যথেষ্ট নয়। সম্ভারের রাজশক্তির প্রত্যক্ষ সহায়তা যাতে রুহীদত্ত না পায় সে-ব্যবস্থা করার জন্য আমি আজই সম্ভারের উদ্দেশে যাত্রা করব। আমাদের দীক্ষাগুরু আচার্য অহিরুদ্র দেবের মাধ্যমে আমি সম্ভারের মহারাজা পরম ভট্টারকের সন্নিকটে তোমার জন্য ন্যায়বিচার প্রার্থনা করব। আমার বিশ্বাস মহারাজ পরম ভট্টারক আমাদের সকল ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেবেন।

প্রদোষ দেব নিজ পিতৃব্যের ওপর বৃথা আস্থা হারানোতে অনুতাপ-দগ্ধ হলেন এবং স্বীয় অপরাধের জন্য পদচুম্বন করে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। অবশেষে এরূপ সঙ্কটকালে করণীয় বিষয়ে শুকদেবের পরামর্শ কামনা করলেন।

শুকদেব প্রদোষ দেবের মস্তকোপরি হস্ত স্থাপন করে বললেন- তোমার সকল সদিচ্ছা পূর্ণ হবে। আমার মনে হয় সম্ভার মহারাজের নিকট আমাদের দাবি হওয়া উচিত পলাশতলী-বটেশ্বরে যেন পৃথক প্রশাসন-ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং সে-লক্ষ্যে এ এলাকাতে পৃথক বীথি গঠন করা হয়। এ সকল দাবি পূরণের লক্ষ্যে সঠিক জনমত গঠনকল্পে বটেশ্বরে আমরা একটা শাস্ত্রার্থ পরিষদ অনুষ্ঠানের অনুমতি চাইতে পারি। আচার্য অহিরুদ্র দেব সম্মত হলে খুব কার্যকর শাস্ত্রার্থ পরিষদ অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে। সেই পরিষদ থেকে পৃথক বীথি গঠন এবং একটি বিষ্ণুমন্দির স্থাপনের যথার্থতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

প্রদোষ দেব ও তৎ-পত্নী কিছুতেই দ্বিপ্রাহরিক ভোজন ব্যতিরেকে শুকদেবকে বিদায় জানাতে সম্মত হলেন না। ইতোমধ্যে পলাশতলীর কর্বট প্রবীণেরা শুকদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য উপস্থিত হলেন। তখন অন্দরমহলে সকল নারীকুল মায়াবতীকে নিয়ে ছিল। অর্কদাসের মাতা মায়াবতীকে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে কপাল চুম্বন করে আদর করলেন। অর্কদাসের কনিষ্ঠ ভগ্নী সুজাতা তাকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে তার কর্ণকুহরে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে জানাল- ভগ্নী, আমার ভ্রাতা অর্কদাস মায়াবতী বলতে বলতে কেন অত সপ্রশংস হয় তা এখন বুঝতে পারছি। ইস! তুমি কী সুন্দর, আর কত মিষ্ট!

সলজ্জ মায়াবতী কোনোরকমে সুজাতার পীড়ন থেকে নিজেকে মুক্ত করল।

অপরাহ্নে সকল অস্বস্তি থেকে মুক্ত হয়ে গোত্রপতি-গৃহের সবাই শুকদেব ও তার কন্যা মায়াবতীকে বিদায় সম্ভাষণ জানাল।

 

 

সাত.

শুকদেবের আবেদন শ্রবণ করে আচার্য অহিরুদ্র দেব সম্ভার-মহারাজের সম্মতি নিয়ে শীঘ্রই শাস্ত্রার্থ পরিষদ আহ্বান করলেন। বটেশ্বরে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। পৌষী পূর্ণিমা উৎসবের দুদিন পরে বটেশ্বরের শিবমন্দির প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বসবে শাস্ত্রার্থ পরিষদ। এই আলোচনা পরিষদে পৌরোহিত্য করবেন আচার্য অহিরুদ্র দেবের প্রধান সহকারী বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আচার্য মাধবশ্রী। শাস্ত্র আলোচনায় অংশ নেবেন সম্ভার আশ্রমের বিজ্ঞ স্নাতক অহিরুদ্র দেবের বরিষ্ট শিষ্য ও ঢবাকার বিশিষ্ট শ্রেষ্ঠীপুত্র পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র। তাদের বাণিজ্যপোত প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে পশ্চিমে কর্ণসুবর্ণ, সপ্তগ্রাম ও কোটালিপাড়া বন্দরে; পূর্বে সুবর্ণগ্রাম ও কর্মান্ত নগরে এবং উত্তরে কামরূপ অহোম রাজ্যের সায়র উপকূলে পাহাড়ের উৎসঙ্গে খাসপুর বন্দর পর্যন্ত। বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য তাদের। অংশগ্রহণ করবেন শিবপুরের কুলীন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। স্থানীয় আলোচকদের মধ্যে অনুমতি পেয়েছেন বটেশ্বর আশ্রমের গুরু ভবদেব ও তৎশিষ্য উদয়মান, হিঙ্গল মল্ল ও নীলাভ্র ভিক্ষু। বর্ণ-গোত্র-ধর্ম-বিশ্বাস নির্বিশেষে সকলে আলোচনা শ্রবণের জন্য উপস্থিত থাকতে পারবে। বেশি কৌতূহল থাকলে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রদত্ত সময়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে। নির্ধারিত আলোচ্য-বিষয় হবে শাস্ত্রীয় শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সামাজিক শান্তি সংরক্ষণের উপায়। পৌরোহিত্য করার দায়িত্বপ্রাপ্ত আচার্য মাধবশ্রী মহোদয় আলোচনার গতিধারা ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। তার নির্দেশ হবে সকলের জন্য অবশ্য পালনীয়। এলাকার জনসাধারণ এ ধরনের আলোচনা-পরিষদের কথা ইতোপূর্বে কখনো শোনে নি। গোত্রের প্রাচীনদের আলোচনা তারা দেখেছে, কিন্তু সেখানে কখনো কোনো শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতকে ওরা দেখে নি। সুতরাং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সীমাহীন কৌতূহল। আলোচনা অনুষ্ঠানের সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অধিকন্তু গোত্রপতির পক্ষ থেকে দুন্দুভি বাজিয়ে সকল এলাকায় এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। 

নির্দিষ্ট তারিখের পূর্ব-দিবসে গুরুদেবের আশীর্বাদ নিয়ে সম্ভার থেকে যাত্রা করলেন পণ্ডিত মাধবশ্রী এবং পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র। বানার নদীপাড়ে রাজঘাট থেকে জলযানে আরোহণ করে তারা যাত্রা করলেন। প্রথমে লক্ষ্যা নদী দিয়ে দক্ষিণে। সেখান থেকে কালীনদী বেয়ে উত্তর-পূর্বে এসে পঞ্চবটি পৌঁছালেন দ্বিপ্রহরে। জলযানেই ভোজনপর্ব সমাধা করলেন। অতঃপর কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করে অবশেষে পথ-প্রদর্শক ও ভৃত্য সমভিব্যাহারে পদব্রজে এসে পৌঁছালেন বটেশ্বর। শুকদেবের গৃহে তাদের রাত্রযাপনের ব্যবস্থা ছিল। রাত্রকালে পণ্ডিতগণ শুকদেবের সঙ্গে এলাকার সামাজিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুসারীদের মনোভাব সম্পর্কে জ্ঞাত হলেন। গুরু অহিরুদ্র দেবের পরিকল্পনা মতো আলোচনা সফলভাবে সমাপ্ত করতে পারবেন বলে অভ্যাগত পণ্ডিতবর্গ  একরকম নিশ্চিন্ত হলেন।

পরদিন প্রাতঃকালে বটেশ্বরের শিবমন্দির প্রাঙ্গণের সম্মুখস্থ নাতিবৃহৎ বেদীর চতুষ্পার্শ্বে মঙ্গল-প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে পরিষদের কার্যক্রম শুরু হলো। প্রথমে আচার্য মাধবশ্রী অগ্রসর হয়ে তিনটি মঙ্গল-প্রদীপে অগ্নিসংযোগ করলেন। তাকে অনুসরণ করলেন পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র, পণ্ডিত পুলিন ভট্ট এবং গুরু ভবদেব। আচার্যের পশ্চাতে এরা সকলে বেদীতে আরোহণপূর্বক নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করলেন। আসন গ্রহণ করল গুরু ভবদেবের প্রিয় শিষ্য উদয়মান, হিঙ্গল ও নীলাভ্র ভিক্ষু। ইসিদাসীর নেতৃত্বে মায়াবতী, লহনা, খুল্লনা, কলিঙ্গা ও বহুসংখ্যক ভক্ত নারী উলুধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। কেউ কেউ শঙ্খধ্বনিও করল। বেদীর সম্মুখে উপবিষ্ট সকলের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য। প্রচণ্ড উৎসাহে সকলেই উজ্জীবিত। অতি উৎসাহে কতিপয় নর-নারী দণ্ডায়মান হয়ে যুক্তকরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দৃশ্যত প্রার্থনা করে নিল। বেদীর বামপার্শ্বে শুকদেব, প্রদোষ দেব এবং অন্যান্য প্রবীণেরা ভূমিতলে বসে পড়লেন। বেদীর ডানপার্শ্বে বসল ইসিদাসী, মায়াবতী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নারীগণ। সম্মুখে নানা বয়সের বিপুল নর-নারী ভূমিতলে উপবিষ্ট। অনেকেই নিজ নিজ গোত্রানুযায়ী উৎসবের বিশেষ সাজসজ্জা করে এসেছে।

পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্ডিত মাধবশ্রী দণ্ডায়মান হলেন, অস্ফুট স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করলেন, উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দুই হস্ত উত্তোলন করে সমবেত জনতাকে স্থির হয়ে বসার ইঙ্গিত করলেন। কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে পরে স্বল্পকথায় পরিশীলিত ভাষায় আলোচনার পদ্ধতি এবং অবশ্য-পালনীয় বিধানাবলী ব্যাখ্যা করলেন। এরপর বেদীতে উপবিষ্ট সম্মানিত আলোচকবৃন্দকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মূল আলোচ্য-বিষয় উত্থাপন করলেন। তিনি জানালেন যে, আলোচনার পৌরোহিত্য তিনি নিজেই করবেন, আলোচনার গতিধারা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। মঞ্চে উপবিষ্ট আলোচকগণের বক্তব্য শ্রবণের পর পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে উপস্থিত যে কেউ প্রশ্ন করতে পারবেন। তবে আলোচকের বক্তব্যে একমত হয়ে কিংবা ভিন্নমত দিয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে পারবেন না। পুরোহিতের নির্দেশে আলোচকগণ তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন, নিজ বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে পারবেন। সমবেত জনতাকে এভাবে প্রস্তুত করে আচার্য মাধবশ্রী গুরু ভবদেবকে ‘শাস্ত্রীয় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার ও সামাজিক শান্তি সংরক্ষণ পূর্ব-নির্ধারিত এ বিষয়ের ওপর তার প্রারম্ভিক বক্তব্য উত্থাপন করতে অনুরোধ করলেন।

এতে পুলিন ভট্ট ভীষণ হতাশ হলেন। আচার্য মাধবশ্রী কাকে প্রথম বক্তব্য পেশ করতে আহ্বান করবেন এ বিষয়ে শুরু থেকেই তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি কুলীন ব্রাহ্মণবংশে জাত এবং উচ্চশিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বলে পরিচিত। দীর্ঘদিন যাবত শিবপুরে বসবাস করছেন। সর্বোপরি তিনি শিবপুর বীথির সামন্তপ্রভু রুহীদত্তের ঘনিষ্ঠ এবং বীথি-প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ধর্মপ্রবক্তা। তার নিশ্চিত প্রত্যাশা ছিল শাস্ত্রার্থ পরিষদের আলোচনায় প্রারম্ভিক বক্তব্যদানের জন্য আচার্য মাধবশ্রী তাকেই আহ্বান করবেন। কিন্তু আচার্য মাধবশ্রী ভবদেবকে বক্তব্যদানে আহ্বান জানালে তিনি স্পষ্টত হতাশ হলেন এবং প্রচণ্ড বিরক্তিতে অস্থির হয়ে পড়লেন।

অনার্যকুলজাত, দগ্ধকাষ্ঠবৎ ঘনকৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, সুগঠিত খর্বাকৃতির দেহগঠন, দীর্ঘ ঘন শ্বেতশুভ্র কেশদাম স্কন্ধোপরি বিন্যস্ত, মুখমণ্ডল স্মিতহাস্যে আলোকোজ্জ্বল, দৃষ্টি সুগভীর তীব্রও প্রখর- গুরু ভবদেব নিজ আসনস্থলেই দণ্ডায়মান হয়ে কয়েক পলক সমগ্র সমাবেশটিতে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। অতঃপর সহাস্যবদনে জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- মাননীয় আচার্য মহোদয়, বিজ্ঞ আলোচকবৃন্দ এবং উপস্থিত আমার প্রিয় ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ! সকলে আমার শুভাশিস গ্রহণ করবেন। এতটুকু বলে কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরব থাকলেন গুরুদেব। অতঃপর ঊর্ধ্বনেত্রে উচ্চস্বরে উচ্চারণ করলেন- আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বমানিভূতানী জায়ন্তে; আনন্দ থেকেই সৃষ্ট এই বিশ্বচরাচর, প্রাণীকুল ও সকল মানবগোষ্ঠী। সুতরাং এ জীবন আনন্দের। আনন্দে জীবনযাপন, আনন্দে মৃত্যু, পুনর্জন্ম আনন্দেরই অনন্ত প্রবাহ। আনন্দ স্বর্গ, আনন্দ ঈশ্বর। এই আনন্দ যেন প্রতিটি মানুষ পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার সুযোগ পায় সে-লক্ষ্যে জ্ঞানের দ্বার সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকতে হবে। উন্মুক্ত থাকতে হবে তপস্যার দ্বার ও কর্মের দ্বার। আমি অদ্যকার অতীব গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রার্থ পরিষদের আলোচনাসভায় দৃঢ়তার সঙ্গে এই প্রস্তাব উত্থাপন করছি যে, শাস্ত্রীয়শিক্ষা গ্রহণের অধিকার বর্ণ-গোত্র, ধনী-নির্ধন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানব-সন্তানের জন্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই রাজ্যে ও সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সংরক্ষণ সম্ভব হবে। আমি আরো বলতে চাই যে …

এই সময়ে গুরু ভবদেবের বক্তব্যে বাধাদান করে পণ্ডিত পুলিন ভট্ট অকস্মাৎ দণ্ডায়মান হয়ে তীব্রকণ্ঠে বলে উঠলেন- এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। শাস্ত্রীয়শিক্ষা সকল মানবকুলের জন্য উন্মুক্ত করা অতীব গর্হিত। বেদান্ত থেকে আরম্ভ করে মানবধর্মশাস্ত্র বা মনুসংহিতা পর্যন্ত প্রতিটি শাস্ত্র সুস্পষ্টভাবে বিধান দিয়েছে যে বেদপাঠ ও অগ্নিআধান সম্পর্কিত প্রতিটি কর্ম কেবল দেব-দ্বিজকুলের পুরুষদের জন্য অনুমোদিত। অসংস্কৃত শূদ্র, নীচুকুলোদ্ভব ব্যক্তি কিংবা সকল বর্ণের নারীর জন্য এসব কর্ম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এইরূপ আচরণ ঘোর পাপাচার। তবে শূদ্র, অনার্য ও নারীকুল মোক্ষলাভের লক্ষ্যে শ্রীকৃষ্ণ, নারায়ণ ও বাসুদেবের উপাসনা করতে পারে। শিক্ষার জন্য রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের আলোচনা শ্রবণ করতে পারে; নাট্য-শাস্ত্রও অনুশীলন করতে পারে।

ভবদেব তার বক্তব্যদানে বাধাগ্রস্ত হবেন এরূপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বক্তব্য থামিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েই থাকলেন। পুলিন ভট্টের এরূপ শীল-বহির্ভূত আচরণে বেদীতে উপবিষ্ট অন্যান্য আলোচকগণ স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন। শ্রোতাদের মধ্যে গুরু ভবদেবের অসংখ্য ভক্তজন উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে উত্তেজনা লক্ষ করা গেল। পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র উঠে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে আলোচনা-অনুষ্ঠানের পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করে যুক্তকরে নমস্কার করলেন এবং বললেন- গুরু ভবদেবের বক্তব্যে বাধাপ্রদান করা সভার শৃঙ্খলা-বহির্ভূত। তাছাড়া পুলিন ভট্ট মহোদয়ের বক্তব্যও অসত্য। এখন থেকে দ্বি-সহস্রবর্ষ পূর্বেই কুরুপাঞ্চালের রাজন্যবর্গের স্তুতির জন্য তথাকথিত নীচকুলজাত শাস্ত্রকার মুনিবর বশিষ্ট, বিশ্বামিত্র ও ভরদ্বাজ বহু শ্লোক রচনা করেছেন, এবং সংস্কৃত ব্যক্তিদের মতো শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন। মুনিবর ব্যস ও কৌশিক কথিত অনার্যকুলজাত। কিন্তু শাস্ত্রজ্ঞানে ও আচরণে তারা স্বীকৃত ব্রাহ্মণ্যশীলের মর্যাদা রক্ষা করে অসংখ্য দ্বিজ কর্তৃক পূজিত হয়েছেন। ভবদেব তার শুদ্ধ-হৃদয় ও সংযতেন্দ্রীয় আচরণের জন্য অসংখ্য মানুষের পূজ্য। সভা-পুরোহিতের নির্দেশে তিনি তার প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখছেন। তার বক্তব্যে বাধাদান গর্হিত কর্ম। আমি পণ্ডিত পুলিন ভট্টের আচরণের নিন্দা জ্ঞাপন করছি এবং তাকে স্তব্ধ থাকার নির্দেশদানের আবেদন করছি। এটুকু বলে তিনি নীরবে নিজ আসনে বসে পড়লেন।

সভাস্থলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। পুলিন ভট্ট প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমি ব্রাহ্মণ। আমার বক্তব্যে নিন্দা প্রকাশ করছেন একজন বৈশ্যসন্তান! উত্তেজনায় তিনি দুই করতলে নিজ পৈতা ধারণ করে চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমি, তোমাকে ব্রহ্মদূষণে অভিযুক্ত করছি- আমি- আমি …। রাগে কাঁপতে থাকলেন ভট্ট মহাশয়।

চতুর্দিকে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। হৈ চৈ-এর মধ্যে বেদীর নিকট থেকে কে যেন মন্তব্য করল- শীল-বর্জিত ব্রাহ্মণের ত্রুটি চিহ্নিত করলে কিংবা তার নিন্দা করলে ব্রহ্মদূষণ হয় না।

এরূপ মন্তব্যে কেউ কেউ হেসে উঠল। এর মধ্যে নারীকণ্ঠও শোনা গেল। আচার্য মাধবশ্রী নিজ আসনে দণ্ডায়মান হয়ে দুই হস্ত ঊর্ধ্বে প্রসারিত করে সকলকে শান্ত হবার আবেদন করলেন এবং সকলকে বসে পড়ার নির্দেশ দিলেন। ক্রমে সভাস্থল শান্ত হয়ে এল। সকলেই স্ব স্ব আসনে বসে পড়ল।

অকস্মাৎ দেখা গেল অর্কদাস পশ্চাৎ থেকে দ্রুত পদে এগিয়ে এসে প্রদোষ দেবের কানে কানে কী যেন বলছে। প্রদোষ দেবের চোখে-মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি যেন অর্কদাসকে কিছু একটা নির্দেশ প্রদান করলেন এবং তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎগতিতে অর্কদাসকে সভা ছেড়ে অন্তর্হিত হতে দেখা গেল।

বেদীর অন্য পার্শ্বে মায়াবতী উপবিষ্ট ছিল। আলোচনাসভায় পণ্ডিত পুলিন ভট্টের অশালীন মন্তব্যে দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল সে। হঠাৎ গোত্রপতির সঙ্গে অর্কদাসের নীরব বাক্যালাপ এবং তার এই দ্রুত অন্তর্ধান পর্যবেক্ষণ করে ক্ষোভের পাশাপাশি সে বিচলিত হয়ে উঠল। গোত্রপতির কানে কানে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে গিয়েছিল অর্কদাস? গোত্রপতি তাকে কী নির্দেশ দিলেন? এত ব্যতিব্যস্ত গুরুগম্ভীর হয়ে ছুটে গেল কেন সে? কোনো নতুন সঙ্কট কি সৃষ্টি হয়েছে? অস্থিরতায় উঠে পড়ে সে অত্যন্ত সঙ্কোচে সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। অনতিদূরেই মন্দিরের পশ্চাতে গিয়ে সে অর্কদাসকে আবিষ্কার করল তার কয়েকজন সঙ্গীসাথী ও বয়স্ক বনবাসী নারী পরিবেষ্টিত অবস্থায়। দূর থেকেই দেখতে পেল অর্কদাস কী যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের। অর্কদাস তার সঙ্গীদেরকে জরুরি-সব নির্দেশদান করে বিদায় করতেই ধীরপদে মায়াবতী নিকটবর্তী হলো।

মায়াবতীর আবির্ভাবে অর্কদাস যুগপৎ বিস্মিত ও আহ্লাদিত হলো। বলল- এসো। এখানে যদিও তোমার মতো একজন বীরাঙ্গনার উপস্থিতি প্রত্যাশিত নয় তবু স্বাগতম!

ভেতরের উদ্বিগ্নতাকে চাপা দিয়ে কণ্ঠস্বরে যথাসম্ভব তারল্য মেখে মায়াবতী মন্তব্য করল- মন্দিরের পশ্চাতে সংগোপনে কী পরামর্শ করা হচ্ছে বীর প্রবরের? এরই মধ্যে কী ঘটেছে? গোত্রপতি তোমাকে কী নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন? কিসের এত ব্যস্ততা, এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা! আমি কি জানতে পারি?

হ্যাঁ, নিশ্চয় জানতে পারো। শিবপুর বীথির গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষের প্রধান শাস্ত্রী মনোহর নাগকে দেখা গেছে সভাস্থলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে। শিবপুর বীথির গূঢ়-পুরুষেরা অন্তর্ঘাত করে আমাদের শাস্ত্রার্থ পরিষদে যাতে বিঘু ঘটাতে না পারে তার পরামর্শ করছি। সশস্ত্র কর্মযোগে থাকব আমরা এবং শাস্ত্রজ্ঞান প্রয়োগ করবে তোমরা। উভয়ে মিলেই-না সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপন করতে পারব আমরা। তোমার তো শাস্ত্রালোচনায় মনোনিবেশ করা আবশ্যিক। তাছাড়া উদয়মান তো সেখানেই আছে। আমি তো দূরের মানুষ। শাস্ত্রজ্ঞানীর সান্নিধ্য কি তোমার অধিক কাম্য নয়? 

অর্কদাসের বঙ্কিম বাক্য মায়াবতী হেসে হাল্কা করে দিল। বলল- হ্যাঁ, শাস্ত্রালোচনা থেকে জ্ঞান আহরণ করা অবশ্যই আবশ্যিক। চিন্তা নেই, আজকের দিনটা তোমার কাজেই সহায়তা করি; শাস্ত্র বিষয়ে উদ্ভূত জ্ঞান পরে সতীর্থ হিঙ্গল মল্ল ও উদয়মান থেকে জেনে নেওয়া যাবে। আমাকে জ্ঞান দিতে ওরা কিন্তু অতিশয় আন্তরিক এবং ক্লান্তিহীন। কথা শেষ করে অর্কদাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে মুখটিপে হাসতেই সে যেন গম্ভীর হয়ে উঠল।

গম্ভীরতার সাথেই অর্কদাস বলল, এতসব ঘটনা ঘটে গেছে যে এক কথায় সবটুকু বলা যাবে না। এসো, পনসবৃক্ষটির ছায়াতলে কিছুক্ষণ বসি। পরামর্শ করি। আমার আশঙ্কা হচ্ছে আগামী দিনগুলো আমাদের জন্য কঠিন করে তুলবে শিবপুর বীথির সামন্তপ্রভুর মন্ত্রণাদাতা কুটিল ব্রাহ্মণ ঐ পুলিন ভট্ট।

পুলিন ভট্টের নাম শুনতেই জ্বলে উঠল মায়াবতী। সরোষে মন্তব্য করল- কী আস্পর্র্ধা! ব্রহ্মদূষণ! মানুষ হিসেবে সে কি গুরুদেবের হাঁটুর তুল্য? আমিও বলে দিয়েছি, শীল-বর্জিত ব্রাহ্মণের নিন্দা করলে ব্রহ্মদূষণ হয় না। চিৎকার-চেঁচামেচিতে এবং বিদ্রূপের হাসিতে অনেকেই আমার কথায় সমর্থন যুগিয়েছে। ওর থোঁতামুখ ভোঁতা হয় নাই?

অর্কদাসকে তেমনি চিন্তান্বিত ও উদ্বিগ্ন দেখে তার স্কন্ধোপরি মৃদু চাপড় দিয়ে মায়াবতী পুনরায় বলল- এবার ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এসো তো! আর আমাকে খুলে বলো, কী হয়েছে।

অর্কদাস ধীর পদে এগিয়ে গা ছেড়ে বসে পড়ল তৃণাচ্ছাদিত একটু জায়গা দেখে। কোনো ভাবান্তর নেই। গুরুগম্ভীর। মায়াবতী পাশে বসল ঘনিষ্ঠ হয়ে। অর্কদাস বিষয়টা খুলে বলতে আরম্ভ করল।

 

বর্ষপূর্বে প্রচণ্ড ঝড়ঝঞ্ঝায় পলাশতলীর কয়েকটি ক্ষেত্রকর পরিবার বিশেষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে গোত্রপতি প্রদোষ দেব ধর্মগোলা থেকে সাহায্য প্রার্থনা করলে পুলিন ভট্টের পরামর্শেই সামন্ত রুহীদত্ত তা বাতিল করেছিলেন। পুলিন ভট্টের মতে অনার্য দরিদ্র মানবকুলের প্রতি দয়ার্দ্র ব্যবহার করলে ওদের নাকি বাড় বেড়ে যায়। শূদ্র ও দাস শ্রেণীকে পদদলিত রাখাই সমাজে নিরঙ্কুশ শান্তি রক্ষা করার প্রাথমিক পূর্বশর্ত, শাস্ত্রে নাকি তেমন বিধানই দেওয়া আছে। বর্ণভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য সমাজব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে পুনপ্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে সমাজের সেবক ও দাস শ্রেণীর মানুষকে নিষ্করুণভাবে দাবিয়ে রাখা অবশ্যই প্রয়োজন- পুলিন ভট্টের পরামর্শটি ছিল সেরূপই। রুহীদত্ত ক্ষত্রিয় শাসক। ব্রাহ্মণ পরামর্শকদের নীতিমালা মান্য করে চলাই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন। অন্যথায় মুণ্ডিতমস্তক শ্রমণেরা ব্রাহ্মণদের স্থান দখল করে নেবে; বৈশ্যশ্রেণী শক্তিমান হয়ে চক্রহাতে পুনরায় রাজশক্তি করায়ত্ত করবে- যেমন করেছিল সম্রাট অশোকের সময়।

মধ্যখানে অর্কদাসকে বাধাগ্রস্ত করে মায়াবতী বলল- হ্যাঁ, বিষয়টি আমি ইতোপূর্বে কিছুটা তোমার মাধ্যমেই অবগত হয়েছিলাম। কিন্তু পিতৃব্য প্রদোষ দেব তো বসে নেই মোটেও। অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। উৎপন্ন ফসল থেকে ধর্মগোলার ভাগ শিবপুর পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে পলাশতলীতে পৃথক ধর্মগোলা স্থাপন করেছেন। রাজকোষে কর প্রদান স্থগিত করা হয়েছে। স্বভূমির ‘সীতা’ও ব্যক্তিসম্পত্তির ‘ভাগ’ কোনটাই শিবপুরে প্রেরণ করা হচ্ছে না। অদ্যকার শাস্ত্রার্থ পরিষদের সুপারিশ পাওয়া গেলে বিষ্ণুমন্দির স্থাপিত হবে এবং পৃথক বীথিও প্রতিষ্ঠিত হবে। পিতার দীক্ষাগুরুর আশীর্বাদে এই ব্যাপারে সম্ভারের মহারাজা পরম ভট্টারকের সম্মতি পেতে মোটেও অসুবিধা হবে না। প্রায় এক নিশ্বাসে সবগুলো কথা অর্ককে জানাতে পেরে এক ধরনের পরিতৃপ্তিবোধ করল মায়াবতী। প্রশান্তির  হাসি ফুটে উঠল তার মুখে।

অর্কদাস হতাশার সুরে বলল- মায়াবতী! তোমার সারল্যে আমি বিস্মিত হচ্ছি। তুমি জানো না, ইতোমধ্যে পুলিনভট্ট, রুহীদত্ত, পৃষধ্র ঘোষ এবং নরাধম মনোহর নাগ- আমার পিতৃহত্যাকারী- একযোগে কী কী ষড়যন্ত্র করছে। পশ্চিমের আর্যাবর্ত থেকে বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ পরিবারকে বিপুল পরিমাণ স্বভূমি ও জলাভূমি দান করে শিবপুর বীথির সর্বত্র বসতি স্থাপন করে দেওয়া হচ্ছে। এ সকল ভূমিতে নবাগত ব্রাহ্মণ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে শত শত ক্ষেত্রকর-হালিক-জালিক উৎপাদনে নিযুক্ত হয়ে এবং বহুসংখ্যক দাসদাসী গৃহকর্মে নিযুক্ত হয়ে ব্রাহ্মণদের দাসত্বে আবদ্ধ হচ্ছে। এ সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা অব্যাহত মন্ত্রোচ্চারণ করে চতুর্বর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মাহাত্ম্য প্রচার করছে। মনুর বিধান অনুসরণ করে আর্যব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শাসকদের মান্য করাই যে পরজন্মে ঘৃন্য যোনীপ্রাপ্ত হওয়ার দুর্ভাগ্য মোচনের মোক্ষম পন্থা একথা বলে তারা তাদের শাসন-শোষণ চিরস্থায়ী করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। সর্বশেষ যেটা করেছে সেটা আরো ভয়াবহ।

মায়াবতী উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল- সেটা আবার কী?

অর্কদাস বলল- তাতঃ শুকদেবের বিষ্ণুভক্তির সুযোগ নিয়ে প্রথমে তাকে গোত্রপতির বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে এখন তাকে একঘরে করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পুলিন ভট্টের নেতৃত্বে সকল ব্রাহ্মণ একযোগে প্রচারে নেমেছে এই বলে যে, তাতঃ শুকদেব মহাশয় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নিজ কন্যার বিবাহ দেন নাই; উপরন্তু তাকে শাস্ত্রশিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে খুবই গর্হিত ধর্মবিরোধী কাজ করেছেন। ভগবান বিষ্ণুর নাকি বিধান আছে- প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর কোনো বালিকার বিবাহ না হলে তাকে বৃষলী বলে গণ্য করতে হবে।

কথা বলতে বলতে অর্কদাস ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে পড়ল। তার চক্ষু বিস্ফারিত হলো, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হলো। এক সময়ে যথেষ্ট উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল- দেখো মায়াবতী! আমি কিন্তু এ সকল ব্রাহ্মণদের রসনাকর্তন করব, শিরচ্ছেদ করব। পুলিন ভট্টের নির্দেশেই নরাধম শান্ত্রী মনোহর নাগ আমার স্বর্গীয় পিতা অভয় কোচকে অস্ত্রাঘাত করেছিল। সেদিন আমি বালকমাত্র।

উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল অর্কদাস। বলল- জানো! প্রতিদিন আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমার স্বহস্তেধৃত খড়গের কঠিন আঘাতে ওদের শিরচ্ছেদ ঘটাব। বলতে বলতে কেমন যেন ভেঙ্গে পড়ল সে। রুদ্ধকণ্ঠে পুনরায় উচ্চারণ করল- দেখে নিও মায়াবতী। আমি ওদের একজনকেও ছাড়ব না। কেবল তুমি আমার পাশে থেকো। বলতে বলতে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল কান্নায়।

এরূপ আকস্মিকতায় কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল মায়াবতী। কয়েক মুহূর্তের জন্য মাত্র। অতঃপর দাঁড়িয়ে নিকটে এগিয়ে গিয়ে ভেঙ্গে পড়া অর্কদাসের মুখমণ্ডল দুই হাতে বেষ্টন করে তাকে বুকের কাছে টেনে নিল। মস্তকে কোমলভাবে গণ্ড স্পর্শ করে গভীর আবেগে উচ্চারণ করল- এই তো তোমার পার্শ্বেই আছি।

সেদিনের সেই নির্জন দ্বিপ্রহরে উদ্গত যৌবন এক তরুণ ও উদ্ভিন্ন যৌবনা এক তরুণী কতক্ষণ গভীর আশ্লেষে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের হৃদয়ে কীরূপ কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল, কিংবা মনে স্বপ্ন রচিত হয়েছিল কি না তা কেই-বা জানবে। তবে এক সময়ে আবেগও অবসিত হলো, দেহ শিথিল হলো, আলিঙ্গন ছেড়ে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও খুবই ঘনিষ্ঠভাবে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকল।

 

 

আট.

শাস্ত্রার্থ পরিষদের সভা-পুরোহিত তার প্রারম্ভিক বক্তব্যে আলোচনার গতিধারা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু পুলিন ভট্ট ও চন্দ্রশেখর মৈত্রের বিতণ্ডাতে তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন নি। বিতণ্ডাকারী দুজনই পণ্ডিত এবং শাস্ত্রার্থ পরিষদের আলোচনায় আমন্ত্রিত অতিথি। অধিকন্তু উদ্ভূত বিতণ্ডা ছিল অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক। তবে সামগ্রিক পরিবেশ ভট্ট মহাশয়ের কতটা প্রতিকূলে তা উপলব্ধি করে তিনি আপাত নীরব হলে এক পর্যায়ে মাধবশ্রী পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে সক্ষম হন। সভাস্থল শান্ত হয়ে এলে ভবদেব তার অসমাপ্ত বক্তব্য সমাপ্ত করেন।

এরপর পর্যায়ক্রমে আলোচকগণ উত্থাপিত বিষয়ের ওপর নিজ নিজ বক্তব্য উত্থাপন করলেন। পুরোহিত মহোদয় স্থির করলেন যে বয়োকনিষ্ঠদেরকে প্রথম দিকেই সুযোগ দেবেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যদানের জন্য। তিনি সর্বপ্রথম আহ্বান করলেন গুরু ভবদেবের আশ্রমের তরুণ শিক্ষার্থী হিঙ্গল মল­কে। হিঙ্গল মল­ উদয়মানের সন্নিকটে উপবিষ্ট ছিল। আসন ত্যাগের পূর্বে সে উদয়মানের মুখপানে দৃষ্টিপাত করল। উদয়মান স্কন্ধে হস্তস্থাপন করে অভয়দান করল এবং অস্পষ্টভাবে কী যেন বলল। অতঃপর সভা-পুরোহিতের নির্দেশে হিঙ্গল মল্ল সংক্ষেপে তার বক্তব্য উত্থাপন করল।

গুরুদেবকে শ্রদ্ধা ও উপস্থিত সকলকে অভিবাদন জানিয়ে হিঙ্গল যে বক্তব্য উত্থাপন করল তার সারমর্মটুকু সুস্পষ্ট : পলাশতলী-বটেশ্বরসহ সম্ভার রাজ্যের সকল বীথি এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজ্যের অধিকাংশ ভূভাগ হয় জলাভূমি কিংবা জঙ্গলাকীর্ণ। সেই প্রাচীনকাল থেকে এ সকল অঞ্চল আবাদ করে বসবাস করছে শবর, ডোম, চণ্ডাল, মল্ল, রাজবংশী, কোচ, কীরাত এই সকল নামের ছোট-বড় বহু জনগোষ্ঠী। মানব ইতিহাসের এক পর্যায়ে হিমালয় পর্বতমালার উত্তর ও মহাচীনের পশ্চিমে সৌমার নামক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী তাইগ্রীস নদী বিধৌত বদ্বীপ অঞ্চলে সুমেরীয় সভ্যতা গড়ে তোলে। বাণিজ্য উপলক্ষে সমুদ্রপথে বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়ায় ওদের বিরাট দল-উপদল ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূল ও দক্ষিণাপথ অতিক্রম করে আমাদের দেশেও বসতি স্থাপন করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা এ দেশের প্রাচীনতর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে নতুন সমাজ-সভ্যতা গড়ে তোলে। যে সকল গোত্র এ প্রক্রিয়ায় এদেশে এসে বসতি স্থাপন করে সংখ্যার দিক থেকে তাদের মধ্যে প্রধান ছিল পুণ্ড্র, কর্বট ও বঙ্গ। এরা সপ্রাণবাদী ছিল, প্রাণের অনন্ত অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, পূর্ব-পুরুষের আশীর্বাদ কামনায় পূজা-অর্চনা করত। আত্মোন্নতির জন্য যোগাভ্যাস ও তান্ত্রিক সাধনা করত। এরা উন্নত কৃষিকর্মেও দক্ষতা অর্জন করেছিল; কৃষি-সম্পর্কিত নানা উৎসব, যেমন পৌষ-পার্বণ, নবান্ন ইত্যাদি পালন করত; নৌযান নির্মাণ ও ব্যবসায়ে পারঙ্গম ছিল।

স্থলপথে পশ্চিমদিক থেকে বৈদিক আর্যগণ ভারতবর্ষে অভিযান চালানোর বেশ পূর্বেই আর্য-ভাষাভাষী আরেক নরগোষ্ঠী জলপথে আমাদের এলাকায় এসে উপনিবেশ গড়ে তোলে। এরা আর্যসাহিত্যে অসুর নামে পরিচিত। এরা ছিল বৈদিক আর্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত খর্বাকৃতির, হ্রস্ব কপাল, মার্জিত রুচিসম্পন্ন, চিন্তাশীল এবং কৃষিজীবী। এরাও বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। ইতোপূর্বে আগত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একটি সমন্বিত উন্নত জীবনাচার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণে এদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। নিজ-যোগ্যতায় এদের অনেকে প্রাকবৈদিক যুগে আবির্ভূত বর্ণবিভাগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রূপে বৃত হয়েছিল। ঘোষ, বসু, মিত্র, দত্ত, দেব, কর, গুপ্ত, নাগ, পাল, সেন, চন্দ্র ইত্যাদি পদবি প্রাচীনকালে ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।

এরপর হিঙ্গল মল্ল অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে তার বক্তব্যের শেষাংশ উপস্থাপন করেছিল- গুরুদেব আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, আমরা শৈব হই, তান্ত্রিক হই, বৌদ্ধ হই, অজীবিক হই কিংবা বিষ্ণুভক্ত হই- শ্রম করে জীবিকা অর্জনের জন্য আমাদের অভিন্ন ধর্ম হলো কৃষিধর্ম। যে সকল জমি-জলা-জঙ্গলের মাঝে আমরা বসবাস করি, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা জীবিকা অর্জন করে বেঁচে থাকি সেই জন্মভূমিকে মাতৃসম গ্রহণ করতে হবে। মায়ের কোল-নিবাসী প্রতিটি মানুষকে সহোদরসম ভালোবাসতে হবে। গভীর মমতায় পরস্পর হাতে হাত ধরে আনন্দের মধ্যে বাঁচতে হবে। আনন্দে সৃষ্টি, আনন্দে জীবনযাপন, আনন্দে মৃত্যু- পুনর্জন্ম আনন্দেরই অনন্ত প্রবাহ। সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে এই চেতনা সকলের অন্তরে জাগরূক রাখতে পারলে সমাজে অবশ্যই অব্যাহত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

হিঙ্গল মল্ল তার বক্তব্য সমাপ্ত করলে গুরু ভবদেব নীরবে স্মিতহাস্য ও মস্তক আন্দোলিত করে তাকে অনুমোদন জানালেন। আলোচনাসভার পুরোহিত মহাশয় স্পষ্ট ও দৃঢ় বক্তব্যের প্রশংসা করলেন এবং পরবর্তী নির্ধারিত আলোচক আশ্রমের আরেক তরুণ শিক্ষার্থী নীলাভ্র ভিক্ষুকে আহ্বান করলেন।

নীলাভ্র দণ্ডায়মান হয়ে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করল এবং সকলকে যথাবিহিত শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার বক্তব্য উত্থাপন করল। সে বলল : শাস্ত্রশিক্ষা ও সামাজিক শান্তি সংরক্ষণ সম্পর্কে সঠিক মতামত দিতে গেলে প্রাচীন শাস্ত্রকারদের কথা এবং পুরাণের কথার উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। বহুবর্ষ পূর্বের কথা। আদি ঋষিগণ- বশিষ্ট, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ- ঋকবেদের শ্লোকসমূহ রচনা করেছিলেন। এ সকল ঋষিগণ জ্ঞান-সাধনায় নিবেদিতপ্রাণ এবং ব্যক্তিগত আচরণে শুদ্ধহৃদয়, সংযতেন্দ্রীয় থাকায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। জন্মসূত্রে নয়, ত্যাগ, তপস্যা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে এরা ব্রাহ্মণপণ্ডিত ও ঋষি বলে গণ্য হয়েছিলেন। এ সকল কারণে তাদের বিধান প্রজাকুল নিঃশঙ্কচিত্তে মান্য করত। এ সকল সম্মানিত ঋষিপুরুষদের সহায়তায় রাজন্যবর্গ তৎকালে প্রচলিত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূলে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরা ইন্দ্র্র, বরুণ, অগ্নি, সোম প্রভৃতি দেবতার দোহাই দিয়ে প্রজাকুলকে রাজ-আজ্ঞা পালন করার বিধান দিতেন। কয়েক শতাব্দী এরূপ নির্বিবাদে চলার পর কিছু কিছু প্রজার মনে সন্দেহ দেখা দেয় এবং কোনো কোনো বুদ্ধিমান সাহসী মানুষ সকল নিপীড়নমূলক বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন। উৎকল অঞ্চলের এক রাজার পরামর্শক ছিলেন পণ্ডিত চার্বাক। সেই রাজার পুত্র মহারাজ পৃথ্ব মগধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পণ্ডিত চার্বাক তারও উপদেষ্টা ছিলেন। চার্বাক ছিলেন নিরীশ্বরবাদী দার্শনিক এবং কঠোর আর্যবিরোধী। তিনি বলতেন, ভণ্ড, ধূর্ত ও রাক্ষস- এই তিনে মিলে আগ্রাসী আর্যদের বেদান্ত দর্শন রচনা করেছে। চার্বাকের প্রভাবে মগধরাজ ও প্রাচ্যের অন্যান্য রাজন্যবর্গ ধর্মকথা ও আধ্যাত্মিকতা অগ্রাহ্য করে কৃষিবিদ্যা প্রবর্তন ও কৃষিকৃৎ-কৌশল প্রচার করতে থাকেন। তারা কৃষিকর্মকেই মানুষের আদিধর্ম বলে মান্য করার পরামর্শ দেন।

কিছুকালের মধ্যেই আর্য-আগ্রাসন-বিরোধী অসুর সম্রাট জরাসন্ধ মগধের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং মহা পরাক্রমশালী হয়ে ওঠেন। প্রাচ্যের অন্যান্য রাজন্যবর্গ- কামরূপের রাজা ভগদত্ত, শোণিতপুরের দৈত্যরাজ বান, পুণ্ড্র্ররাজ বাসু দেব, বঙ্গরাজ সমুদ্র সেন ও তৎপুত্র চন্দ্র সেন- এরা সকলেই মগধ সম্রাট জরাসন্ধের অনুগত ছিলেন। এরা একযোগে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষ অবলম্বন করেন। আর্য-বিরোধী জরাসন্ধ ও তার বংশধরেরা হাজার বছর ধরে মগধ শাসন করেন। জীবনবাদী, মানবপ্রেমী, ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী জৈন, অজীবিক ও বৌদ্ধ ধর্ম এ সময় অনুকুল পরিবেশে বিস্তারলাভ করে। বৌদ্ধ ধর্ম মৌর্য সম্রাটদের আমলে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সম্রাট অশোক বুদ্ধের শান্তির বাণী সমগ্র রাজ্যে প্রচারের উদ্যোগ নেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তিনি অসংখ্য শিলালিপি স্থাপন করেন স্থানীয় মানুষের ভাষায়- মাগধী কিংবা প্রাকৃতে। মৌর্যদের আমলে কিংবা গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সেইভাবে প্রাচ্যদেশে প্রবেশ করতে পারে নি। সাধারণ মানুষের ওপর বৌদ্ধদের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। কৌশলী ব্রাহ্মণ শাস্ত্রকারগণ মানুষের মন জয় করার লক্ষ্যে প্রাগার্য দেবতা শিবকে এবং প্রাগার্য দেবী দুর্গা, কালী ও মনসাকে স্বীকৃতি দিয়ে শৈব ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে এবং নতুন নতুন পূজা-অর্চনার প্রচলন করে, যেখানে নিম্নবর্গের মানুষ মু্ক্তির সন্ধান পেতে পারে। এভাবে পরিবর্তিত ব্যবস্থায় সম্রাট অশোকের আমলে যেসব রাজপুরুষ বৌদ্ধধর্ম-সংক্রান্ত-বিষয় প্রচারণায় প্রশাসনের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন সেই ধর্মমহামাত্র এবং অন্তমহামাত্র ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে ধর্মসামন্ত ও রাজ্যসামন্তে রূপলাভ করে। পরবর্তী পর্যায়ে এরা ব্রাহ্মণ্য-বর্ণবাদী-ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় বর্ণে রূপলাভ করলেও প্রজাশোষণ ও নিপীড়নে তারা দৃঢ়ভাবে এখনও ঐক্যবদ্ধ আছে।

মহামতি বুদ্ধ মানবের জন্য উন্নততর জগৎ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। সে-লক্ষ্যে তিনি ভিক্ষুসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানে থাকবে না জাতিভেদ, শ্রেণীভেদ, উঁচুনীচু ভেদাভেদ। চণ্ডালকুলে জন্ম নিয়েও কঠিন সাধনায় এবং মানবপ্রেমে একজন মানুষ স্থবির মহাস্থবির সিদ্ধাচার্য হয়ে উঠতে পারেন। ভিক্ষুসংঘে পরিধেয় তিনখণ্ড বস্ত্র, একটি ভিক্ষাপাত্র, একটি চিরুনি, কোমর বন্ধনী, একটি সূচ ও জলপান করার মৃৎপাত্র- এগুলোই ব্যক্তিগত সম্পদ। বাকি সকল কিছুই সংঘের সম্পত্তি।

বক্তব্যের শেষপ্রান্তে এসে নীলাভ্র ভিক্ষু করজোড়ে সকলকে নমস্কার করে বলল- ভক্তগণ, শাস্ত্রশিক্ষা, অধ্যয়ন ও কঠিন সাধনাই মুক্তির পথ; সমাজে অব্যাহত শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায়। স্মরণ করুন প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণেরা জীবিকা অর্জনের কর্মে নিয়োজিত থাকতেন। পণ্ডিত পরাশর কৃষিবিদ ছিলেন, তৎপিতা ঋষি বশিষ্ট পশুপালন করতেন। অথচ আজকের ব্রাহ্মণেরা পরশ্রমভোগী, প্রতারক। গ্রামীণ কৃষিসমাজে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- ব্রাহ্মণ, বাসক, বাঁশ; তিনে বাস্তুনাশ। অর্থাৎ বর্তমানে ব্রাহ্মণের শোষণ কৃষকের সর্বনাশ ডেকে আনে।

এভাবে নীলাভ্র ভিক্ষু তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানলে গুঞ্জরণ উঠল শ্রোতাদের মধ্যে। মঞ্চ থেকে পুলিন ভট্ট কিছু বলার উদ্যোগ নিলে তাকে থামিয়ে দিয়ে পুরোহিত মহাশয় শ্রীউদয়মানকে তার বক্তব্যদান করার আহŸান জানালেন।

উদয়মান বক্তব্য রাখার প্রস্তুতি নিয়ে দণ্ডায়মান হলো। পণ্ডিত পুলিন ভট্ট একই সঙ্গে দণ্ডায়মান হয়ে বিনয়ের সঙ্গে সভা-পুরোহিতকে অভিবাদন করে বললেন- মহোদয়! আলোচনার প্রারম্ভ থেকে এ পর্যন্ত ভবদেবের আশ্রমের একাধিক অর্বাচীন শিক্ষার্থীর মুখে অনেক জ্ঞানের কথা শ্রবণ করেছি। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য আর অধিক সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি বেদজ্ঞ পণ্ডিত। আসুন! আমরা প্রবীণেরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উত্থাপিত প্রশ্নটির মীমাংসায় পৌঁছাই এবং সমাজপতিসহ উপস্থিত সকলকে জ্ঞাত করে দেই।

পুলিন ভট্টের বিনয়ের ভণিতায় আচার্য মাধবশ্রী দৃশ্যত সন্তুষ্ট হলেন। বললেন- হ্যাঁ, পণ্ডিত ভট্ট মহোদয় উত্তম প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু যেহেতু উদয়মানকে ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি, সে অত্যন্ত সংক্ষেপে তার বক্তব্য উত্থাপন করুক। ইতোমধ্যে এদের বক্তব্য এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে আমরা আলোচনা-পরিষদের মূল মনোভাবটি মূল্যায়ন করে নিতে পারি।

শুকদেব পার্শ্বে উপবিষ্ট প্রদোষ দেবের সঙ্গে কানে কানে কী যেন পরামর্শ করে নিজ আসনে দাঁড়িয়ে জোড়হস্তে নমস্কার করলেন। মাধবশ্রী ইঙ্গিতে অনুমোদন দিলে তিনি বললেন- মহাশয়গণ। দ্বিপ্রহর আগত প্রায়। আমরা সামান্য ফলাহারের প্রস্তুতি রেখেছি। উদয়মান তার বক্তব্য সমাপ্ত করলে আমরা আলোচনায় কয়েক দণ্ডকালের বিরতি নিতে পারি। ফলাহার গ্রহণকালে আপনারা প্রবীণেরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করে নিতে পারবেন।

প্রস্তাব সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হলো। নির্দেশ পেয়ে উদয়মান করজোড়ে উপস্থিত সকলের প্রতি অভিবাদন জানাল এবং ধীরকণ্ঠে আরম্ভ করল : আসুন, সর্বপ্রথম আমরা সকলে সম্ভারের মহারাজা পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেন মহোদয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করি। এই সম্ভারেই ত্রেতাযুগের রাজা শ্রী হরিশচন্দ্রের রাজধানী ছিল। আসুন আমরা সকলে মিলে এই রাজ্যের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ও সকল প্রজাকুলের কল্যাণ কামনা করি।

এই পর্যায়ে প্রথমে নারী শ্রোতৃমণ্ডল থেকে এবং পরে অন্যান্য শ্রোতার নিকট থেকে সমর্থন এবং আনন্দসূচক উলুধ্বনি ও হর্ষধ্বনি শোনা গেল। উদয়মান পুনরায় করযুগল একত্র করে সকলকে অভিবাদন জ্ঞাপন করল।

 

বলল, আপনারা জানেন অথবা ইতোমধ্যে শ্রবণ করেছেন যে বৈদিক আর্যগণ ব্রহ্মাবর্ত থেকে আর্যাবর্তে বসতি বিস্তারে অগ্রসর হয়ে মথুরা কাশীতে পৌঁছে প্রাগার্য জনগোষ্ঠী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাদের বাধার সম্মুখীন হয়ে বৈদিক আর্যগণ কিছুতেই কাশী-মথুরা অঞ্চল অতিক্রম করে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হতে পারছিল না। একমাত্র লৌহ-নির্মিত যুদ্ধাস্ত্র ব্যতিরেকে অন্যকোনো ক্ষেত্রেই বৈদিক আর্যগণ বাধাদানকারী সেই প্রাগার্য জনগোষ্ঠী থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারে নি- কি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়, কি কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্রিয়াকর্মে। সে-সময়ে কুরু-পাঞ্চাল রাজ্যের অনন্যসাধারণ মেধাসম্পন্ন এক আর্যপুত্র ঋষি গার্গ্য মুনির আশ্রম থেকে তিনখানি বেদসহ সমস্ত ব্রাহ্মণ্যবিদ্যা আয়ত্ত করে মহাব্রাহ্মণ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করল। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে জানতে পারল যে, সে নিজে কুরু-পঞ্চালের রাজপুত্র এবং সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। অচিরেই তিনি রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হলেন এবং আর্য জনগোষ্ঠীর অগ্রাভিযান সফল করার উপায় উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করলেন। এই প্রতিভাধর রাজার নাম প্রবাহন জৈবলি। সকল প্রজাসাধারণের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য সে উদ্ভাবন করল ব্রহ্মের ধারণা। তার রচিত শাস্ত্রমতে ব্রহ্ম সকল দেবতাকুলের ঊর্ধ্বের দেবতা এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের সকল বস্তু ও প্রাণী তারই সৃষ্টি এবং সব তাতেই বিলীন হয়। তিনি অব্যয়, অব্যক্ত, সর্বব্যাপক, স্বয়ম্ভু, স্বমহিমায় ভাস্বর, অদ্বিতীয়, অদৃশ্য, আদি-অন্তহীন, কাল ও সীমার অতীত। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের নিয়ন্ত্রক। তার মতে ব্রহ্মপুরাণ আদি পুরান। সেই সঙ্গে  প্রবাহন যুক্ত করল বায়ু বা শিবপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণ। প্রাচীন স্থানীয় দেবতা নারায়ণই সূর্যদেবতা, সে-ই বিষ্ণু; প্রাচীন দেবতা যোগীনই রুদ্র, রুদ্রই মহাদেব বা শিব। এরা ব্রহ্মের মহিমারই প্রকাশমাত্র। রাজা যেহেতু প্রজাদের প্রতিপালক অতএব রাজা বিষ্ণুরই অবতার মাত্র। রাজার আদেশ অবশ্যই সকলের মান্য।

প্রবাহন এভাবে প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সকল দেবতাকে আত্মীকৃত করে নিল আর্য সংস্কৃতিতে এবং রাজার নিয়ন্ত্রণে সকল মানুষের সমন্বয়কে শান্তিপূর্ণ করার শাস্ত্রগত বিধান প্রতিষ্ঠা করল। প্রাকবৈদিক যুগের বর্ণবাদী ব্যবস্থাকে আর্যরা গ্রহণ করে নিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বিপুল সংখ্যক বৈশ্যের সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি নতুন বর্ণ- শূদ্র। উত্তম-শূদ্র হলো তারাই যারা নির্বিবাদে এই নতুন বর্ণব্যবস্থা মেনে নিল, আর যারা মানল না তাদেরকে বলা হলো অধম-শূদ্র বা অন্ত্যজ। প্রাচীন সমাজের অনেকে আর্যসমাজে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় হিসাবে যুক্ত হলো এবং সমাজ ও রাজ্যশাসন-ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী বর্ণে রূপান্তরিত হলো। মগধে মৌর্য রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্র গুপ্ত এরূপ ক্ষত্রিয় এবং তার মন্ত্রী বিষ্ণুগুপ্ত কৌটিল্য অনুরূপ ব্রাহ্মণ। এভাবে আর্যকরণ প্রশংসনীয় গতিতে অগ্রসর হলো প্রাচ্যের দিকে। কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো না; মহামতি বুদ্ধের জীবনবাদী নিপীড়নমুক্ত ও মানবপ্রেমী ন্যায়ভিত্তিক সমাজও প্রতিষ্ঠিত হলো না। কেন হলো না? কারণ এই উদ্যোগের মধ্যে প্রকাণ্ড একটি প্রতারণা লুকিয়ে আছে। প্রতারণাটি হলো এই যে পরবর্তী জন্মে মানুষ কোন বর্ণে জন্মলাভ করবে তা নির্ভর করবে এ জন্মের কর্মফলের ভিত্তিতে। আবহমান কাল থেকে আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন মানুষের বর্ণ নির্ধারিত হয়েছে তার নিজস্ব যোগ্যতায়- অধ্যয়ন, অনুশীলন ও তপস্যায়। ব্যাস, কৌশিক, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ ও পরাশর ব্রাহ্মণ হিসাবে স্বীকৃত হয়েছেন নিজ যোগ্যতায়, জন্মসূত্রে নয়। ব্রাহ্মণ তার জ্ঞানচর্চা, হৃদয়ের শুদ্ধতা ও উন্নত আচরণে গ্রহণযোগ্য। ক্ষত্রিয় তার রণনৈপূণ্য ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতায় স্বীকৃত। এবং এটি এই জন্মেই, কথিত পরজন্মে নয়। নিপীড়নমুক্ত, জীবনবাদী, মানবপ্রেমী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই এই প্রতারণা থেকে মানবগোষ্ঠীকে উদ্ধার করতে হবে- আর সেটা সম্ভব সমাজের বৈষম্য দূর করে; সকলের জন্য শাস্ত্রশিক্ষার দ্বার, কর্মের দ্বার, তপস্যার দ্বার সমানভাবে উন্মুক্ত করে দিয়ে। আসুন আমরা সকলে মিলে উদ্যোগ নেই, আমরা নিশ্চয় জয়যুক্ত হব।

উদয়মানের বক্তব্যের পর সভা-পুরোহিত ফলাহারের জন্য আলোচনায় বিরতি প্রদান করলেন। অতঃপর গুরু ভবদেব, চন্দ্রশেখর মৈত্র ও পুলিন ভট্টকে নিয়ে প্রস্তাবিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্যে সভা-পুরোহিত মত-বিনিময়ে প্রবৃত্ত হলেন। মত-বিনিময়ের সময়ে তিনি গোত্রপতি প্রদোষ দেব এবং শুকদেব মহাশয়কেও ডেকে নিলেন। সম্ভারের মহারাজা পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেন নিজেও বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারি এটা বিবেচনায় এনে অনেক তপ্তবাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনা করা হলো। অবশেষে সকলে মিলে তিনটি সুপারিশে ঐকমত্য পোষণ করলেন। এক, বটেশ্বরে শীঘ্রই একটি বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠিত করা হবে; একজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং তারই

তত্ত্বাবধানে সেই মন্দির-সংলগ্ন একটি বিদ্যাপীঠ পরিচালনা করা হবে; দুই, উক্ত বিষ্ণুমন্দির, শিক্ষাশ্রম এবং বটেশ্বরে ইতোপূর্বে প্রতিষ্ঠিত সকল মন্দিরের ব্যয়-নির্বাহের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ স্বভূমি দান করা হবে; এবং তিন, বটেশ্বরকে কেন্দ্র করে একটি পৃথক বীথি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

ফলাহারের বিরতির পর পুনরায় সভা আরম্ভ হলে আচার্য মাধবশ্রী আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে নিজ বক্তব্য উত্থাপন করলেন এবং আলোচকদের পক্ষ থেকে উপর্যুক্ত তিনটি পরামর্শের কথা ঘোষণা করলেন। আলোচনার সময়ে পুলিন ভট্ট যদিও তৃতীয় সুপারিশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন, তবে ঘোষণার সময়ে বাধা প্রদান থেকে বিরত থাকলেন।

বিপুল হর্ষধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে আলোচনা সমাপ্ত হলো। এর পক্ষকালের মধ্যেই শুকদেব মহাশয় প্রদোষ দেবকে নিয়ে সম্ভারে যাত্রা করলেন।

 

মাস কয়েক কেটে গেল। অবশেষে কয়রা নদীর উত্তরপারের পিপ্পলী হাট, বিল্বগ্রাম ও পলাশতলী এবং দক্ষিণপারের ঘাগড়া, কদম্বঘাট ও বটেশ্বর এই ছয়টি গ্রামের জমি-জলা ও বনভূমির নির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করে পৃথক একটি বীথি স্থাপন করার রাজকীয় হুকুমনামা জারি করা হলো। নতুন বীথির নামকরণ করা হলো পলাশতলী-বটেশ্বর বীথি। সম্ভার মহারাজের পক্ষ থেকে প্রদোষ দেবকে এই বীথির শাসনকার্য পরিচালনা করার দায়িত্ব প্রদান করা হলো। কর-আদায় ব্যবস্থা, আরক্ষা-ব্যবস্থা, ধর্মগোলা ব্যবস্থা, অভিন্ন চারণক্ষেত্র ও জলাভূমি, গ্রাম-পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও বীথি-প্রশাসনের অন্যান্য কার্যাদির কাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে প্রদোষ দেবকে জ্যেষ্ঠ কায়স্থ হিসাবে পদায়ন করা হলো। বটেশ্বরে একটি বিষ্ণুমন্দির স্থাপন করার নির্দেশ দিয়ে বেদজ্ঞ পণ্ডিত মাধবশ্রীকে নিয়োগদান করা হলো। শিবমন্দিরের পার্শ্বে অভিন্ন বেদীতে বিষ্ণুমন্দিরেরও পূজামণ্ডপ নির্মাণ করা হলো। একদিন ঘটা করে সেখানে বিগ্রহও প্রতিষ্ঠা করা হলো। মন্দিরের অদূরে পুরোহিত মহোদয়ের আবাসস্থল, আশ্রম গৃহাদি এবং নতুন বীথির প্রশাসনিক গৃহাদি নির্মাণের আয়োজন শুরু হলো পূর্ণ উদ্যোমে। সকলের প্রত্যাশা আগামী নববর্ষের ভাদ্রী পূর্ণিমার পূর্বেই একটি পূর্ণাঙ্গ বীথি-প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতিষ্ঠিত হবে বিষ্ণুমন্দির সংলগ্ন বিদ্যাপীঠ। জনপদসমূহের সকল জনগোষ্ঠী নতুন কর্মযোগে বিপুলভাবে যুক্ত, উৎসাহিত, উত্তেজিত ও আনন্দিত হয়ে উঠল। আনন্দ নেই কেবল কর্বট প্রবীণ শুকদেবের। কেবল ভয়, কেবল উদ্বেগ। কোথায় যেন অলক্ষে চলছে ষড়যন্ত্র। শুকদেবের বিরুদ্ধে, আর তার প্রাণপ্রিয় কন্যা মায়াবতীর বিরুদ্ধে।

 

 

নয়.

নতুন করে একটা প্রশাসন-ব্যবস্থা গড়ে তোলা বিপুল এক কর্মযজ্ঞ। নতুন বীথির প্রধান পুরুষ প্রদোষ দেব, তার প্রধান মন্ত্রণাদাতা শুকদেব। ছয়টা মাস ধরে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে শুকদেবকে। জ্যৈষ্ঠকায়স্থ প্রদোষ দেবও দিনরাত লেগে আছেন এই কর্মযজ্ঞে। কিন্তু একটি বিষয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন শুকদেব। নতুন বীথির নানাবিধ সাংগঠনিক কর্মে পুলিন ভট্টের এত আগ্রহের কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন না। এটা-সেটা পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রায় প্রতিনিয়তই হাজির হচ্ছিলেন তিনি। শুকদেব লক্ষ করেছেন ইতোমধ্যে আচার্য মাধবশ্রীর সঙ্গে তার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছে। এমনকি ঘনিষ্ঠতা হচ্ছে প্রদোষ দেবের সঙ্গেও।

সেদিনই আলোচনা হচ্ছিল বিষ্ণুমন্দির-ভিত্তিক বিদ্যাপীঠের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার বিষয় নিয়ে। পুলিন ভট্ট প্রস্তাব করলেন যে বিদ্যাপীঠের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রধান অংশ হবে উপনয়ন অনুষ্ঠান। ‘উপ-নী’ অর্থাৎ কিনা ‘যুবকের নতুন জীবনে প্রবেশ’। আচার্য মাধবশ্রী যাদেরকে শিক্ষার্থী হিসাবে গ্রহণ করবেন তাদেরকে অবশ্যই উপনয়ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ব্রহ্মচর্য পালনের প্রতিজ্ঞা করে বিদ্যার্জনের ব্রত গ্রহণ করতে হবে। অতীতকালে তপোবনে বিভিন্ন গুরুর আশ্রমে যেমনি থাকত তেমনি আচার্যের পদপ্রান্তে সর্বদা নিবেদিত থাকতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে।

প্রস্তাব শুনে দৃশ্যত সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন প্রদোষ দেব। বলেছিলেন- হ্যাঁ, পণ্ডিত মহাশয় উত্তম প্রস্তাব করেছেন। আচার্য মাধবশ্রীর পরিচর্যায় এখানেও একটা সার্বজনীন বিদ্যাপীঠ গড়ে উঠবে।

আচার্য মাধবশ্রী স্মিতহাস্যে শিরঃসঞ্চালন করে প্রদোষ দেবের এই মন্তব্যে সম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন। সেই বেদজ্ঞ পণ্ডিতের দৃষ্টি হয়তো দূর অতীতে বিস্তারলাভ করেছিল হয়তো তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন যে এখানেও তক্ষশিলার মতো বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ গড়ে উঠবে। শুকদেবও আহ্লাদিত হয়েছিলেন। কিন্তু পুলিন ভট্ট শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন- বিদ্যাপীঠ সার্বজনীন হবে কী করে? শাস্ত্রে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে উপনয়ন, বেদপাঠ ও অগ্নি আধান ফলপ্রসূ হতে পারে কেবল তাদের ক্ষেত্রেই যারা দ্বিজ, অশূদ্র এবং কোনো পাপকর্মে লিপ্ত নয়। বিদ্যাদান কিংবা বিদ্যার্জন তো সার্বজনীন হতেই পারে না।

পুলিন ভট্টের ঐ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেন নি মাধবশ্র্রী কিংবা প্রদোষ দেব। তবে কি ওরাও পুলিন ভট্টের এই সব কুটিল তর্কজালে প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন? বিদ্যাপীঠকে সার্বজনীন করতে না পারলে সমন্বয়ধর্মী সমাজব্যবস্থা কী করে গড়ে উঠবে? অস্পৃশ্যতার অবমাননা থেকে মানুষের মুক্তি হবে কী ভাবে? কী ভাবে মুক্তি পাবে নারীসমাজ? ইত্যাকার ভাবনায় শুকদেব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

পিতার শুষ্ক মুখ দর্শনে উৎকণ্ঠিত হলো মায়াবতী। দাওয়ায় উপবেশনের ব্যবস্থা করে ছুটে গেল হস্ত-মুখাদি প্রক্ষালনের জল সংগ্রহ করতে।

শুকদেব মাদুরের ওপর বসে পড়লেন; নিষ্পলক তাকিয়ে দেখলেন কন্যাকে। মুখশ্রী তার স্বর্গত মাতার যেন প্রতিরূপ। এখনও তেমন ভারী হয়ে ওঠে নি। তবে তেমনি লাবণ্যময়। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন। ভাবলেন, বিবাহটা হয়ে গেলে ভালো হতো। কিন্তু …। ইতোমধ্যে পুলিন ভট্টের প্ররোচনায় নানা ধরনের কানাঘুষা শুরু হয়েছে। শুকদেবকে একঘরে করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির জ্যেষ্ঠ কায়স্থ প্রদোষ দেবের প্রশ্রয় পেলে কিংবা আচার্য মাধবশ্রীর সমর্থন পেলে কবেই তা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিয়ে ফেলতেন পুলিন ভট্ট। ক’দিন পূর্বেও মায়াবতীর অগ্রজ ভানুপ্রসাদ বিষয়টি শুকদেবের নিকট উত্থাপন করে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। পুত্র ভানুপ্রসাদকে দোষারূপ করা যায় না। সে ঘোর সংসারী মানুষ। অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকে জোত-জমি-জলা-খামার নিয়ে। পুত্রবধু মদনিকাও অনুরূপ। গৃহস্থালীর হাজারো কর্ম ও দাসদাসী নিয়ে সেও ব্যস্ত। শাশুড়ি গত হবার পর অধিকতর নিবিষ্ট সে সকল কর্মে। শ্বশুরের সেবা যন্তের দায়িত্ব অর্পণ করেছে মায়াবতীর ওপর। কিন্তু নারীমহলে ত্রয়োদশবর্ষ অতিক্রান্ত আইবুড়ো কন্যার বিষয়ে কোনো কথা উঠবে না, তা হতে পারে না।

দু বৎসর পূর্বেও শুভানুধ্যায়ীগণ বিবাহের দুয়েকটি প্রস্তাব এনে হাজির করত। কিন্তু বারংবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এখন কেউ প্রস্তাবও আনে না। জ্ঞানার্জনে নিবেদিত ত্রয়োদশবর্ষ অতিক্রান্ত কন্যার পাণিগ্রহণের আগ্রহ দেখাবে কোন যুবা? উদয়মান, হিঙ্গল- এরা মায়াবতীর সতীর্থ। অসঙ্কোচ মেলামেশা, বন্ধুত্ব। কিন্তু তারা কি সংসারী হবার কথা ভাবতে পারে? অর্কদাসের দৃষ্টিতে কেমন যেন মুগ্ধ বিস্ময় লক্ষ করেছেন শুকদেব। কিন্তু ওরা তো প্রদোষ দেবের কুলস্থ, আশ্রিত। প্রদোষ দেব কি সেরূপ বিবাহে সম্মতি দেবে? সবচেয়ে বড় কথা, এসব ব্যাপারে মায়াবতীর ভাবনাটি কী তাও তো জানা নেই শুকদেবের। সে কি তার সঙ্গে এ প্রসঙ্গে আলাপ করবে?

শীতের অপরাহ্ন। দেখতে দেখতে চতুর্দিক অন্ধকারে হয়ে আসছে। মায়াবতী কখন যে দাওয়ার এক প্রান্তে দুই ঘটি জল রেখে গেছে টেরও পায় নি শুকদেব। পিতাকে চিন্তামগ্ন দেখে মায়াবতী কী ভেবেছে কে জানে; হয়তো গোধনগুলি চারণভূমি থেকে ফিরে এল কি না তাই দেখতে দৌড়ে গেছে। এ কর্মে নিয়োজিত আছে একজন দাসী। কিন্তু ধবলীকে একনজর না দেখলে, ওকে ক্ষণকাল হাত বুলিয়ে আদর না করলে মায়াবতী স্বস্তি পায় না। আপন মনেই হাসল শুকদেব।

অন্ধকার তখনো ঘনীভূত হয় নি। কুয়াশার আচ্ছাদন ভেদ করে বৃক্ষলতার ফাঁকে ফাঁকে চন্দ্রকিরণ লুটিয়ে পড়েছে ভূমিতে, দূর্বার ডগায় শিশির কণায়। কী এক আলো-আঁধারি খেলা! শুকদেব গাত্রোত্থান করলেন।

 

দুই দিবস পর বিষ্ণুমন্দির প্রাঙ্গণে একটি অনাড়ম্বর উপনয়ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। বন্দর-নগরী ঢবাকা থেকে পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা কর্তৃক প্রেরিত পাঁচ জন এবং পুলিন ভট্ট কর্তৃক নির্বাচিত শিবপুর বীথির স্থানীয় দুই জন, মোট সাতজন বারো-তেরো বৎসর বয়সের বালককে মন্ত্রপাঠ ও অগ্নি-আধানের মাধ্যমে উপবীত পরিধান করানো হলো। এরা প্রত্যেকে পৃথক পৃথকভাবে ব্রহ্মচর্য পালন ও একনিষ্ঠভাবে অধ্যয়নে ব্রতী থাকার শপথ বাক্য পাঠ করল। আনুষ্ঠানিকভাবে আশীর্বাদের মাধ্যমে তাদেরকে মাধবশ্রীর শিক্ষাশ্রমে গ্রহণ করা হলো। শুকদেব, প্রদোষ দেব, পুলিন ভট্টসহ বেশ কিছু মান্যবর লোকজন উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন গুরু ভবদেব এবং তার শিষ্যবর্গও। এ ধরনের শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানে নারীকুলের উপস্থিতি প্রত্যাশিত নয়। তবুও ভবদেবের সঙ্গী হিসাবে মায়াবতী, ইসিদাসী ও আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিল। পুলিন ভট্ট এতে অস্বস্তি বোধ করলেও আচার্য মাধবশ্রীর নিস্পৃহতা লক্ষ করে এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন। তার প্রধান লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ঢবাকা নগর পরিষদের ব্রাহ্মণ-সদস্য পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা প্রেরিত পাঁচজন শিক্ষাব্রতীকে বিষ্ণুমন্দিরের ব্রহ্মচর্যাশ্রমে অন্তর্ভুক্ত করাতে পেরেছেন। এদের মধ্যে তিনটি বালক ব্রাহ্মণ কুলজাত, একজন ক্ষত্রিয় কুলজাত এবং একজন প্রভাবশালী বৈশ্য কুলের। দেবজ্যোতি শর্মা পুলিন ভট্টের ঘনিষ্ঠ জন, গুরুভ্রাতা। পুলিন ভট্ট, মাধবশ্রী ও দেবজ্যোতি এই তিনজনই সুদূর কর্ণসুবর্ণ নগর পরিষদের অন্যতম নগর-উপপ্রধান আচার্য হলায়ুধ মিশ্রের অনুগত শিষ্য। তিনি তাদের দীক্ষাগুরু। গুপ্ত সাম্রাজ্যের বহিঃপ্রান্তিক সামন্তরাজ্য সম্ভারে এরা বসতি স্থাপন করেছিলেন ব্রাহ্মণ্য-সমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিয়ে। জলপথে কর্ণসুবর্ণ, কোটালীপাড়া, ঢবাকা ও সুবর্ণগ্রামে বাণিজ্য উপলক্ষে বণিকশ্রেষ্ঠদের যে সকল মাঝিমাল্লারা যাতায়াত করে তাদের মাধ্যমে এদের অদ্যাবধি নিয়মিত যোগাযোগ হয় আচার্য হলায়ুধ মিশ্রের সঙ্গে। তার আদর্শ অনুসরণ করেই পুলিন ভট্ট প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রাহ্মণ্যসমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্রত গ্রহণ করেছেন। এই পাঁচ জন শিক্ষাব্রতীর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন শিবপুর বীথিতে বসবাসরত ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে আরো দুজন বালককে। এটা শুরু মাত্র। নিকট ভবিষ্যতে আরো আসবে। তাদের মাধ্যমে হলায়ুধ মিশ্রের অন্যান্য সহযোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সহজ হবে। শিবপুর ও বটেশ্বরসহ সম্ভার রাজ্যের সর্বত্র ব্রাহ্মণ্যসমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভবপর হবে। ভবিষ্যতের সেই অভিসন্ধির সাফল্য কল্পনা করে মনে মনে পুনঃপ্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন পুলিন ভট্ট : আচার্য অহিরুদ্র দেব! তোমার প্রিয় শিষ্য আচার্য মাধবশ্রীর সহায়তা নিয়েই তোমার সমন্বয়ধর্মী-সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেব।

অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলে শুকদেব বিনীতভাবে নিজ কন্যা মায়াবতীর শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহের কথা প্রকাশ করে তাকেও মাধবশ্রীর শিক্ষাশ্রমে স্থান দেওয়ার প্রার্থনা করলেন। এতে পুলিন ভট্ট বিস্ময় ও প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করলেন। মনুর বিধান থেকে একাধিক শ্লোক উচ্চারণ করে ব্যাখ্যা দিলেন যে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ হিসাবে আচার্য মাধবশ্রী কিছুতেই এ প্রস্তাবে সম্মতি দিতে পারেন না। কারণ মৌর্য শাসনামলে শ্লথ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার কারণে সমাজে বহুবিধ আনাচার প্রবেশলাভ করেছে। এ সকল শাস্ত্রবিরোধী অনাচার সংশোধন করে চতুর্বর্ণ-ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্যসমাজ পুনঃনির্মাণ করা সকলেরই কর্তব্য এবং তা-ই কল্যাণকর।

তৎক্ষণাৎ পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র ও উদয়মান পুরাণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে দ্বিমত পোষণ করলেন। তারা মানবধর্ম শাস্ত্র, মনুসংহিতা এবং বৃহস্পতি-স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিলেন যে, অতীতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য শুধু এই তিন বর্ণের বালকই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূদ্র বর্ণের আগ্রহী বালককেও উপনয়ন দান করা হয়েছে। আর তাছাড়া নারীশিক্ষারও অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। প্রাচীনতম ঋকবেদে অনেক নারী মন্ত্র-রচয়িত্রীর নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ঘোষা, বিশ্ববাবা ও অপালা শ্লোক-রচয়িত্রী হিসাবে বিলক্ষণ স্বীকৃতিলাভ করেছিলেন।

পুলিন ভট্ট দমে যাবার পাত্র নন। তিনিও যথাযোগ্য দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যুত্তর দিতে লাগলেন। ফলে উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হলো। শুকদেব এ পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়লেন। ভবদেব হস্ত উত্তোলন করে সকলকে থামতে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করলেন- শুকদেব মহাশয় আচার্য মাধবশ্রীর নিকট একটি প্রার্থনা করেছেন। বিষয়টির ওপর আচার্য মহোদয়ই সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রকৃত অধিকারী।

তার বক্তব্যে প্রদোষ দেব ও আচার্য মাধবশ্রীসহ সকলেই কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন। এ পরিস্থিতিতে প্রদোষ দেব প্রসঙ্গান্তরে গেলেন- তাহলে এক্ষণে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা হোক।

অতঃপর দীর্ঘক্ষণ মতবিনিময় ও বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হলো যে বিষ্ণুমন্দির ও শিক্ষা-আশ্রমের দৈনন্দিন কর্মাদি সম্পন্ন করার জন্য এবং আচার্য মহোদয়ের সেবার জন্য কয়েকজন সার্বক্ষণিক কর্মী প্রয়োজন। যারা অন্তরের ভক্তিতে এরূপ কর্মে আগ্রহী এবং যাদের সংসারে তেমন পিছুটান নেই কেবল তাদেরকেই এসব কর্মে নিয্ক্তু করা হবে। অনেক বাছাইয়ের পর ঘাগড়া গ্রামের ভাগচাষী দীননাথ দাসকে নিযুক্ত করা হলো। সে বয়সে পৌঢ়, বিপত্নীক এবং সংসারে কোনো পিছুটান নেই। পৃথক বীথি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শুরু থেকে সে ভক্তি সহকারে এখানকার নানান নির্মাণ কাজে শ্রমদান করে আসছে। সে খুবই বিনয়ী এবং দায়িত্বশীল। তাকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বাছাই করা হলো বটেশ্বর গ্রামেরই বনবাসী জনগোষ্ঠীর দুজন কিশোরী খুল­না এবং কলিঙ্গাকে। এরা ইতোপূর্বে শিবমন্দির এবং গুরু ভবদেবের আশ্রমে প্রশংসনীয় শ্রমদান করেছে। ভগবান বিষ্ণু এবং মন্দির পুরোহিত মাধবশ্রীর প্রতি তাদের ভক্তি অপরিসীম। এরা প্রতেকেই আশ্রমে সার্বক্ষণিকভাবে অবস্থান করবে এবং মন্দির-প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা ও পুরোহিত মহোদয়ের সেবাকর্মে নিযুক্ত থাকবে।

সর্বশেষে শুকদেব মহোদয়ের প্রার্থনাটিও বিবেচনা করা হলো। আচার্য মাধবশ্রী নিজেই জানালেন যে, মায়াবতী সুবিধামতো প্রতিনিয়তই আশ্রমে আসতে পারে এবং নিজেকে মন্দির ও পুরোহিত মহোদয়ের সেবাকর্মে নিয়োজিত করতে পারে। ইচ্ছা করলে আচার্য মহোদয় যখন শিক্ষার্থীদেরকে পাঠদান করবেন কিংবা আলোচনা করবেন তখন সে পশ্চাতে নীরবে উপবেশন করে সে-সকল শ্রবণও করতে পারে। মায়াবতী তো মাধবশ্রীর স্নেহের পাত্র, কন্যাতুল্য।

আচার্য মহোদয় বক্তব্য শেষ করলে মায়াবতী সম্মুখে অগ্রসর হয়ে মাধবশ্রীর পদপ্রান্তে আভূমি গড় হয়ে প্রণাম করল এবং প্রণত অবস্থাতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। এরূপ আনন্দ-সংবাদ পেয়ে অকস্মাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার তাৎপর্য কী হতে পারে তা উপস্থিত কেউ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো না। 

 

দশ.

মাঘের শেষে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে শিবরাত্রি। শিবরাত্রির ব্রত পালনে উপবাসই প্রধান কর্ম। পূর্বদিবস দিনমান সংযত থেকে একাহারে যাপন করতে হবে।

স্থাপিত প্রতিমা, ঘট, পট, মণ্ডল, শালগ্রাম, পুস্তক, শিবলিঙ্গ ও জল এই সকল পূজার আধার। যদিও ব্রাহ্মণ্যশাস্ত্র বিধান দিয়েছে যে উপনীত ব্রাহ্মণ ব্যতীত প্রতিমা ও শালগ্রাম পূজায় কারো অধিকার নেই, তথাপি বটেশ্বর শিবমন্দিরে প্রথমাবধি অব্রাহ্মণ দ্বারাই পূজার পৌরোহিত্য চলে এসেছে। গুরু ভবদেব এ বছর শ্রী উদয়মানকে পূজার পৌরোহিত্য করার ভার দিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। উদয়মান প্রত্যুষ থেকে সংযত উপবাসী। উপবাসকর্মে তার সঙ্গে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যোগ দিয়েছে হিঙ্গল মল­, কলিঙ্গা এবং মায়াবতী।

উদয়মান যথাবিহিত স্বস্তিবাচন, সামান্যার্ঘ্য, জলশুদ্ধি, করশুদ্ধি, পুষ্পশুদ্ধি ইত্যাকার পূর্বকর্ম সমাধাপূর্বক আসন গ্রহণ করে প্রাণায়াম করতে শুরু করল। অদূরে আরো বহু ভক্তের সম্মুখে হিঙ্গল, কলিঙ্গা এবং মায়াবতী তাদের আসন গ্রহণ করল। মেরুদণ্ড সোজা রেখে উদয়মান মূলাধার সঙ্কোচন করে পূরক, কুম্ভক ও রেচক অর্থাৎ মৃদুভাবে শ্বাসবায়ুর আকর্ষণ, রোধ ও পরিত্যাগ করতে করতে হৃদয়ে দেবমূর্তির ভাবনা ধারণ করতে থাকে। পূজার অগ্রগতি হলে এক পর্যায়ে উত্তরপার্শ্বে পিনাক স্থাপন করে উদয়মান নিজেই উত্তরাস্য হয়ে উপবেশন করল- ভস্ম দ্বারা কপালে অর্ধচন্দ্রাকৃতি বা ত্রিপুণ্ড্রক অঙ্কন করে নিজ কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করে অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ করল। ‘ওঁ হবায় নমঃ, ও মহেশ্বরায় নমঃ’ বলে পিনাকের ওপর আতপচাল, পুষ্প ও দূর্বা ছড়িয়ে দিয়ে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করল। এরপর প্রথমে জল দ্বারা এবং পরে প্রথম প্রহরে দুগ্ধ দ্বারা ধৌত করার পর উদয়মান নিজ আসনে থেকেই ভক্তজনের মুখোমুখি হয়ে পুনরায় উপবেশন করল। অতঃপর দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনীর দ্বারা নিজ দক্ষিণ গণ্ডে আঘাত করে ‘বমবম’ শব্দে উচ্চস্বরে মুখবাদ্য শুরু করল এবং বগল বাজাতে থাকল। সকলে একই সঙ্গে ‘নমঃ শিবায়ঃ, নমঃ শিবায়’ বলে উচ্চস্বরে ধ্বনি দিতে লাগল। এভাবে দীর্ঘক্ষণ শিব প্রণাম চলতে থাকলে মন্দির সম্মুখে একটি আনন্দ-উৎসবের আমেজ রচিত হলো। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর সমাগত হলে উদয়মান পুনরায় উত্তরাস্য হয়ে নিজ আসন গ্রহণ করল। যথানিয়মে সে প্রথমে দধি দ্বারা, কিছু সময় অতিক্রান্ত হলে ঘৃত দ্বারা এবং পরে মধু দ্বারা পরপর শিবকে স্নান করিয়ে পুনরায় জল দ্বারা ধৌত করে এবং অস্ফুট স্বরে যথাবিহিত মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকে। এ সকল কর্মযোগে রাত্রির তৃতীয় প্রহর এগিয়ে চলে। ভক্তজনেরা অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ চতুর্পার্শ্বে একটু ঘুরে পুনরায় আসে। সর্বশেষে শিবমন্দিরের পুরোহিত ভবদেব উদয়মানের পার্শ্বে এসে আসন গ্রহণ করেন। এবার ব্রতকথা। পূজা-উৎসবের সর্বশেষ অংশ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ। ব্রতকথা শেষ হলে পূজা সমাপ্ত হবে। সকলে ভক্তিভরে কপালে ঠেকিয়ে গ্রহণ করবে পূজার প্রসাদ। কেউ খাবে, কেউ নিয়ে যাবে আপনজনদের জন্য রুদ্র মহাদেবের মাঙ্গলিক আশিস। পূজা-মণ্ডপের পার্শ্বে অদূরে কিছু ফলাহার ও মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা হয়েছে। শিবরাত্রির উৎসব উপলক্ষে পূজার প্রসাদ হিসাবে সেগুলো ভক্তজনে বিতরণ করা হবে।

গুরুদেব জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- ওঁ শিবায় নমঃ . . . ওঁ পুরা কৈলাশ শিখরে সর্বরত্ন বিভূষিতে। সর্বতু কসুমাকীর্ণে সর্বতু ফল শোভিতে . . .  ফাল্গুনে কৃষ্ণ পক্ষস্য যা তিথিঃ স্যাচ্চতুর্দশী . . . তুচ্ছতা ভগবদ্বাক্যং বিস্মিত হিমশৈলজা . . .।

ভক্তি-গদগদ-চিত্তে মায়াবতী শ্রবণ করছিল গুরুদেবের জলদগম্ভীর-কণ্ঠ উচ্চারিত ব্রতকথা। বক্তব্যের অর্থসমূহ তার বোধগম্য ছিল না, তবুও কেমন যেন একটা আমেজ সৃষ্টি হলো তার অন্তরে। তাকিয়ে দেখল গুরুদেবের ঘনশ্যাম মুখমণ্ডল, ঋজু নিরাভরণ দেহখানি। পার্শ্বেই উপবিষ্ট তরুণ পূজারি শ্রী উদয়মান- গৌর গাত্রবর্ণ, ঊর্ধ্বাঙ্গ তারও সম্পূর্ণ নিরাভরণ, প্রশস্তবক্ষ, সুগঠিত বাহুযুগল। দীর্ঘক্ষণ উপবাসী হলেও কোনোরূপ ক্লান্তির ছায়ামাত্র নেই। নিবিষ্ট ধ্যানমগ্ন। মায়াবতী কেমন যেন তন্দ্রার জগতে প্রবেশ করে। হিমালয়ের ঊর্ধ্বলোকে কৈলাশ শিখর। তুষারাবৃত। প্রভাতের সূর্যকিরণে যেন স্বর্ণালী আলোর বিচ্ছুরণ। সেখানে উপবিষ্ট মায়াবতীরই পরম আদিপিতা জটাবল্কলধারী রুদ্রমহাদেব। উদয়মানের মতোই অর্ধমুদ্রিত নয়ন, ধ্যানমগ্ন। তার পার্শে-ই উপবিষ্ট যেন অভয়মুদ্রায় দক্ষিণহস্ত তুলেধরা স্নেহময়ী পরম মাতা শ্রীদুর্গা। অন্তর উদ্বেলিত অপূর্ব এক অনুভব মায়াবতীর। কী অপরূপ আনন্দময়! জীবনের কী পরম নির্ভরতা! বিজয়লাভের কী নিশ্চিত আশ্বাস! ভক্তি গদগদ  হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে মায়াবতী। মনে মনেই উচ্চারণ করে- হে আমাদের পরম আদি পিতা, পরম আদি মাতা! আমার ভক্তি নমস্কার গ্রহণ করো। তোমরা আমাদেরকে, তোমাদের অগণিত সন্তানদেরকে কতই যত্ন করে শিক্ষা দিয়েছ হলকর্ষণ, রেশম-বয়ন, হস্তবিদ্যা, মৎস্যশিকার, নৌকানির্মাণ করার! কত আদর করে উৎসাহিত করেছ নৃত্য-গীতে, আনন্দ-উৎসবে উলুধ্বনি দিতে, আলপনা অঙ্কনে; আর হাতে তুলে দিয়েছ ধানদূর্বার বরণডালা, হরিদ্রা-সিঁদুরের সাজসজ্জা আর কদলীবৃক্ষের উৎসব আচ্ছাদন! আরো দিয়েছ পরস্পর আপ্যায়নে গুবাকতাম্বুল, ভেদাভেদহীন যুথবদ্ধ ভালোবাসায় পরম আনন্দে জীবনযাপন করার স্বর্গীয় মন্ত্র!

হে পরম পিতা, হে পরম মাতা, একটু পরশ দাও, শক্তি দাও, সাহস দাও, আর অমৃতলোক থেকে সন্তানদেরকে দাও অফুরন্ত ভালোবাসা। তোমাদের মোহন পরশে তোমাদের সন্তানেরা জেগে থাকবে অনন্তকাল।

ব্রতকথা সমাপ্ত হলো। অনেকেই উঠে পড়ল। অদূরে পূজার প্রসাদ গ্রহণ করতে এগিয়ে গেল কেউ। মন্দিরের সম্মুখভাগের দীপাবলী স্তিমিত প্রায়- একটু আলো-আঁধারী। অবশিষ্ট প্রাঙ্গণ জুড়ে ঘন অন্ধকার। এরই মধ্য থেকে বেরিয়ে এল অর্কদাস। এক পা এক পা করে সাবধানে এগিয়ে মায়াবতীর পেছনে নীরবে দাঁড়াল ক্ষণকাল। মায়াবতী তখনও নিশ্চুপ, ধ্যানমগ্ন। চক্ষুদ্বয় নিমীলিত। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্ষণকাল দ্বিধাগ্রস্ত দণ্ডায়মান থেকে অর্কদাস তার দক্ষিণহস্তখানি মায়াবতীর স্কন্ধে স্থাপন করল। মুখ নামিয়ে নিম্নকণ্ঠে প্রায় ফিসফিস করে বলল- মায়াবতী! এবার জেগে ওঠো। গুরুদেব ব্রতকথা সমাপ্ত করেছেন। পূজা সমাপ্ত হয়েছে।

মায়াবতী নিজের একখানি হস্ত অর্কদাসের হস্তোপরি স্থাপন করে উচ্চারণ করল- হ্যাঁ, কে? তার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব ক্রমে কেটে গেল। মুখ তুলে পেছনে তাকাল। ইতোমধ্যে হিঙ্গল মল­ এগিয়ে এসে মায়াবতীর সম্মুখে দাঁড়াল। সাথে ঘনিষ্টভাবে দাঁড়িয়ে কলিঙ্গা। হিঙ্গল সহাস্যে বলে উঠল-

সখী মায়াবতী, ভক্তিমতী! দ্যাখো চক্ষু মেলিয়া।

তোমারই পাশে কে আছে দাঁড়াইয়া।

এরপর আবৃত্তির ভঙ্গি করে সুর তুলল-

হৃদয়ের অর্ঘ্যখানি স্বপনে দিয়েছ যারে

সে তো নেমে এসেছে মর্ত্যে তোমারই দ্বারে

সখী ভক্তিমতী মায়ামতী, দ্যাখো চক্ষু মেলিয়া

 

কলিঙ্গা অস্ফুট হেসে উঠল। ঘাড় কাৎ করে সলজ্জে হিঙ্গলের স্কন্ধে নিজ গণ্ড স্পর্শ করল।

অর্কদাস বলল- মায়া! গুরুদেব ব্রতকথা তো কবেই শেষ করে ফেলেছেন। কার ধ্যানে মগ্ন ছিলে অতক্ষণ? মায়াবতী ততক্ষণে সম্পূর্ণ সজাগ হয়েছে। সে অর্কের কথায় কর্ণপাত করল না। অনুচ্চ স্বরে হিঙ্গলকে বলল- কাব্যরচনায় তো ভালোই হাত পাকিয়েছ। ব্রতকথা শুনেছ কিছু?

হিঙ্গল জবাব দিল- শুনেছি বৈ কি। গুরুদেব শুরু করেছিলেন দুর্বোধ্য সংস্কৃতে। কিন্তু পরে তো প্রাকৃতজনের ভাষাতেই ব্রতকথা শুনিয়েছেন। কিন্তু তোমার ভক্তির যে গভীরতা লক্ষ করলাম তাতে কাব্যরচনায় উদ্বুদ্ধ না হয়ে পারি নি।

অর্কদাস যোগ করল- হ্যাঁ, মায়া! তোমার নিমগ্ন ধ্যান-দর্শনেই হিঙ্গলের কাব্যপ্রেরণা এসে গেছে। তবে হ্যাঁ, কপালে ভস্মমাখা ত্রিপুণ্ড্রক এবং কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালায় উদয়মানের গৌরবর্ণের সুগঠিত নিরাভরণ দেহখানি কিন্তু সত্যি আকর্ষণীয় ছিল।

কোনো প্রত্যুত্তর করল না মায়াবতী। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বলল- হ্যাঁ, পূজার প্রসাদ, রুদ্র মহাদেবের মাঙ্গলিক আশিস; চলো, সেদিকে এগিয়ে যাই।

কেমন যেন হতাশাগ্রস্ত হয়ে মিইয়ে পড়ল অর্কদাস। উদয়মান সম্পর্কে তার খোঁচাখানি যেন মেনেই নিল মায়াবতী। প্রত্যুত্তর দিল না কেন? অর্কদাসের দেহখানিও তো সুগঠিত, গাত্রবর্ণও গৌর বটে। তবে? তবে কি মায়াবতী উদয়মানকেই কামনা করে মনে মনে?

 

 

 

 

এগারো.

রুহীদত্তের আবাসগৃহের সন্নিকটেই শিবপুর বীথির প্রশাসনিক কার্যালয়- অধিকরণ গৃহ। চতুর্দিকে সযত্নে পরিচর্যা করা অগণিত ফলজ বৃক্ষরাজির মধ্যখানে অপরিসর উন্মুক্ত চত্বর। সেখাইে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিবপুর বীথির অধিকরণ গৃহ। পূর্বপার্শ্বের ঝোপঝাড় পার হয়ে পায়ে-হাঁটা সঙ্কীর্ণ রাস্তা। এটি অতিক্রম করে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই বীথির সামরিক স্থাপনা। এই স্থাপনার অধিকর্তা প্রচণ্ড দাপুটে গুল্মিক পৃষ্ধ্র ঘোষ। এককালে তার নামেই আতঙ্ক সৃষ্টি হতো জনমনে। গ্রাম-পঞ্চায়েতের আরক্ষাব্যবস্থা তার নির্দেশেই পরিচালিত হতো। ফসল ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যে রাজার ভাগও আদায় হতো তার নির্দেশে। এমনকি, গ্রাম-পঞ্চায়েতে বিচারব্যবস্থা এবং দণ্ডদানও সে নিয়ন্ত্রণ করত। তার অনেক বেআইনী কর্মকাণ্ড নিয়ে গ্রাম-প্রধানগণ বীথি-সামন্ত রুহীদত্তের নিকট প্রতিকার চেয়েও কোনো ফল পায় নি। লোকগুঞ্জন ছিল সামন্ত রুহীদত্ত না কি তার ভয়েই নতমস্তক। কিন্তু তেমন আতঙ্ক ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসছে। পলাশতলীর গ্রামপ্রধান কর্বট গোত্রপতি প্রদোষ দেবের প্রতিরোধের ফলে তার দাপট একবারেই কমে গেছে। সম্প্রতি পলাশতলী-বটেশ্বরে পৃথক বীথি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শিবপুর বীথিরও অনেক সম্পন্ন কৃষক পৃষধ্রকে আর তেমন ভয় পায় না। রাজার ন্যায্য প্রাপ্য উৎপন্ন ফসল ও অন্যান্য দ্রব্যাদির ভাগ তারা যথাসময়ে পরিশোধ করে। কিন্তু উপরি দাবি করলে প্রত্যাখ্যাত হয়। গ্রাম-পঞ্চায়েতের গ্রামিক, মহত্তর ও ধর্ম-প্রবক্তাদের বিচারসভায় কৈফিয়ত দিয়ে তবে নিষ্কৃতি পায়।

শাস্ত্রের সকল বিধান মেনে রাজধর্ম পালনে তেমন আনন্দ নেই। আনন্দ থেকে দায়ভাগই বরং বেশি। কেবল যদি দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন নীতিমালা নিয়ে চলতে হয় তাহলে ভোগ করব কীভাবে? পলাশতলীর কর্বটেরাই যত নষ্টের মূলে। কর্বট গোত্রপতি প্রদোষ দেবের সঙ্গে জুটেছে তারই পিতৃব্য শুকদেব। সে নাকি সমন্বয়ধর্মী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বটেশ্বরে শিবমন্দিরের পার্শ্বে একই বেদীতে পৃথক বিষ্ণুমন্দির স্থাপন করেছে। বিষ্ণুমন্দিরের গৈরিক বর্ণের ধ্বজাটির পার্শ্বেই শিবমন্দিরের রক্তবর্ণ ধ্বজাটিও পতপত করে উড়ছে। যেন দুটি সহোদর! সমন্বয়ধর্মী সমাজ-প্রতিষ্ঠার আর বাকি রইল কী! কলিকাল আর কাকে বলে!- গূঢ়পুরুষ প্রদত্ত এ সকল তথ্যাদি নিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে আলোচনা করছিলেন শিবপুর বীথির তিন প্রধান ব্যক্তি- সামন্ত রুহীদত্ত, গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষ এবং পরামর্শদাতা ধর্মপ্রবক্তা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পর থেকে প্রায় প্রতিনিয়তই পুলিন ভট্ট বটেশ্বর যাচ্ছেন। আচার্য মাধবশ্রী বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। তাকে বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন সম্ভার মহারাজের কুলগুরু আচার্য অহিরুদ্র দেব স্বয়ং। তার মাধ্যমেই শুকদেব এবং প্রদোষ দেব মহারাজের আশীর্বাদপুষ্ট। তিনি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। মনু-সংহিতার বিধানসমূহে তার ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই স্বাভাবিক। চতুর্বর্ণীয় ব্রাহ্মণ্য-সমাজব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার সক্রিয় সমর্থন আদায় করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজসাধ্য হবে। এ লক্ষ্যেই পুলিন ভট্ট মাধবশ্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দীর্ঘক্ষণ রুহীদত্ত কোনো কথা বলছিলেন না। পৃষধ্র ঘোষের আস্ফালন আর আক্রোশের বহিঃপ্রকাশের মধ্যে পুলিন ভট্টের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও আশাবাদী মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে বিষাদক্লিষ্ট চিন্তাকুল মুখে অকস্মাৎ হাসি ফুটিয়ে তিনি মন্তব্য করলেন- দেখো হে! ব্র্যাঘ্রই বলো আর সারমেয়ই বলো, মুখের সম্মুখে সুস্বাদু মাংসখণ্ডটি তুলে ধরতে পারলে তাদের অবশ্যই বশ করা যাবে। কিন্তু ভাবছি কাজটি করা যাবে কীভাবে।

দুজনেই উৎসুক হয়ে বিষয়টি বুঝতে চাইলেন। রুহীদত্ত ব্যাখ্যা করলেন। বললেন- মূলে কর্বটেরা তো শূদ্র বর্ণভুক্ত। গুপ্ত রাজন্যবর্গের উৎসাহ পেয়ে কর্বটেরা এ অঞ্চলে বহু বনভূমি আবাদ করেছে। এসব শূদ্র কৃষককুলের কোনো কোনো পরিশ্রমী সাহসী যুবক অঢেল জলা-জমির ও ভূসম্পত্তির মালিক হয়েছে এবং রাজকোষে ভাগ প্রদান করার সুযোগ পেয়ে সৎ শূদ্র থেকে বৈশ্যের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। শুকদেব আর প্রদোষ দেব এরূপ কুলমর্যাদা ভোগ করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। গোত্রপতি নির্বাচিত হয়ে প্রদোষ দেব আমাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদাপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষা থেকে। ইতোমধ্যে অর্জনও করেছে অনেক। আচার্য অহিরুদ্র দেবের সহায়তায় এবং সম্ভার মহারাজার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে একটি পৃথক বীথি গঠন করে ফেলেছে। তার শাসনভারও হাতে পেয়েছে।

কথার মধ্যে বাধা দিলেন পুলিন ভট্ট। বললেন- আমার ধারণা ছিল বৈশ্যপুত্র বীথি-প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। কিন্তু দেখতে দেখতে সে পৃথক বীথির ছয়টি গ্রামের প্রত্যেকটিতে নতুন করে গ্রাম-পঞ্চায়েত গড়ে তুলেছে- আরক্ষা, বিচার ও দণ্ডদান ব্যবস্থা কার্যকর করে ফেলেছে। শীঘ্রই বীথি-অধিকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

রুহীদত্ত বললেন- এ সাফল্যের কারণ জানো? কারণটা হলো, শুকদেবের সুচিন্তিত কর্ম-পরিকল্পনা এবং প্রদোষ দেবের বিপুল জনপ্রিয়তা। একটু থেমে আবার বললেন- এখানেই আমাদের কিছু করণীয় ভাবতে হবে।

হুঙ্কার দিয়ে উঠল পৃষধ্র ঘোষ- কী করতে হবে, আমাকে নির্দেশ দিন। কার কার শিরচ্ছেদ করতে হবে বলে দিন, অচিরাৎ কর্ম-সমাধা করে দেব।

পুলিন ভট্ট বিরক্ত হলেন। বললেন- দেখো হে, তোমার মোটা মাথায় এসব বুদ্ধি খেলবে না। তুমি বরং এখান থেকে নিষ্ক্রান্ত হও। নিজ কার্যালয়ে গিয়ে আসব পানে মনোনিবেশ করো, তোমার ক্ষাত্রতেজের উপশম হবে। এদিকে আমরা করণীয় নির্ধারণ করি।

পৃষধ্র ঘোষ নিষ্ক্রান্ত হলে অনেক মত-বিনিময়ের পর তারা দুজন মিলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন : এক, শুকদেব এবং প্রদোষ দেব এই দুজনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে হবে; দুই, নতুন বীথিতে একটি সামরিক-স্থাপনা প্রতিষ্ঠার জন্য সম্ভারের মহারাজের অনুমতি নিতে হবে এবং রুহীদত্ত কিংবা পুলিন ভট্টের অনুগত কোনো ব্যক্তিকে গুল্মিক নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে; তিন, মায়াবতীকে চরিত্রহীনা ভ্রষ্টা বলে এবং শুকদেবকে ভণ্ডধার্মিক বলে প্রচার করতে হবে; এবং সর্বশেষে চার, কর্বট গোত্রে বিভাজন সৃষ্টি করতে হবে এবং শৈব ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মন্ত্রণাগুলো নিখুঁত। বাস্তবায়ন করতে পারলে উদ্দেশ্যসাধনে অব্যর্থ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবায়নের উপায় কী! পুলিন ভট্ট বাতায়নপথে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। ভ্রূ কুঞ্চিত করে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকলেন।

প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল সমাপ্তই হয়েছে অস্থিরতা দিয়ে। সমাজের স্থিতি কেমন যেন ভেঙ্গে পড়ছে। ভারত সীমান্তের ওপার থেকে আগত গ্রিক, শক, কুশান ও হুন আক্রমণকারী রাজন্যও এদেশে নিজেদের ছোট-বড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পরবর্তীকালে তাদের অনেকেই বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছে। রাজন্যবর্গকে অনুসরণ করে অনেক অব্রাহ্মণ, নিপীড়িত প্রাকৃতজন, অনার্য, বৈশ্য, শূদ্র, এমনকি নারীজাতিও বিষ্ণুর উপাসনায় মুক্তির সন্ধান পেয়েছে। বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করলেও এ সকল রাজন্যকে ব্রাহ্মণ্য কাব্যে এবং তাদের রচিত পুরাণে শূদ্র বলে উলে­খ করা হয়েছে। ফলে শূদ্রগণ প্রকারান্তরে উৎসাহিত হয়েছে এবং সমাজে ক্রমে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করার সাহস সঞ্চয় করেছে।

বৌদ্ধ, জৈন, শৈব বা বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীগণ সমাজে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য নিয়ে নানাবিধ সংস্কারের কথা বললেও কেউই জন্মান্তরবাদ ও কর্মফলের মূলতত্ত¡ নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলেও রাজ্যশাসনে এবং সমাজে ব্রাহ্মণেরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রক্ষা করেছেন। কেবল জৈন আচার্য ভদ্রবাহু ও তার শিষ্য গোদাসপন্থী অজীবিকদের ব্যাপক প্রচারণা ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। তাকে প্রতিরোধ করতে ব্রাহ্মণসমাজও সর্বত্র সংগঠিত হয়েছে। শতাব্দী ধরে রচিত হয়েছে মনুসংহিতা। গুপ্ত শাসনের প্রারম্ভ থেকেই ব্রাহ্মণগণ তাদের আধিপত্যবাদী অবস্থান পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। রাজ্য-শাসনে, এমনকি সমাজের সর্বস্তরে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ প্রচণ্ড উৎসাহে নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে। নিজ বর্ণের অবস্থান নিরঙ্কুশ রাখার লক্ষে নতুন নতুন বিধানও দিতে থাকে।  অসবর্ণ বিবাহের তীব্র বিরোধিতা, অসবর্ণ বিবাহ-প্রসূত সন্তানদের অন্ত্যজ ঘোষণা করা হয়; এবং তপস্যা, শিক্ষা ও সম্পদ যাতে তারা অর্জন করতে না পারে সে বিষয়ে ব্রাহ্মণ্যসমাজ যথাযথ বিধান প্রদান করেছিল। নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য শূদ্রদেরকে সৎ শূদ্র এবং অসৎ শূদ্র বিভাজন করে রাখা হয়। চতুর্বর্ণ বহির্ভূত স্বল্পসংখ্যক মানুষকে অন্ত্যজ বলে ঘোষণা করে তাদেরকে সমাজের নিকৃষ্ট সেবাদান কর্মে বাধ্যতামূলকভাবে নিযুক্ত করা হয়। প্রয়োজনে তাদের ওপর নির্যাতন করার বৈধতা দান করা হয়। প্রতিবাদী অসৎ শূদ্রদের সামনে এই দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয় যে ব্রাহ্মণদের প্রতি কোনো উদ্ধত আচরণ করলে এ-জন্মে এবং নিশ্চিতই পর-জন্মে তাদের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে। মনুর বিধানে স্পষ্ট বলা হলো, শূদ্রগণ নিম্নবৃত্তির মানুষ। তার ধর্ম উচ্চবর্ণের সেবাদান করা। এই সেবাদান কর্মটি পুরুষানুক্রমে করে যাওয়াই তার স্বধর্ম। বিধান হলো- স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ, পর ধর্মে ভয়াবহঃ। আরো বিধান দেওয়া হলো যে রাজপুরুষগণ যেন ব্রাহ্মণদের সঙ্গে উদ্ধত আচরণকারীর মুখ-গহ্বর ও কর্ণ-কূহরে উত্তপ্ত তেল ঢেলে দেয়। ভগবান শ্রীরাম চন্দ্রের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তারা যেন শম্বুকের মতো শূদ্র-তপস্যাকারীর শিরোচ্ছেদ করে। তাদের লক্ষ্য অর্জনে এ সকল ব্যবস্থা ও তার সুপরিকল্পিত প্রচার যথেষ্ট কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর পর থেকে ক্রমবর্ধমান হয়ে ওঠে নানা অনাচারের লক্ষণ। সুযোগ পেলেই ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের প্রতি তাদের মান্যতায় শৈথিল্য প্রদর্শন করতে থাকে; বৈশ্য ও শূদ্রবর্ণের প্রজাকুলও ক্ষেত্র-বিশেষে প্রতিবাদী হবার সাহস দেখায়। সমাজ-জীবনের এসব দুঃসহ দুর্বিপাকের সম্ভাবনার কথা ভেবে শিহরিত হয়ে উঠলেন পুলিন ভট্ট। মনুসংহিতার বিধানসমূহ ক্ষেত্র-বিশেষে অনার্য জনগোষ্ঠীর প্রতি নির্যাতনমূলক প্রতীয়মান  হলেও সার্বিক বিবেচনায় এ ব্যবস্থাসমূহই বৃহত্তর মানব-জীবনের জন্য কল্যাণকর। চতুবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্য-ব্যবস্থা বাস্তবায়ন মানব-সভ্যতার স্থিতির জন্য অপরিহার্য- এটাই প্রকৃতিরও বিধান, ভগবানের ইচ্ছা।

স্মৃতিকাতর হলেন পুলিন ভট্ট। কর্ণসুবর্ণ নগরের উপান্তে অবস্থিত পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র মহোদয়ের বিদ্যাপীঠ; সেখান থেকেই শিক্ষা সমাপ্ত করে স্নাতক হয়েছিলেন তিনি। ইতোমধ্যে প্রায় তিন যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। অন্যান্য অনেকের মধ্যে মাধবশ্রী এবং দেবজ্যোতি শর্মা ছিলেন তার ঘনিষ্ট বন্ধু। প্রণাম করে বিদায় গ্রহণ করার প্রাক্কালে পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র তাদের তিনজনকে পৃথকভাবে বলেছিলেন- দেখো, তোমরা তো তিনজনই গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের বহিঃপ্রান্তিক রাজ্য সম্ভার এলাকা থেকে এসেছ। ওদিকে বহু মানুষ, অধিকাংশ নিম্নবর্ণের- বন-জঙ্গল-জলাভূমি আবাদ করে নতুন বসতি গড়ে তুলছে এবং ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী সেসব নতুন ভূসম্পত্তির মালিক হচ্ছে। সেসব নতুন বসতি স্থাপন করা জনপদে রাজ-পুরোহিতের পরামর্শে ব্রাহ্মণ পরিবারকে ভূমিদান করা হচ্ছে। ব্রাহ্মণ বসতি না থাকলে প্রাকৃতজনের পূজা-অর্চনা ও জজমানী কে করবে? এখন সমাজের বড় দুঃসময়। সকল স্নাতক মিলে আমাদেরকে ব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণ-সমাজকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিতে হবে। তোমরা যদি এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে সম্মত থাকো তাহলে ঢবাকা নগর পরিষদ এবং সম্ভারের মহাসামন্তের অধিকরণের উচ্চপদে আসীন আমার দুজন বন্ধুর নিকট পত্র লিখে তোমাদের কথা জ্ঞাত করব। তোমরা কি এ দায়িত্ব নিতে সম্মত আছ?

পুলিন ভট্ট তার দীর্ঘ অধ্যয়ন-জীবনে ব্রাহ্মণ-সমাজের এরূপ একটা যৌথ উদ্যোগের বিষয়ে অনুমান করতে পেরেছিলেন মাত্র। স্পষ্টভাবে জ্ঞাত হন নি। পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্রের অসঙ্কোচ বক্তব্যে তারা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন এবং সর্বপ্রথমে দেবজ্যোতি শর্মা তার সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। মাধবশ্রী নীরব থাকলেন, কিন্তু পুলিন ভট্ট আগ্রহ প্রকাশ করলেন। হলায়ুধ মিশ্র অতঃপর তাদেরকে জানালেন যে ব্রাহ্মণ-সমাজ যে সংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেটা হলো শিক্ষাদান সম্পর্কিত। ব্রাহ্মণ শিক্ষকদেরকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। সর্বনিম্নে উপাধ্যায়, এর পরবর্তী পর্যায়ে আচার্য এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে হলো গুরু। বিভিন্ন জনপদে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যাপীঠ গড়ে তুলতে হবে; উপনয়ন দান কেবল ব্রাহ্মণ বালকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তবে রাজ-আশীর্বাদ লাভের লক্ষ্যে প্রভাবশালী ক্ষাত্রকুল থেকে এবং আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তির লক্ষ্যে উচ্চ মর্যাদার বৈশ্যকুল থেকে দুয়েকজন বালককে উপনয়ন দান করে বিদ্যাপীঠে গ্রহণ করা যেতে পারে। কিয়ৎক্ষণ থেমে থেকে পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র পুনরায় বলেছিলেন- আজকাল বৈশ্য, বণিক ও কারিগর শ্রেণীর বহু শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে। এরা সমুদ্রপথে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সিংহলের সঙ্গে বাণিজ্য করছে। নদীপথে কর্ণসুবর্ণ, সপ্তগ্রাম, কোটালিপাড়া, সুবর্ণগ্রাম এবং ঢবাকায় এরা এদের বাণিজ্য তরী নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করছে। ওদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখা বাঞ্ছনীয়। ওদের কর্মচারী ও মাঝিমাল্লাদের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গেও প্রয়োজনে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারো। আগামীকল্যই তোমরা যাত্রা করতে পারো। আশীর্বাদ করি, তোমাদের অভিযাত্রা সফল হোক। কয়েক শতাব্দী ধরে সমাজে যে অস্থিরতা বিস্তার লাভ করছে, মনুর বিধানকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করে জনসংখ্যার গরিষ্ঠতম অংশ শূদ্র জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চতুর্বর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই। 

পুলিন ভট্ট স্মৃতিকাতর হয়ে গুরুদেব হলায়ুধ মিশ্রকে মনে মনে প্রণাম জানালেন। ভাবলেন, তার আজ্ঞা তিনি এ পর্যন্ত আন্তরিক নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন। কিন্তু বর্তমান সঙ্কট সমাধানের উপায় কী সেটা বড় প্রশ্ন। হঠাৎ করে তার মনে উদয় হলো যে বৌদ্ধগণ ধর্ম-সম্মেলন করে তাদের সংঘের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পেরেছিল। পুরাকালে নানাবিধ যজ্ঞের মাধ্যমে আর্যগণও উদ্ভূত বহু সমস্যার সমাধান খুঁজে নিয়েছেন। বিশ্বজিৎ, রাজসূর্য, অশ্বমেধ এবং গোমেধ এই চারটি যজ্ঞই কলিযুগে নিষিদ্ধ। কিন্তু শাস্ত্রে কোথাও কোথাও উল্লেখ আছে পুরুষমেধ যজ্ঞের কথা। এ যজ্ঞের মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনার্যকুলকে আর্যকুলে গ্রহণ করা হয়েছে। এরূপ একটি যজ্ঞ করে প্রদোষ দেবকে যদি বৈশ্যবর্ণ থেকে ক্ষত্রিয় বর্ণে উন্নীত করা যায় তাহলে ক্ষাত্র-ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা প্রাপ্তির ফলে সে রুহীদত্তের অনুগত হয়ে পড়তে পারে এবং এর ফলে শুকদেবের সঙ্গে বিভেদ সৃষ্টি করা সম্ভব। এর পরিণামে সমগ্র কর্বট গোত্রকেও বিভক্ত করে ফেলা সম্ভব। পুলিন ভট্ট অকস্মাৎ উত্তেজিত হয়ে দণ্ডায়মান হলেন- উপায় পেয়ে গেছি!

পরিকল্পনাটি প্রথমে রুহীদত্তের মনঃপুত হলো না। প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্যপুত্র প্রদোষ দেব তার সমমর্যাদায় ভূষিত হবে এটা তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু কয়েকদিন ক্রমাগত শলাপরামর্শ করে পুলিন ভট্ট রুহীদত্তকে বোঝাতে সমর্থ হলেন যে, এটাই একমাত্র পথ। এখন এরূপ একটা যজ্ঞের আয়োজন করার জন্য সম্ভার রাজ্যের ব্রাহ্মণ-সমাজের ও প্রভাবশালী সামন্ত-পুরুষদের সম্মতি এবং সর্বশেষে সম্ভার-মহারাজের অনুমতি প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে বীথি-প্রশাসনের অস্থায়ী দায়িত্ব পৃষধ্র ঘোষের স্কন্ধে ছেড়ে দিয়ে পুলিন ভট্ট ও রুহীদত্ত শিবপুর ত্যাগ করলেন। তারা প্রথমে গেলেন ঢবাকা নগরীতে। সেখানে নগর-পরিষদের ব্রাহ্মণ সদস্য দেবজ্যোতির সঙ্গে পরামর্শ করে পরে গেলেন সম্ভারে। 

পুরুষমেধ যজ্ঞের প্রস্তাব ব্যতিক্রমী বটে। প্রস্তাবের কথা জানতে পেরে সম্ভারের মহারাজ প্রতাব চন্দ্র সেন ভাবলেন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির এই দৃষ্টান্তটি স্থাপন করলে অনেক সম্পন্ন স্বাধীন কৃষককে ও ভূমি-মালিকদেরকে অনুগত রাখা সহজতর হবে। তদুপরি তার জনপ্রিয়তাও বাড়তে পারে। এসব বিবেচনায় তিনি সংশ্লিষ্ট সর্বমহলের পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করে সুচিন্তিত প্রস্তাব উত্থাপন করার নির্দেশ দিলেন আচার্য অহিরুদ্র দেবকে। মহারাজার নির্দেশক্রমে অহিরুদ্র দেব সম্ভার রাজ্যের প্রতিটি বীথিতে অবস্থিত বিষ্ণুমন্দিরের প্রধান পুরোহিত, ব্রাহ্মণ্য বিদ্যাপীঠ এবং অধিকরণের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সামরিক অধিনায়কদের এক সভা আহ্বান করে বিষয়টি বিশদ আলোচনা করলেন। এ আলোচনায় উপস্থিত রাখলেন ঢবাকা নগর পরিষদের ব্রাহ্মণ সদস্য দেবজ্যোতি শর্মা, শিবপুর বীথির পণ্ডিত পুলিন ভট্ট এবং বীথি-সামন্ত রুহীদত্তকে। নব প্রতিষ্ঠিত বীথি থেকে আচার্য মাধবশ্রী, জ্যেষ্ঠকায়স্থ প্রদোষ দেব এবং তৎপরামর্শক শুকদেবকেও উপস্থিত রাখলেন।

পুলিন ভট্ট প্রাচীন শাস্ত্রের বিধান উল্লেখ করে পুরাণ থেকে একাধিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এরূপ পুরুষমেধ যজ্ঞের মাধ্যমে পলাশতলী-বটেশ্বরের জ্যেষ্ঠকায়স্থ প্রদোষ দেব ও তার পরিবারকে ক্ষত্রিয় বর্ণে গ্রহণ করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন। মহারাজ প্রতাব চন্দ্র সেনের রাজকার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পালনের লক্ষ্যে প্রদোষ দেবের পরিবারকে ব্রাহ্মণকুলের আশীর্বাদপূত করে নেওয়ার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বললেন যে এতে ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি বাড়বে এবং প্রজাশাসনে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে। কিন্তু দ্বিমত প্রকাশ করলেন আচার্য অহিরুদ্র দেবের বরিষ্ঠ শিষ্য পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্র। তার মতে, ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি বাড়লে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির বদলে অব্রাহ্মণদের ওপর নিপীড়ন বাড়তে পারে। প্রদোষ দেবকে বর্ণান্তর না করেই বীথি-সামন্ত পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। ক্ষাত্রবর্ণে পদমর্যাদা পরিবর্তন করলে কর্বট গোত্রে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে, এতে প্রজাদের অকল্যাণও হতে পারে।

কর্বট গোত্রের বিভাজন এবং প্রজাদের অকল্যাণের আশঙ্কা প্রকাশ করে চন্দ্রশেখর মৈত্র যেসব যুক্তি প্রদর্শন করলেন তাতে বিচলিত হলেন শুকদেব। প্রদোষ দেব প্রথমে কথঞ্চিৎ চিন্তাকুল থাকলেও বর্ণ-উত্তরণের সুযোগপ্রাপ্তির সম্ভাবনায় নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করলেন। উপস্থিত আরো অনেকে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিলেন। অনন্তর বিপুল সংখ্যাধিক্যের সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হলো। অবশেষে মহারাজ শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেনের নির্দেশে আচার্য অহিরুদ্র দেব প্রায়-সমাগত ফাল্গুনের শুক্লা চতুর্দশী দিবসারম্ভের কোনো এক শুভলগ্নে সম্ভারের বিষ্ণুমন্দির চত্বরে এ যজ্ঞানুষ্ঠানের আহ্বান করেন। মহারাজের ইচ্ছানুসারে তিনি নিজেই এই যজ্ঞে পৌরোহিত্য করবেন বলে জানান।

পুরুষমেধ-যজ্ঞ অনেকের মনেই কৌতূহল সৃষ্টি করল। কেউ কেউ হয়তো শাস্ত্রালোচনায় এরূপ যজ্ঞের কথা শুনেছে, কিন্তু বাস্তবে প্রত্যক্ষ করেনি। আয়োজন করতে বেশি বেগ পেতে হলো না। দিন-তারিখ এবং স্থানের কথা মতামত গ্রহণের আলোচনাসভাতেই ঘোষিত হয়েছিল। মহারাজের পক্ষ থেকে যজ্ঞে উপস্থিত থাকার নির্দেশের কথা সেদিনই সকল ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত ও বিশিষ্টজনদের জানিয়ে দেওয়া হলো।

যথাসময়ে যজ্ঞানুষ্ঠান শুরু হলো। ষোড়শ উপাচার্য সংগৃহীত হলো; অগ্নি আধানের নিমিত্তে চন্দন কাষ্ঠ ও অপরাপর সমিধ একত্রিত করা হলো। রাখা হলো খাঁটি গব্যঘৃত। যথাসময়ে পাদপ্রক্ষালনান্তে উত্তরমুখী হয়ে যজ্ঞবেদীতে স্থিত মৃগচর্মাসনে উপবেশন করলেন আচার্য অহিরুদ্র দেব। যজ্ঞস্থানের সন্নিকটে বেদীর বাইরে অর্ধচন্দ্রাকৃতি হয়ে আসন গ্রহণ করলেন মহারাজ প্রতাপ চন্দ্র সেন এবং অতঃপর তার উভয় পার্শ্বে পদমর্যাদা অনুসারে অন্যান্য ব্রাহ্মণ, আচার্য, উপাধ্যায় ও অমাত্যগণ। বেদীর ওপর যজ্ঞপুরোহিতের বামপার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করলেন প্রদোষ দেব। তার মস্তক মুণ্ডিত, কপালে শ্বেতচন্দনের প্রলেপ, মধ্যখানে সিঁদুরের টিপ। মুখমণ্ডলে আশা-আনন্দের উদ্ভাস।

আচার্য অহিরুদ্র দেব অস্ফুট শব্দে ওঁ সূর্যায় নমঃ, ওঁ বিষ্ণুবে নমঃ জপতে জপতে উঠে যজ্ঞকুণ্ডে সমিধ কাষ্ঠাদিতে অগ্নিসংযোগ করলেন, ঘৃত ঢেলে দিলেন এবং উপচারাদি নিবেদন করে নিজ আসনে উপবেশন করে উচ্চস্বরে বেদপাঠ করলেন। যজ্ঞধূমে চারদিক আচ্ছাদিত হলো। অপরূপ সুগন্ধি তৎসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি অপূর্ব পুণ্যময় পরিবেশ সৃষ্টি হলো। অতঃপর যজ্ঞানলের উত্তাপে যজ্ঞ পুরোহিত নিজ হস্তদ্বয়কে উষ্ণ করে প্রদোষ দেবের মুখমণ্ডল, গাত্র ও বাহুদ্বয়ে প্রলেপ দিয়ে অগ্নিদেবতার পদতলে তার জীবন, অস্তিত্ব ও পৌরুষ উৎসর্গ করলেন। এরপর একগুচ্ছ বিল্বপত্র দিয়ে তাকে সম্মার্জনের মাধ্যমে পবিত্র ঘোষণা করলেন। বললেন, ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদে প্রদোষ দেবকে তৎপিতার সকল বংশধরসহ ক্ষত্রিয়বর্ণে গ্রহণ করা হলো। ঘোষণা করা হলো যে প্রদোষ দেব নিষ্ঠার সঙ্গে ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করবে এবং নামের সঙ্গে কুল-পদবি হিসাবে দেববর্মণ যুক্ত করতে পারবে। অতঃপর প্রদোষ দেবকে কিছু মন্ত্রোচ্চারণ করালেন এবং এই শপথবাক্য পাঠ করালেন যে এখন থেকে ক্ষাত্রধর্ম তার স্বধর্ম। স্বধর্ম পালনের জন্য তিনি প্রাণপাত করতেও প্রস্তুত থাকবেন। আচার্য অহিরুদ্র দেবের সঙ্গে প্রদোষ দেব বর্মণ এবং সমুপস্থিত আরো কয়েকজন ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত উচ্চস্বরে উচ্চারণ করলেন, ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরাধর্মে ভয়াবহঃ’।

সেদিন বিষ্ণুমন্দির চত্বরে আচার্য অহিরুদ্র দেবের আশ্রমে দিনভর উৎসব অনুষ্ঠান চলল। বেশ কয়েকটি পশু ছাগ-মেষ যজ্ঞবলি হিসাবে উৎসর্গীকৃত হলো। ভাত-মাছ ও ফলাহারের সঙ্গে মাংস দ্বারা অনেকেই রসনা পরিতৃপ্ত করলেন। দধি ও মিষ্টান্ন সন্ধ্যাকাল অবধি বিতরণ করা হলো। অতঃপর পরদিন প্রত্যুষে শুকদেব, প্রদোষ দেব বর্মণসহ অন্যরা নিজ নিজ বীথি অভিমুখে প্রত্যাগমন করলেন।

 

 

বারো.

পুরুষমেধ যজ্ঞের বিষয় জানতে পেরে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির সকল স্তরের জনগণ প্রথমদিকে যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিল। বিস্মিত এজন্য যে এরূপ কোনো যজ্ঞের কথা ইতোপূর্বে কেউ গল্পেও শোনে নি। আর আনন্দিত কেননা তাদের গোত্রপতি প্রদোষ দেব বর্মণ সম্ভার মহারাজের কুলগুরু ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ গুরুজন কর্তৃক আশীর্বাদপূত হয়েছেন; মহারাজও তাকে আশীর্বাদ করেছেন এবং সন্তুষ্ট হয়ে পদোন্নতি প্রদান করে নব প্রতিষ্ঠিত বীথির সামন্ত হিসাবে নিযুক্ত করেছেন। এ উপলক্ষে পুলিন ভট্ট ও মাধবশ্রীর পরামর্শে বীথির অধীনস্ত ছয়টি গ্রাম পঞ্চায়েতের সকল সদস্য নিয়ে একটি উৎসবের আয়োজন করা হলো। এরূপ উৎসব-অনুষ্ঠান সকলের একটি মিলনমেলা হবে এবং বীথি-প্রশাসনের সংহতি সৃষ্টিতে তা সহায়তা করবে ভেবে শুকদেবও সম্মতি দিলেন। তবে আরক্ষা-ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে শীঘ্রই একটি সামরিক-স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে জেনে অনেকেই হতোদ্যম হলেন।

 

শিবপুর বীথির গুল্মিক ও তার শান্ত্রীদের আচরণে বাড়াবাড়ির অভিজ্ঞতা আছে প্রায় সকলেরই। আরক্ষা-ব্যবস্থায় গ্রামরক্ষীদলের ভূমিকাই যথেষ্ট বলে বিবেচনা করলেন অনেকে। সে-দলের সকল রক্ষীই নির্বাচন করা হয় স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে। প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হলে গ্রাম-পঞ্চায়েতের গ্রামিকের নিয়ন্ত্রণে তাদের কাজ করতে হয়। পঞ্চায়েতে ব্রাহ্মণ, কুটুম্ব, মহত্তর কিংবা অন্যান্য সকল সদস্যকে ওরা সাধারণত গুরুজন হিসাবে মান্য করে। প্রদোষ দেব বর্মণের রক্ষীদলের পরিচালক অর্কদাসের নেতৃত্বে যে রক্ষীদলটি গড়ে উঠেছে ওরা জনসাধারণের প্রিয়পাত্র, আপনজন। ধর্মগোলা রক্ষণাবেক্ষণ ও ধর্ম-প্রবক্তার অন্যান্য ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনে ওদের সুচারু দক্ষতা সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু সামরিক-স্থাপনা মহারাজের নির্দেশে গঠিত হয় এবং তার পরিচালনায় গুল্মিক নিযুক্ত থাকেন। তাকে নিয়োগদান করেন মহারাজের সামরিক-প্রধান, যদিও স্থানীয়ভাবে তার কর্মকাণ্ড বীথি-প্রশাসনে নিযুক্ত সামন্ত মহোদয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাই এ বিষয়ে বীথির অন্তর্গত লোকসাধারণের করণীয় কিছু নেই। 

সবাই ইতোমধ্যে জ্ঞাত হয়েছে যে, সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা, গুল্মিক নিযুক্তি এবং একটি সুপরিসর গুল্মিক-স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। শিবপুর বীথির ধর্ম-প্রবক্তা ও ব্রাহ্মণ পরামর্শক পুলিন ভট্ট এবং পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির ধর্ম-প্রবক্তা ও ব্রাহ্মণ পরামর্শক আচার্য মাধবশ্রী এ ব্যাপারে সক্রিয়। প্রদোষ দেব বর্মণও সম্মতি দিয়েছেন। তবে শুকদেব প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে ধীরে অগ্রসর হবার পক্ষপাতী ছিলেন। প্রদোষ দেবের অতিউৎসাহী দৃষ্টিভঙ্গী লক্ষ করে তিনি কিয়ৎ হতোদ্যম হলেন। হতোদ্যম হবার আরো কারণ ছিল। কর্বটদের গোত্রপতি প্রদোষ দেব বর্মণকে যজ্ঞাগ্নির পবিত্র উত্তাপে সম্মার্জিত করে ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদের কথা ঘোষণা করে ক্ষাত্রবর্ণে গ্রহণ করা হলো। তাতে সকল কর্বটেরা উল্লসিত হয়েছিল। কিন্তু এক মাস পার হতেই সকলে উপলব্ধি করল যে ক্ষাত্রবর্ণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন প্রদোষ দেব বর্মণ এবং তৎ-পিতার ঔরসজাত সকল বংশধরগণ। এই মর্যাদা তারা বংশানুক্রমে ভোগ করবে। কিন্তু প্রদোষ দেবের কুল-বহির্ভূত কর্বট গোত্রের অন্য কেউই এ মর্যাদার অধিকারী হবে না। মধ্য থেকে কর্বট গোত্রে একটি স্থায়ী বিভাজন সৃষ্টি হয়ে গেছে, যা বংশানুক্রমে চলতে থাকবে। ভবিষ্যতে এই ঘটনার ফলে আরো কী কী অপপ্রভাব পড়তে পারে এই নিয়ে কর্বট নবীন-প্রবীণ অনেকেই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ছয়টি গ্রাম-পঞ্চায়েতের সকল সদস্য নিয়ে উৎসব অনুষ্ঠানের মিলনসভাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আরম্ভ হলো আচার্য মাধবশ্রীর পৌরোহিত্যে। বটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমাঞ্চল বন-বনানীতে আচ্ছাদিত উচ্চভূমি। তারই শেষপ্রান্তে পলাশতলী যাবার পথপার্শ্বে কয়রা নদীর পাড় ধরে নির্মিত হয়েছে নতুন বীথির অধিকরণ-গৃহ। সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানেই। দ্বিপ্রহরের বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে প্রায় সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। ঘুরে ঘুরে দেখছেন নব নির্মিত অধিকরণ-গৃহাদি। অধিকরণে কর্মরত আমলা, কায়স্থ ও শান্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করে নিচ্ছেন কেউ কেউ।

শুরুতেই আচার্য মাধবশ্রী সকলের পক্ষ থেকে প্রদোষ দেব বর্মন ও তার পিতৃকুলের সকলকে ক্ষত্রিয়বর্ণে বরিত হওয়ায় আশীর্বাদ করে অভিনন্দন জ্ঞাপন করলেন। উপস্থিত অনেকে হর্ষধ্বনি তুলল, কেউ কেউ উলুধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। এরপর তিনি সমাবেশে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে গুরু ভবদেব, পুলিন ভট্ট, ভবদেবের শিষ্য শ্রী উদয়মান, হিঙ্গল মল্ল এবং আশ্রমের উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সকলেই দাঁড়িয়ে করজোড়ে নমস্কার করলেন। অতঃপর তিনি অধিকরণে কর্মরত কায়স্থ, আমলা, মহত্তর, খড়কি, বহনায়কসহ সকলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর একে একে প্রতিটি গ্রাম-পঞ্চায়েতের গ্রামিক, কুটুম্ব, মহত্তর ও অন্যান্য সদস্যদেরকেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিল্বগ্রাম, পলাশতলী ও বটেশ্বর ছাড়া অন্য কোনো গ্রামে ব্রাহ্মণ সদস্য না থাকায় সেখানে মহত্তরকে ধর্মপ্রবক্তা বা বিচারকের দায়িত্ব দান করা হয়েছে- এ কথাও তিনি ঘোষণা করলেন। সর্বশেষে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রদোষ দেব বর্মণের রক্ষীদলের পরিচালক অর্কদাসকে।

অর্কদাস দণ্ডায়মান হয়ে জোড়হস্তে সকলকে নমস্কার করল। পলাশতলীর গ্রাম-পঞ্চায়েতের একজন মহত্তর সদস্য উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- হ্যাঁ, ওকে আমরা বিলক্ষণ চিনি। শিশু বয়স থেকেই তাকে দেখে এসেছি। সে তো আমাদের গ্রাম-পঞ্চায়েতের এককালের রক্ষীদলের প্রধান স্বর্গত অভয় কোচের একমাত্র পুত্র। বর্তমানে প্রদোষ দেব বর্মণের কুলস্থ।

সপ্রশংস দৃষ্টিতে স্মিতহাস্য মুখে দাঁড়িয়ে পক্ককেশ সেই বৃদ্ধ দেখতে থাকলেন অর্কদাসকে। ইতোমধ্যে একজন প্রশ্ন করলেন- অর্কদাস যেহেতু প্রদোষ দেবের কুলস্থ এবং পেশাতেও অস্ত্রধারী, সে কি প্রদোষ দেব বর্মণের সঙ্গে ক্ষাত্রবর্ণে অন্তর্ভুক্ত হবে? অনেকের মনেই এ প্রশ্নটি আছে। এর সমাধান প্রয়োজন।

আকস্মিক এরূপ প্রশ্নে সকলে ভাবিত হলো। আচার্য মাধবশ্রী তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান না পেয়ে নিশ্চুপ থাকলেন। প্রদোষ দেব বর্মণ দাঁড়িয়ে বললেন- হ্যাঁ, আমি যেহেতু তাকে কুলস্থ বলে গ্রহণ করেছি, তাহলে তো সে আমার কুলমর্যাদাই ভোগ করার অধিকারী বটে।

তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে উঠলেন পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। বললেন, না, সেটা হতে পারে না। অর্কদাস কর্বট গোত্রে জাত নয়। সে কোচ গোত্রে জাত এবং সেবাদানকারী পিতার পুত্র। রাজকোষে সে কিংবা তার পিতা কখনও কোনো ভাগ দেয় নি। সে তো প্রকৃতপক্ষে শূদ্র। কর্বট গোত্রে যুক্ত হয়ে সে যে এতদিন বৈশ্যের মর্যাদা ভোগ করেছে সেটা ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমের রীতিবিরোধী। মনুর বিধানে স্পষ্ট বলা আছে …

কিন্তু পুলিন ভট্টের বক্তব্য সমাপ্ত হওয়ার আগেই পশ্চাৎ থেকে কতিপয় ব্যক্তি চিৎকার করে উঠল- রাখুন এসব শাস্ত্রকথা। যতসব ব্রাহ্মণ্য কূটকচাল!

সঙ্গে সঙ্গে প্রাঙ্গণ জুড়ে ব্যাপক কোলাহল আরম্ভ হলো। চতুর্দিক থেকে নানা ধ্বনি উঠতে থাকল।

– থামুন মহাশয়

– আর আমাদের মধ্যে বিভেদ লাগাতে হবে না

-বেটা, কুটিল ভণ্ড।

-আপনারা সকলে থামুন। সভাপুরোহিত মহাশয় কিছু বলুন।  

আকস্মিক এই গোলযোগের প্রথম দিকে ক্ষণকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকলেও মাধবশ্রী ততক্ষণে সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে সম্মোধন করে বললেন- আপনারা থামুন। এ প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এ অনুষ্ঠানের এটা বিবেচ্য নয়। চলুন, আমরা অদ্যকার করণীয় সমাধা করি।

অতঃপর গ্রাম-পঞ্চায়েতের দুয়েকজন গ্রামিক তাদের কার্যক্রমের অগ্রগতি বর্ণনা করলেন। শিবপুর বীথিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতেই চারটি গ্রাম-পঞ্চায়েত কার্যকর ছিল। কদম্বঘাট ও ঘাগড়া গ্রামে নতুন পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ দুটি গ্রামে জনবসতি খুবই কম থাকার কারণে বটেশ্বর গ্রাম-পঞ্চায়েতের মাধ্যমে শাসিত হতো। তাছাড়া ওখানকার অধিবাসীরা ব্যাপক-সংখ্যক অরণ্যাচারী হওয়ায় পৃথক গ্রাম-পঞ্চায়েত গড়ে ওঠে নি। নতুন বীথি গঠিত হওয়ায় গুরু ভবদেব এবং শুকদেবের উৎসাহে নতুন করে গ্রাম-পঞ্চায়েত গড়ে তোলা হয়েছে।

পুলিন ভট্ট ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম প্রথার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন এবং মনুসংহিতার বিধান মান্য করার সুফলের কথা ব্যাখ্যা করে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য উত্থাপন করলেন। প্রদোষ দেব বর্মণ সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং বীথি-শাসনকর্মে সকলের সহযোগিতা প্রার্থনা করলেন। সভাপুরোহিত সভা পরিচালনায় সহযোগিতার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানালেন এবং আয়োজিত ভোজে যোগ দেওয়ার জন্য সকলকে নিমন্ত্রণ করলেন।

অতঃপর ফেনাভাত, সবজি, মৎস্য ও মিষ্টান্ন ভোজন শেষে ফলাহার গ্রহণের মাধ্যমে ভোজসভা সমাপ্ত হলো। গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যবর্গ ও অতিথিগণ বিদায় গ্রহণ করলে অধিকরণগৃহে সামন্ত মহোদয়ের কক্ষে বসলেন প্রদোষ দেব বর্মণ, মাধবশ্রী, শুকদেব ও পুলিন ভট্ট। ভবদেব স্বল্পক্ষণের জন্য বসলেও কোনো গুরুতর আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। কেবল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে সকলকে মনোযোগী থাকার পরামর্শ দিয়ে শিষ্যবর্গসহ প্রস্থান করলেন। শুকদেব কিয়ৎক্ষণ ইতস্তত করে অর্কদাসের বর্ণ অবস্থানের বিষয়টি নিষ্পত্তি করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলেন। অন্য কেউ কোনো মন্তব্য করার পূর্বেই পুলিন ভট্ট দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন- নব নিযুক্ত সামন্ত মহোদয়ের কুলস্থ বলে তাকে কোনো অবস্থাতেই ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা দেওয়া যায় না। শাস্ত্রের বিধান আমাদের সকলেরই মান্য করা উচিত; তাতেই নব প্রতিষ্ঠিত বীথির এবং প্রজা-সকলের কল্যাণ নিহিত। শুকদেব লক্ষ করলেন মাধবশ্রী এ কথার পর অনিশ্চিতভাবে মস্তক আন্দোলিত করে উচ্চারণ করলেন- হ্যাঁ, তা তো বটেই, তা তো বটেই। প্রদোষ দেব বর্মণও নিস্পৃহ থাকলেন, কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলেন না।

বেলা পড়ে এলে গাত্রোত্থান করলেন শুকদেব। নিজ গৃহাভিমুখে যাত্রা করলেন- ক্লান্ত, বিষণ্ন ও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে। নতুন বীথির সকল কর্মকাণ্ডে পুলিন ভট্টের এইরূপ প্রভাব বৃদ্ধি নিশ্চিতই দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয়। কর্বট গোত্রের বিভাজন তো হয়েই গেছে। জনপদে শুকদেব ও মায়াবতী সম্বন্ধে নানাবিধ কুৎসা ইতোমধ্যে প্রচারিত হয়েছে বলে তিনি আভাস পেয়েছেন। অবশেষে কি শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মীদের মাঝেও বিভাজন সৃষ্টি হবে? প্রদোষ দেব বর্মন এবং আচার্য মাধবশ্রী কি পুলিন ভট্টের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়ে যাবেন? শুকদেব পূজাগৃহ অতিক্রম করে শয়নগৃহের পূর্বপার্শ্বস্থ দাওয়ায় পৌঁছে দেখলেন পুত্রবধূ দাঁড়িয়ে আছে। শুকদেবের বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা রইল না। প্রক্ষালনের জলের ঘটি একপার্শ্বে রেখে মদনিকা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল নত মস্তকে। হয়তো শ্বশ্রূপিতার পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়। শুকদেব উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন- তুমি কেন বৌমা? মায়াবতী নেই? সে কি অসুস্থ? কোথায়?

-না বাবা, মায়া অসুস্থ নয়। আচার্যদেবের আশ্রমের কর্ম সমাপ্ত হলে সে গুরুদেবের আশ্রমে যাবে। তার নাকি খুবই জরুরি কিছু কাজ বাকি আছে। আমাকে বলে গেছে, ফিরতে বিলম্ব হবে। ধীর কণ্ঠে জবাব দিল মদনিকা।

-সে কী! শুধু বিস্ময় নয়, কিছুটা বিরক্তিও প্রকাশ করলেন শুকদেব। বললেন- আমি তো তাকে ইতোমধ্যেই বিষ্ণুমন্দির এবং আচার্য মাধবশ্রীর গৃহকর্মে নিবিষ্ট থাকার কথা বলেছি। আবার ভবদেবের আশ্রমে কেন?

এ প্রশ্নের কোনো প্রত্যুত্তর করল না মদনিকা। নিম্নকণ্ঠে বলল- আমি কি আপনার জলখাবার এনে দেব?

-না, তার প্রয়োজন নেই। আমি প্রক্ষালন সমাপ্ত করে পূজাগৃহেই বসব। সময়মতো সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে দিও, আর মায়াবতী ফিরে এলে আমার নিকট পাঠিয়ে দিও।

 

সন্ধ্যাকাল অতিক্রান্ত। মায়াবতী গৃহে প্রত্যাবর্তন করল। পরিচ্ছন্ন হয়ে পিতৃদেব সমুখে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভ্রাতৃজায়া মদনিকা এসে মৃদুস্বরে বলল- এই যে ঠাকুরঝি, তোমার বিলম্ব দেখে পিতৃদেবকে চিন্তিত মনে হলো। তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, যাও, চটজলদি সাক্ষাৎ করে এসো।

হাসল মায়াবতী। বলল- হ্যাঁ, সে তো যাবই। ঘরে ফিরে পিতার খোঁজ নেওয়া তো আমার নিত্যদিনের প্রথম কর্ম।

সূর্যাস্তের পূর্ব থেকেই পূজাগৃহের পশ্চিমের দাওয়ায় নিশ্চুপ বসে ছিলেন শুকদেব। বাড়ির পশ্চিম দিকটি ঘন ঝোপঝাড় ও নানাবিধ বৃক্ষরাজিতে আচ্ছন্ন। প্রত্যক্ষ অবলোকন করা না গেলেও বোঝা যায় সূর্য অস্তাচলে যাচ্ছে। গোধুলি নেমে আসছে। এ সময়টা কেমন যেন একটা বিষণ্নতায় মনটা ভারাক্রান্ত হয় অকারণেই। নীরবে এগিয়ে এসে পিতার মাদুরের ওপর ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে পড়ল মায়াবতী। বলল- অমন চুপচাপ বসে আছ যে! তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? 

শুকদেব কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। ঘাড় ফিরিয়ে কন্যার মুখপানে তাকালেন একবার। কিয়ৎক্ষণ তাকিয়েই থাকলেন। অতঃপর ধীর কণ্ঠে বললেন- গুরুদেবের আশ্রমে কি জরুরি কোনো প্রয়োজন ছিল? আমার তো প্রত্যাশা ছিল তুমি বিষ্ণুমন্দির এবং মন্দির পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রীর সেবাকর্মেই নিবিষ্ট থাকবে।

পিতার কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য লক্ষ করল মায়াবতী; বক্তব্যের মর্ম উপলব্ধি করতেও কোনো অসুবিধা হলো না। সহজভাবেই জবাব দিল সে- হ্যাঁ বাবা, গুরুদেবের আশ্রমে জরুরি একটা বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে গিয়েছিলাম। তোমাকে আগে জানাতে পারি নি। এখন বিস্তারিত বলব। আর তাছাড়া তোমার সদিচ্ছা যতই থাকুক, যারা দ্বিজ বংশজাত নয় তাদের পক্ষে বিষ্ণুমন্দির বেদীতে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মনুসংহিতার এই বিধান মান্য করে চলার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। আচার্য মাধবশ্রী এই নির্দেশের ব্যতিক্রম আমাদেরকে কিছুই বলেন নি।

চোখ-মুখে চাঞ্চল্য প্রকাশ পেল শুকদেবের। ঘুরে কন্যার মুখোমুখি হয়ে বসলেন তিনি। সম্ভবত আরো জানতে চান কিংবা অনেক কথা বলতে চান। বিস্মিত হয়ে তিনি বললেন- মনুর বিধান মান্য করার কথা পুলিন ভট্ট বলবেন কেন? তিনি তো মন্দির-পুরোহিত নন, বটেশ্বর বিষ্ণুমন্দির ব্যবস্থাপনার দায়দায়িত্বও তো তার ওপর ন্যস্ত হয় নি!

মায়াবতী জবাব দিল- সে কী! তুমি কি জানো না? প্রায় প্রতিনিয়তই তিনি আসেন পুরোহিত মহাশয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তিনি তো বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদেরকে মাঝে-মধ্যে পাঠদানও করে থাকেন। এ ব্যাপারে নাকি পলাশতলী-বটেশ্বরের বীথি-সামন্তের সুস্পষ্ট অনুমোদন আছে।

শুকদেব কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। বিষাদপূর্ণ ভারী কণ্ঠে বললেন- ভট্ট মহাশয় প্রতিনিয়ত আসেন জানতাম, কিন্তু বীথি-সামন্তের অনুমোদন নিয়েই এত কিছু হচ্ছে তা তো জানা ছিল না।

পিতার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখপানে তাকিয়ে রইল মায়াবতী। সন্ধ্যাকালের আবছা আলোয় পিতার বিষাদে ভরা চেহারা দেখে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল সে। অভয় দেওয়ার মতো দৃঢ় ঘোষণায় জানিয়ে দিল শুকদেবকে- বাবা, তুমি নিশ্চিত থেকো, এ অবিচার আমরা মেনে নেব না, কিছুতেই চলতে দেব না। এ সকল বিষয় নিয়ে পরামর্শ করার জন্যই গুরুদেবের আশ্রমে গিয়েছিলাম।

শুকদেব মায়াবতীর মুখপানে দৃষ্টি স্থাপন করলেন, নীরবে তাকিয়ে থাকলেন। গভীর মনোযোগে নিরীক্ষণ করে কী যেন সন্ধান করলেন কন্যার চেহারায়, অভিব্যক্তিতে। হতবিহ্বল হয়ে মায়াবতীও তাকিয়ে থাকল ক্লান্ত-বিষণ্ন  অসহায় পিতার দিকে। পিতা শুকদেব সমগ্র জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে সূর্যতপ করেছেন, বিষ্ণুপূজা করেছেন এবং গভীরভাবে বিশ্বাস করেছেন যে শ্রী বিষ্ণুর মহিমায় একদিন সকল শ্রমজীবী, নির্যাতিত ও অভুক্ত মানুষ বৈষ্ণব মতের আশ্রয়ে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করবে। এই প্রবীণ বয়সে এসে তার বিশ্বাস কি ক্রমে ভেঙ্গে পড়ছে? তার দৃষ্টি কি হতাশায় ঝাপসা হয়ে আসছে? তাকে কি কোনো আশার বাণী শোনাতে পারবে মায়াবতী? উদয়মান, হিঙ্গল মল্ল ও অর্কদাস সকলে মিলে?

বৃদ্ধপিতাকে অভয় দিয়ে মায়াবতী বলল- তুমি কিছু ভেবো না। ভট্ট মহাশয়কে নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা আমরা করছি। এসব ব্যাপার নিয়ে পরামর্শ করার জন্যই গুরুদেবের আশ্রমে গিয়েছিলাম।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তুলে তাকালেন শুকদেব। মায়াবতী বলল- সামনের সপ্তাহে চৈত্র-সংক্রান্তি। এ উপলক্ষে এবার অনেক ধুমধাম করে চড়কপূজা ও মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সকালে সকলে মিলে দীঘি থেকে তুলে আনবে চড়ক গাছ। দীঘির পাড়ে পোঁতা হবে চড়ক, নির্মিত হবে ঘূর্ণায়মান মঞ্চ। গাছটি শিবলিঙ্গের প্রতীক, উপরের মাথার অংশটি গৌরীর প্রতীক। তান্ত্রিক ওঝা এসে কোনো বাছাই-করা বালককে বড়শিতে গেঁথে শূন্যে ঝুলিয়ে দেবে। সে চক্রাকারে চারদিকে ঘুরবে ঝুলে থেকে। মন্ডা-মিঠাই শূন্যে ছুঁড়ে মারবে। ভক্তরা কলা ও অন্যান্য ফল মানত করে শূন্যে ছুঁড়ে দিলে শুরু হবে হরিলুট। দ্বিপ্রহর নাগাদ পূজা শুরু হবে। পূজারীর হাত থেকে ভক্তগণ চরণামৃত নেবে। রক্তবর্ণ বস্ত্র পরিধান করে কেউ কেউ খোল-করতাল বাজিয়ে নাচবে। চড়ক গাছে কেউ কেউ ভক্তিভরে ফুল দেবে, সিঁদুর দেবে, বেলপাতা দেবে। এভাবে পূজা শেষ হবে। এরপর জোড়ায় জোড়ায় হাজির হবে শিব ও কালী। শুরু হবে শিব-কালীর নাচন এবং স্নানোৎসব। আমরা সকলে মিলে পলাশতলী বীথির প্রতিটি গ্রাম থেকে, অরণ্যাচারী প্রতিটি জনগোষ্ঠী থেকে শিবভক্তদের জমায়েত করব। গুরুদেব সম্মতি দিয়েছেন। প্রতিটি গ্রাম ও জনগোষ্ঠী থেকে শিব ও কালী সাজবে। শিবের নর্তনকাণ্ড শুরু হবে সন্ধ্যারাত্রে। ত্রিশূল হস্তে শিব নাচবে, সঙ্গে নাচবে মা-কালী। জোড়ায় জোড়ায়। করতাল বাজবে, ঢোলক বাজবে, মাদল বাজবে; মশাল হাতে মানুষ জমায়েত হবে মেলাপ্রাঙ্গণে। সর্বশেষে রাত্রি তৃতীয় প্রহরে স্নানোৎসব। নকল শিব, নকল মা-কালী সাজ ফেলে দেবে; দীঘিতে নেমে গাত্র মার্জনা করে পরিচ্ছন্ন হবে- আবার সাধারণ মানুষ হয়ে যাবে। ভক্তগণ ধ্বনি দেবে; ভক্তদের ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হবে- হরগৌরী প্রাণনাথ, মাথার ওপর জগন্নাথ। এইবার উদ্ধার করো, বম বম ভোলানাথ শিবশঙ্কর-মহাদেব। পরদিন সকাল থেকে বসবে গাজনের মেলা। চলবে দিনভর। কাঠের লাঙ্গল, খন্তি-কুড়াল-দা, খই-ফানুশ-বাঁশি, মাদক-আসব, চিৎকার চেঁচামেচি এবং হরগৌরীর যুগল মৃন্ময় মূর্তি। সে এক কাণ্ড হবে, দেখে নিও।

শুকদেব কন্যার উচ্ছ্বাস-দর্শনে বিস্মিত হলেন। বললেন- তুই কি ইতোপূর্বে এরূপ চড়কপূজা দেখেছিস? দেখেছিস গাজনের মেলা?

মায়াবতী জবাব দিল- না, দেখি নি। শুনেছি মাত্র।

শুকদেব বললেন- আমিও শুনেছি। অনেক ধুমধাম করে এরূপ চড়কপূজার প্রচলন নাকি অনেক গোত্রেই আছে।

উৎসাহ পেয়ে মায়াবতী বলল- হ্যাঁ, আমরা পুলিন ভট্টের ঘোষিত মনুর বিধানের প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে এরূপ ধুমধামের ব্যবস্থা করছি। গুরুদেব তার সকল শিষ্যদের বলে দিচ্ছেন। ইসিদাসী, খুল্লনা, কলিঙ্গা, সুপন, হিঙ্গল এরা সকলে বনবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এরা অনেকে শিব-কালী সেজে নাচে যোগ দেবে। তুমি অনুমতি দিলে আমিও নাচব বাবা।

শুকদেব কন্যার উৎসাহ দেখে আনন্দিত হলেন। মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলেন ক্লান্তি আর হতাশার কথা। হেসে বললেন- নিশ্চয়ই। কিন্তু মা, তোর সঙ্গে শিব সাজবে কে? অর্কদাস, হিঙ্গল, না কি উদয়মান?

মায়াবতী সপ্রতিভভাবেই বলল- এখনও ঠিক হয় নি বাবা। একজনকে বাছাই করে নেব। আমার সঙ্গে নাচতে যার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখব তার সঙ্গেই নাচব। শীঘ্রই চূড়ান্ত বাছাই হবে। অতঃপর কয়েকদিন নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।

শুকদেব হাসলেন।

 

 

তেরো

শিবমন্দিরের পুরোহিত গুরু ভবদেব তার ভক্তজনদেরকে ঘটা করে চড়কপূজার আয়োজন করার পরামর্শ দিয়েছেন। সকল গ্রাম-পঞ্চায়েত গ্রামিককে এ ব্যাপারে অনুরোধ করে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাই প্রতিটি গ্রামেই শিবভক্তদের মাঝে বিশেষ উৎসাহ। তবে বিল্বগ্রাম এবং পলাশতলী গ্রামের ধর্মপ্রবক্তাগণ এরূপ আচার-বিরোধী পূজা-অর্চনা নিয়ে বেশি মতামাতি না করতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, এতে করে দ্বিজসংস্কৃত জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বৈষ্ণব মতানুুসারীদেরও অনেকে এতটা পছন্দ নাও করতে পারে।

পণ্ডিত পুলিন ভট্ট তার গূঢ়পুরুষদের মাধ্যমে এরূপ জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের প্রস্তুতি হচ্ছে জানতে পেরে বিশেষ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি আচার্য মাধবশ্রী এবং বীথি-সামন্তকে এ ব্যাপারে পূর্বাহ্নে হস্তক্ষেপ করার পরামর্শ দিলেন। বিল্বগ্রামে সাম্প্রতিককালে গড়ে ওঠা দেবপাড়ায় নবীন-প্রবীণদের সঙ্গে একাধিক আলোচনাসভাও করলেন। অন্য কোনো গ্রামে এখনও পৃথক কোনো দেবপাড়া গড়ে ওঠে নি। পলাশতলীতে বিছিন্নভাবে দুয়েক ঘর ব্রাহ্মণ আছেন বটে। এরূপ কয়েকজন ব্রাহ্মণ কুলপ্রবীণ সহকারে পুলিন ভট্ট একদিন বীথি-সামন্তের গৃহে হাজির হলেন।

জনপদে বসবাসরত এ সকল আর্যসংস্কৃত জনদেরকে নিজ গৃহে উপস্থিত দেখে প্রথমে প্রদোষ দেব বর্মন কৃতার্থ বোধ করলেন। অতঃপর তাদের আগমণের কারণ অবগত হলেন। প্রদোষ দেব বর্মনকে তারা বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে পুরুষমেধ যজ্ঞের মাধ্যমে ক্ষত্রিয়কুলে বৃত হবার ফলে তার কিছুটা অতিরিক্ত দায় অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। মনুর বিধান নিষ্ঠার সঙ্গে সকলে যাতে পালন করে তা দেখা বীথি-সামন্ত হিসাবে এবং একজন ক্ষত্রিয় কুলপতি হিসাবে প্রদোষ দেব বর্মণের বিশেষ কর্তব্য। তাদের সকল পরামর্শ তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করলেন এবং জানালেন যে এ ব্যাপারে কী করা যায় ভেবে দেখবেন। সর্বশেষে কথঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন- তবে কিনা, চড়কপূজা তো শিবমন্দির প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন থেকেই হয়ে আসছে। প্রজাকুলের মধ্যে শিবভক্তরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাছাড়া অরণ্যাচারী জনগোষ্ঠীও চড়কপূজা এবং চড়কের মেলায় উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে থাকে। দেখি, বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রী কী বলেন।

 

তখন ভবদেবের আশ্রমগৃহের সম্মুখস্থ চত্বরের একপার্শ্বে বৃক্ষছায়া তলে সকলে জমায়েত হয়েছিল। গুরুদেব উঠে গেলে ইসিদাসী স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেই আলোচনার নেতৃত্ব নিলেন। আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো- গত বছরের পূজারী হড়জন মণ্ডলকে এবারও পূজারীর দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করা হবে। এ বছরের পূজা প্রবীণেরাই ব্যবস্থা করবেন; সঙ্গে থাকবেন আশ্রমের জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসী। বৈকাল-মারী পাহাড় অঞ্চলের তান্ত্রিক ওঝা ভোলাভব অম্বষ্ঠকে খবর দেবে হিঙ্গল মল্ল। আশ্রম থেকে যারা শিব-কালীর সাজ গ্রহণ করবে তাদের এখনই বাছাই করতে হবে এবং নিয়মিত অনুশীলনের উদ্যোগ নিতে হবে। আলোচনা সমাপ্তির পূর্বে ইসিদাসী বললেন- একটা কথা সকলের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। পূজা উৎসবটাকে আমরা যতই জনপ্রিয় ও সার্বজনীন করতে চাইছি ততই বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা তো মহাদেব পূজা আগেও করেছি, হরগৌরী সেজে কেউ কেউ নৃত্যও করেছে; আনন্দ করেছে, পরদিন চড়কের মেলা বসেছে; কেউ তো কোনোদিন সমালোচনা করে নি, কোনো কটুবাক্য বলে নি। এবার কী এমন ঘটল? একবার ভেবে দেখো সকলে!

সকলে ক্ষণকাল নীরব থাকল। হিঙ্গল অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে দুই হস্ত প্রসারিত করে নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করল-

শোনো হে ভক্তজন!

টিকিধারী পণ্ডিত এক কুচুটে ব্রাহ্মণ

শিবপুর বীথির স্বর্গ হতে নিত্য করে অবতরণ

পলাশতলী বটেশ্বরের মর্ত্যভূমে! কী বা কারণ?

ভেবে দেখো হে ভক্তজন!

 

আবৃত্তি শ্রবণে প্রায় সকলেই আহ্লাদিত হলো। মস্তক দুলিয়ে কেউ কেউ মন্তব্য করল- জয়তু নব্যকবি। মায়াবতী বলল- আমাদের নব্যকবি সকলের প্রাণের কথাটিই বলেছে। শিবপুর বীথির স্বর্গ হতে যিনি মর্ত্যে নেমে কোন্দল সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিত কি পুলিন ভট্ট, না কি আচার্য মাধবশ্রী?

বিষয়টির নিরসন হওয়া প্রয়োজন। আমরা দল বেঁধে এক্ষুনি আচার্য দেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি। 

হাত তুলে সকলকে নিরস্ত করলেন জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসী। বললেন- আচার্য দেবের নিকট বিষয়টি উত্থাপন করতে হলে গুরুদেবের সম্মতি প্রয়োজন। এ বিষয়টা নিয়ে পরবর্তীকালে কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে। আমরা বরং এই মুহূর্তে আশ্রম থেকে  কারা শিব-কালীর ভূমিকায় সাজবে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সমাধা করে নেই।

কলিঙ্গা সর্বদাই একটা সলজ্জভাব বজায় রাখে। স্বল্পভাষী, বলেও নিম্নস্বরে। সে প্রস্তাব দিল- আমাদের জ্যেষ্ঠাভগ্নীকেও এবার কালীমাতা সেজে নাচে অংশ নিতে হবে।

ইসিদাসী প্রশ্নটি লুফে নিলেন। সহাস্যে সকৌতুকে যুক্ত করলেন- প্রশ্নটা হচ্ছে, আমার সঙ্গে শিবের ভূমিকা নেবে কে? নব্যকবি হিঙ্গল মল্লকে আমার সঙ্গে শিব সাজিয়ে নেই, তুমি কি সম্মত আছো কলিঙ্গা দেবী?

কলিঙ্গা কোনো প্রত্যুত্তর করল না। লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে পড়ল, গণ্ডদেশ আরক্ত হয়ে উঠল। হিঙ্গল মল্ল ও কলিঙ্গার ঘনিষ্ঠতার কথা প্রায় সকলেই জানে। ওদের প্রণয়-সম্পর্ক আশ্রমের বন্ধুমহলে স্বীকৃত বিষয়। হিঙ্গল তার শ্বেতশুভ্র দন্তরাজি প্রকটিত করে উচ্চস্বরে ঘোষণা দিল- জ্যেষ্ঠাভগ্নীর সঙ্গে শিব সাজতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই; কলিঙ্গা সম্মতি দিলেই হলো।

মায়াবতী এগিয়ে এসে কলিঙ্গাকে খোঁচা দিল। বলল- এই দগ্ধমুখি! এক্ষুনি প্রতিবাদ কর। নইলে তোর শিব কিন্তু হাত-ছাড়া হয়ে গেল।

মিনমিনে কণ্ঠে কলিঙ্গা বলল- কারো শিবঠাকুর কি আবার হাতছাড়া হয় নাকি? অপচেষ্টা করলে মদনদেবের মতো জ্যেষ্ঠাভগ্নীও তো ভস্ম হয়ে যাবেন। পুরাণশাস্ত্রে উলে­খ আছে না, স্বর্গের দেবতাগণ ষড়যন্ত্র করে শিবঠাকুরের ধ্যান ভাঙ্গাতে গেলে প্রেমের দেবতা মদনদেব শিবঠাকুরের অগ্নিদৃষ্টিতে ভস্ম হয়ে গিয়েছিলেন।

-বাবা। কত আত্মবিশ্বাস! বলল মায়াবতী। কিন্তু আমিও যে নৃত্য করতে আগ্রহী। মুশকিল হলো এখন পর্যন্ত কোনো শিবঠাকুরের সন্ধান পাচ্ছি না। আমার যে কী উপায় হবে!

ঠিক এই সময়ে বৃক্ষরাজির আড়াল ছাড়িয়ে চত্বরে আবির্ভূত হলো অর্কদাস। হিঙ্গল মল্ল উঠে মায়াবতীর সন্নিকটে এগিয়ে এল। কানে কানে কথা বলার ভঙ্গী করে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করল-

 

           ভক্তিমতি মায়াবতী দেখো চক্ষু মেলিয়া

           তোমারই পাশে আছে কে দাঁড়াইয়া

 

উদয়মান স্বস্তি প্রকাশ করে বলল- ভালোই হয়েছে। সঠিক সময়ে উপস্থিত হয়েছে বন্ধুবর অর্কদাস। মায়াবতী নৃত্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমি প্রস্তাব করছি অর্কদাসই তার শিবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক। কী বলো হে অর্ক?

প্রস্তাব শুনে অর্কদাস উৎফুল্ল না হয়ে কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কিছুটা দ্বিধাভরে জানাল- না, সেটা বোধহয় সম্ভব নয়। বীথি-সামন্ত এ কাজে আমাকে অনুমতি দেবেন বলে মনে হয় না।

-কেন, কেন? উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলেন ইসিদাসী।

অনুচ্চকণ্ঠে অর্কদাস বলল- এ কথার জবাব জনান্তিকে দিতে হবে।

ইসিদাসীকে জনান্তিকে কোন কথাটি বলছে তা শ্রবণ করার জন্য অর্কদাসকে ঘিরে ধরল মায়াবতী, হিঙ্গল এবং উদয়মান। এক পার্শ্বে সরে গিয়ে অর্কদাস পুলিন ভট্টের সা¤প্রতিক কর্মতৎপরতার বিষয়টি ইসিদাসীকে জ্ঞাত করল। পলাশতলীর দুজন প্রবীণ ব্রাহ্মণসহ পুলিন ভট্ট বীথি-সামন্তের গৃহে উপস্থিত হয়ে মনুর বিধান বাস্তবায়নে ক্ষত্রিয়কুলের দায়িত্বের কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন সামন্ত মহাশয়। ভট্ট মহাশয়গণ নিষ্ক্রান্ত হলে বীথি-সামন্ত সকলের সম্মুখে এই মন্তব্য করেছেন যে, আমরা ক্ষত্রিয় হিসাবে আশীর্বাদপূত হয়েছি। নীচু জাতের পূজা-অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত উৎসাহ প্রদর্শন না করাই শ্রেয়। অর্কদাসকে লক্ষ্য করে তিনি আরো বলেছেন- পূজা-অনুষ্ঠানাদির নিরাপত্তা-ব্যবস্থায় তুমি সক্রিয় থাকতে পারো; এটা রাজকার্যের অংশ, রাজকর্মচারীর অর্পিত দায়িত্ব। কিন্তু সাবধান, তুমি নিজে পূজায় অংশগ্রহণ করবে না। মনে রাখবে এটা আমার নির্দেশ।

পুরুষমেধ যজ্ঞের প্রভাবে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রদোষ দেব বর্মণের মনোভাবের এতটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে সকলে বিস্ময়ে বিমূঢ় হলো। কারো মুখে কোনো শব্দ জোগাল না। মায়াবতী ক্ষণকাল সকলের মুখপানে একে একে দৃষ্টিপাত করল। দৃষ্টিতে তার ক্রোধের আগুন। অর্কদাসের সম্মুখে তর্জনী উত্তোলন করে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠল- সামন্ত মহোদয়ের এই নির্দেশ আমরা মানতে বাধ্য নই। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন রাজধর্ম- সে-ধর্ম পালনেই রাজকার্য সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রজা-সাধারণের ধর্ম-কর্ম কিংবা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানাদি নিয়ন্ত্রণ করা তার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

কিয়ৎকাল নিশ্চুপ থাকল মায়াবতী। অতঃপর পুনরায় উচ্চকণ্ঠে বলল-  আমরা প্রত্যেকে হরগৌরীর পূজায় অংশগ্রহণ করব। শিব হচ্ছে কর্বটদের ওলান ঠাকুর, আমাদের সকলের আদি পিতা; কালী আমাদের আদিমাতা। তাদের নর্তনে আনন্দের আতিশয্য। সে আনন্দে প্রলয়, সে আনন্দে সৃষ্টি। পূজা-অনুষ্ঠানাদিতে আমরা অবশ্যই অংশগ্রহণ করব।

কিয়ৎকাল নিশ্চুপ থেকে দম নিল মায়াবতী। অতঃপর অর্কদাসকে লক্ষ্য করে বলল- তুমি করবে না অর্কদাস? তুমি নৃত্য করবে না, ত্রিশূল হস্তে, শিব ঠাকুরের সজ্জায়, আমার সঙ্গে?

অর্কদাস বিমর্ষ, বিমূঢ়। বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে শুধু উত্তেজিত মায়াবতীকে স্থির দৃষ্টিতে দেখল। কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারল না।

পরিবেশটা অত্যধিক গুরুগম্ভীর হয়ে উঠলে উদয় এগিয়ে এল। সমস্যাটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গি করে ঘোষণা করল- জ্যেষ্ঠাভগ্নী অদ্যকার করণীয় বিষয়ক আলোচনা ইতোমধ্যে সমাপ্ত করেছেন। আমরা চলো সকলে শিবমন্দিরের পশ্চাতের সেই বিশাল পনস বৃক্ষটির ছায়াতলে গিয়ে বসি এবং নব্যকবি শ্রীমান হিঙ্গল মল্লের কাব্যপ্রতিভা নিয়ে তত্ত্বালোচনায় মনোনিবেশ করি। তৎসঙ্গে সূর্যাস্তটাও উপভোগ করা যাবে।

সকলেই প্রস্তাবটি পেয়ে যেন স্বস্তিবোধ করল। কলরব করতে করতে তারা হেঁটে গেল মন্দিরের পশ্চাতে। দিনান্তের সূর্যরশ্মিতে তেজ নেই। উদয়মান নিজের একপার্শ্বে মায়াবতীকে এবং অন্যপার্শ্বে অর্কদাসকে নিয়ে মৃত বৃক্ষকাণ্ডটির ওপর বসে পড়ল। অন্যেরাও বসল এখানে-ওখানে। উদয়মানই আলোচনার সূত্রপাত করল। হিঙ্গল মল্লের কাব্য নিয়ে ঠিক তত্ত¡ালোচনা নয়, তবে কথা বলল তার কাব্যের সূত্রটি ধরেই- নব্য কবি যাকে চক্ষু মেলিয়া দেখে নিতে আবেদন করেছিল, যাকে শিবের ভূমিকায় পাওয়ার জন্য ব্যাকুল প্রশ্ন রেখেছে ভক্তিমতি মায়াবতী, তার বিপদগ্রস্ততার বিষয়টি আমাদের সকলকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বস্তুতপক্ষে, অর্কদাস এক্ষণে শুধুমাত্র অর্কদাসই নয়, বরং রাজকীয় প্রতিহারী-দলের পদস্থ পরিচালক। মায়াবতীর হৃদয়ের অর্ঘখানি শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে গ্রহণ করতে পারছে না। তার সম্মুখে হিমালয়-সদৃশ প্রতিবন্ধক হিসাবে দেখা দিয়েছে সামন্ত মহোদয়ের নির্দেশ। আমাদের সকলের কর্তব্য হবে বিপদগ্রস্ত এই বন্ধুদ্বয়কে সহায়তা করা। এসো, সমস্যাটি নিয়ে আমরা ভাবি।  

অতঃপর কলিঙ্গা লহনার সঙ্গে কানাকানি করে কিছু একটা পরামর্শ করল এবং পরে হিঙ্গলের কর্ণকুহরে কোনো একটা মন্ত্রণা প্রদান করল। হিঙ্গল তার স্বভাবসুলভ নাটকীয় ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়াল এবং শ্বেতশুভ্র দন্তরাজি বিকশিত করে বলল-

 

ক্ষম অর্কদাসে সখী মায়াবতী, পেয়েছি সমাধান।

তোমারই শিব হবে মাতোয়ারা বন্ধু উয়দমান।

 

কী বলো হে উদয়মান? এর থেকে উত্তম সমাধান এই মুহূর্তে আর কী হতে পারে? মায়াবতী তার শিব পাবে, অর্কদাস রাজনির্দেশ লঙ্ঘন করার বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার পাবে।

লহনা, কলিঙ্গা, সুপন একযোগে ধ্বনি দিয়ে উঠল- উত্তম প্রস্তাব, উত্তম প্রস্তাব।

গুরুজনের ভঙ্গীতে হাত তুলে সকলকে অভয় মুদ্রা দেখাল উদয়মান। বলল- আমার কোনোই আপত্তি নেই। প্রয়োজনে দগ্ধ কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে মার্জনা করে গাত্রবর্ণকে সুনীল করে নেব। প্রশ্ন হলো, মায়াবতী কি আমাকে গ্রহণ করবে, সুযোগ পেলেই সর্বক্ষণ আর্যকুলোদ্ভব বলে যাকে তীরস্কার করে? মনে হয় আর্যপুত্র হওয়া যেন বড়ই অপরাধ, বড়ই ঘৃণ্য বিষয়।

হেসে উঠল মায়াবতী। বলল- আমি কর্বট কন্যা। আমাকে কর্বট-কুলোদ্ভব বলে সম্বোধন করলে তো আমার নিন্দাবাদ করা হলো বলে ভাবি না। তবে আর্যপুত্রকে আর্যপুত্র বলা অন্যায় হবে কেন?

আলোচনাটি ভিন্নখাতে সরে যাচ্ছে দেখে অর্কদাস স্বস্তিবোধ করল। সে বলল- নিশ্চয় না। আমাকে কেউ যদি কোচ-কুলোদ্ভব বলে সম্বোধন করে আমি কি কোনো আপত্তি করব? করব না। কারণ সেটাই তো সত্যি। তাহলে আর্যপুত্রকে আর্যপুত্র বলে সম্বোধন করলে কেন অন্যায় হবে?

উদয়মান কিঞ্চিৎ গম্ভীর হয়ে বলল- হ্যাঁ, নিশ্চয় হবে। কেননা আর্য কোনো নৃতাত্তি¡ক পরিচয় নয়। ভাষা-সংস্কৃতি এবং বিশেষ একটা আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিচায়ক মাত্র। কর্বট একটা মানবকুলের নৃতাত্তি¡ক পরিচয়, একটা মানবগোষ্ঠীর গোত্রের পরিচয়। তেমনি শবর, মল্ল, রাজবংশী, অহোম, কোচ ইত্যাদিও। প্রাচীন আর্যগণও এরূপ বিভিন্ন গোত্রের মিশ্রিত একটি জনগোষ্ঠী। এরা মূলত ছিল পশুপালক, বৈশ্য ও যোদ্ধা। যুদ্ধ করে তারা এ দেশের জনগোষ্ঠীকে পদানত করেছে। সকলকে অনার্য আখ্যা দিয়ে শূদ্রে ও দাসে পরিণত করেছে। তবে এদেশের শাসককুল ও পুরোহিতকুল থেকে বশ্যতা স্বীকারের অঙ্গীকারে কোনো কোনো ব্যক্তিকে নিজেদের দলভুক্ত করে নিয়েছে। ক্রমে আর্যরা সমাজে বিদ্যমান ব্রাহ্মণ্যব্যবস্থা গ্রহণ করে কঠোর বর্ণ-বিভাজনের মাধ্যমে নিজের আধিপত্য নিরঙ্কুশ করার ব্যবস্থা করেছে। এ ব্যবস্থার নাম আর্যব্যবস্থা- এ সভ্যতার নাম আর্যসভ্যতা। এদের একটা অভিন্ন ভাষা আছে, শিক্ষাব্যবস্থা আছে, সাহিত্য আছে। যদিও এই শিক্ষার চর্চা কঠোরভাবে সীমিত আছে কেবল ব্রাহ্মণকুলে এবং ক্ষত্রিয়কুলে। তথাকথিত ক্ষত্রিয়কুল-জাত বলে আমি সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী মাত্র। আমি আর্যশিক্ষা-ব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়েছি, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেছি, কিন্তু আমি তো আর সে-সভ্যতার ধারক-বাহক নই। আমি সে-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নই, অধিবক্তাও নই। মানুষের প্রতি মানুষের অবিচার-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে একদিন গৃহত্যাগ করেছিলাম। বৌদ্ধ শ্রমণ চন্দ্রশেখর মৈত্রকে অনুসরণ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলাম। অহিংসাকে পরম ধর্ম মান্য করে একসময় বৌদ্ধধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলাম। আমি আর্য হব কেন? আমি কি মাথা নত করেছি ব্রাহ্মণ্য অবিচারের কাছে? আমি কি মান্যতা দেখিয়েছি মনুর বিধানে? আমার সুদৃঢ় জবাব হলো ‘না’। সুতরাং আমাকে আর্য নামে তিরস্কার করা অন্যায় হবে, দূরে সরিয়ে রাখা হৃদয়হীনতার পরিচায়ক হবে।

কিয়ৎকাল নীরব থেকে উদয়মান মায়াবতীর মুখোপরি দৃষ্টি নিবদ্ধ করল এবং কোমল কণ্ঠে বলল- আমি কি তাহলে ত্রিশূূল হস্তে মায়াবতীর সঙ্গে নৃত্যে অংশ নিতে পারি না?

এমত স্পষ্ট ও তীব্র আবেগঘন বক্তব্য শ্রবণ করে সকলের দৃষ্টিতে উদয়মান সম্পূর্ণ নতুনরূপে প্রতিভাত হলো। অর্কদাস কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তার পূর্বেই মায়াবতী বলল- হ্যাঁ, নিশ্চয় তুমি আমার সঙ্গে নাচে অংশ নিতে পারো। বুঝতে পারছি, তুমি বিশালহৃদয় ব্যক্তি। নির্যাতিত মানবকুলকে ভালোবেসে তুমি গৃহত্যাগ করেছ, অহিংসাকে পরমধর্ম মেনে বৌদ্ধধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করেছ। কিন্তু তোমার বৌদ্ধধর্ম কি বর্ণাশ্রমের নির্যাতন থেকে মানবকুলকে পরিত্রাণ দিতে পেরেছে? কর্মফল-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদের প্রতারণার ফাঁদ থেকে কি আমাদেরকে মুক্ত করতে পেরেছে?

উদয়মান দৃঢ়তার সঙ্গেই জবাব দিল- হ্যাঁ, আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভিক্ষুর ত্যাগ, ইন্দ্রিয় সংযম, কামনার বিলোপ এবং নির্বাণ- এ সকলই তো জীবের মঙ্গলের নিমিত্তে।

হাসল মায়াবতী। বলল- ওটা আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র। তোমরা পারো নাই। বরং বর্ণাশ্রমে আকীর্ণ আর্য ব্রাহ্মণ্য-ব্যবস্থার বশ্যতা মেনে নিয়েছ, আত্মপ্রবঞ্চনার পথ ধরে নির্বাণ প্রাপ্তির কথা বলেছ। ওটা আনন্দহীনের ধর্ম। কিন্তু অপরপক্ষে শিবের নাচন আনন্দ-সাগরে ডুব দেওয়া। এসো আমরাও নাচি, শিবঠাকুরের মতো উন্মত্ত আনন্দে নাচি, হরগৌরীর মতো নাচি, সকলে মিলে নাচি। শবর, মল­, রাজবংশী, অহোম, কর্বট, কোচ, কৃষিজীবী, বনবাসী- আমাদের সকলের পরম পিতা শিব, পরম মাতা কালী আমাদেরকে আশীর্বাদ করবে, ভালোবাসা দেবে। আর দেবে এই পৃথিবীতে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার অফুরন্ত প্রাণশক্তি। আর্যগণ যেমন নিজের মতো করে বর্ণাশ্রমী একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছে মানুষকে শোষণ করার লক্ষ্যে, আমরাও সকল অনার্যকুল, যাদেরকে আর্যগণ সর্বক্ষণ নিগৃহীত করছে, অবমাননা করছে- আমরা সকলে মিলে গড়ে তুলব শৈবধর্ম-ভিত্তিক এক মানবিক সভ্যতা। গড়ে তুলব বর্ণাশ্রমের নির্যাতন থেকে এবং কর্মফল-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদের প্রতারণা থেকে মানুষের চিরন্তন মুক্তির সোপান।   

 

 

চৌদ্দ.

চড়কপূজা ও চড়ক-মেলার প্রস্তুতি চলল পূর্ণোদ্যমে। সবদিক সামাল দিচ্ছেন জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসী। হড়জন মণ্ডল এসে পূজারীর দায়িত্ব নিলেন; গেল-বছরের প্রবীণেরা সকলেই ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এলেন। তান্ত্রিক ভোলাভব অম্বষ্ট এসে বাছাই করা পাহাড়ী হরিতকী বৃক্ষ কেটে দীঘির জলে নিমজ্জিত করলেন। আশ্রমের শিব-কালীরা নিয়মিত অনুশীলন করতে থাকল। চতুর্দিকে সাজসাজ রব। তরুণেরা মাতোয়ারা, আনন্দ-উৎসবের হিল্লোল চারদিকে- আকাশে, বাতাসে, বনাঞ্চলে।

পূজার দিন সূর্যোদয়ের পূর্বেই ভক্ত তরুণ-তরুণীদল এসে জমায়েত হতে থাকল। ভোলাভব অম্বষ্ঠের কয়েকজন প্রবীণ শিষ্য এসে দীঘিতে নিমজ্জিত হরিতকী বৃক্ষ তুলে এনে যথানিয়মে যথাস্থানে পুঁতে দিল। নির্মিত হলো চড়ক গাছ ও ঘূর্ণায়মান মঞ্চ। বেলা বাড়তে থাকল। দূরদূরান্ত থেকে উৎসাহী মানুষের ভিড় বাড়তে থাকল। ভক্তি-ভরে জোড় হাতে নমস্কার করল শিবলিঙ্গের প্রতীক চড়ক গাছটিকে, গৌরির প্রতীক গাছের চূড়ায় সাজানো মাথাটিকে। কেউ কেউ আভূমি প্রণিপাত করল। কোলাহল, চিৎকার, উলুধ্বনি। ভোলাভবের নিদের্শে একনিষ্ঠ, কর্মব্যস্ত তার সহযোগীবৃন্দ। একসময়ে ঢোলকবাদ্য আরম্ভ হলো। অসংখ্য ঢোলকের তীব্র শব্দে গগন বিদীর্ণ, শ্রবণেন্দ্রিয় স্থবির প্রায়। অনতিবিলম্বেই দীঘির পাড়ে মেলাপ্রাঙ্গণে জমায়েত অগণিত মানুষকে স্তম্ভিত করে বড়শীতে ঝুলে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করল এক কিশোর। হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী। দুই হস্তে শূন্যে ছুড়ে দিচ্ছে কলা, ফলফুল, শুকনো মিষ্টান্ন। ভক্তজন তাদের মানত করা কলা ও মিষ্টান্ন বিতরণের জন্য তুলে দিচ্ছে তান্ত্রিক ওঝা কিংবা তার সহযোগীদের হস্তে। চলল হুলস্থূল হরিলুট।

দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হলে প্রবীণ পূজারী হরজন মণ্ডল চড়ক গাছের সন্নিকটে এগিয়ে গেলেন ভক্ত সহযোগী সমভিব্যহারে। সকলের পরিধানে সংক্ষিপ্ত রক্তবর্ণ পরিধেয়। ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাভরণ, মস্তকে রক্তবর্ণ পট্টি বাঁধা। প্রথমেই ফুল বেলপাতা ছুঁইয়ে ও সিঁদুর মেখে মহাদেবকে নমস্কার করলেন সকলে, অতঃপর চড়ক গাছের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে পূজা শুরু করলেন। ভক্তগণ নিজ নিজ মানত এগিয়ে দিয়ে পূজারীর হাত থেকে ফুল-ফল কিংবা চরণামৃত গ্রহণ করে ক্রমে উৎসবের ভিড়ে হারিয়ে যেতে থাকল।

বেলা পড়ে এলে একসময় ঢোলকবাদ্য একযোগে থেমে গেল। নতুন পর্যায় শুরু হবার ইঙ্গিত পেয়ে চতুর্দিকে উলুধ্বনি উঠল। আবার বেজে উঠল ঢোলক নতুন তালে; সঙ্গে করতাল, আর মাদল। শুরু হলো শিব-কালীর নৃত্য, হর-গৌরীর নৃত্য। জোড়ায়-জোড়ায় নৃত্যে যোগ দিল অসংখ্য নারী-পুরুষ। তারা এল দূর-দূরান্ত থেকে, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে। বিচিত্র তাদের সাজপোশাক। শিবের হাতে ত্রিশূল, কণ্ঠে নরমুণ্ডের বদলে খোসা-ছাড়ানো নারিকেল ও নানাবিধ বীচির মালা। নগ্নদেহে ছাইভস্ম মাখা। শিরোপরি জটা-বাঁধানো চূড়া। পরিধানে প্রশস্ত একখণ্ড রক্তবর্ণ লিঙ্গপট্ট। কালীমাতার সাজে নারীকুল; দুখণ্ড বস্ত্র- একটি বুকে বাঁধা, অন্যটি পরিধানে; তারও অধিকাংশ রক্তবর্ণ। খোঁপায় নানা বর্ণের ফুল।

আশ্রম থেকে আগতদের মধ্যে উদয়মান ভক্তি-ভরে প্রথমে নমস্কার করল শিবলিঙ্গ ও গৌরীমাতার প্রতীকে। অতঃপর পূজারীর নিকট থেকে চরণামৃত গ্রহণ করে দক্ষিণ হস্তের ত্রিশূল ঊর্ধ্বমুখি করে ধরে বাম বাহুর আলিঙ্গন থেকে মায়াবতীকে বিযুক্ত করল এবং বাদ্যের তালে তালে শুরু করল তার নৃত্য। নৃত্য শুরু করল মায়াবতীও। একে একে যোগ দিল হিঙ্গল ও কলিঙ্গা; সুপন ও লহনা। ইসিদাসী হাস্যমুখে ওদেরকে তাল দিল। তবে অন্তরের বিমর্ষ আভায় তার হাসি মাঝে-মধ্যেই যেন স্তিমিত হয়ে পড়ছিল। উপযুক্ত সঙ্গী পায় নি বলে সে নৃত্যে অংশগ্রহণ করতে পারে নি। সন্নিকটে অর্কদাস- রাজপুরুষের দায়িত্বে নিয়োজিত। দায়িত্ব আর অন্তর-আকাক্সক্ষার টানাপোড়নে ক্ষত-বিক্ষত চেহারা নিয়ে সে যেন একাকী দণ্ডায়মান। তার অনতিদূরেই উদয়মান- শিব, উন্মত্ত ভোলানাথ। তার নর্তন আনন্দের আতিশয্য। আনন্দ তার বিষাণ বাদনে। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ত্রিশূলের আঘাতে ত্রিভুবন তাণ্ডবে পরিব্যাপ্ত। দিগ¦লয়ে গ্রহ ও জ্যোতিষ্ক সেই আনন্দে নির্বাপিত হয়। শিবের ভ্রূভঙ্গে জগতের বিলয় হয়, তবুও জগৎ তাকে ঘিরেই নর্তনানন্দে মাতোয়ারা। শিব সহাস্যবদনে সমুদ্রের বিষপান করে নীলকণ্ঠ হন- তিনি আনন্দ সাগরে অবগাহন করেন, গৃহকে করেন আনন্দতীর্থ। তথাপিও আজ অর্কদাস নিরানন্দ।

সূর্য অস্ত গেলে বাদ্যের ধ্বনি পুনরায় একযোগে থেমে যায়। নৃত্য সমাপ্ত। এবার দীঘির জলে অবগাহন। চতুর্দিকে গগনবিদারী ধ্বনি ওঠে- ‘হরগৌরী ভোলানাথ, মাথার ওপর জগন্নাথ। এইবার উদ্ধার করো শিব, বম বম মহাদেব’। ধ্বনি চলতে থাকে, ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। দীঘির জলে যুগলে-যুগলে অবগাহনে নামে। মশাল প্রজ্জ্বলিত হয় সমগ্র প্রাঙ্গণে, দীঘির চতুর্দিকে। আলোয় আলোময় হয়ে উঠে দিগ¦লয়, চঞ্চল হয় দীঘির জল, ভক্তজনের হৃদয় আন্দোলিত হয় অনির্বচনীয় তুরীয় আনন্দে। বুঝি-বা আনন্দলোকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।

কত পল, কত দণ্ড, কত প্রহর অতিক্রান্ত হয়েছে উদয়মান জানে না। জানে না মায়াবতীও। এক সময় দৃশ্যমান হলো উদয়মান দীঘির জল থেকে উঠে আসছে এলায়িত মায়াবতীকে পাঁজাকোলা করে। উদয়মানের দেহ থেকে ছাইভস্মের কালিমা মুছে গেছে- গৌরবর্ণ দেহখানি উদ্ভাসিত। চোখে-মুখে উদ্বেগ। মায়াবতী তার কোলে। সিক্ত কুন্তলরাজি, স্খলিত বসন। সমগ্র দেহ নিংড়ে জল পড়ছে পদপ্রান্তে।

অর্কদাস এগিয়ে গেল। কী হয়েছে, কী হয়েছে বলে চিৎকার করে সন্নিকটে উপস্থিত হলেন ইসিদাসী। অন্যরা তখনও অবগাহনে ব্যস্ত। চতুর্দিক আলোর বন্যায় ভাসমান। ভূমিতে বসে পড়ে মায়াবতীর অচেতন দেহখানি কোল পেতে নিজ-বক্ষে টেনে নিলেন ইসিদাসী। মায়াবতীর অচেতন দেহখানির দিকে দৃষ্টিপাত করে উদ্বিগ্ন অর্কদাস পুনরায় প্রশ্ন করল- কী হয়েছে?

উদয়মান দম নিয়ে প্রত্যুত্তর করল- স্নান করতে করতে অকস্মাৎ লক্ষ করলাম মায়াবতী ডুবে যাচ্ছে। ভাবলাম, হয়তো ইচ্ছে করেই ডুব দিয়েছে। কিন্তু তার হস্তদ্বয় জলের উপরে উৎক্ষিপ্ত হলে ভাবলাম অন্যকিছু। দ্রুত তাকে তুলে আনলাম। মনে হচ্ছিল তার সমস্ত দেহ যেন নিস্তেজ হয়ে নেতিয়ে পড়ছে।

ব্যগ্র হয়ে ইসিদাসী বলল- অর্ক, তুমিও আমার সঙ্গে ধরো। না না মন্দিরে নয়, শুকদেব মহাশয়ের গৃহে। চলো সেখানেই নিয়ে যাই।

ইসিদাসী মায়াবতীকে জড়িয়ে ধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নিজ পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারছিল না মায়াবতী। ইসিদাসী পুনরায় তাকে ভূমিতে শয়ান করে তার মাথাটা কোলে তুলে নিলেন। দুই গণ্ডদেশে মৃদৃ চাপড় দিয়ে ডাকলেন- মায়াবতী, মায়াবতী চোখ মেলে তাকাও। অতঃপর অর্ককে বললেন- তুমি দ্যাখো তো, ভোলাভব অম্বষ্ঠ কিংবা তার দলের কোনো লোককে পাও কি না। বলতে বলতে তিনি মায়াবতীর হাতের পাতা মার্জনা করতে থাকলেন। উদয়মানও পার্শে¦ বসে পড়ে তার পায়ের পাতা মর্দন করতে লাগল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই মায়াবতীর চেতনা ফিরে এল। ফ্যাল ফ্যাল করে ইসিদাসীকে প্রশ্ন করল- সে কী! আমি এখানে তোমার কোলে শুয়ে আছি কেন?

অর্কদাস উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরে এল ভোলাভব কিংবা তার কোনো সহযোগীকে খুঁজে না পেয়ে। কিন্তু মায়াবতীর জ্ঞান ফিরে এসেছে দেখে খুশি হয়ে বলল- এই তো মায়াবতী সুস্থ হয়ে পড়েছে। চলো, আমাদের কাঁধে ভর দিয়ে। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকো। তোমাকে গৃহে পৌঁছে দিই। 

 

 

পনেরো.

রাত্রি দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত। আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করে যথাবিহিত পরিচ্ছন্ন হয়ে সামান্য আহার্য গ্রহণ করে নিল উদয়মান। সারাদিনের ক্লান্তি অপনোদনের লক্ষে শয্যা পেতে লম্বমান হলো। ক্লান্তি অপনোদন হলো বটে। কিন্তু উদ্বেগ কমল না। মায়াবতীর আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়ার বিষয়টা কিছুতেই মন থেকে দূরীভূত করতে পারল না। মায়াবতী দীঘির জলে কিছুক্ষণ উচ্ছ¡ল আনন্দে লাফালাফি করছিল, দশতি টেনে নিয়ে গাত্রমার্জনা করছিল, বলেছিল- চলো সাঁতার কেটে মাঝ দীঘিতে যাই। দুজনে একযোগে গেলে খুব আনন্দ হবে। দেখো, আরো কতজনা গেছে ওদিক। উদয়মান সাবধানী কণ্ঠে বলেছিল- দিনমান তো অনেক পরিশ্রম হয়েছে, অত ধকল সইতে পারবে তো? হেসে উঠেছিল মায়াবতী। বলেছিল- আমি কর্বট নারী। শিশুবয়স থেকে জলকেলি করে অভ্যস্ত। শিশুবয়সে পুকুর থেকে, বিল থেকে কত শাপলা-শালুক তুলে এনেছি। আবার হেসে বলেছিল- তুমি তো আমার শিবঠাকুর। তুমি পাশে থাকতে আমার আবার ভয় কী উদয়! বলেই সে টুপ করে ডুব দিয়েছিল। দীঘির জলে লজ্জা আড়াল করতে, নাকি উদয়মানকে ভয় দেখাতে? হায়, কর্বট কন্যা মায়াবতী জানবে কী করে পূর্বাশ্রমে উদয়মান ছিল গুপ্ত সামরিক বাহিনীর অশ্বারোহী দলের অগ্রসৈনিক। কর্ণসুবর্ণের নগর-পরিষদে কর্মরত গুপ্ত সাম্রাজ্যের ক্ষত্রিয় রাজপুরুষ অর্চিষ্মান ঘোষের জ্যেষ্ঠপুত্র উদয়মান ঘোষকে কেবল অস্ত্রচালনা নয়, অশ্বারোহণ, পর্বতারোহণ ও সন্তরণ সর্বপ্রকার দক্ষতার জন্যই প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। 

পূজা-প্রাঙ্গণের স্তিমিত কোলাহল তখনও ভেসে আসছিল। খোল-করতাল-মাদলের শব্দ, দোহার নট্টের পায়ের ঘুংঘুরের ধ্বনি দূরাগত সঙ্গীতের মতো প্রতীয়মান হচ্ছিল। তখনও হয়তো অক্লান্ত কোনো শিবঠাকুর-কালীমাতার জুটি জলক্রীড়ায় সক্রিয়। বিলম্বে আগতদের পূজাপর্ব কিংবা স্নান-পর্ব সমাপ্ত হতে বেশি দেরি নেই। প্রভাতে পুনরায় শুরু হবে চড়কের মেলা। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল উদয়মান। মেলাপ্রাঙ্গণে যাবার পূর্বে অবশ্যই একবার মায়াবতীকে দেখতে যেতে হবে। তার অসুস্থতা এখন কোন পর্যায়ে কে জানে। অকস্মাৎ তার মনে ভিন্নতর চিন্তার উদ্রেক হলো। মায়াবতী কি সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, না কি ভান করছিল? তার শিবঠাকুর নিমজ্জিত হয়ে পড়া থেকে তাকে উদ্ধারের জন্য কী করতে পারে দেখবে বলে? দীঘির মধ্যস্থলে সন্তরণকালে অকস্মাৎ সে চিৎকার করে বলেছিল- ও মাগো, আমি তো ডুবে যাচ্ছি। আমাকে বাঁচাও উদয়মান! এতটুকু বলে সত্যিই সে ডুবে যাচ্ছিল; দুই হস্ত ঊর্ধ্বে তুলে ধরে যেন সাহায্য পাওয়ার শেষ চেষ্টা করছিল। উদয়মান তরিৎগতিতে তাকে নিজ বক্ষে তুলে নিয়ে চিৎশয়ানে দ্রুত সাঁতারে পাড়ে নিয়ে এসেছিল। উদয়মানের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে পড়েছিল যেন নিশ্চিন্ত নির্ভরতায়। অচিরেই সেই অনাস্বাদিত, অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয় আনন্দানুভূতি সঞ্চারিত হয়েছিল উদয়মানের অন্তরেও। অভূতপূর্ব এক আনন্দস্রোত যেন তাকে বিলীন করে দিয়েছিল নিঃসীম মহাশূন্যে, মহাকালে। উদয়মান বুঝি-বা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল। এরই নাম কি নির্বাণলাভ? এরই নাম কি ইহজাগতিক সকল আকাক্সক্ষা থেকে মুক্তি? এরূপ তুরীয় অবস্থায় কতক্ষণ কেটেছিল উদয়মানের- কয়েক পল কিংবা অনন্তকাল, উদয়মান স্মরণ করতে পারে না। একসময় অনুভব করতে পারে মায়াবতী নিস্তেজ, অর্ধচেতন। তাকে জড়িয়ে পড়ে আছে বুকের ওপর।

কী এমন অসুস্থতা যে এত অল্পকালের ব্যবধানে নির্জীব হয়ে প্রায় অচেতন হয়ে পড়তে পারে? এবং ভূমিতে শয়ান অবস্থায় ইসিদাসীর কোলে মস্তক রেখে দণ্ডকালের মধ্যে উঠে দাঁড়াতেও পারে? কাঁধে ভর দিয়ে হলেও প্রায় অর্ধ-ক্রোশ দূরত্ব হেঁটে অতিক্রম করতে পারে? সবটুকুই কি অভিনয় হতে পারে? কিন্তু এরূপ অভিনয় করে তার কী লাভ হতে পারে? কেবল মজা করা? উদয়মানকে বোকা বানানো? রাত্রির শেষ প্রহরে তন্দ্রা এসেছিল উদয়মানের। সূর্যোদয়ের পূর্বে ব্রাহ্মমুহূর্তের দুই দণ্ডকাল অতিক্রম করে দিবাভাগ প্রবেশ করেছে রৌদ্রমুহূর্তে। চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত। চটজলদি শয্যাত্যাগ করে প্রাতঃকৃত সমাপ্ত করল সে। সংক্ষিপ্ত প্রাতঃরাশ সেরে নিয়ে যাত্রা করল শুকদেব মহাশয়ের গৃহাভিমুখে। অসুস্থ মায়াবতী এখন কেমন আছে না দেখে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না সে।

শুকদেব তখনও তার প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় উপবিষ্ট। সুঁড়িপথ অতিক্রম করে গৃহপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই উদয়মানকে দেখতে পেলেন শুকদেব। পরিধানে পীত বর্ণের খাটো ধুতি, ঊর্ধ্বগাত্র একই বর্ণের হালকা উত্তরীয়তে আবৃত। উদয়মান এগিয়ে এল দ্রুত পদক্ষেপে, ক্লান্ত এবং বিষণ্ন। নমস্কার, প্রতিনমস্কার ও শিষ্টবাক্য বিনিময়ের পর শুকদেব প্রত্যুত্তর  করলেন- হ্যাঁ, ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদেই মঙ্গল নিহিত। সূর্যতর্পন সমাপ্ত করে প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় বসে শাস্ত্রপাঠ করছিলাম। শাস্ত্রপাঠে আমাদের অন্তর নির্মোহ, সহিষ্ণু, বিগতব্যথ ও শান্ত হতে পারে। হ্যাঁ, মায়াবতী তেমন ভালো নেই। রাত্রির শেষ প্রহর থেকে গাত্রে উত্তাপ সঞ্চারিত হয়েছে; সর্দিজ্বর ও মাথাধরা নিয়ে শয্যাশায়ী। বৌমা শুশ্রূষায় নিরত আছে। তুমি সেদিকে যেতে পারো। এতটুকু বলে একজন পরিচারিকাকে ডেকে উদয়মানকে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন।

শুকদেবের পূজাগৃহের দক্ষিণ-সংলগ্ন সুপরিসর শয়নগৃহ। দক্ষিণমুখী; পূর্ব ও দক্ষিণ উভয় পার্শ্বে প্রশস্ত দাওয়া; গৃহপ্রবেশের মুখে পাদোদক। তাতে নিম ও অন্যান্য ভেষজবৃক্ষের কিছু পত্রগুচ্ছ নিমজ্জিত। উদয়মান প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে পড়ল দ্বিধান্বিত হয়ে। শুকদেব লক্ষ করে এগিয়ে এলেন। হেঁকে বললেন- বৌমা! উদয়মান মায়াবতীকে দেখতে এসেছে। তাকে তো চেনোই; সে মায়াবতীর সতীর্থ। ওকে শয্যাপাশে আসন পেতে দাও।

উদয়মানকে দেখে মদনিকা কোনো সঙ্কোচ প্রকাশ করল না। সপ্রতিভ কণ্ঠেই বলল- এসো ঠাকুরপো, তোমার সতীর্থ বান্ধবীটি বড়ই কাতর হয়ে পড়েছে। তার শুশ্রূষার প্রয়োজন।

উদয়মান গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেখল মায়াবতীকে। তার চোখে-মুখে কোনো ছলনার আভাসমাত্র লক্ষ করল না। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে, কাৎ হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছে। হালকা কাঁথায় তার দেহখানি আবৃত। ঘনকৃষ্ণ কুন্তলরাজি তখনও সিক্ত। দীঘির জল তো রাতেই মার্জিত হয়েছে। তবে কি জ্বর কমানোর জন্য পরে মাথায় জল ঢালা হয়েছে? না, না, এভাবে হবে না। মাথার চুল মুছে প্রায় শুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। উদয়মান শয্যার প্রান্তে উপবেশন করে ধীরে মায়াবতীর কপালে হস্ত স্থাপন করল। তখনও উত্তাপ আছে। উদয়মানের হস্ত স্পর্শে মায়াবতী খানিক নড়ে উঠল। ঘাড় সোজা করে চিৎ হয়ে শয়ন করল। চোখ মেলে দেখল উদয়মানকে। একটু হাসবার চেষ্টা করল। হাসিটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাল। বলল- তুমি ভালো আছ তো শিবঠাকুর। একটি হাত কাঁথার ভেতর থেকে বের করে কপালে স্থাপিত উদয়মানের হাতের ওপর রাখল মায়াবতী। আবার হাসবার চেষ্টা করল।

মদনিকা গতরাতের হর-গৌরী দুই সতীর্থ বন্ধুকে লক্ষ্য করে স্বস্তিবোধ করল। বলল- ঠাকুরপো, তুমি ঠাকুরঝিকে কিয়ৎক্ষণ সঙ্গদান করো। আমি ওদিকটা সামলে এখনই পুনরায় ফিরে আসব।

মদনিকা গৃহান্তরে গমন করল। তার বিস্তর কাজ। পরিচারক-পরিচারিকার ওপর নির্ভর করে কি সংসার চলে?

উদয়মান কিয়ৎক্ষণ নয়, দিনমানের জন্য স্থিত হয়ে পড়ল। সর্দিজ্বরের উপশমের লক্ষ্যে সরিষা তেলের প্রলেপ দিতে থাকল হাতের পাতায়, পায়ের পাতায়। ভ্রাতৃবধুকে ডেকে নানাবিধ পথ্যের ব্যবস্থা করার কথা বলল। তুলসী পাতা, শেফালী পাতা ও পান পাতা বাটার রস ঝিনুকে তুলে একটু একটু করে পান করানো; গরম ভাতে সরিষাবাটা মাখিয়ে মুখে তুলে খাওয়ানো; গরম জলে পরিচ্ছন্ন বস্ত্রখণ্ড সিক্ত করে হাত, পা ও মুখমণ্ডল মার্জনা করে দেওয়া- এ সকল রোগহর সেবাকর্ম পরপর করে চলল অব্যাহতভাবে; গভীর নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সঙ্গে। দ্বিপ্রহর গড়িয়ে গেল। মায়াবতী কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে থেকে এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ল। জ্বরের প্রকোপটা কমে এলে উদয়মান স্বস্তিবোধ করল। মদনিকাও।

মদনিকা সস্নেহে উদয়মানকে বলল- এ যাত্রা অনেক হয়েছে, ঠাকুরপো। তুমি আশ্রমে ফিরে যাও; স্নান-টান করে আহারাদির পর কিয়ৎকাল বিশ্রাম গ্রহণ করো। তোমার যা চেহারা হয়েছে, ভয় পাই, কখন না আবার তুমিই অসুস্থ হয়ে শয্যা গ্রহণ করো।

ম্লান হাসল উদয়মান। বলল- এ দেহ বড় কঠিন। ভিক্ষুর ত্যাগ, ইন্দ্রিয়সংযম ও বাসনার বিলোপের মধ্যে কঠোর আত্মনিগ্রহের জন্য সদাই প্রস্তুত। এত অল্পেতে এটা ভেঙ্গে পড়বে না। যাহোক, এখন যাচ্ছি। ফেরার সময়ে দেখি শিমুলের কুঁড়ি, সজিনা গাছের ছাল আর রক্তচন্দন সংগ্রহ করে নিয়ে আসব। সাধারণ সর্দিজ্বর হয়ে থাকলে এসব প্রয়োগ করলে আজ রাত্রির মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পড়বে। কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে অভয়বাণী শোনাল মদনিকাকে- দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার ঠাকুরঝি নিশ্চয়ই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাবে। মানুষের সাধনার শক্তি অপরিসীম; জগতে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই।

স্খলিত উত্তরীয়খানি গায়ে জড়িয়ে ক্লান্ত পদক্ষেপে শুকদেবের শয়নগৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলো উদয়মান। কৃতার্থ বৌঠান শয়নগৃহের দাওয়া পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিল। লক্ষ করল শ্বশ্রূপিতা তার প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন উয়মানের যাত্রাপথে।

অপরাহ্নে মায়াবতীর দেহের উত্তাপ আবার বেড়ে উঠল। চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করল। শয্যায় ছটফট করে এপাশ-ওপাশ করতে থাকল। মাঝে-মধ্যে অস্ফুট অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে থাকল- বৌঠান, গা ব্যথা করছে, ইস! মাথাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।

তার কাতরানো লক্ষ করে সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঈষদোষ্ণ জলে গুড় ও লেবুর রস মিশিয়ে ঝিনুকবাটিতে মুখে তুলে দিচ্ছিল মদনিকা। একজন পরিচারিকা শীতলজলে বস্ত্রখণ্ড ভিজিয়ে কপালে জলপট্টি দিয়ে চলেছে। ভানুপ্রসাদ গৃহে প্রবেশ করে ভগ্নীর এরূপ রোগযন্ত্রণা দেখে বিলক্ষণ ব্যথিত হলো; কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করে অসহায়ের মতো বেরিয়ে গেল। শুকদেব প্রার্থনাগৃহে বিষ্ণুজপে নিমগ্ন। এমন সময় তার প্রার্থনাগৃহ-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল ইসিদাসী, হিঙ্গল মল­, কলিঙ্গা এবং অর্কদাস। ভানুপ্রসাদই প্রথম ওদেরকে লক্ষ করে প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বলল- বাবা! দেখো আশ্রম থেকে অনেকেই এসেছেন। হয়তো মায়ার অসুস্থতার সংবাদ পেয়েছেন। বলে সে গৃহসংসারের নিত্য করণীয় পালনে কোনদিকে অন্তর্হিত হলো।

বিষ্ণুজপে ক্ষান্ত দিয়ে শুকদেব গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আগন্তুকদের অভ্যর্থনা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় উঠে ইসিদাসী শুকদেবকে নমস্কার করলেন। যথাবিহিত শিষ্টবাক্য বিনিময়ের পর ইসিদাসী মায়াবতীর কুশল জানতে চাইলেন। বললেন- মেলাপ্রাঙ্গণে তাকে না পেয়ে আমরা অনুমান করলাম যে মায়া গতরাতের ধকল সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারে নাই। এ জন্য খোঁজখবর নিতে এলাম।

বিষণ্নমুখে শুকদেব বললেন- মায়ার শারীরিক অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয় নি। রাত্রিবেলা আপনারা নিষ্ক্রান্ত হলে বৌমা অতিযত্নে তার গাত্র শুষ্ক করেছে, সরিষা তেলে হাত-পা মার্জনা করেছে এবং সরষেবাটা সহযোগে গরমভাত মুখে তুলে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ক্রমে তার অবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু ভগবানের কী ইচ্ছা তিনিই জানেন। রাত্রি শেষ প্রহর থেকে মায়ার গাত্রে পুনরায় তাপের সঞ্চার হলো। প্রচণ্ড জ্বরে সে অতিশয় কাতর হয়ে পড়ল।

দর্শনার্থীগণ উদ্বিগ্ন হলেন। ইসিদাসী জানতে চাইলেন- এখন কেমন আছে মায়াবতী? আমরা কি তাকে দেখতে যেতে পারি?

শুকদেব ব্যস্ত হয়ে বললেন- অবশ্যই। প্রত্যুষকাল থেকে উদয়মান এবং বৌমায়ের অব্যাহত শুশ্রূষায় তার জ্বরের উপশম হয়েছিল। দ্বিপ্রহরে কিয়ৎকাল নিদ্রা গিয়েছে। অপরাহ্নে পুনরায় দেহে তাপসঞ্চার হয়েছে। মনে হচ্ছে, সাধারণ সর্দিজ্বর নয়, বড় কিছু। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে শুকদেব সকলকে শয়নগৃহের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন।

এগিয়ে গেল সকলে। সদা উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল মায়াবতী প্রচণ্ড জ্বরে কাতর হয়ে পড়েছে শুনে অর্কদাসের যন্ত্রণাবোধ হচ্ছিল। তবে যন্ত্রণাবোধের চেয়ে তীব্র হয়ে উঠল পরাজয়ের গ্লানি। সুযোগ আর আগ্রহ থাকা সত্তে¡ও মায়াবতীর সঙ্গে শিবঠাকুর সেজে নৃত্য-উৎসবে অংশ নিতে সে পারেনি। ক্ষত্রিয় রাজপুরুষ প্রদোষ দেব বর্মণের আদেশ শিরোধার্য করে রাজকর্মচারীর দায়িত্ব পালন করেছে। ধিক তার ক্ষাত্রশক্তির! যদি জীবনে মায়াবতীকেই হারাতে হয়, তা হলে কী হবে এই ক্ষাত্রশক্তি দিয়ে, রাজপুরুষের অহমিকা দিয়ে! নর্তনানন্দের অমৃত আকণ্ঠ পান করেছে উদয়মান! রোগেকাতর শয্যাশায়ী মায়াবতীর শুশ্রূষাতেও উদয়মান! কিছু করতে না পারার অক্ষমতা প্রচণ্ড অন্তর্দাহের সূচনা করল অর্কদাসের অন্তরে।

ইসিদাসী সঙ্গীদেরকে সাবধান করলেন। বললেন- তোমরা কিন্তু পরিচ্ছন্ন না হয়ে কেউ গৃহে প্রবেশ করবে না। ঐ যে দেখো, ভেষজবৃক্ষের পত্রগুচ্ছ নিমজ্জিত পাদোদক গৃহদ্বারে রাখা আছে।

অতঃপর সকলে মায়াবতীকে দেখে তার সঙ্গে কিয়ৎক্ষণ সঙ্গ দিয়ে ও রোগমুক্তির প্রার্থনা করে শুকদেবের গৃহত্যাগ করল।

 

একদিন-দুদিন করে চারদিন অতিক্রান্ত হলো। মায়াবতীর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। বরং ক্রমেই যেন এগিয়ে গেল অবনতির দিকে। প্রতিদিনের প্রথম প্রহরে জ্বরের প্রকোপ কমে আসে, অপরাহ্নে পুনরায় হাড় কাঁপিয়ে ফিরে আসে। শিমুলের কুঁড়ি মাখনে মিশিয়ে কপালে প্রলেপ দিলে প্রচণ্ড মাথাধরা কিছুটা লাঘব হলেও দুদিন পর পুনরায় শুরু হলো। মায়াবতীর কাতর আর্তনাদে বেদনার্ত হয় স্বজনেরা। পিতা, ভ্রাতা, ভ্রাতৃজায়া ও গৃহের শিশু কিংবা পরিচারিকাদের সঙ্গে আশ্রমের সতীর্থরাও উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠিত। ইসিদাসী ও উদয়মান বলতে গেলে স্নান-আহার-নিদ্রা বিস্মৃত হয়ে পড়ে আছে মায়াবতীর শুশ্রূষা নিয়ে। মায়ের আকুলতা ইসিদাসীর। উদয়মান উদ্বিগ্ন। যে যা পরামর্শ দিচ্ছে তার সংস্থানে সে অবিশ্রান্ত। কে যেন পরামর্শ দিল আর উদয়মান ছুটে গেল রাত্রি দ্বিপ্রহরে নিশিন্দাবৃক্ষের শেকড় তুলে আনতে। রোগক্রান্ত নারীর কোমরে ধারণ করলে নাকি তিন দিনে রোগের উপশম হয়। কিন্তু হলো না। ওঝা-বৈদ্য দুয়েকজন যারা ছিলেন, নানা ব্যবস্থা দিয়েছেন। সজিনার ছালবাটা, শিশির জলে রক্তচন্দন ঘষে কপালে চোখে-মুখে প্রলেপ লাগানো, গুড়ের জলে কালজিরা মিশিয়ে দুবেলা সেবন, ঈষদোষ্ণ জলে পরিচ্ছন্ন বস্ত্রখণ্ড ভিজিয়ে সমস্ত দেহ মার্জনা, মাথায় ঠাণ্ডা জলের ধারায় দেহ শীতল করার চেষ্টা; সবকিছুই যেন বিফল হতে চলল। তবে কি মায়াবতীর জীবন বিপন্ন?

মায়াবতীর দেহ কৃশ, চোখ ঘোলাটে এবং কোটরাগত। মাঝে-মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে প্রলাপ বকে। নাড়ি দুর্বল ও তাল দ্রুত। শুকদেবের অনুমতি নিয়ে বৈকালমারী পাহাড় অঞ্চলের তান্ত্রিক ওঝা ভোলাভব অম্বষ্ঠকে ধরে আনতে ছুটে গেল উদয়মান ও হিঙ্গল। সব শুনে ভোলাভব কিছু ভেষজ ঔষধসহ হাজির হলেন। মায়াবতীকে গভীর মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুখ কালো করে বললেন- অবস্থা খুবই গুরুতর। হর-গৌরী প্রাণনাথ- মাথার ওপর জগন্নাথ। মায়ের কী ইচ্ছে তিনিই জানেন, আমরা তো নিমিত্ত।

উৎকণ্ঠিত শুকদেব ভোলাভবের হস্ত ধারণ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ক্রন্দনসিক্ত কাতরকণ্ঠে বললেন- অম্বষ্ঠ মহাশয়, যা লাগে আমি সব কিছুই দিতে প্রস্তুত আছি। আমার মা-মরা কন্যাটিকে সুস্থ করে তুলুন।

অম্বষ্ঠ মহাশয় ছিলেন শুকদেবের শেষ ভরসার স্থল। কারণ তারা প্রাচীনতর  জনগোষ্ঠী। মনুর স্মৃতিশাস্ত্রে যে কয়টি আদিম জনগোষ্ঠীর অবশেষ শনাক্ত করা হয়েছে অম্বষ্ঠ গোত্র তার মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীকালে অম্বষ্ঠদেরকে মনু বৈদ্যরূপে অভিহিত করেছেন। মনুর মতানুসারে অম্বষ্ঠ জাতি ব্রাহ্মণ পিতা ও বৈশ্য মাতার মিলনে-জাত সঙ্কর বর্ণ। ভেষজ ও আর্যবেদ চর্চা তাদের জাতধর্ম, কুলবৃত্তি। ইতোমধ্যে বহু জটিল রোগনির্ণয় এবং তার চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে ভোলাভব অম্বষ্ঠ যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। শুকদেব ভোলাভবের হস্ত ধারণ করে উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি মেলে তার মুখপানে তাকিয়েই থাকলেন।

ভোলাভব অভয় দিলেন। বললেন- হ্যাঁ, সবই মায়ের ইচ্ছা। আমি এই দুটো ঔষধ দিয়ে যাচ্ছি। এটা মধু সহযোগে এবং এটি ছাগদুগ্ধ সহযোগে দিনে দুবার করে সেবন করাবেন। তৃতীয় দিন দিবাগত রাতে বৈকালমারী পাহাড়ের জঙ্গলাকীর্ণ উচ্চভূমিতে আমি তান্ত্রিক গুরুদেবের আশ্রমে মা-কালীর মন্দিরে প্রাণভিক্ষা করে রক্তপূজা নিবেদন করব। মধ্যরজনীতে পূজা সমাপ্ত হবে। সে-পূজার প্রসাদ সূর্যোদয়ের পূর্বে রোগাক্রান্তকে সেবন করাতে হবে। মায়ের কৃপায় বোধকরি সুস্থ হয়ে যাবে।

শুকদেব যেন কিঞ্চিৎ আশার আলো প্রত্যক্ষ করলেন। কিন্তু গভীর রজনীতে এমন দুর্গম পথ অতিক্রম করে কে নিয়ে আসবে তান্ত্রিক গুরুর আশ্রম থেকে রক্তপূজার প্রসাদ? উদয়মান এবং হিঙ্গল একবার দিবাভাগে গমন করে ভোলাভবকে ডেকে এনেছেন। পুনরায় কি তারা যাবে? তিনি দুর্ভাবনায় পতিত হলেন।

পরবর্তী দুদিনে মায়াবতীর সাথী, বন্ধুজন, ভক্তজন ও শুভানুধ্যায়ী অনেকেই তাকে দেখতে এল। কেউ কেউ শিবমন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা করল। বিষ্ণুমন্দিরে প্রার্থনায় বসল শিক্ষাআশ্রমের সেবক দীননাথ ও খুল­না। বটেশ্বর আশ্রমের গুরু ভবদেব মহাশয়ও উপস্থিত হলেন। রোগশয্যায় শায়িত অচেতন মায়াবতীর কপালে-মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলেন। অভয় দিয়ে শুকদেবকে বললেন- আপনি তো ভগবানে বিশ্বাস করেন। বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করুন, নিশ্চয় আপনার কন্যা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে অবিলম্বে আপনার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

মন্দিরের সেবক দীননাথ মায়াবতীর মুখের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। চিৎকার করে ঘোষণা করল- আমি দিদিকে কাঁধে তুলে আমাদের বিষ্ণুমন্দিরে নিয়ে যাব। ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় আমার দিদিমণি নিশ্চয় সুস্থ হয়ে উঠবে।

মায়াবতীর এমত অসুস্থতা পুলিন ভট্টের কাছে কার্যসিদ্ধির একটা উপায় হিসাবে বিবেচিত হলো। তিনি তাই সোচ্চার হয়ে উঠলেন। সর্বত্র প্রচার করে বেড়ালেন যে ভণ্ডধার্মিক শুকদেব তার কন্যাকে বিদ্যা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছেন; এটা ঘোর অধর্ম। পঞ্চদশ বর্ষ অতিক্রম করলেও নিজ কন্যাকে বিবাহ দেন নি, সেটা পাপাচার। কপট ব্রহ্মচারী সতীর্থদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশাই কেবল নয়, একজনের সঙ্গে হর-গৌরী সেজে নৃত্য করেছে; দীঘির জলে অবগাহন করে কেলি করেছে। অতীতে বক্তব্য ও আচার-আচরণে পুলিন ভট্টের মতো শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে। তাই ভগবান সমুচিত শাস্তি দিচ্ছেন। তার অসুস্থতা সাধারণ রোগ কেবল নয়, পাপাচারের শাস্তি। সহজে নিরাময় হবার নয়।

বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রী মায়াবতীকে স্নেহ করেন। পুলিন ভট্টের এমত প্রচারণায় তিনি কদাপিও একমত হতে পারেন নি। তৎসত্তে¡ও স্পষ্ট করে পুলিন ভট্টের কথার কোনো প্রতিবাদ করেন নি। বিদ্যাপীঠের কয়েকজন শিক্ষার্থী মায়াবতীকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাদেরকে তিনি সানন্দে অনুমতি প্রদান করেন এবং নিজেও শুকদেবের গৃহে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটা জানতে পেরে পুলিন ভট্ট তাকে বাধা দিয়ে বলেন- আচার্য মাধবশ্রী, আপনি মন্দিরের পুরোহিত। কখনও এই বৃষলী কন্যাকে দর্শনের জন্য ভণ্ডধার্মিক শুকদেবের গৃহে আপনার যাওয়া সঙ্গত নয়। এতে ভক্তকুলের নিকট আপনার পবিত্র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

কিয়ৎকাল নীরবে দ্বিধাগ্রস্ত পণ্ডিত মাধবশ্রীর মুখপানে তাকিয়ে থেকে পুনরায় বললেন- দেখুন, ভগবানের কৃপায় আমরা দুজনেই শ্রাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণপণ্ডিত হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। আমরা প্রবীণ হয়েছি। স্মরণ করার চেষ্টা করুন, দীর্ঘ তিন যুগ পূর্বে আমরা যখন কর্ণসুবর্ণ নগরের উপান্তে পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্রের বিদ্যাপীঠ থেকে স্নাতক হয়ে গৃহস্থ-জীবনে প্রবেশ করছিলাম তখন কী ব্রত গ্রহণ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন গুরুদেব। এতটুকু বলে পুলিন ভট্ট কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন হতভম্ব মাধবশ্রীর মুখপানে। তাকে নীরব দেখে পুনরায় বললেন- এখন সমাজের বড়ই দুঃসময়। পলাশতলী গ্রামে আমাদের চেষ্টায় কয়েকঘর ব্রাহ্মণ বসতি স্থাপন করেছে ঠিকই, কিন্তু যথেষ্ট-সংখ্যক যজমানী পাচ্ছে না। প্রাকৃতজন প্রজাকুল তো সকলেই শিবভক্ত শূদ্র। শাস্ত্রের বিধান মান্য করে কোথায়! এখন সকল স্নাতক মিলে ব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণ সমাজকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার ব্রত অবশ্যই পালন করতে হবে। শুকদেব ভণ্ডধার্মিক, তার কন্যা দুশ্চরিত্রা- একথা প্রমাণ করে বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেবের শাসনকর্ম থেকে তাকে বিতাড়িত করেই আমাদের লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হতে হবে।

বক্তব্য শ্রবণ করে মাধবশ্রীর চক্ষু কপালে উঠল। শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ হয়েও একজন মানুষ কী করে এমন ঘৃণ্য কুটিল ভাবনা ভাবতে পারে, কী করে একজন শিক্ষিত ব্রাহ্মণ এমন শীলবর্জিত হতে পারে তা কল্পনা করতেই পারেন না মাধবশ্রী। তার মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল নিষ্ঠাবান বিষ্ণুভক্ত শুকদেবের নিষ্পাপ চেহারা এবং তার কন্যা সদাহাস্যমণ্ডিত প্রাণচঞ্চল যৌবনদীপ্ত মায়াবতীর মুখমণ্ডল। নিম্নকণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন- সম্ভার বিষ্ণুমন্দিরের প্রধান পুরোহিত আচার্য অহিরুদ্রদেবের দীক্ষা গ্রহণ করে আমরা মানুষকে ভালোবাসার ব্রত গ্রহণ করেছি। বটেশ্বরের গুরু ভবদেব প্রাকৃতজনের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাভক্তি অর্জন করেছেন। শুকদেব এবং তার কন্যা মায়াবতীও মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে। আমরা নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ বলে দাবী করি; কিন্তু ব্রাহ্মণ্য-শীল বর্জন করে, ঘৃণা আর কুটিলতা নির্ভর হয়ে কি ব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণ সমাজব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারব? বলুন, এভাবে কি মানবকুলের ইহজাগতিক কিংবা পারলৌকিক কোনো কল্যাণ হবে?

পুলিন ভট্ট মাধবশ্রীর নিকট থেকে এরূপ প্রশ্ন প্রত্যাশা করেন নি। তার দিকে তাকিয়ে তিনি ঈষৎ হেসে বললেন- আপনার মতো সহজসরল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করলে কি আর ব্রাহ্মণেরা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে?

পুলিন ভট্ট মাধবশ্রীর সঙ্গে আর অধিক বাক্য বিনিময় করলেন না। ইতোমধ্যে গূঢ়পুরুষের মাধ্যমে অতীব প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য তিনি জানতে পেরেছিলেন যেগুলো তার সাথে আলোচনা করার প্রয়োজনবোধ করেছিলেন। এটা তার কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য ছিল যে বটেশ্বর আশ্রমে স্থিত তরুণ বৌদ্ধশ্রমণ উদয়মান বন্দরনগরী কর্ণসুবর্ণের নগরপ্রধান শ্রী অর্চিষ্মান ঘোষের জ্যেষ্ঠপুত্র। অর্চিষ্মান পদস্থ ক্ষত্রিয়। গুপ্তসম্রাট স্বয়ং তাকে কর্ণসুবর্ণের নগরপ্রধান হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ্য-ব্যবস্থার অনুরাগী। পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র তারই নিয়ন্ত্রণাধীন একটি উপ-পরিষদের প্রধান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। হলায়ুধ মিশ্রের উপ-পরিষদের প্রধান কার্য ছিল নগরীতে অবস্থিত মন্দির ও তীর্থস্থানসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং বহিরাগত তীর্থযাত্রীদের দেখাশোনা করা। হলায়ুধ মিশ্র কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে নিবেদিত ছিলেন। সে-কারণে তিনি অজীবিক ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রতি কিছুটা বিদ্বেষ পোষণ করতেন। কর্ণসুবর্ণে বসবাসরত এবং বহিরাগত আগন্তুক সকল অজীবিক কিংবা বৌদ্ধ অর্হন্ত ও শ্রমণদের বিরুদ্ধে তিনি গূঢ়পুরুষ নিযুক্ত রাখতেন এবং তাদের প্রকাশ্য ধর্মানুষ্ঠানে বাধা প্রদান করতেন।

কয়েক বর্ষ পূর্বে নালন্দা থেকে জ্ঞানার্জন সমাপ্ত করে ঢবাকার এক ধনাঢ্য শ্রেষ্ঠীপুত্র শ্রী চন্দ্রশেখর মৈত্রের নেতৃত্বে তিন-চার জন বৌদ্ধশ্রমণ কর্ণসুবর্ণে উপস্থিত হয়। রাজপুরুষদের জন্য নির্ধারিত একটি দণ্ডিকে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য প্রবেশ করার অপরাধে চন্দ্রশেখর মৈত্র এবং তার সঙ্গীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন হলায়ুধ মিশ্রের পুত্র বিপ্রদাস মিশ্র। চন্দ্রশেখর মৈত্র তার প্রতি এরূপ ব্যবহারকে নীতিগর্হিত এবং অন্যায় আখ্যায়িত করলে তাদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। ঘটনাচক্রে দণ্ডিকে সে-সময়ে নগর পরিষদের অশ্বারোহী-বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা উদয়মান উপস্থিত ছিল। উদয়মান বিপ্রদাসের দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বৌদ্ধ শ্রমণদের উদ্ধার করে এবং বিপ্রদাসকে তাৎক্ষণিকভাবে দলবলসহ দণ্ডিক ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। বিপ্রদাস পিতৃপরিচয় দান করে দাবি করে যে, ‘মন্দির ও তীর্থস্থান-রক্ষা নগর উপ-পরিষদ -এর ব্রাহ্মণ সদস্যের পুত্র হিসাবে বহিরাগত ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম বিরোধীদের অসঙ্গত আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার তার আছে। এতে উদয়মান ক্ষিপ্ত হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং বিপ্রদাসকে দণ্ডিক ত্যাগ করতে বাধ্য করে।  

পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র সমগ্র বিষয়টি জানতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কেবল পুত্রের অবমাননাই নয়, তিনি উদয়মানের এই আচরণ বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলে বৌদ্ধদের উদ্ধত আচরণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখলেন। এর একটা বিহিত করার লক্ষ্যে তিনি বিষয়টি নিয়ে নগরপ্রধান অর্চিষ্মান ঘোষ সকাশে উপস্থিত হলেন। তিনি উদয়মানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন না করে বরং এই যুক্তি তুলে ধরেন যে সাম্রাজ্যের রাজপুরুষদের জন্য নির্ধারিত উন্নতমানের দণ্ডিকে কোনো অবস্থাতেই বৌদ্ধ শ্রমণদেরকে আতিথ্য-গ্রহণের সুযোগ প্রদান করা যুক্তিযুক্ত হবে না, বিনিময়ে তারা অর্থমূল্য যতই প্রদান করুক না কেন। আনুষ্ঠানিক সেই আলোচনার মধ্যে অশ্বারোহী বাহিনী-প্রধানের অনুমতি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল উদয়মান। অতিথিগণ বৌদ্ধশ্রমণ এই বিবেচনায় চন্দ্রশেখর মৈত্রদের দণ্ডিক থেকে বহিষ্কার করা অন্যায় এবং বিধান-বিরোধী এই বক্তব্যটি সে খুব দৃঢ়তার সঙ্গে উত্থাপন করেছিল। পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র উদয়মানের বক্তব্যের প্রতিবাদ করলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। হলায়ুধ মিশ্র এক পর্যায়ে মন্তব্য করেন ব্রাহ্মণ পরামর্শকগণকে মান্য করে প্রজাশাসন করা ক্ষত্রিয়কুলের স্বধর্ম। এই কথাটি প্রত্যেক ক্ষত্রিয়ের স্মরণ রাখা কর্তব্য। অতএব বৌদ্ধ শ্রমণদের নগর থেকে বহিষ্কার করা হোক।

উদয়মান ক্রোধে ফেটে পড়ে জবাব দিয়েছিল- পণ্ডিত মহাশয়ের স্মরণ রাখা উচিত যে, যার সামনে আপনি এ সকল ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি আপনার ঊর্ধ্বতন রাজপুরুষ। আপনি সাম্রাজ্যের একজন বেতনভুক কর্মচারী মাত্র। ঊর্ধ্বতন রাজপুরুষকে মান্য করাও আপনার কর্তব্য। আপনার স্বধর্ম!

বিতর্কের এই পর্যায়ে নগর-প্রধান অর্চিষ্মান হস্তক্ষেপ করেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে চন্দ্রশেখর মৈত্রসহ সকল বৌদ্ধ শ্রমণদের নগর থেকে বহিষ্কারের দাবিটি কার্যকর করার নির্দেশ দান করেন।

উদয়মান পিতার এই অন্যায্য-আপস কিছুতেই গ্রহণ করতে পারে নাই। নিজেকে পরাজিত অপমানিত বোধ করে সে। প্রচণ্ড অভিমানে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, অন্যায়ের সঙ্গে আপসের জীবন সে চায় না। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চায়। আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে চাকরি ছাড়বে; এমনকি পিতৃগৃহও ত্যাগ করবে। অতঃপর গৃহে ফেরার পথে অশ্বারোহী বাহিনী-প্রধানের কার্যালয়ে গিয়ে বাহিনী থেকে পদত্যাগ করে অস্ত্র-সজ্জা ছেড়ে দায়িত্বমুক্ত হয়।

অপরাহ্নে গৃহত্যাগ করার পূর্বে পিতা-মাতার পদধূলি গ্রহণ করে সে অভিমান-ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে- মানবজন্মে তোমাদের কোলে এসেছিলাম। সে-কারণে তোমাদেরকে সহস্র নমস্কার জানাচ্ছি। আমি এ গৃহ ত্যাগ করছি; চন্দ্রশেখর মৈত্রের সঙ্গে আমিও প্রব্রজ্যায় নির্গত হচ্ছি। তোমাদেরকে জানিয়ে যাই- ব্রাহ্মণদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করব এবং এই সাম্রাজ্যে মানুষের কল্যাণে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় সর্বস্বত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকব। এই আমার ক্ষাত্রকুলের ধর্ম। আমাকে ক্ষমা কোরো, আমাকে আশীর্বাদ কোরো।

হতবুদ্ধি অর্চিষ্মান নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলেন, মাতা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা অংশুমান জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল- দাদা আমাদেরকে ফেলে চলে যেও না।

এরপর বেশ কয়েকবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে এবং পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র নগর উপ-পরিষদের দায়ভার বুঝিয়ে দিয়েছেন তার সুযোগ্যপুত্র পণ্ডিত বিপ্রদাস মিশ্রের হাতে। আর ওদিকে কনিষ্ঠ ভ্রাতা অংশুমান ঘোষ কর্ণসুবর্ণ নগরের অশ্বারোহী বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তারূপে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শোনা যায় যে সে নাকি তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে খুঁজে বের করে আনবে বলে শোকাতুরা মায়ের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। গূঢ়পুরুষ এসকল তথ্যও তাকে জ্ঞাত করেছে। কিন্তু মাধবশ্রীর মনোভাব লক্ষ করে এসকল গূঢ়তথ্য তাকে জানানো নিতান্তই অসঙ্গত হবে এমন বিবেচনা করে পুলিন ভট্ট দ্রুতপদে নিষ্ক্রান্ত হলেন। কারো সঙ্গে কোনো পরামর্শ নয়, বরং তিনি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় নির্ধারণ করে ফেললেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য মনে মনে যথোপযুক্ত উগ্রপুরুষ সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

 

 

 

ষোলো.

 

ভোলাভব অম্বষ্ঠের ঔষধ সেবনে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হলো মায়াবতীর। আচ্ছন্ন অচেতন ভাবটা কেটে গেল। জ্বর তেমন না কমলেও হজমশক্তি কিছুটা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ায় খাদ্যগ্রহণের রুচিও বৃদ্ধি পেল। জীবন বিপন্নতার ভীতি তিরোহিত হলো সকলের মন থেকে। মদনিকা শিয়রের পার্শ্বে বসে কৌতুক করে মন্তব্য করল- ঠাকুরঝির ভয় নেই। তোমার শিবঠাকুর তো সাগরের বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হতে পারে, আর তোমার রোগ হরণ করতে পারবে না? তুমি সেরে উঠবে ঠাকুরঝি!

তৃতীয় দিবসে শুকদেবের দুশ্চিন্তার আরো অবসান ঘটল। গভীর রজনীতে বৈকালমারী পাহাড়ের জঙ্গলে গিয়ে রক্তপূজার প্রসাদ আনার প্রস্তুতি গ্রহণ করল উদয়মান। তার সঙ্গে গমন করবে হিঙ্গল মল্ল। প্রসাদ নিয়ে গভীর রাতেই তারা প্রত্যাবর্তন করবে। সূর্যোদয়ের পূর্বেই মায়াবতীকে প্রসাদ সেবন করিয়ে তার জীবনরক্ষা করবে।

প্রসাদ আনতে অর্কদাসও যেতে মনস্থির করেছিল। কিন্তু প্রদোষ দেব সম্মতি প্রদান করেন নি- শুকদেবের অনূঢ়া কন্যার জন্য বীথি-প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্তব্যরত ব্যক্তির ততোধিক করণীয় আছে বলে তিনি বোধ করেন নি। বিভিন্ন ব্যক্তি বিষয়টাকে বক্রদৃষ্টিতে দেখতে পারে বলেও তার ধারণা হলো।

কিন্তু বিষয়টাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নাই অর্কদাস। বীথি-প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক শুকদেব মহোদয়। কর্বট গোত্রের তিনি বিশিষ্ট জনও বটে। তার একমাত্র কন্যার প্রাণরক্ষা করার প্রচেষ্টায় যুক্ত হওয়া কোন বিবেচনায় বাড়াবাড়ি হবে? বরং তার বিবেচনায় এটা বীথি-প্রশাসনেরই অন্যতম কর্তব্য। মায়াবতী কেবল অনূঢ়াই নয়, অনন্য নারী। তেমন আর কে আছে কর্বট গোত্রে, কিংবা পলাশতলী-বীথির সমগ্র জনপদে? উচ্ছল, চঞ্চল, প্রাণবন্ত; সদাহাস্যোজ্জ্বল, অপরূপ কান্তিময়; অস্তাচলগামী সূর্যের উজ্জ্বল আভা তার গাত্রবর্ণে। প্রতিক্ষণ তার মনে হচ্ছিল প্রদোষ দেবের নির্দেশ অবিবেচনা-প্রসূত। রোগে কাতর আপনজনের জন্য, হৃদয়েশ্বরীর জন্য যদি এটুকু কর্মেও সে এগিয়ে যেতে না পারে তাহলে কোন মূল্য আছে রাজপুরুষোচিত মর্যাদা ও ক্ষমতার? অন্তর তার অস্থির ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রদোষ দেবের নির্দেশের বিপরীতে সে কোনো বক্তব্যই উত্থাপন করতে পারে নি। সেজন্য তার গ্লানিবোধের সীমা নেই। মর্মপীড়ায় সে বিষণ্ন হয়ে একাকী ঘুরে বেড়ায়।

ইসিদাসী উদয়মান আর হিঙ্গলকে বললেন- যাত্রারম্ভের পূর্বে চলো গুরুদেবের আশীর্বাদ নেবে। এতটা পথ অতিক্রম করবে, আবার রাতেই ফিরতে হবে।

ভবদেব আশীর্বাদ করলেন। উদয়মানের হাতে পুরাতন বৃক্ষশাখার একখানি যষ্ঠি তুলে দিয়ে বললেন- অন্ধকার পথ, বিপদসঙ্কুলও হতে পারে। হাতে রাখা ভালো।

অতঃপর যথাসময়ে উদয়মান এবং হিঙ্গল রওয়ানা দিল। জঙ্গলাকীর্ণ পথ পেরিয়ে কদম্বঘাট গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে পূর্বসায়রের প্রশস্ত খাঁড়ি। সেখানে একটা গ্রাম্য হাট। হাটের অদূরে পশ্চিম পার্শ্বে উৎরাই শুরু। কিছুদূর গেলে বৌদ্ধমন্দির। মন্দিরের পর বৈকালমারী পাহাড়ের সানুদেশ। পাহাড়ের শেষ উচ্চতায় গভীর বনে আচ্ছাদিত তান্ত্রিক পূজারী গুরুদেবের আখড়া। আখড়ার-পশ্চাৎ চত্বরের অপর পার্শ্বেই কালীমায়ের মন্দির। এপাশে কয়েকটা কুঁড়েঘর। হিঙ্গল মল­ই পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। গুনগুনিয়ে গান করতে করতে সে পথ চলল। উদয়মানের হাত থেকে যষ্ঠিখানা নিয়ে সেটার মাথায় তাদের কাপড়ের পুটলি বেঁধে কাঁধে তুলে বলল- দেখো উদয়, এটা কাঁধে থাকলে হাঁটার তাল পাওয়া যাবে। থাকুক আমার হাতেই।

 

 

ভোলাভব অম্বষ্ঠ একদিন আগেই তার তান্ত্রিক গুরুর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। রক্তপূজার উপকরণাদি যোগাড়যন্ত্র করতে হয়েছে। ভোলাভব বৃক্ষপত্র আচ্ছাদিত নিচু একটা গৃহ থেকে বের হয়ে উদয়মানকে বসতে দিলেন দাওয়ার ওপর দুটো মাদুর পেতে। শালপাতার ঠোঙ্গায় মোড়ানো চিঁড়া, নাড়ূ, মুড়ির মোওয়া এবং ঘটি ভর্তি জল রেখে দিয়ে বললেন- অনেক দূর হেঁটে এসেছ। এগুলো খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করো। সাঁঝ বাতির সময় ভক্তরা মশাল জ্বালিয়ে দেবে। তান্ত্রিক পূজার কৃত্য শুরু হবে। পশ্চাতের প্রশস্ত চত্বরের শেষপ্রান্তে কালীমন্দিরের সম্মুখ থেকে রাত্রি দ্বিপ্রহরকালে তোমরা পূজার প্রসাদ নিয়ে যাত্রা করতে পারবে। এখন তোমাদের ওদিক পানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গুরুদেব বাইরের লোকের পূজায় অংশগ্রহণ পছন্দ করেন না। তোমাদের সেবনের প্রসাদ এবং মায়াবতীর প্রসাদ পুঁটলি বেঁধে আমি তোমাদেরকে এনে দেব।

চিঁড়া, নাড়ূ ও মুড়ির মোওয়া আগ্রহের সঙ্গে ভক্ষণ করল দুজনে। উদয়মান আকণ্ঠ জলপান করে খুঁটিতে হেলান দিয়ে হাত ছড়িয়ে চক্ষু মুদে পড়ে থাকল। হিঙ্গল মল­ এদিক-সেদিক পায়চারী করে দেখতে লাগল।

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে কুঁড়ের সম্মুখে দু পাশে দুটো মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেল স্বল্পবসনা দুই রমণী। উদয়মানকে চক্ষু মুদে পড়ে থাকতে দেখে হিঙ্গলের দিকে তাকিয়ে চোখটিপে হাসল দুজনেই। কোনো কথা বলল না।

পশ্চাতে আখড়া-চত্বরে ব্যস্তসমস্ত কর্মকোলাহল চলতে থাকল সন্ধ্যাকাল থেকেই। রাত্রি প্রথম প্রহর অতিক্রম করলে অকস্মাৎ সমবেত কণ্ঠে উলুধ্বনি শোনা গেল। সঙ্গে ঢোলক, বাদ্য, করতাল ও মাদলের শব্দ শুনে জেগে উঠল উদয়মান। বোঝা গেল পূজা শুরু হয়েছে, নৃত্য চলছে। হয়তো পূজারই অঙ্গ বিশেষ। এক সময়ে সমস্বরে চিৎকার শুনে উৎকণ্ঠিত হলো উদয়মান ও হিঙ্গল- ‘বোম ভোলানাথ, জয় মা-কালীর জয়’! হয়তো পশু বলি হচ্ছে। পেছনে যাওয়ার অনুমতি নেই।

কিছুক্ষণ পরে ভোলাভব এসে হাজির হলেন। পেছনে সেই দুজন স্বল্পবসনা রমণী। হাতে শালপাতায় প্রসাদ এবং জলের ঘটি। মাদুরের ওপর রেখে নীরবে তারা অন্তর্হিত হলো। যাওয়ার পূর্বে আগের মতোই চোখটিপে হাসল। ভোলাভব বললেন- ওদিকে বাদাড়-ঝোপে প্রাকৃতিক কাজ সারতে পারো। ধামাতে জলের ব্যবস্থা আছে, পরিচ্ছন্ন হয়ে নিতে পারো। এরপর প্রসাদ খেয়ে নাও। আমি রোগীর জন্য প্রসাদের পুঁটুলি নিয়ে এখনই আসছি।

ভোলাভবের আপ্যায়নে মুগ্ধ হলো ওরা দুজন। খাওয়া সেরে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলে ভোলাভব বললেন- সাবধানে পথ চলবে। পথে অনেক সময় দুর্বৃত্তরা আক্রমণ করে থাকে। অবশ্য তোমরা তো আর বণিক নও, তোমাদের কাছে লুটে নেবার আছেই বা কী! তবুও সাবধানে যেও। জয় মা-কালীর জয়!

প্রসাদ খেয়ে দেহমনে চাঙ্গাবোধ করল উদয়মান। প্রসাদের খাদ্যস্বাদ যেরূপই হোক পরিমাণে যথেষ্ট ছিল। ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়েছে। রক্তপূজার প্রসাদের পুঁটলিটা হিঙ্গল মলে-র হাতে দিয়ে বলল- এটা রক্ষা করা তোমার দায়িত্ব। তোমাকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। দেখি, গুরুদেবের আশীর্বাদপূত যষ্ঠিখানা আমার হাতে দাও।

অতঃপর মাভৈঃ মাভৈঃ রবে রাতের অন্ধকারে ঘন বনজঙ্গলের পথ ধরে যাত্রা করল দুজনে। আকাশ পরিচ্ছন্ন। দিগন্তের আবছা আলোয় জঙ্গলাকীর্ণ পায়ে হাঁটার পথ মাঝে-মধ্যে দৃশ্যমান হচ্ছিল। সম্মুখে হিঙ্গল চলছিল পথ দেখিয়ে। পেছনে উদয়মান। দুজনেই দ্রুত তালে হাঁটছিল। সূর্যোদয়ের পূর্বে অবশ্যই রোগাক্রান্তকে পূজার প্রসাদ সেবন করাতে হবে। উত্তেজনা, প্রত্যাশা ও আনন্দ উদয়মানকে অবিরাম স্পর্শ করে যাচ্ছিল- অচিরেই মায়াবতী সুস্থ হয়ে উঠবে। তার যৌবনদীপ্ত দেহখানি আবার দুলে দুলে উঠবে প্রাণোচ্ছল হাসিতে।

হঠাৎ একটা উৎরাই অতিক্রম করতে গিয়ে পা ফসকালো হিঙ্গলের। সঙ্গে সঙ্গে সে চিৎকার করে উঠল- সাবধান, পেছনে লক্ষ করো উদয়মান!

চোক্ষের পলকে ঝুঁকে পড়ে ডান দিকে সরে গেল উদয়মান। হিঙ্গল দেখতে পেল উদয়ের দিকে ভীষণ আকৃতির ভুঁড়িষ্মান এক ব্যক্তি উদ্যত খড়গ হস্তে ধাবমান; তার পশ্চাতে আরো দুজন। মুহূর্ত মাত্র। মাভৈঃ রবে হুংকার দিল উদয়মান। অতপর কী ঘটল বুঝতে পারল না হিঙ্গল। তবে অন্ধকারে যেটুকু স্পষ্ট হলো তাতে দেখতে পেল ভীষণ-দর্শন দুর্বৃত্তটি উবু হয়ে উল্টে পড়ছে আর তার খড়গটা উদয়মানের হাতে। অতঃপর যেন মুহূর্তও নয়। প্রচণ্ড আঘাতে দুর্বৃত্তের মস্তক ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভূমিতে ছিটকে পড়ল।

 

 

 

মাভৈঃ বলে উদয়মান পুনরায় হুংকার ছাড়ল। সঙ্গী দুজন পলায়ন করতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের অস্ত্র হস্তচ্যূত হলো। অতঃপর ঊর্ধ্বশ্বাসে অন্ধকারে অন্তর্হিত হলো।

পশ্চাৎধাবনরত উদয়মান একটু অগ্রসর হয়ে হঠাৎ থেমে পথের মধ্যখানে দণ্ডায়মান হয়ে দীর্ঘ একটা দম নিল। অতঃপর চিৎকার করে বলল- বন্য শৃগালের দল, পালাচ্ছিস কেন? সৎকারের জন্য সঙ্গীর মৃতদেহটা অন্তত তুলে নিয়ে যা।

রক্তমাখা খড়গখানা মস্তক-বিচ্ছিন্ন ধড়ের পার্শ্বে রেখে ভক্তি সহকারে গুরুদেবের আশীর্বাদপূত যষ্ঠিখানা তুলে নিয়ে উদয়মান বলল- বন্ধু মোর হিঙ্গল মল­! এসো মাভৈঃ বলে পুনরায় যাত্রা শুরু করি।

অতঃপর অতি সতর্ক পদক্ষেপে দুই বন্ধু মিলে বৈকালমারী পাহাড়ের উৎরাইয়ের বনপথে দ্রুতপদে এগিয়ে চলল কদম্বঘাট গ্রামের দিকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা ঘন বনজঙ্গল অতিক্রম করে যেন খানিকটা ধাতস্থ হলো।

হিঙ্গল মল­ বামহস্তে পূজার প্রসাদের পুঁটলিটা নিজবক্ষে চেপে ধরে ডানহস্ত প্রসারিত করে আবৃত্তি করে উঠল-

           ক্ষাত্রকুলে জন্ম তাহার উচ্চে অধিষ্ঠান

           সংহারিতে কপটাচারী ব্রাহ্মণ যত

           খড়গ হস্তে যত্রতত্র

           হুংকারিয়া লড়িবে দিনমান।

সেই বীরপ্রবর আর কেহ নয়, বন্ধু মোর উদয়মান।

 

 

 

 

 

সতেরো.

সেদিন প্রত্যূষকাল থেকেই মেঘলা দিবস। সূর্যের মুখ প্রত্যক্ষ করা যায় নি। দ্বিপ্রহরে আকস্মাৎ ঝঞ্ঝা-বায়ুতে প্রকৃতি দুরন্ত হয়ে উঠল। সঙ্গে বৃষ্টিপাত। অপরাহ্নে বৃষ্টি থেমে গিয়ে খানিকক্ষণ বাতাস বইল। অতঃপর স্বল্পকালের মধ্যে আকাশ সূচিস্নাত-পরিচ্ছন্ন হয়ে দেখা দিল। সূর্যের আলো হিরন্ময় বর্ণ ধারণ করে চারদিক ছড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টিস্নাত বৃক্ষশাখা, পত্রগুচ্ছ ও দুর্বাদল সোনালি সূর্যকিরণ গায়ে মেখে অপূর্ব রূপ ধারণ করল। শুকদেবের প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় মাদুর পেতে অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিল মায়াবতী। চারদিকে তাকিয়ে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ দেখে কেমন যেন আজ আনন্দে ভরে উঠল তার হৃদয়। মাথা বাড়িয়ে শুকদেবকে ডাকল- বাবা, এদিকে এসো! দেখো, কী সুন্দর রূপ ধরেছে আমাদের বাড়িঘর, গাছগাছালি!

তান্ত্রিক গুরুদেবের প্রসাদ সেবন করেছে মায়াবতী দিন দশেক পূর্বে। ক্রমে সে সুস্থ হয়ে উঠছে। রোগের কোনো আর উপসর্গ নেই- শরীর দুর্বল, এই যা। আহার-নিদ্রা-বিশ্রাম নিয়মিত করতে পারছে। তিন দিন পূর্বে ইসিদাসী আর মদনিকা মিলে তাকে পুকুরে স্নান করিয়ে নিয়ে এসেছে। বিশেষ পথ্য হিসাবে ছাগদুগ্ধ এবং মধু এখনও নিয়মিত তাকে দেওয়া হচ্ছে। মদনিকা আজ তাকে রসাল আম্রফলের সঙ্গে দুধভাত খাইয়েছে। শুকদেবের পরিবারে স্বস্তি ফিরে এসেছে, স্বস্তিবোধ করছে মায়াবতীর সকল ঘনিষ্টজনেরা, ভক্তজনেরাও। শুকদেব বিশেষ আনন্দিত এই কারণে যে পুলিন ভট্টের অভিশাপ ও ঘোষণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মায়াবতীর অসুস্থতা তাদের অধর্ম ও পাপাচারের ফল নয়। মায়াবতী শত্র“র মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করে সুস্থ হয়ে উঠছে। সে কলকলিয়ে কথা বলছে, হাসছে। আগের মতো শুকদেবকে শাসনও করছে। 

কন্যার উচ্ছ¡সিত আহ্বানে শুকদেব প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় বের হয়ে এলেন। তৎক্ষণাৎ মায়াবতী লক্ষ করল গৃহপ্রাঙ্গণে একযোগে প্রবেশ করছে উদয়মান, হিঙ্গল কলিঙ্গা ও ইসিদাসী। শুকদেব অভ্যাগতদের স্বাগত জানালেন। গৃহাভ্যন্তর লক্ষ করে হেঁকে উঠলেন- কে আছো তোমরা, অতিথি এসেছেন। প্রক্ষালনের জল দাও, আসন পেতে দাও।

ইসিদাসী নমস্কার করে কৌতুকের সঙ্গে শুকদেবকে বললেন- হ্যাঁ, আজ আমরা সত্যই বিশেষ অতিথি। আমরা একটা শুভবার্তা নিয়ে এসেছি। সুতরাং বিশেষ সমাদরের দাবিদার বটে।

শুকদেব উৎসুক হয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন- সে বার্তাটি কী! বার্তাটি যখন শুভ, অবিলম্বে ব্যক্ত করাই তো বাঞ্ছনীয়।

ততক্ষণে দুজন পরিচারিকার হাতে জলের ঘটি এবং নিজে মাদুর নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলো মদনিকা। মায়াবতী উৎফুল­ হয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মন্তব্য করল- বাবা সঠিক কথা বলেছেন; বার্তাটি যেহেতু শুভ, আর বিলম্ব না করে ব্যক্ত করা হোক। অতঃপর ইসিদাসীকে লক্ষ্য করে বলল- জ্যেষ্ঠাভগ্নী যেহেতু দলের মধ্যে গুরুজন, আপনিই শুরু করেন।

ইসিদাসী মুখটিপে হাসলেন। বললেন- আমরা সকলে অর্কদাসের মাতা এবং বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণের পক্ষ থেকে শুকদেব মহাশয়ের একমাত্র কন্যা মায়াবতীর বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।

বার্তাটি অপ্রত্যাশিত, তবে নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য এবং আনন্দের। শুকদেব ক্ষণকাল বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রইলেন। মায়াবতী কথঞ্চিত আরক্ত হলেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে হালকা কণ্ঠে অনুযোগ করল- সে কী! কয়রা নদীর ওপার থেকে এহেন প্রস্তাব যে বড়? বটেশ্বর এলাকার কেউ বুঝি প্রস্তাব দিতে সাহস করলেন না!

-কে আবার সাহস করবে? রক্ষীদলের প্রধান বলে কথা, কে যাবে টক্কর দিতে? কলিঙ্গা কৌতুকচ্ছলে বলল।

ইসিদাসী ধমক দিলেন- কথাটাকে তরল করে দিও না। গুরুদেবের নির্দেশে আমরা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। তোমরা নিশ্চয় অবগত আছ যে, প্রস্তাবটি বীথি-সামন্ত সমীপে উত্থাপন করেছেন অর্কদাসের মাতা। সামন্ত মহোদয় প্রস্তাবটি গ্রহণ করে বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত মহাশয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। সকলে এ প্রস্তাব আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং গুরুদেবকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি শুকদেব মহাশয়ের নিকট উত্থাপন করার অনুরোধ করেছেন। গুরুদেব সে-দায়িত্ব দিয়ে আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। এটাকে তোমরা তরল বাক্যালাপের বিষয়বস্তু করে তুলো না যেন।

এতক্ষণ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে নীরব ছিলেন শুকদেব। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি এবার মুখ খুললেন। বললেন- সমমর্যাদাসম্পন্ন সৎপাত্রে কন্যাদান করার প্রস্তাব কোন্ দায়িত্ববান পিতা উপেক্ষা করতে পারে? সত্যি, এ বার্তা শুভ এবং আনন্দের। তবে আমার কন্যাটি যেহেতু প্রাপ্তবয়স্কা, তার মতামত না জেনে তো আমার পক্ষে কিছুই বলা সঙ্গত নয়। মায়াবতীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে আপনারা বরং তার মতামত জেনে নিন।

ইসিদাসী হাসলেন, বললেন- যাক, আপনার ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেল। মায়ার সঙ্গে আমরা কথা বলে নেব।

মায়াবতী যাতে অসঙ্কোচে মতপ্রকাশ করতে পারে সে-সুযোগ করে দেওয়ার জন্য শুকদেব উঠে গৃহান্তরে গমন করলেন। যাওয়ার পূর্বে মদনিকাকে উদ্দেশ্য করে বলে গেলেন- আজকের দিনে ওঁরা বিশেষ অতিথি। ওঁদের আপ্যায়নের যেন ত্র“টি না হয়।

মদনিকা বলল- ওসব নিয়ে ভাববেন না। আমি সব ব্যবস্থা করব।

শুকদেব অদৃশ্য হওয়ামাত্র কলিঙ্গা উঠে গিয়ে মায়াবতীর মাদুরের একপাশে ঘনিষ্ট হয়ে বসল। মন্তব্য করল- লজ্জ্বা-ঘৃণা-ভয়, এই তিন থাকিতে নয়। মায়াবতীর থুতনিতে একটু টোকা দিয়ে সহাস্যে বলল- বিলম্ব না করে মতামতখানি জানান দাও। মনের মানুষের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হলেই কেবল নারীর সুখ। ঠিক কি না?

মদনিকা প্রতিবাদ করে উঠল- ঠাকুরঝি তো কবেই তার মতামত জানান দিয়ে দিয়েছে। কয়রা নদীর এপার থেকে কেউ কোনো প্রস্তাব নিয়ে এল না বলে ক্ষোভ প্রকাশ কি সে করে নাই? আবার কেন?

ইসিদাসী এবার গম্ভীর হলেন। জবাবে বললেন- বিবাহ নিঃসন্দেহে একটি সমাজ-স্বীকৃত ব্যবস্থা। বর্ণবিভাজিত আমাদের সমাজে বহুধরনের বিবাহ-ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। বৈশ্য ও শূদ্রের জন্য যে বিবাহ-ব্যবস্থাটি আছে সেটা হলো ‘আসুর’ বিবাহ, অর্থাৎ স্থিরকৃত পণদান করে কন্যা ক্রয় করা। এ ক্ষেত্রে বিবাহ-ইচ্ছুক পাত্র মনস্থির করেছে, মাতা ও অন্যান্য গুরুজনের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। গুরুজনেরা সম্মত হলে স্থিরকৃত পণদান করে পাত্র কন্যাকে বিবাহ করে ঘরে তুলে নিয়ে সংসার পাতবে। কিয়ৎক্ষণ থেমে তিনি পুনরায় বললেন- কয়রা নদীর ওপার থেকে প্রস্তাব এসেছে, এপারে বটেশ্বর থেকে কেউ সাহস করে প্রস্তাব দিল না বলে মায়াবতী যে মন্তব্য করেছে সেটা নেহাৎ হালকা কথা, রসিকতা বলতে পারো। মোটেই ক্ষোভের কথা নয়।

ইসিদাসীর গম্ভীর আলাপও পরিবেশ গম্ভীর করতে একেবারে ব্যর্থ হলো। হিঙ্গল বলল- হ্যাঁ, এপার থেকে কে আর প্রস্তাব দেবে? এক তো আমি হিঙ্গল মল­। আমি বৈশ্য নই, শূদ্র কি না তাও সঠিক জ্ঞাত নই। আমার বিবাহ করতে হবে গান্ধর্ব মতে। নারী-পুরুষ পরস্পরের সম্মতিতে বিবাহ। এতটুকু বলে চোখ টিপে কৌতুকপূর্ণ হাসিতে মুখ ব্যাদন করল। শুভ্র দন্তরাজি প্রকটিত করে বলল- মায়াবতী তার কর্বটীয় গাত্রবর্ণের অহমিকা পরিত্যাগ করে আমার মতো ঘনকৃষ্ণ বর্ণের মানুষটিকে যদি গ্রহণ করতে সম্মত থাকে তাহলে কলিঙ্গার কী গতি হবে সে-দুর্ভাবনায় আমি মরে যাই। সুতরাং বাকি রইল ক্ষাত্রকুলজাত নবীন পুরুষ উদয়মান। কী বলো হে বন্ধু উদয়মান?

মদনিকা এগিয়ে গিয়ে হিঙ্গলের কথার প্রতিবাদ করল। উদয়মান আবার কী বলবে? সকল কথা কি মুখ ফুটে উচ্চারণ করে বলতে হয়? সেই যে চড়ক পূজার দিন থেকে গত মাস কয়েক ধরে শিবঠাকুর হয়ে সে যে ঠাকুরঝির সেবা করছে আহার-নিদ্রা-বিশ্রাম ত্যাগ করে, নিজের জীবন বিপন্ন করে- তাতে কি কিছু বলা হয় নি?

এবার মায়াবতী গম্ভীর হয়ে বলল- বিলক্ষণ তার বিশেষ অর্থ আছে। কিন্তু আমাকে ভালোবেসে সে বিবাহ করতে প্রস্তুত কি না সেটা স্পষ্ট নয়।

মদনিকা উদয়মানকে খোঁচা দিয়ে বলল- এবার তুমি কথা বলো ঠাকুরপো। আমি তোমাদের আপ্যায়নের আয়োজন করি।

সকলে উদয়মানের মুখপানে তাকিয়ে থাকল উন্মুখ প্রতীক্ষায়। পরিবেশ গুরুগম্ভীর হয়ে উঠল। বেশ কিছুকাল অসহ্য নীরবতায় কেটে গেল। মায়াবতীই নীরবতা ভঙ্গ করল। বলল- কী, কোনো কথা বলছ না কেন? আমাকে বুঝি তুমি ভালোবাসো না?

উদয়মান কোনোরূপ বিব্রত না হয়ে সহজ কণ্ঠে বলল- নিঃসন্দেহে তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে যে কত গভীরভাবে ভালোবাসি, গত কয়েকমাস তোমার সেবাযত্ন করতে গিয়ে মর্মে উপলব্ধি করেছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারব কি না জানি না। এমনকি, আদৌ আমি গৃহী হতে পারব কি না তাও জানি না। আমি তো ব্রত নিয়েছি। আমি তো বৌদ্ধ শ্রমণ। বৌদ্ধ ভিক্ষু!

একথা শ্রবণ করে মায়াবতী বিষণ্ন হয়ে পড়ল। বলল- তোমার জন্য আমার কষ্ট হয় উদয়মান। তোমার মতো হৃদয়বান একজন পুরুষ নির্বাণ লাভ করে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছো জেনে আমার অন্তর পীড়িত হয়। তুমি তো মহাসাঙ্গিক বৌদ্ধ মতধারা অনুসরণ করতে পারো- যারা পরবর্তীকালে মহাযান পন্থা অর্থাৎ মহৎবাহন বা পথ গ্রহণ করেন। শুধু নিজের জন্য নয়, তারা সকল জগৎ-সংসারের জন্য, সকল জীবের নির্বাণলাভের প্রয়াসী ছিলেন। তারা মনে করে গৃহী হয়েই এ কাজ করা সম্ভব।

কিয়ৎক্ষণ থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মায়াবতী। পরে বলল- দেখো উদয়মান, তুমি গৃহত্যাগের প্রাক্কালে পিতামাতার সম্মুখে সদম্ভে ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালনের যে ঘোষণা দিয়েছ সে-ব্রত পালন করতে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়েই তোমাকে লড়াই করে যেতে হবে। অর্কদাস, হিঙ্গল, এমনকি জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসী, আমরা সকলে সে-লড়াইয়ে নিরত আছি। অর্কদাস আমাকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়ে যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে তার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

মায়াবতীর এরূপ মন্তব্যের পর কিয়ৎকাল অখণ্ড নীরবতায় কেটে গেল। মন্তব্যটি সম্মতিসূচক কি না সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইসিদাসী একেই সম্মতি বলে গ্রহণ করলেন। বিগত বৎসরাধিককাল ধরে দুজনের সঙ্গেই মায়াবতীকে সমভাবে অসঙ্কোচে মেলামেশা করতে দেখেছেন তিনি। লক্ষ্য করেছেন যে উভয়েই তার ঘনিষ্ঠ সতীর্থ এবং নির্ভরযোগ্য বন্ধু। কিন্তু একটা বিষয়ে তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন। সেটা এই যে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব অতিক্রম করে প্রণয় ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে সেটা অর্কদাসের সঙ্গেই কল্যাণকর হবে। উদয়মান যতই উত্তম চরিত্রের যুবাপুরুষ হোক, যতই আন্তরিক হোক, সে কি পশ্চিমমুল­ুকে নিজ কুলে গিয়ে মায়াবতীকে নিয়ে গৃহস্থ হতে পারবে? পারবে থাকতে সকলের সঙ্গে মিলে স্বচ্ছন্দে, স্বস্তিতে? তাছাড়া উদয়মান আদৌ গৃহস্থ হবে কি না তাই নিয়ে তো অদ্যাবধিও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে? অপরপক্ষে অর্কদাসের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলে মায়াবতী বসবাস করবে নিজের পরিচিত জনগোষ্ঠীর মাঝে। থাকবে ইসিদাসীরও চোখের সামনে। সবচেয়ে বড় কথা যুগল-জীবনেও ওরা গুরু ভবদেবের সমাজ-বদলের সংগ্রামে যথাযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। সুতরাং আর কালবিলম্ব না করে তিনি ঘোষণা দিলেন- হ্যাঁ, আমরা শুকদেব মহাশয় এবং তার কন্যার মতামত জানতে পারলাম। মতামত স্পষ্ট হলো।

প্রতিবাদ না করলেও জ্যেষ্ঠাভগ্নীর সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পারল না উদয়মান। মায়াবতী কেবল অর্কদাসের সাহসের প্রশংসা করেছে, বিবাহ-প্রস্তাবে সম্মতিদান করে নি। কিন্তু কোন কারণে তার মতামতটুকু অস্পষ্ট রেখে দিল মায়াবতী? তা কি উদয়মানকে এখনও বিকল্প প্রস্তাবদানের ইঙ্গিত দিচ্ছে? না, না, জ্যেষ্ঠাভগ্নীর ঘোষণাকে মেনে নেওয়া ঠিক নয়। সে সরবে বলতে চাইল যে মায়াবতীর মতামত স্পষ্ট নয়, দৃঢ় নয়, চূড়ান্তও নয়। কিন্তু কণ্ঠে তার কোনো শব্দই উচ্চারিত হলো না। সে মায়াবতীকে ভালোবাসে, গভীরভাবে, প্রাণের চেয়েও। কিন্তু বিবাহ? অস্থির হয়ে উঠল তার অন্তরস্থল। ভিক্ষুর ত্যাগের মাধ্যমে নির্বাণপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষার শেকড়-সুদ্ধ বুঝি কেঁপে উঠল। সে হতবুদ্ধি, বিভ্রান্ত, নিঃশ্চুপ। নীরবে নতমুখে সবার সঙ্গে মিষ্টান্ন-ফলাহার খেয়ে সে আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করল।

ইসিদাসী সকল বিষয় ভবদেব সমীপে নিবেদন করলেন। তিনি খুবই উৎফুল্ল ও আনন্দিত হলেন, এবং যথাসময়ে আচার্য মাধবশ্রী ও প্রদোষ দেব বর্মনকে জ্ঞাত করলেন। সকলের মনে এই প্রত্যাশার সৃষ্টি হলো যে অচিরেই একটি আনুষ্ঠানিক উৎসবের মাধ্যমে ধুমধাম সহকারে বিবাহকার্যটি সম্পন্ন হবে। কিন্তু বস্তুত তেমন কিছুই ঘটল না, বরং সংশ্লিষ্ট-জনেরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বীথি-পরিচালনার অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।

 

সেসময়ে পণ্ডিত পুলিন ভট্টের দিন কাটছিল প্রচণ্ড অস্থিরতায়। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক হিসাবনিকাশ কষে নির্ভরযোগ্য এবং দক্ষ উগ্রপুরুষ তিনি নিয়োগ করেছিলেন উদয়মানকে শেষ করে দেবার জন্য। কিন্তু তার সকল পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। উল্টো সে নিজেই ধরাশায়ী হয়েছে। এসব কথা জানাজানি হয়ে গেলে তার মুখ লুকানোর জায়গা থাকবে না। বিশেষ করে রাত্রির অন্ধকারে ঘটে যাওয়া এরূপ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণ বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। শান্তিশৃঙ্খলা যদি রক্ষা করতে না পারা যায় তবে বীথি-সামন্তের মর্যাদা থাকে কীভাবে? বিষয়টি নিয়ে তিনি এতই উদ্বিগ্ন হয়েছেন যে অনুসন্ধান করে সত্য উদঘাটন করতে তার রক্ষীদল-প্রধান অর্কদাসকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। দুশ্চিন্তার শেষ নেই পুলিন ভট্টের। ব্যাটা হিঙ্গল মল­ আবার কাব্য রচনা করে আবৃত্তি করে বেড়াচ্ছে-

 

           ক্ষাত্রকুলে জন্ম তাহার উচ্চে অধিষ্ঠান

           সংহারিতে কপটাচারী ব্রাহ্মণ যত

           খড়গ হস্তে যত্রযত্র

           হুংকারিয়া লড়িবে দিনমান

           সেই বীরপ্রবর আর কেহ নয়, বন্ধু মোর উদয়মান।

এ কাব্যখণ্ডের ব্যাখ্যা চাইলে সে হাসে- তার শুভ্র দন্তরাজি প্রকটিত করে কেবল হাসে। ওটাও প্রাকৃতজনের মধ্যে এক ধরনের জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

অবশেষে করণীয় নির্ধারণের জন্য পরামর্শ করতে রুহীদত্ত সকাশে সমুপস্থিত হলেন পুলিন ভট্ট। মলিন মুখে ক্ষণকাল নীবর থেকে অবশেষে বললেন- চারদিকের পরিস্থিতিতে কোনো মঙ্গলের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।

উদগ্রীব রুহীদত্ত মন্তব্য করলেন- নতুন কী হয়েছে বিশদে ব্যাখ্যা করুন।

পুলিন ভট্ট নিবেদন করলেন- শূদ্র জনগোষ্ঠীর ঔদ্ধত্য ক্রমে সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। অভাবিতপূর্বসব ঘটনা ঘটাচ্ছে এসব নীচুজাতের কুলাঙ্গাররা। কোনটা রেখে কোনটা বিবৃত করব সেটাই সমস্যা। কিছু একটা করতে হবে, করতে হবে!

রুহীদত্ত বললেন- আহা! কেবলই উত্তেজিত হচ্ছেন, বলছেন না তো কিছুই। স্পষ্ট করে না বললে করণীয় সম্পর্কে কী করে সিদ্ধান্ত নেব?

পুলিন ভট্ট নিজেকে সংযত করলেন। মনে মনে ভেবে নিলেন রুহীদত্তকে কোনটা জানাবেন এবং কতটুকু জানাবেন। উগ্রপুরুষ নিযুক্ত করার বিষয়টি গোপন রাখতে হবে, কাউকে বলা যাবে না; তবে রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা তৎপর, হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে এবং এটা নিয়ে পলাশতলী-বটেশ্বরের বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বিশেষ উদ্বিগ্ন- এ বিষয়টি জানাতে হবে। আর জানাতে হবে নীচুবর্ণের মনুষ্যকুল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং রাজপুরুষদের সঙ্গে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে সেটা। এবং সকলকিছুর মূলে গুরু ভবদেব, তার শিষ্যগণ এবং শুকদেব মহাশয়ের ইন্ধন।

পুলিন ভট্টের নীরবতায় এবার রীতিমত অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন রুহীদত্ত। বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কি কোনো বক্তব্য দেবেন, নাকি নিজ মনেই ঘোঁট পাকাবেন?

বিনয়ের হাসিতে বিগলিত হলেন পুলিন ভট্ট। বললেন- কথাগুলো গুছিয়ে নিলাম। হাজার হোক বীথি-সামন্ত সকাশে বক্তব্য দিতে যাচ্ছি। এরপর তিনি তার ভাবনা অনুযায়ী ঘটে-যাওয়া কিছু বিষয় নিয়ে তার উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করলেন।

নবপ্রতিষ্ঠিত পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির অন্তর্গত বিল্বগ্রামে একটি দেবপাড়া বর্তমান। সেখানে কয়েকঘর ব্রাহ্মণ এবং একটি ক্ষত্রিয় পরিবারের বসতি বিদ্যমান। সংবাদ পাওয়া গেছে যে কর্মকরগণ ক্ষেত্র-কর্ষণের সকল কর্ম নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করলেও গৃহকর্মে অনীহা প্রকাশ করছে। বলছে, ওটা ওদের কাজ নয়, দাস-দাসীদের কাজ। তাছাড়া সপ্তাহে একদিনও বেগার দিতে সম্মত নয়। কী অপরিসীম ঔদ্ধত্য! ব্রাহ্মণের ঘরে বেগার দিতে অসম্মতি! এ দিকে ভাগচাষী শূদ্ররা উৎপন্ন ফসলের প্রাপ্য অংশের অতিরিক্ত উপরি চাইলে সরাসরি অস্বীকার করছে! ধৃষ্টতা অসহ্য বটে। এরা রৌরব নরকবাসী  হবে।

রুহীদত্ত মন্তব্য করলেন- হ্যাঁ, বিষয়টি আমিও লক্ষ করেছি। রাজন্যের আদায় তুলতে গেলে কিংবা ধর্মগোলার অংশ তুলতে গেলে আমাদের বীথিরও কোনো কোনো কৃষক রাজপুরুষদেরকে উপরি দিতে অস্বীকার করছে। ওরা বলছে- স্বভূমির সীতা নিয়ে যাও, কৃষকের জমি থেকে ন্যায্য ভাগ নিয়ে যাও, উপরি দেব কেন? গুল্মিক থেকে প্রেরিত প্রতিহারী কিংবা জ্যেষ্ঠ প্রতিহারীকেও কোনো কোনো কৃষক পাত্তা দেয় না। নিজ অধিকার রক্ষায় এরা প্রতিবাদী হচ্ছে। এটা নিশ্চিতই অনাসৃষ্টির লক্ষণ।

পুলিন ভট্ট উৎসাহিত হয়ে বললেন- এ সবকিছুর মূলে বটেশ্বর আশ্রমের বিদ্যাপীঠ; অমৃতবচন বলে কথিত ভবুদেবের নিয়মিত ভাষণ এবং তার শিষ্যদের অব্যাহত প্রচার। কয়েকজন বৌদ্ধ শ্রমণ এবং শিবভক্ত শিষ্য একযোগে ইতরজনকে সংগঠিত হয়ে অধিকার আদায়ে ইন্ধন দিচ্ছে। গ্রামসভার ধর্মপ্রবক্তা কিংবা গ্রাম-মহত্তরগণ কোনো দণ্ডদান করলে সেটা ন্যায়ভিত্তিক কি না এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এবং গ্রামপতিদের মুখোমুখি বিতর্ক করতেও সাহসী হচ্ছে কেউ কেউ। কিছুক্ষণ থেমে দম নিলেন পুলিন ভট্ট। অতঃপর বললেন- সেদিন বিল্বগ্রামের বনাঞ্চলে শুষ্ক বৃক্ষশাখা ও পত্রাদি সংগ্রহরত কতিপয় অন্ত্যজ বালিকার সঙ্গে দেবপাড়ার কয়েকজন যুবক রসিকতা করতে গিয়ে গায়ে হাত দিলে দলবেঁধে প্রতিবাদ করেছে এবং উদ্যত বৃক্ষশাখা নিয়ে ধাওয়া করার সাহস দেখিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আমি গূঢ়পুরুষ মাধ্যমে তথ্য পেয়েছি যে, ওরা বিষয়টি নিয়ে ধর্মপ্রবক্তার নিকট নালিশ রুজু করার পরিকল্পনা করেছে। দুঃসাহস লক্ষ করেছেন? দ্বিজ যুবকের বিরুদ্ধে নালিশ রুজু করবে অন্ত্যজ নারী? ভবদেবের আশ্রমের ইসিদাসী নিজে অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর নারী। সে এবং তার সঙ্গীরা নারীদের পক্ষে থাকতেই পারে। কিন্তু শুকদেবের কন্যা মায়াবতী? সে-ই নাকি নারীদের উত্তেজিত করছে। অনাসৃষ্টিটা কতদূর সেটা লক্ষ করুন!

অতঃপর ক্ষাত্রকুলের এক রাজপুরুষ রুহীদত্ত এবং কুলীন ব্রাহ্মণকুলের এক উপদেষ্টা পুলিন ভট্ট দুইয়ে মিলে এ সময়ের করণীয় নির্ধারণ করে ফেললেন। বর্ণভিত্তিক আর্যব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রাকৃতজনকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার মূলনীতিকে ভিত্তি করেই কার্যক্রম নিতে হবে এ ব্যাপারে উভয়ে একমত হলেন। কৌশল হিসাবে পূর্বেই স্থির করা ছিল যে নব্যক্ষত্রিয় প্রদোষ দেব বর্মণ এবং শুকদেব বর্মণের পরিবারের মধ্যে অনমনীয় বিরোধের সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে শুকদেবের কন্যার সঙ্গে অর্কদাসের বিবাহের প্রস্তাব বিশেষ ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। সুতরাং যে করেই হোক এ বিবাহ বন্ধ করতে হবে। অর্কদাস প্রদোষ দেবের কুলস্থ, সুতরাং সেও ক্ষত্রিয় বলে স্বীকৃত হতে পারে। তাছাড়া যে নারী ভ্রষ্টা, যে নারী উদয়মানের মতো অজ্ঞাত কুলশীল দুশ্চরিত্র পরপুরুষের সঙ্গে হর-গৌরী নাচের নামে জলকেলি করতে পারে, অসুস্থতার ভান করে যে দিনরাত উদয়মানের সেবা গ্রহণ করতে পারে, সে তো বৃষলীতুল্য। তার সঙ্গে অর্কদাসের মতো সদ্বংশজাত উত্তম চরিত্রের ক্ষত্রিয় যুবকের কী করে বিবাহ হতে পারে? বীথির সর্বোচ্চ ধর্ম-প্রবক্তা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ মাধবশ্রীর নিকট তার সঠিক শাস্ত্রীয় বিধান চাইতে হবে।

এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর দুজনেই আত্মতুষ্টি বোধ করলেন। যুক্তিগুলো শাণিত। বক্তব্যগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে প্রদোষ দেব তোষামোদ বোধ করবেন, মাধবশ্রীর মনে মায়াবতী ও উদয়মান সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব জন্মাবে এবং বিবাহ প্রস্তাবটি রোধ করতে পারলে প্রদোষ দেব ও শুকদেবের পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্টতা সৃষ্টির সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। তাছাড়া উদয়মান দুশ্চরিত্র এবং মায়াবতী ভ্রষ্টা এসব কথা ব্যাপক প্রচারিত হবে। মনুসংহিতার শাস্ত্রীয় বিধানসমূহ প্রয়োগের মাধ্যমে আর্যায়ন প্রক্রিয়া কঠোরতর হবে। কিন্তু এ সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে অচিরেই পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেখানে রাজকীয় প্রতিহারী দলের গুল্মিক প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সম্ভাররাজের কাছে এ সকল যুক্তিসহ গুল্মিক প্রতিষ্ঠার আবেদন অনুমোদন করাতে পারলে নিজেদের বশংবদ লোককে গুল্মিকের প্রধান হিসাবে নিয়োগ করা যাবে। প্রদোষ দেব এবং আচার্য মাধবশ্রীকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে প্ররোচিত করতে পারলে নিঃসন্দেহে সম্ভার মহারাজের আনুকূল্য পাওয়া যাবে বলে তারা মনে করলেন।

পুলিন ভট্ট করিৎকর্মা ব্রাহ্মণ-পুরুষ। শিবপুর বীথির সর্বোচ্চ রাজপুরুষ রুহীদত্তের সর্বাত্মক সমর্থন পাওয়াতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে তেমন কঠিন হবে না বিবেচনা করে তিনি কালবিলম্ব না করে কার্যে অগ্রসর হলেন। সর্বাগ্রে তিনি শিবপুর বীথির সকল ব্রাহ্মণ কুলপতিদেরকে নিজ গৃহে আমন্ত্রণ করে এক সমাবেশের আয়োজন করলেন। পলাশতলী ও বিল্বগ্রামের দুয়েকজনকেও ডেকে নিলেন। কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি এরূপ সমাবেশের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করলেন। সা¤প্রতিককালে ঘটে যাওয়া দুয়েকটা অনাচারের কথা উলে­খ করে তিনি জানালেন যে বীথি-সামন্ত ও অন্যান্য রাজপুরুষসহ আমরা সকলে একটা বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। শাস্ত্রীয় বিধান, দ্বিজ ব্রাহ্মণ এবং রাজপুরুষদের প্রতি ভয়-ভক্তি ক্রমেই যেন তিরোহিত হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে হত্যাকাণ্ড, মাদক সেবন ও ব্যাভিচারসহ গর্হিত কর্মকাণ্ড শান্তি-শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ক্ষেত্রকর্মকরেরা ব্রাহ্মণদের গৃহকর্মে বেগার দিতে অনীহা প্রকাশ করছে, ব্রাহ্মণদের যজমানী পেশা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে; এ সবই অনাসৃষ্টির লক্ষণ। অবশেষে পুলিন ভট্ট সকলকে অভয় দিয়ে বললেন- সকল ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। আপনারা নির্ভয়ে থাকুন। রাজশক্তি সর্বতঃভাবে আপনাদের আনুকুল্য প্রদান করবে।

আলোচনা সমাপনান্তে যৎসামান্য ফলাহারে আপ্যায়িত করে তিনি অভ্যাগতদের বিদায় করলেন। এরপর তিন-চার দিনের মধ্যে তিনি তার সকল অনুগত গূঢ়পুরুষ, গূঢ়নারী, মাদকসেবী ও বারাঙ্গনাদেরকে পৃথক পৃথকভাবে ডেকে যথাবিহিত নির্দেশ দান করলেন। তৎপরবর্তী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই মাধবশ্রী ও প্রদোষ দেব বর্মনকে নতুন বীথিতে গুল্মিক স্থাপনে উদ্যোগী করে তুললেন।

 

 

 

আঠারো.

বিবাহের প্রস্তাবটি শুকদেব মহাশয় আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, মায়াবতীও প্রকাশ্যেই নিজের মত প্রকাশ করেছে- এ তত্ত্বে জানতে পেরে অর্কদাসের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু মাসাধিককাল গত হলেও বিবাহ অনুষ্ঠানের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না দেখে সে কিঞ্চিত হতাশ হয়ে পড়ল। বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণ বিবাহ-প্রস্তাব বিষয়ে প্রথমে যথেষ্ট উৎসাহী থাকলেও পরবর্তীকালে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথিতে রাজকীয় প্রতিহারী দলের গুল্মিক প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি যেন অধিক ব্যগ্র হয়ে পড়েছেন।

সত্যিকার অর্থেই সম্ভার মহারাজ পরম ভট্টারকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং তাকে সামরিক শক্তি দিয়ে সহায়তা দান করা সামন্ত হিসাবে নিজের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করেন প্রদোষ দেব বর্মণ। তদুপরি ক্ষত্রিয় হিসাবে স্নাতক হবার পর সামরিক দায়িত্ব ও গুরুত্ব বর্ধিত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে তিনি আচার্য মাধবশ্রী এবং পুলিন ভট্টকে নিয়ে বারকয়েক সম্ভার ঘুরে এসেছেন। গুরু অহিরুদ্র দেব আশীর্বাদ করেছেন, মহারাজও গুল্মিক স্থাপনে তার সম্মতি দিয়েছেন। শিবপুর বীথির সহকারী গুল্মিক মনোহর নাগকে নতুন বীথির রাজকীয় প্রতিহারী দল গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত থাকার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তার এ দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে- এ বিবেচনাতেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য বীথি-সামন্ত তার অধিকরণগৃহে সংশ্লিষ্ট সকলকে একদিন ডাকলেন। বৈঠকে উপস্থিত হলেন অধিকরণে কর্মরত প্রবীণ রাজপুরুষগণ, নবীন জ্যেষ্ঠ কায়স্থ, প্রথম কুলিক, প্রথম সার্থবাহ এবং প্রতিটি গ্রাম-পঞ্চায়েতের নির্বাচিত গ্রামিকগণ। ডাক পড়ল রক্ষীদলের প্রধান অর্কদাসেরও। শুরুতেই শিবপুর বীথির প্রাক্তন সহকারী গুল্মিক মনোহর নাগকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো নতুন বীথির দায়িত্বপ্রাপ্ত গুল্মিক হিসাবে। ঘোষণা করা হলো, অর্কদাস তারই অধীনে উপগুল্মিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে। অর্কদাসের রক্ষীদলে কর্মরত সকল রক্ষীই ইচ্ছে করলে প্রতিহারী দলে যোগ দিতে পারবে। তবে সকলকেই নতুন করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। মনোহর নাগের অধীনে শিবপুরে কর্মরত প্রতিহারী মংরু, ভোলামাল, খদেরু ইতোমধ্যেই মনোহর নাগের সঙ্গে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির প্রতিহারী দলে যোগদান করেছে।

পিতৃহত্যাকারী মনোহর নাগ, যাকে শিরোচ্ছেদ করার কঠিন প্রতিজ্ঞা অর্কদাস শৈশবে গ্রহণ করেছিল, যে প্রতিজ্ঞা তার অন্তরে আজও দৃঢ়মূলে প্রতিষ্ঠিত, তার অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হবে এটা জ্ঞাত হয়ে সে মনে মনে দারুণ ক্ষুব্ধ হলো। তৎসত্তে¡ও প্রতিজ্ঞা করল রাজকার্যে প্রদত্ত দায়িত্ব সে অবশ্যই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে। তবে প্রতি মুহূর্তেই অপেক্ষায় থাকবে কখন পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তম সুযোগটি উপস্থিত হয়। আরেকটি বিষয় নিয়ে সে বিশেষ ক্ষুব্ধ হলো। পুলিন ভট্ট শিবপুর বীথির ধর্ম-প্রবক্তা। এখানে কী কারণে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে? ধর্ম-প্রবক্তা হিসাবে আচার্য মাধবশ্রী কি যথেষ্ট নয়? আর আলোচনা-অনুষ্ঠানে শুকদেব মহাশয়ই-বা অনুপস্থিত কেন?

এরপর থেকে চরম অস্থিরতার মধ্যে অর্কদাসের দিনপাত হতে লাগল। বিবাহের প্রস্তাব পাঠানোর পর-অবধি সে একদিনও শুকদেব মহোদয়ের গৃহে গমন করে নাই। হয়তো কিছুটা লজ্জাবোধে আক্রান্ত হয়েছিল। শীঘ্রই শুকদেব মহোদয়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করতে তার গৃহে যাবে বলে সে স্থির করেছিল। ভেবেছিল তখন মায়াবতীরও সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না। ইতোমধ্যে তান্ত্রিক গুরুর আখড়া সন্নিকটে গভীর রাতের সেই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গূঢ়পুরুষ প্রদত্ত কিছু তথ্য যাচাই করার জন্য তাকে মংরু ও খদেরুর সঙ্গে কথা বলতে জরুরি নির্দেশ দান করলেন প্রদোষ দেব।

 

মধুপূর্ণিমা প্রায় সমাগত। প্রতিবারের মতোই উৎসবের মেজাজ। গুরু ভবদেবের আশ্রমে এ উপলক্ষে নানা ব্যস্ততা। আলপনা অঙ্কন, নাট্যমঞ্চ নির্মাণ, অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা- বিশাল কর্মযজ্ঞ। বটেশ্বর জনপদের বনবাসী গোষ্ঠীর নানা বয়সের নারী-পুরুষ দলে দলে আসছে, যাচ্ছে, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসছে। গুরু ভবদেবের ভক্ত শিষ্যবৃন্দ বচনামৃত সভার আয়োজনে ব্যস্ত। ওদিকে মন্দিরে পূজার আয়োজন, প্রাঙ্গণে ভাদ্রীমেলার ব্যবস্থা।

মায়াবতী গুরুদেবের আশ্রমের দিকে রওনা হলো। রোগমুক্তির পর এটাই তার প্রথম বাইরে যাওয়া। আশ্রমে পৌঁছে গুরুদেবের পদধূলি নিয়ে সে তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করল। গুরুদেব হাসলেন। হাত তুলে আশীর্বাদ করে উচ্চারণ করলেন- কল্যাণ হোক, অন্তরের অস্থিরতা দূরীভূত হোক।

ইসিদাসী ব্যস্ত ছিলেন, তার মধ্যেও তাকে অভ্যর্থনা করলেন। একে একে সকলেই এগিয়ে এল- সুপন, কলিঙ্গা, হিঙ্গল, লহনা। কেবল উদয়মানকে দেখা গেল না। হিঙ্গল সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে নাটকীয় ভঙ্গীতে হেসে বলল- সখী! দৃষ্টি তোমার বড়ই চঞ্চল? কিসের সন্ধানে অস্থির এত?

কপট ক্রোধে ধমকে উঠল মায়াবতী। বলল- অসময়ে কাব্য-আবৃত্তি আমাদের আনন্দ দিচ্ছে না। বন্ধুজন বলে নিজেকে দাবি করো যদি তবে আসল বন্ধুটিকে খুঁজে আনো।

কলিঙ্গা তীর্যক মন্তব্য ছুড়ে দিল- আমরা বুঝি সবাই নকল বন্ধু?

হিঙ্গল তার শ্বেতশুভ্র দন্ত বিকশিত করে পুনরায় আবৃত্তির সুরে বলল- কোনো ভাবনা নেই, এসো আমার সঙ্গে।

অতঃপর হিঙ্গল এগিয়ে চলল মন্দিরের পশ্চাতে সেই প্রাচীন পনস বৃক্ষতলে। সত্যিই সেখানে উদয়মান উপবিষ্ট ছিল একাকী নির্জনে। ভাদরের ভরা যৌবনা কয়রা নদীর উচ্ছ¡সিত জলস্ফীতি ছাড়িয়ে সুদূর আকাশে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ।

 

এতগুলো পদশব্দে তার ধ্যান ভঙ্গ হলো। ম্লান হাসল, মুখে কিছু উচ্চারণ করল না।

মায়াবতী বিনা ভূমিকায় ঘনিষ্ঠ হয়ে তার পাশে বসে পড়ল। বলল- বন্ধুবর, এত বিষণ্ন কেন? চারদিকে এত কর্মযজ্ঞ, তুমি অমন নিষ্ক্রিয় কেন? একাকী!

পুনরায় ম্লান হাসল উদয়মান। বলল- কেমন আছো, মায়াবতী?

-খুব ভালো আছি। তোমাদের সাক্ষাতের জন্য মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে পড়েছিল। সে-জন্যই আসা।

কলিঙ্গা বলল- এই, আমরা চলো এবার যাই। মায়াবতী তার আসল বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছে। তাছাড়া আমি তো স্বল্পক্ষণের জন্য আশ্রমের কর্মকাণ্ড দেখতে এসেছিলাম। এখনই বিষ্ণুমন্দিরে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

কলিঙ্গা যেতে উদ্যত হলো। তার কথা শুনে মায়াবতীও উঠল। উদয়মানের কাঁধে হস্ত স্থাপন করে বলল- উদয়মান, তুমি চলো। আমারও যেতে হবে বিষ্ণুমন্দিরে। আচার্যদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা দরকার।

উদয়মান আবার হাসল। বলল- কলিঙ্গাকে সঙ্গে করে তুমি যাও। তোমরা দুজনেই তো বিষ্ণুমন্দিরের সেবিকা। আমি সেখানে গিয়ে কী করব?

মায়াবতী বিস্মিত হবার ভঙ্গী করে বলল- সে কী! আমার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে তুমিও তো গেলে। তুমিও তো অন্যতম বার্তাবাহক! আমরা প্রস্তাব গ্রহণ করলাম, এরপর সবাই নিষ্ক্রিয়। তোমাদের কোনো করণীয় নেই! অনেকদিন তো নিষ্ফল গত হয়ে গেল। চলো, আচার্যদেবের নিকট। তিনি তিথি-নক্ষত্র বিচার করে শুভদিন সন্ধান করে বিবাহের লগ্ন স্থির করে দেবেন। বিবাহটি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সম্পন্ন হয়ে যাবে? নাকি তোমার হৃদয়ে কোনো বিকল্প ভাবের উদ্রেক হয়েছে? 

উদয়মানের কাঁধে বিপুল ধাক্কা দিয়ে হেসে উঠল মায়াবতী- ওঠো। উঠছ না কেন?

মায়াবতীর কৌতূকাক্রান্ত উৎফুল­ চোখে-মুখে তাকিয়ে ভাবল উদয়মান- হ্যাঁ, মায়াবতী। হৃদয়ে বিকল্প ভাবের উদ্রেকই নয়, এতদিন পর্যন্ত সযত্নে লালিত ভাব-ভাবনা, বিশ্বাস-আস্থা সবকিছু যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ছে। এতদিন জেনেছি মানবজন্মই দুঃখের কারণ। সে-দুঃখ থেকে পরিত্রাণ-লাভে কেবলই নির্বাণপ্রাপ্তির পথের সন্ধান করেছি; তোমাদের মতো বেঁচে থাকার অপার আনন্দের অমরাবতীর স্বপ্ন দেখতে শিখি নি। কিন্তু আমি আবার বাঁচতে চাই! আমাকে কি বাঁচিয়ে তুলতে পারো বন্ধু! নির্বাণ নয়, জীবন চাই। নিজের এবং সকল মানবের কল্যাণ চাই!

কিন্তু তার প্রতীজ্ঞার কথা স্মরণ হলে সে অকস্মাৎ লাফিয়ে উঠে বলল- তাই তো। আমাদেরও-তো একটা কর্তব্য আছে। চলো কলিঙ্গা! মায়াবতীকে নিয়ে আমরা এগোই।

ইতোমধ্যে বিল্বগ্রামের কতিপয় অন্ত্যজ নারী-পুরুষ একটা অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হলো ইসিদাসীর কাছে। এ অন্যায়-অবিচারের কথা গুরুদেবকে জ্ঞাত করতে হবে। প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্ত্যজ বলে ওরা কি মানুষ নয়? তাদের মানসম্ভ্রম বলে কি কিছু থাকবে না? নতুন বীথি গঠন করে প্রদোষ দেব বর্মন ক্ষত্রিয় হলেন, আমাদের গ্রামগুলোতে ব্রাহ্মণ বসতি বেড়ে দেবপাড়া গড়ে উঠছে। তাতে আমাদের কল্যাণ কোথায়? তদুপরি এরূপ অনাচার!

বিবরণ শুনতে শুনতে ইসিদাসী বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়লেন, কিন্তু কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন না। গুরুদেবকে সংক্ষেপে বিষয়টি অবগত করে তার পরামর্শমতো তক্ষুনি অভিযোগকারী নারী-পুরুষের দল সমভিব্যহারে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির প্রধান ধর্মপ্রবক্তা ও বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রীর নিকট ছুটে গেলেন।

তখন আচার্যদেব আশ্রমগৃহের দাওয়ায় মাদুরে উপবিষ্ট হয়ে পণ্ডিত পুলিন ভট্টের সঙ্গে কথা বলছিলেন। অদূরে নতুন বীথির নবনিযুক্ত গুল্মিক মনোহর নাগ অপেক্ষমান। তার পেছনে দণ্ডায়মান দুজন শস্ত্রধারী প্রতিহারী। ছোটখাটো সমরসজ্জা দর্শনে ইসিদাসী ধারণা করলেন যে উচ্চপদে বৃত দুজন প্রবীণ ব্রাহ্মণ হয়তো কোনো গুরুতর বিষয়ে আলোচনায় রত। তথাপিও ইসিদাসী আচার্যদেবের সম্মুখে উপস্থিত হলেন অন্ত্যজ নারী-পুরুষদের ছোটখাটো দলটি নিয়ে।

আচার্যদেব বিস্মিত হলেন। তার প্রত্যাশা ছিল পুলিন ভট্টের সঙ্গে পূর্বাহ্নে স্থির করা গুরুতর আলোচনা তক্ষুনি সমাপ্ত হবে। স্নানাহারের সময়ও আসন্ন। ভাদ্রীপূজার প্রস্তুতির ব্যস্ততা পরিহার করে ভবদেবের আশ্রমের জ্যেষ্ঠাভগ্নী এই অসময়ে এসে উপস্থিত হতে পারেন এমনটা তিনি প্রত্যাশা করেন নি।

ইসিদাসী বিনয়ের সঙ্গে করজোড়ে নমস্কার করে নিবেদন করলেন- মান্যবরের পদপ্রান্তে আমাদের ভক্তি নিবেদন করছি। আমরা ধারণা করতে সক্ষম যে আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নিমগ্ন। তবুও অসময়ে আপনার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়। কেননা আপনি আমাদের বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত, বিদ্যপীঠের গুরু এবং অত্যন্ত মান্যবর বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। সর্বোপরি আপনি আমাদের বীথির ধর্ম-প্রবক্তাও বটে। অনুমতি পেলে আরজি উপস্থাপন করতে পারি।

মাধবশ্রী কোনো কথা বলার পূর্বেই অসহিষ্ণুকণ্ঠে পুলিন ভট্ট বলে উঠলেন- যত মার্জিত ভাষাই প্রয়োগ করো না কেন, আমরা জানি তোমরা নীচুকুলোদ্ভব। যা বলার বলে ফেলো।

ইসিদাসী পুলিন ভট্টের নির্দেশের প্রতি কোনোই কর্ণপাত করলেন না। মাধবশ্রীর প্রতি দৃষ্টি রেখে বললেন- বক্তব্য উত্থাপনের জন্য আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি।

এবারও মাধবশ্রী উত্তর প্রদানের সময় পেলেন না। পুলিন ভট্ট উচ্চস্বরে ধমকে উঠলেন- বললাম তো, যা বলার বলে ফেলো।

ইসিদাসী এবার পুলিন ভট্টকে লক্ষ করে বললেন- আমরা পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির কতিপয় সংক্ষুব্ধ প্রাকৃতজন, আমাদের বীথির ধর্মপ্রবক্তার দ্বারস্থ হয়েছি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। মধ্যখানে আপনি কেন বাধাগ্রস্ত করছেন? আপনি আমাদের ধর্ম-প্রবক্তা নন। আপনার তো এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য থাকা সঙ্গত নয়।

অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পুলিন ভট্ট দাঁড়িয়ে পড়লেন। ক্রোধে তার মুখমণ্ডল আরক্ত হয়ে পড়ল। তিনি আরো কিছু বলতে গেলে আচার্য মাধবশ্রী তাকে নিরস্ত করলেন। ইসিদাসীর প্রতি দৃষ্টি ফিরিয়ে উচ্চারণ করলেন- নিবেদন  করুন।

ইসিদাসী তার সঙ্গে উপস্থিত অন্ত্যজ বালিকা ও নারীদের দেখিয়ে বললেন- কিছুদিন পূর্বে বিল্বগ্রামের এই সকল অন্ত্যজ নারী ও বালিকাগণ বনাভ্যন্তরে শুষ্ক বৃক্ষশাখা ও পাতা সংগ্রহ করছিল। তখন দেবপাড়ার তিনজন যুবক এদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করে, ধর্ষণের চেষ্টায় একজনকে বিবস্ত্র করে ফেলে। মরিয়া অবস্থায় বাকি সকলে মিলে ওকে রক্ষা করে এবং যুবকদের তাড়া করে সে-বিপদ থেকে আত্মরক্ষা করে ঘরে প্রত্যাবর্তন করে। পরদিন গ্রাম-পঞ্চায়েতের গ্রামিকের পরামর্শক্রমে পঞ্চায়েতের ধর্ম-প্রবক্তার নিকট অভিযোগ রুজু করতে গেলে তিনি অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে ব্রাহ্মণ বংশজাত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শূদ্র কিংবা অন্ত্যজজনের কোনো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। মনুসংহিতায় নাকি সেরূপ বিধানই আছে। এরা সকলে অদ্য প্রত্যুষে গুরু ভবদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। গুরুদেব বলেছেন যে, দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন রাজধর্ম। উঁচু-নীচু ও নারী-পুরুষ ভেদে সকলের আত্মসম্ভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ারও অধিকার আছে।

পুলিন ভট্ট অনেক কষ্টে ধৈর্য ধরে নিশ্চুপ ছিলেন। ইসিদাসীর বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্রোধে ফেটে পড়লেন- বিল্বগ্রামের ধর্ম-প্রবক্তা সঠিক কর্মটি করেছেন। ব্রাহ্মণ-পুত্রদের বিরুদ্ধে অন্ত্যজদের অভিযোগ মনুর বিধান মতে গ্রহণযোগ্য নয়।

অতঃপর আচার্য মাধবশ্রীকে বললেন- এই জন্যই আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে মনুর বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। ভবদেবের আশ্রমটি উঠিয়ে দিতে হবে, দুশ্চরিত্র শ্রমণ উদয়মানকে বটেশ্বর থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তা না হলে শূদ্র ও অন্ত্যজ প্রাকৃতজনের প্রতিবাদী আচরণে বর্ণভিত্তিক আর্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। সমাজের সমূহ অকল্যাণ হবে।

দীর্ঘক্ষণ অধোবদনে নিশ্চুপ রইলেন আচার্য মাধবশ্রী। অতঃপর অভিযোগকারী দলটির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অভয় মূদ্রায় দক্ষিণ হস্ত উত্তোলিত করে গম্ভীরকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- আপনাদের অভিযোগ আমি গ্রহণ করলাম। বিচারকর্মের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে জ্যেষ্ঠাভগ্নীর মাধ্যমে আপনাদিগকে অবগত করা হবে। এক্ষণে আপনারা আসতে পারেন।

অতঃপর অভিযোগকারী দল সমভিব্যাহারে ইসিদাসী আশ্রম-প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন।

দুই প্রবীণ ব্রাহ্মণ পরস্পরের আচরণে নিজেরাই কিয়ৎক্ষণ বিস্মিত ও চিন্তাকুল হয়ে পড়লেন। সমস্ত আলোচনাই শ্র“তিগোচর হলো উপস্থিত গুল্মিক মনোহর নাগ, তার দুই সশস্ত্র প্রতিহারী ও আশ্রমের সেবক-সেবিকা খুল­না ও দীননাথের। দুয়েকদিনের মধ্যে এসকল বিষয়বস্তু বটেশ্বরে বহুল আলোচিত হবে এ সম্বন্ধে আর কোনো সংশয় থাকল না।

ক্ষণকাল অতিক্রান্ত হলে আচার্য মাধবশ্রী মুখ খুললেন। বললেন- দেখুন ভট্ট মহোদয়, আপনার দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমি ঐকমত্য পোষণ করতে পারছি না। আমি বিষ্ণুর পূজারী এবং সকল ধর্মবিশ্বাসের সমন্বয়ে সৃষ্ট উদার মতবাদে বিশ্বাস করি। তাতেই কল্যাণ নিহিত। গুরু ভবদেবের আশ্রম থাকবে, থাকবে শিবমন্দির। ভাদ্রী পূর্ণিমার পূজা হবে, মেলাও অনুষ্ঠিত হবে। ব্রাহ্মণের শীল নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে সকলে আমাদের মান্য করবে- এ সম্বন্ধে আমার কোনোই সংশয় নেই। আমরা অন্যদিন এ বিষয়ে অধিক আলোচনা করার সুযোগ পাব। আপনি আজ আসুন। ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু।

 

এ সকল বিষয় আচার্য দেবের আশ্রমে যাওয়ার পথেই মায়াবতী ও তার সঙ্গীরা ইসিদাসীর নিকট থেকে অবগত হলো। মন্দিরের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তার নিকট থেকে সকল কথা শুনল তারা। অতঃপর মায়াবতী গম্ভীর হয়ে বলল- বন্ধু উদয়মান! তোমাকে তো তাহলে বটেশ্বর-ছাড়া করবে পুলিন ভট্ট।

উদয়মান হাসল। বলল- হিঙ্গলকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিও। একবার তো ইহধাম ছাড়ারও প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। পরিণতি জানো নিশ্চয়।

কলিঙ্গা অতিশয় বিস্মিত হয়ে উদয়মানের মুখপানে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকল। অতঃপর বলল- হ্যাঁ, তাই বলো, এতক্ষণে পরিষ্কার হলো; এইবার হিঙ্গলের কাব্যখণ্ডটির অর্থ বোঝা গেল। ঐ যে- ক্ষাত্রকুলে জন্ম তাহার উচ্চে অধিষ্ঠান!

উদয়মান বলল- এই কাব্যখণ্ডটি স্থগিত রেখে এসো সকলে মিলে বেশি বেশি করে অন্য কাব্যখণ্ডটি আবৃতি করতে থাকি। দেখি কে কাকে বটেশ্বর ছাড়া করতে পারে?

মায়াবতী বলল- অন্য কোন কাব্যখণ্ডটি?

উদয়মান প্রত্যুত্তর করল-

           শোনো হে ভক্তজন,

           পৈতাধারী পণ্ডিত কুচুটে ব্রাহ্মণ

           শিবপুর বীথির স্বর্গ হতে নিত্য করে অবতরণ

           পলাশতলীর মর্ত্যভূমে, কী বা কারণ?

           ভেবে দেখো হে ভক্তজন।

 

উদয়মানের কাব্যখণ্ডের অর্থ সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। কোন অশুভ ইঙ্গিতে সবকিছু অস্থির হয়ে উঠবে এই ভাবনায় মায়াবতী হঠাৎ বিমর্ষ হয়ে পড়ল। ইসিদাসীর সাথে দ্রুত কথা শেষ করে উদয়মান ও কলিঙ্গাকে সঙ্গে নিয়ে সে আচার্যদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেল। আচার্যদেবের আশীর্বাদ নিয়ে মায়াবতী তক্ষুনি নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করল।

তখন অপরাহ্ন প্রায়। শুকদেব প্রার্থনাগৃহের দাওয়ায় মাদুর পেতে একাকী বসেছিলেন। মদনিকা শুকদেবের সম্মুখে এসে দণ্ডায়মান হলে তিনি বুঝতে পারলেন যে পুত্রবধু তাকে কিছু বলতে চায়। মুখ তুলে হাসিমুখে বললেন- বউমা! কিছু বলতে চাও বলে মনে হচ্ছে।

মায়াবতী পার্শ্বে উপবেশন করলে মদনিকা মৃদুস্বরে জবাব দিল- হ্যাঁ, বাবা। বলছিলাম কি, ঠাকুরঝির বিবাহের প্রস্তাবটিতে আমরা তো বলতে গেলে সম্মতি দিয়েছি। আপনার পুত্রকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি সাগ্রহে সম্মতি দিয়েছেন। কিন্তু অনেকদিন তো হয়ে গেল। দিনক্ষণ স্থির করার জন্য এবার তো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শুকদেব কন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন- হ্যাঁ, বিষয়টি নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। প্রদোষ দেব বীথি-সামন্ত। রাজকার্য নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত। অর্কদাসের আর কে-ই-বা আছে যে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে? দেখি, একদিন যাব। প্রদোষ দেবের সঙ্গে আমি কথা বলব। প্রয়োজনে আচার্য মাধবশ্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে একটা দিনক্ষণ স্থির করে ফেলা যাবে। শুভকর্মে বিলম্ব নাস্তি। ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু।

 

 

উনিশ.

গূঢ়পুরুষ থেকে প্রাপ্ত যে তথ্যটা প্রদোষ দেব অর্কদাসকে যাচাই করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা অর্কদাসের নিকট ছিল বিস্ময়কর। উদয়মানকে বন্ধু হিসাবে সে পেয়েছে দুই বৎসরের অধিককাল ধরে। সরল-সহজ নিবেদিত বৌদ্ধ শ্রমণ; বন্ধু হিসাবে আন্তরিক; ব্রাহ্মণ্য-সমাজব্যবস্থার নির্যাতন-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাহসী এবং অবিচল নিষ্ঠাবান। হেন বন্ধুটি যে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সুদূর কর্ণসুবর্ণ নগরে নিযুক্ত মহাসামন্ত অর্চিষ্মান ঘোষের পুত্র হতে পারে এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের অশ্বারোহী বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হতে পারে- এটা এক অকল্পনীয় বিষয় ছিল তার নিকট। এ তথ্য পুলিন ভট্টের গূঢ়পুরুষেরাই সংগ্রহ করেছে। এ সত্য অবগত হয়ে পুলিন ভট্ট গুপ্তঘাতক নিয়োগ করে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছেন। কী ভয়াবহ কথা! কত কুটিল আর নীচ এই পুলিন ভট্ট! এই করে তিনি বর্ণভিত্তিক আর্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবেন!

বীথি-সামন্ত মহোদয় খুবই সঙ্গোপনে এ তথ্যগুলো তাকে দিয়েছিলেন। তিনি বলে দিয়েছিলেন মনোহর নাগের বিশেষ অনুগত প্রতিহারী মংরু এবং খদেরু এ সকল ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। দুজন প্রতিহারীকে আসবপানে আপ্যায়ন করে এবং পৃথক পৃথক অবস্থানে রেখে জেরা করে তথ্যসমূহের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করা যাবে।

অর্কদাস কালবিলম্ব না করে রক্ষীদলের দুজন দক্ষ সদস্যের সঙ্গে বটেশ্বরের বনবাসী এক শৌণ্ডিকের গৃহে মংরু ও খদেরু পাঠিয়ে দেয় আপ্যায়নের জন্য। সেখানে কড়া আসবের সঙ্গে দেওয়া হয় কচি গো-শাবকের ঝলসানো মাংস। মত্ত আনন্দে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অতঃপর অর্কদাস নিজে গিয়ে নরম-গরমে জেরা করে সকল তথ্য অবগত হয়। সে জানতে পারে যে মংরু ও খদেরু দুজনেই পঞ্চবটিতে সাধুজীর আখড়ায় গিয়েছিল মনোহর নাগের নির্দেশে। নগদ অর্থব্যয়ে অন্তর্ঘাতের নিমিত্তে একাধিক উগ্রপুরুষ চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। কার্য সমাধা করতে পারলে সহস্রাধিক কার্ষাপণ প্রদান করা হবে অঙ্গীকার করেছিলেন পুলিন ভট্ট। নিযুক্ত উগ্রপুরুষ কার্য সমাধা করতে ব্যর্থ হওয়ায় পণ্ডিতজী বর্তমানে বিশেষ উদ্বিগ্ন। তদুপরি উদয়মানের কনিষ্ঠ ভ্রাতাও নাকি তার নিরুদ্দিষ্ট জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সন্ধানে সশরীরে সম্ভার রাজ্যে উপস্থিত হয়েছে। তাকে মহারাজা পরম ভট্টারক নাকি বিশেষ সম্মানিত অতিথির মর্যাদা দান করেছেন। সে অবস্থান করছে পণ্ডিত চন্দ্রশেখর মৈত্রের আতিথ্যে।

এদিকে নবনিযুক্ত গুল্মিক এবং পণ্ডিত পুলিন ভট্ট পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির রাজকার্যে ব্যাঘাত সৃষ্টির লক্ষ্যে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছেন। গুল্মিক মনোহর নাগকে ভট্ট মহোদয় পরামর্শ দিয়েছেন তিনি যেন রাজকীয় সুবিধা দিয়ে, ঘুষ দিয়ে ধর্মগোলা থেকে অন্যায় শস্যদান করে মাদকসেবী দুর্বৃত্তের একটি অনুগত দল সৃষ্টি করেন। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন রাজধর্ম। তাই যথেষ্ট-সংখ্যক দুষ্টের জন্ম না হলে মনোহর নাগ দমন করবেন কাকে? চারদিকে দুষ্ট-দুর্বৃত্তেরা নানা ব্যাঘাত সৃষ্টি করলে নাকি গুল্মিকের কদর বাড়বে, সামন্ত মহোদয় তার ওপর নির্ভর করবেন।

এ সকল তথ্য জ্ঞাত হয়ে অর্কদাসের শিরা-উপশিরা তপ্ত হয়ে উঠল। ক্রোধে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। বহু কষ্টে সে নিজেকে সংযত করল এবং স্থির করল যে সর্বদা সাবধান থাকতে হবে এবং সঠিক সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তার সর্বপ্রধান কাজ হবে ব্রাহ্মণ্য আর্য-ব্যবস্থার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামের ব্রতগ্রহণকারী সতীর্থ চতুষ্টয় একত্রিত হয়ে আলোচনা করা এবং করণীয় নির্ধারণ করা। সতীর্থ চতুষ্টয়ের কথা মনে হতেই মায়াবতীর চেহারাটা তার চোক্ষে ভেসে উঠল। চঞ্চল, সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী; অথচ কী প্রতীজ্ঞায় যেন আচ্ছন্ন। অদম্য এক আকর্ষণবোধ করল অর্কদাস। কতদিন দেখা নেই! যাবে একবার! কিন্তু এমত সংকটকালে কীভাবে সম্ভব? অর্কদাস নিজেকে সংযত করল এবং সামন্ত মহোদয়ের নিকট যথাবিহিত প্রাপ্ত তথ্যসমূহ উত্থাপন করল।

প্রদোষ দেব বর্মণ প্রায় বৎসরাধিককাল সামন্ত-প্রশাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতায় ইতোমধ্যে নিজেকে নিরুত্তেজিত রাখতে অভ্যস্ত হয়েছেন। প্রায় সমূদয় তথ্যই তার জানা ছিল; শুধু উদয়মানের কনিষ্ঠ ভ্রাতাটিও যে সম্ভার রাজ্যে আতিথ্যগ্রহণ করেছে কেবল এ বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। ইতোমধ্যে আচার্য মাধবশ্রীর মাধ্যমে বিল্বগ্রামের ব্রাহ্মণ যুবকদের অসদাচরণ সম্পর্কিত অভিযোগটির কথাও তিনি জ্ঞাত হয়েছেন। আচার্য মাধবশ্রী তাকে আরো অবহিত করেছেন যে, বিল্বগ্রামের ধর্মপ্রবক্তা ব্রাহ্মণ যুবকদের বিরুদ্ধে অন্ত্যজ নারীদের অভিযোগ আমলে নিতে সম্মত হন নি। পুলিন ভট্ট মনে করেন বিল্বগ্রামের ধর্মপ্রবক্তা সঠিক কাজ করেছেন। ভট্ট মহোদয় ব্রাহ্মণ্য উন্মাদনায় মত্ত এবং নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠীকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী। অধিকন্তু তিনি চরিত্রহীনতার অভিযোগ তুলে বৌদ্ধশ্রমণ উদয়মানকে এলাকা থেকে বহিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং মনুসংহিতার বিধান অমান্য করার অভিযোগ তুলে আসন্ন ভাদ্রীমেলাও বন্ধ করে দেবার পরামর্শ দিয়েছেন। এ সকল কথা জানিয়ে সর্বশেষে তিনি বলেছেন- আমি কিন্তু তার কোনো পরামর্শ গ্রহণ করি নি। অধিকন্তু আমি সংক্ষুব্ধ অন্ত্যজ নারীদের অভিযোগ বিচারের জন্য গ্রহণ করেছি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে অকল্যাণ হবে, সামাজিক শান্তি বিঘিœত হবে বলে আমি মনে করি। আমি আমার অবস্থানে থেকে আপনার সহৃদয় সমর্থন প্রত্যাশা করছি।

আচার্য মাধবশ্রীর উদারতা, ন্যায়নীতিবোধ এবং সাধারণ প্রজাকুলের প্রতি মমত্ববোধ লক্ষ করে সেদিন প্রদোষ দেব অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে পুলিন ভট্ট যে এত কুটিল এবং নীচ সেটা লক্ষ করে তিনি বিচলিত হয়ে উঠেছেন। নবনিযুক্ত গুল্মিক মনোহর নাগ কার্যত তারই অনুগত। ভট্ট মহোদয় প্রায় প্রতিদিনই এখানে উপস্থিত হন- জনপ্রশাসন-কার্যে নানা পরামর্শ দান করেন। প্রদোষ দেব ভেবেছেন, এই বিপজ্জনক লোকটি সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে; প্রয়োজনে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির কার্যক্রমে নাকগলাতে তাকে প্রকাশ্যে নিষেধ করে দিতে হবে।

অর্কদাসের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা নিরূপিত হওয়ায় প্রদোষ দেব অধিক উদ্বিগ্ন হলেন। নিকট অতীতে পুলিন ভট্টের নানাবিধ পরামর্শ ও আচরণ স্মরণ করে লক্ষ করলেন যে তিনি সর্বদা পিতৃব্য শুকদেব বর্মণ ও ভবদেব সম্পর্কে তার মনকে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মনুসংহিতা ও শাস্ত্রের বিধানের দোহাই দিয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছেন। প্রদোষ দেব নিশ্চিত হলেন যে এতে তার কোনো কু-মতলব অন্তর্নিহিত আছে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে স্থির করলেন যে শীঘ্রই আচার্য মাধবশ্রী, গুরু ভবদেব এবং বীথিতে কর্মরত এক-দুজন ঊর্ধ্বতন রাজপুরুষ নিয়ে একটা মন্ত্রণাসভা অনুষ্ঠান করতে হবে। এটা করতে হবে আসন্ন মধুপূর্ণিমা ও ভাদ্রী মেলার পূর্বে। যে কোনো নাশকতা অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে।

 

এমত জটিল পরিস্থিতির মধ্যে অনেক দ্বিধা কাটিয়ে মনকে সুদৃঢ় করে সিদ্ধান্ত নিলেন শুকদেব। পুত্রবধুর পরামর্শমতো প্রদোষ দেবের সঙ্গে বিবাহ প্রস্তাব বিষয়ে কথা বলতে একদিন যাত্রা করলেন বীথি অধিকরণ গৃহাভিমুখে।

প্রদোষ দেবের সাক্ষাৎপ্রার্থী জেনে শুকদেবকে এক শান্ত্রীসসম্মানে এগিয়ে নিয়ে গেল সামন্ত মহোদয়ের অধিকরণগৃহে। এসকল গৃহাদি নির্মাণ-পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রাথমিক পর্যায়ে শুকদেব ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ক্রমশ কেমনভাবে যেন তিনি বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছেন। তিনি জানেন বর্তমানে পুলিন ভট্টই সর্বদা প্রদোষ দেবের সকল কর্মকাণ্ডে লেগে থাকেন।

সামন্ত মহোদয়ের কক্ষটি সুপরিসর। তারই একপার্শ্বে বিঘত দেড়েক উচ্চতার লম্বাকৃতির একটি তক্তপোষ। তার ওপর আলাদা ছোট ছোট মাদুর পেতে উপবিষ্ট ছিলেন প্রদোষ দেব বর্মণ, আচার্য মাধবশ্রী, গুরু ভবদেব এবং পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। সম্মুখে মুখোমুখি গোল হয়ে বসে আছে গুল্মিক, জ্যেষ্ঠকায়স্থ ও প্রথম সার্থবাহ সহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

শুকদেবকে গৃহে প্রবেশ করতে দেখে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন প্রদোষ দেব বর্মণ। দ্রুত তক্তপোষ ত্যাগ করে গৃহদ্বারে অগ্রসর হয়ে পিতৃব্যের পদধূলি নিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন- আপনি এসে পড়েছেন, এটা অতি আনন্দের বিষয়। আমারই উচিত ছিল আপনাকে আমন্ত্রণ করা। আসুন, আসন গ্রহণ করুন।

আনুষ্ঠানিক এরূপ একটি আলোচনাসভাকে বাধাগ্রস্ত করতে হচ্ছে দেখে শুকদেব কিছুটা বিড়ম্বনা বোধ করলেন। বললেন- তোমাদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করব জানলে আসতাম না। আমি নেহাতই একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম একান্তে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়ে যাব।

তটস্থ হয়ে প্রদোষ দেব প্রত্যুত্তর করলেন- নিশ্চয়, নিশ্চয়। অতঃপর জ্যেষ্ঠকায়স্থকে লক্ষ করে বললেন- আপনারা কিয়ৎকাল গৃহান্তরে থাকুন।

মাধবশ্রী ওঠার উদ্যোগ নিলে শুকদেব বললেন- না না, আপনার যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গুরু ভবদেবের প্রতি লক্ষ করে বললেন- বিশেষ করে আপনার উপস্থিতি তো একান্ত প্রয়োজন।

প্রদোষ দেব তক্তপোষে নিজের মাদুরটি পিতৃব্যকে সসম্মানে ছেড়ে দিলেন। অতঃপর আরেকটা মাদুর নিয়ে বসে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে শুকদেবের মুখপানে তাকিয়ে থাকলেন।

শুকদেব কিঞ্চিৎ দ্বিধা করে অবশেষে বললেন- ভালোই হয়েছে, গুরু ভবদেব আছেন, আচার্যদেবও আছেন। আমার জীবন তো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দিনগত, পাপক্ষয়। সেদিন জ্যেষ্ঠাভগ্নী গিয়েছিলেন একটি শুভবার্তা নিয়ে আমাদের গৃহে। আমরা খুবই আনন্দের সঙ্গে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছি। মায়াবতীও তার মতামত জানিয়েছে। এরপর তো তোমরা রাজকার্যের নানাবিধ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে আর সময় করতে পারো নাই।

অতটুকু বলে থামলেন শুকদেব। প্রদোষ দেব বিনয়ের সঙ্গে বললেন- হ্যাঁ, তাতঃ, আমরা এরপর গুল্মিক প্রতিষ্ঠার কর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

গুরু ভবদেব জানালেন- তা বটে। তবে গুরুজনের উচিত একটা দিনক্ষণ স্থির করে শুভকর্মটি নিষ্পন্ন করে ফেলা।

স্বস্তি প্রকাশের ভঙ্গিতে শুকদেব বললেন- আমিও এই কথাটিই বলতে এসেছিলাম, প্রদোষ দেব।

প্রদোষ দেব কিছু বলার আগেই মুখ খুললেন পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। তিনি বললেন- যদিও বিষয়টি আমার সঙ্গে কেউই আলোচনা করেন নি তবে বিবাহ প্রস্তাবটি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে আমি ভাবনাচিন্তাও করেছি- শাস্ত্রের বিধানানুযায়ী এ বিবাহ তো হতে পারে না!

সকলে যেন আকাশ থেকে পতিত হলেন। প্রদোষ দেব প্রশ্ন করলেন- কেন? কেন?

পুলিন ভট্ট তার যুক্তিগুলো পূর্বেই শাণিত করে রেখেছিলেন। বললেন- প্রথমত, এ বিয়েটা অসবর্ণ। পাত্র যেহেতু আপনার কুলস্থ, সেহেতু তাকে ক্ষত্রিয় বলে গণ্য করতে হয়। কন্যা তো ক্ষত্রিয় নয়!

এবার সকলের হতভম্ব হওয়ার পালা। মাধবশ্রী প্রশ্ন করলেন- কয়েক মাস পূর্বে এই অধিকরণগৃহে দাঁড়িয়েই আপনি জোর বিতর্ক করেছিলেন এই বলে যে কুলস্থ হলেও অর্কদাসকে ক্ষত্রিয় তো দূরের কথা বৈশ্যও বলা যায় না। কেননা সে তো বেতনভূক কর্মচারী অভয় কোচের পুত্র।

হাল ছাড়বার পত্র নন পুলিন ভট্ট। প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন- মনুর বিধান মতে পঞ্চদশ বর্ষ বয়স পর্যন্ত কোনো কন্যা অবিবাহিত থাকলে তাকে বৃষলী বলে গণ্য করা হয়। তাকে বিবাহ দিতে হলে শুকদেব মহোদয়কে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে- কন্যার জন্য শুদ্ধিযজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে হবে। তাছাড়াও শুকদেবের কন্যা একাধিকবার ব্রাহ্মণের প্রতি অশোভন আচরণ করেছে। সে তো ব্রহ্ম অভিশাপে অভিশপ্ত।

শুকদেব মাথা তুলে শীতলকণ্ঠে জবাব দিলেন- ভট্ট মহাশয় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বেড়িয়েছিলেন যে মায়াবতীর অসুস্থতা আমাদের অধর্ম ও পাপাচারের শাস্তি; অতএব এ রোগের কোনো নিরাময় নেই। দম্ভের সঙ্গে চিৎকার করেছিলেন যে এটা ব্রাহ্মণের বাক্য, মিথ্যা হবার নয়। কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় সে তো সুস্থ হয়ে উঠেছে। তাহলে ব্রাহ্মণের দম্ভ কি মিথ্যা? নাকি সেই দাম্ভিক ব্রাহ্মণকে শীল-বর্জিত, পতিত বলে গণ্য করা সঙ্গত?

পুলিন ভট্ট এবার প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে দণ্ডায়মান হয়ে পড়লেন। দক্ষিণ হস্তে ঘন ঘন নিজের পৈতাখানি মর্দন করতে লাগলেন। উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনে পাশ্ববর্তী গৃহ থেকে ছুটে এসে প্রবেশ করলেন জ্যেষ্ঠকায়স্থসহ আরো কয়েকজন। গুল্মিক মনোহর নাগ এবং উপ-গুল্মিক অর্কদাস এসে সামরিক কায়দায় দণ্ডায়মান হলো। গৃহে প্রবেশ করল কলিঙ্গা। সে মাধবশ্রীর অনুষঙ্গী হয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছিল। প্রবেশ করলেন ইসিদাসী। ইনি এসেছিলেন গুরু ভবদেবের সঙ্গে।

পুলিন ভট্টের উত্তেজনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল। তিনি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমাকে শীল-বর্জিত পতিত বলে কটুক্তি করা ব্রহ্মদূষণতুল্য। শাস্ত্রে তার কঠিন শাস্তির বিধান আছে। আমি আবার বলছি প্রায়শ্চিত্ত ও শুদ্ধিযজ্ঞ ছাড়া কোনোমতেই এ বিবাহ মন্ত্রপূত হতে পারে না।

প্রদোষ দেব এতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চুপ ছিলেন। এবার গম্ভীরস্বরে বললেন- পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির সামন্তের দায়িত্বে নিযুক্ত আছি আমি এবং ধর্ম-প্রবক্তার দায়িত্বে আছেন আমাদের বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ আচার্য মাধবশ্রী। বিবাহ অনুষ্ঠানকে মন্ত্রপূত করার দায়িত্ব আপনাকে কে দিয়েছে পুলিন ভট্ট মহোদয়?

প্রদোষ বর্মণের নিকট থেকে এরূপ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পুলিন ভট্ট কিঞ্চিত বিপদগ্রস্ত বোধ করলেন। আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে এমন বিবেচনা করে তিনি নীরব হলেন।

পুলিন ভট্টের নিকট থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে গম্ভীরস্বরেই প্রদোষ দেব বর্মণ সকলকে আবেদন করলেন- আপনারা সকলে আসন গ্রহণ করুন। আমরা এবার আমাদের মন্ত্রণাসভা শুরু করব। অদ্যকার আলোচ্য বিষয় : এক, আসন্ন ভাদ্রীমেলা উপলক্ষে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হবার সম্ভাবনা ও নাশকতার আশঙ্কা বিবেচনা এবং এ বিষয়ে করণীয়; এবং দুই, পুলিন ভট্টের প্রস্তাবানুযায়ী নীচকুলের প্রাকৃতজন প্রতিবাদী হয়ে পড়েছে সেটাই প্রকৃত সমস্যা কি না এবং কঠোর আর্যায়নের মাধ্যমে ব্রহ্মদূষণ, রাজদ্রোহ ও শাস্ত্র-বিরোধী কার্যকলাপ নিরোধ করা সম্ভব কি না। এই সভায় পৌরোহিত্য করার জন্য আমাদের মান্যবর ধর্ম-প্রবক্তা আচার্য মাধবশ্রীকে অনুরোধ করছি।

মাধবশ্রী সম্মতি প্রদান করলে তার অনুমতি নিয়ে প্রদোষ দেব বর্মণ বললেন- বিজ্ঞজনের আলোচনার সুবিধার জন্য সভার শুরুতেই বীথি-প্রশাসনের পক্ষ থেকে স¤প্রতি প্রাপ্ত কতিপয় গোপনীয় তথ্য উত্থাপন করা হবে। আমি সভা-পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে আমাদের রক্ষীদলের প্রধান এবং নব-প্রতিষ্ঠিত গুল্মের উপগুল্মিক শ্রী অর্কদাসকে তথ্যসমূহ উত্থাপন করার নির্দেশদান করছি।

সভাস্থলের দক্ষিণপার্শ্বে দণ্ডায়মান অর্কদাস দুই পদক্ষেপ অগ্রসর হয়ে করজোড়ে সভা-পুরোহিত, সামন্ত মহোদয় ও সকলকে অভিবাদন জ্ঞাপন করল। নিরস্ত্র হলেও সে ছিল সম্ভার-মহারাজের সামরিক পোশাকে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত। পরনে পীতবর্ণ খাটোধূতি হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত, কটিতে গেরো বাঁধা রক্তবর্ণের প্রশস্ত কটিবন্ধ, ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাভরণ। তবে পদমর্যাদার প্রতীক হিসাবে বাম স্কন্ধ থেকে ডান-কটি পর্যন্ত পীতবর্ণের অপ্রশস্ত উত্তরীয়। অর্কদাস দণ্ডায়মান হয়ে স্বল্প হাস্যমণ্ডিত মুখ তুলে অকম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল- উপস্থিত মান্যবর সুধীমণ্ডলী। আমরা জানি আপনারা সকলেই আমাদের সামন্ত মহোদয় ও তার বীথি-প্রশাসনের শুভাকাক্সক্ষী এবং এই জনপদের মানবকুলের কল্যাণে নিবেদিত। আমি সর্বপ্রথমে আমাদের বীথির নব-প্রতিষ্ঠিত সামরিক স্থাপনার সংগঠন সম্পর্কে আপনাদের সদয় অবগত করতে চাই। সম্ভারের মহারাজ পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেনের নির্দেশে এই বীথিতে স¤প্রতি একটি গুল্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই গুল্মের প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন শিবপুর বীথির ভূতপূর্ব উপগুল্মিক শ্রী মনোহর নাগ। তিনি এখানে আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত আছেন।

মনোহর নাগ এক পদক্ষেপ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সকলকে অভিবাদন করে নিশ্চুপ দণ্ডায়মান থাকলেন। তার পরিধানে অর্কদাসের অনুরূপ সামরিক সজ্জা। কেবল স্কন্ধে ঝোলানো উত্তরীয়টি পীতবর্ণের সঙ্গে লম্বালম্বি রক্তবর্ণ মিশ্রিত।  

অর্কদাস একটু থেমে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল- ইনি মহারাজের প্রধান সামরিক কর্মকর্তা কর্তৃক নিযুক্ত হলেও যতদিন এই পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির দায়িত্বে নিযুক্ত থাকবেন ততদিন সামন্ত মহোদয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশে দায়িত্ব পালন করবেন। এই বীথির অন্যান্য সকল সামরিক ব্যক্তিবর্গকে সামন্ত মহোদয়ের পরামর্শক্রমে গুল্মিক মহোদয় নিয়োগ দিয়েছেন এবং প্রত্যেকে তারই নির্দেশে দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকবেন। আমি নিজেও তারই নির্দেশে দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের এই বাহিনীতে নিযুক্ত আছেন একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিহারী। এতে এ পর্যন্ত মোট ২০ জন প্রতিহারী যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ প্রতিহারীসহ ৫ জন শিবপুর থেকে বদলি হয়ে এখানে এসেছেন। আমাদের পঞ্চায়েতে কর্মরত গ্রামরক্ষী দল থেকে যোগ দিয়েছেন ৮ জন এবং বিভিন্ন গ্রাম থেকে ৭ জন যুবককে বাছাই করে সামরিক-বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। শিবপুর থেকে আগত ৫ জন ছাড়া বাকি সকলকে বর্তমানে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এই সামরিক-বাহিনীর কর্তব্য হচ্ছে সামন্ত মহোদয়ের অনুগত থেকে মহারাজের শত্র“কে দমন করা এবং বীথির সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে সর্বদা সক্রিয় থাকা।

আপনারা হয়তো অবগত হয়েছেন যে কিছুদিন পূর্বে কদম্বঘাট গ্রামের বনপথে আমাদের বটেশ্বর আশ্রমের বৌদ্ধশ্রমণ শ্রী উদয়মান ও শ্রী হিঙ্গল মল­কে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা আক্রমণ করেছিল। নিজেদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধি ও সাহসের বলে তারা আত্মরক্ষা করে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল। এই ঘটনা ব্যতিক্রমধর্মী। আমাদের সমাজে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণত ঘটে না; নিশুতিরাত্রে গুপ্তঘাতকের আবির্ভাব-তো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এই ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধান-কার্যে তৎপর থেকে আমাদের গূঢ়পুরুষ-গূঢ়নারীগণ কিছু তথ্য উদ্ধার করেছে। সম্প্রতি সামরিক-বাহিনীর প্রশিক্ষিত দুজন প্রতিহারীর সহায়তায় সে-সকল তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আমাদের বীথির শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটানোর জন্য কোনো কোনো মহল অন্তর্ঘাতে লিপ্ত। আমাদের সামরিক-বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদেরকে প্ররোচিত করা হচ্ছে যেন ঘুষ দিয়ে, ধর্মগোলা থেকে অন্যায়ভাবে শস্যদান করে মাদকসেবী কিছু দুর্বৃত্তকে দিয়ে নানাবিধ অপরাধ সংঘঠিত করানো হয়। তাদের যুক্তি হলো এই যে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন রাজধর্ম। দুষ্ট সৃষ্টি না হলে তারা কাকে দমন করবে? দমন করার প্রয়োজন না থাকলে সশস্ত্র বাহিনীর কদর কমে যাবে, সামন্ত মহোদয় তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।

এ পর্যন্ত বক্তব্য শুনে উপস্থিত অনেকেই বিশেষ বিচলিত হয়ে পড়লেন। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন যে, এইসব অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিন ভট্ট দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন, এ সকল তথ্যের সত্যতার কোনো প্রমাণ আছে কি না।

মাধবশ্রী হাত তুলে সকলকে বললেন- আপনারা এক্ষণে ধৈর্য ধারণ করুন। অর্কদাসের বক্তব্য শেষ হলে আপনারা এ সকল বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুয়োগ পাবেন।

পুনরায় শুরু করল অর্কদাস- মান্যবর সুধীজন!

কিন্তু তার বক্তব্যে বাধা দিয়ে পুলিন ভট্ট মন্তব্য করলেন- অন্তর্ঘাত কোনো সমস্যা নয়। কোনো কোনো বৌদ্ধশ্রমণ এবং শুকদেব মহোদয় ও তার কন্যার আচরণে নীচকুলের মনুষ্যকুল প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং শাস্ত্র-বিরোধী হয়ে সমাজ-শাসনের নানাকর্মে প্রতিবাদী হয়ে পড়ছে। এ সবই শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবার প্রকৃত কারণ। কঠোর আর্যায়ন এবং ভাদ্রী পূর্ণিমার মতো অনার্য অনুষ্ঠানাদি নিয়ন্ত্রণ করাই প্রতিকারের একমাত্র উপায়।

বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব কিয়ৎ রাগত স্বরে বললেন- কিন্তু সে-কাজটি না করে গুপ্ত চুক্তি করা হলো কোন কারণে? অর্কদাস, তোমার অবশিষ্ট বক্তব্য সমাপ্ত করো।

উপস্থিত সকলের মধ্যে মৃদু গুঞ্জরণ উঠল। অনেকে পরস্পর বাক্য-বিনিময় শুরু করলেন। আচার্য মাধবশ্রী হস্ত উত্তোলন করে সকলকে শান্ত হতে নির্দেশ দিলেন।

পুনরায় শুরু করল অর্কদাস- মান্যবর সুধী! আমরা যাচাই করে আরো দেখেছি যে উগ্রপুরুষ অর্থাৎ পেশাদার গুপ্তঘাতকদলকে চুক্তিবদ্ধ করে আনয়নের লক্ষ্যে পঞ্চবটির বনাঞ্চলে অবস্থিত এক সাধুজীর আখড়ায় আমাদের গুল্মে কর্মরত বিশ্বস্ত দুজন প্রতিহারীকেও প্রেরণ করা হয়েছিল। এ সকল তথ্য ভয়াবহ অন্তর্ঘাতের ইঙ্গিত দান করে। সমবেত সুধীজন! আপনারা আমাদের সামন্ত মহোদয় ও বীথির জনগণের শুভাকাক্সক্ষী। আপনাদের সকলের সহযোগিতা আমাদের কাম্য। পরম পিতা শিবঠাকুর এবং ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদে আমাদের প্রত্যেকের অন্তরের মহৎ আকাক্সক্ষা পূর্ণ হোক। সকলের কল্যাণ হোক।

বক্তব্য সমাপ্ত করে পুনরায় সভা-পুরোহিত, বীথি-সামন্ত এবং সকলকে করজোড়ে অভিবাদন করে সে দুই পদক্ষেপ পশ্চাতে গেল। কিন্তু সেখানে গুল্মিক শ্রী মনোহর নাগকে উপস্থিত দেখতে পেল না।

তৎক্ষণাৎ কোলাহল শুরু হয়ে গেল। অন্তর্ঘাতের মূল হোতাকে প্রকাশ্যবিচারে সোপর্দ করার দাবি উঠল। কেউ কেউ তাকে খুঁজে বের করে এই বীথিতে অবাঞ্ছনীয় ঘোষণা করার দাবি জানাল। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো : এক,  নাশকতার বিরুদ্ধে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে এবং এই দায়িত্ব পালনে অর্কদাস সর্বশক্তি নিয়োগ করবে; দুই, মধুপুর্ণিমা এবং ভাদ্রীমেলা যথানিয়মে অনুষ্ঠিত হবে; তিন,  মধুপূর্ণিমার পূর্বেই অর্থাৎ আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির ধর্মপ্রবক্তা হিসাবে আচার্য মাধবশ্রী প্রকাশ্য দিবালোকে বিল্বগ্রামের অভিযুক্ত ব্রাহ্মণ যুবকদের, বিল্বগ্রাম পঞ্চায়েতের ধর্মপ্রবক্তার এবং অভিযোগ উত্থাপনকারী সকলের বক্তব্য শ্রবণ করে যথাবিহিত সিদ্ধান্ত নেবেন। এই শুনানী-কার্য তিনি বিষ্ণুমন্দির সম্মুখস্থ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে করবেন, যেন কৌতূহলী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে পারে; এবং চার, বর্ণ-গোত্র-ধর্মবিশ্বাস, ধনী-দরিদ্র ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার পূর্বশর্ত হিসাবে মান্য করা হবে। 

 

 

 

 

সভা সমাপ্তির পূর্বে পুলিন ভট্ট পুনরায় কতিপয় মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তিনি নারীর অধিকার, অসবর্ণ বিবাহ, রাজন্যের অধিকার, প্রজাকুলের অধিকার এবং ব্রাহ্মণের বিচার সম্পর্কে শাস্ত্রের বিধান কী তা সঠিকভাবে নির্ণয় করার দাবি উত্থাপন করলেন। এসকল প্রশ্নে বীথি-সামন্ত ও সভা-পুরোহিতকে দ্বিধাগ্রস্ত লক্ষ করে গুরু ভবদেব আচার্য অহিরুদ্র দেবের অনুমতি নিয়ে একটি শাস্ত্রার্থ পরিষদ অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব করলেন। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে আচার্য মাধবশ্রী ও বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণকে এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।

সভা সমাপ্ত হলে শুকদেব যখন গৃহে প্রত্যাগমন করলেন তখন দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত। মদনিকা ও মায়াবতী দুজনেই অভুক্ত। উদগ্রীব হয়ে তারা প্রতীক্ষা করছিল কখন শুকদেব প্রত্যাবর্তন করেন। গৃহপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেখেই প্রক্ষালনের জল এবং শুষ্ক বস্ত্রখণ্ড হস্তে সন্নিকটে উপস্থিত হলো মায়াবতী। মদনিকা উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল- সব দিক কুশল তো বাবা!

ভাদ্রের খরতাপে শুকদেবের দেহ ঘর্মাক্ত। বস্ত্রখণ্ডটি হাতে তুলে নিয়ে মুখমণ্ডল মার্জনা করে হাসলেন তিনি। একটা পরম স্বস্তির হাসি। দীর্ঘদিন পর শুকদেবকে নিরুদ্বেগে হাসতে দেখে আনন্দিত হলো মদনিকা ও মায়াবতী। ওরা কিছু বলার পূর্বেই তিনি বললেন- অনিশ্চয়তার কালো মেঘ যেন কেটে যাচ্ছে। সামনের দিন অতীব শুভ। আমাদেরকে সাহসী পদক্ষেপে অগ্রসর হতে হবে। আমরা নিঃসঙ্গ নই, নিরাবলম্ব নই। ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু!

 

 

বিশ.

দুই বৎসর পূর্বে আচার্য অহিরুদ্র দেব আচার্য মাধবশ্রীকে বটেশ্বরে প্রেরণ করেছিলেন অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। নব-প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত এবং সংলগ্ন বিদ্যাপীঠে আচার্যের দায়িত্ব পালন করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন এই প্রত্যাশা নিয়ে যে নিকট ভবিষ্যতে বটেশ্বরে একটি সুস্থ সমন্বয়ধর্মী শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। চতুর্বর্ণীয় ব্রাহ্মণ্য সমাজব্যবস্থা থাকা সত্তে্বও দিনে দিনে বিষ্ণুভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে এবং জ্ঞানচর্চা, ন্যায়নিষ্ঠা ও সংযতেন্দ্রীয় মানবিক আচরণের মাধ্যমে ব্রাহ্মণগণ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। প্রকৃতপক্ষে এ পথই পরম ভট্টারক প্রতাব চন্দ্র সেনের সমন্বয়ধর্মী রাজ্যনীতিমালা। এ পথেই রাজ্যের সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত রাখা সম্ভব। কিন্তু গুপ্তহত্যা এবং অন্তর্ঘাত প্রচেষ্টার বিবরণ শ্রবণ করে মাধবশ্রী বিশেষ উদ্বিগ্ন হলেন। বস্তুত পুলিন ভট্ট যে পথে অগ্রসর হচ্ছেন তাতে তো হিতে বিপরীত ঘটার সমূহ সম্ভাবনা আছে। বিল্বগ্রামের দেবপাড়ার যুবকদের অশালীন অশুভ আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা রাজকীয় সামরিক-বাহিনীর আশ্রয়ে মাদকসেবী দুর্বৃত্তদেরকে ইন্ধন দেয়া এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করা- এ সকল পদক্ষেপ কিছুতেই আর্য-ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না। মাধবশ্রী স্থির করলেন বিল্বগ্রামের যুবকদের অশোভন আচরণের শুনানী গ্রহণ করার ব্যবস্থা নেওয়া আশু প্রয়োজন। এ বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য তিনি দিবসের প্রথম প্রহরে গুরু ভবদেবের আশ্রমপানে যাত্রা করলেন। তাকে অনুসরণ করল অনুগত সেবিকা খুল­না এবং কলিঙ্গা।

আচার্য মাধবশ্রী ইতোপূর্বে বারকয়েক এই আশ্রমে এসেছেন। গুরু ভবদেবের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বন্ধুসুলভ এবং আন্তরিক। তারা দুজন সেদিনের মন্ত্রণাসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মধুপূর্ণিমার পূর্বেই শুনানী সম্পন্ন করার ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকল প্রতিকূলতা সত্তে¡ও মধুপূর্ণিমার পূর্ব-দিবসের পূর্বাহ্নকালে বিচারসভা আহ্বান করলেন আচার্য মাধবশ্রী। অভিযোগকারীদেরকে উপস্থিত করার দায়িত্ব দেওয়া হলো ইসিদাসীর ওপর। তিনি তার নারী-সহকর্মীদের সহায়তায় সকলের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। অভিযুক্ত যুবকদেরকে সংবাদ প্রেরণ করা এবং তাদেরকে সভায় উপস্থিত করানোর জন্য পুলিন ভট্টকে অনুরোধ করা হলো। বিল্বগ্রাম পঞ্চায়েতের গ্রামিক এবং ধর্মপ্রবক্তাকে সংবাদ প্রেরণ করার দায়িত্ব নিল অর্কদাস। শুনানী যেহেতু বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ যুবকদের আচরণ নিয়ে, সেহেতু পঞ্চায়েতের গ্রামিক ও ধর্মপ্রবক্তার সঙ্গে অধিকাংশ পঞ্চায়েত সদস্য এবং গ্রামের প্রবীণেরা উপস্থিত হলেন। সংক্ষুব্ধ অন্ত্যজ নারীদের সঙ্গে তাদের পারিবারের লোকজনও উপস্থিত হলো। উপস্থিত হলেন প্রদোষ দেব বর্মণ, গুরু ভবদেব, শুকদেব, উদয়মান, হিঙ্গল ও মায়াবতী। কিন্তু অভিযুক্ত যুবকবৃন্দকে বিচারসভায় উপস্থিত দেখা গেল না। বেশ খানিকক্ষণ বিলম্ব করে পুলিন ভট্ট এলেন দেবপাড়ার দুয়েকজন প্রবীণ ব্রাহ্মণসহ।

মাধবশ্রী কিছুটা বিব্রত হলেন। তবু সামন্ত মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে কী ঘটেছিল সে-বিষয়টি সকলের অবগতির জন্য অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতেই যথানিয়মে শুনানীকর্ম আরম্ভ করলেন। তিনি সকলকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- বীথি-অধিকরণগৃহে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মন্ত্রণাসভার সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি এই বীথির প্রধান ধর্মপ্রবক্তা হিসাবে বিল্বগ্রামের দেবপাড়ার কতিপয় যুবকের অশালীন আচরণে সংক্ষুব্ধ নারীদের অভিযোগ সকলের সম্মুখে ব্যক্ত করার অনুমতি দিচ্ছি।

ইসিদাসী এগিয়ে এসে অভিযোগকারী নারীদের নাম-পরিচয় দান করতে সাহায্য করলে প্রত্যেকে তাদের নাম-পরিচয় জানিয়ে অভিযোগ উত্থাপন করল। সকলে জানাল যে, ঐ দিবসেই সকলে মিলে বিল্বগ্রামের পঞ্চায়েতের গ্রামিকের পরামর্শে ধর্মপ্রবক্তার নিকট যান। ধর্মপ্রবক্তা অভিযোগ গ্রহণ করতে প্রথমে দ্বিধা করেন; সকলে অনুরোধ-উপরোধ করলে জানান যে, ব্রাহ্মণ যুবকদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ গ্রহণ করতে অপারগ। অতঃপর তারা গুরুদেব ও আচার্য মহোদয়ের নিকট বিষয়টি জানিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে।

বিল্বগ্রামের গ্রামিক এবং ধর্মপ্রবক্তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বিবরণের সত্যতা স্বীকার করলেন। আচার্য মাধবশ্রী কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে উপস্থিত ব্রাহ্মণ প্রবীণদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন- আমাদের শাস্ত্রে কোথাও এমন বিধান কি আছে যে অন্ত্যজ নারীরা কোনো ব্রাহ্মণ অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারবে না?

শাস্ত্র থেকে কেউ কোনো বিধানের কথা উল্লেখ করতে না পারলেও একজন উঠে জানালেন যে- এরূপ ঘটনা যুবকেরা অতীতেও অনেক সময়ে ঘটিয়েছে। আমাদের গোচরে এলে আমরা তাদেরকে পারিবারিকভাবে ভর্ৎসনা করে দিয়েছি- কখনও আনুষ্ঠানিক বিচারসভায় উপস্থিত করা হয় নি। একই কারণে অভিযুক্ত যুবকেরাও এ সভায় উপস্থিত থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

আচার্য মাধবশ্রী মন্তব্য করলেন- বিচারসভায় যথানিয়মে আহূত হলে অনুপস্থিত থাকাও আরেকটি অপরাধ। তার জন্যও শাস্তি হতে পারে। 

পুলিন ভট্ট দাঁড়িয়ে বললেন- আমার বিবেচনায় বিল্বগ্রামের ধর্মপ্রবক্তা সঠিক কর্মটি করেছেন। ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে বরং কোনো অভিযোগ উত্থাপন করলে ব্রহ্মদূষণের অপরাধ সংঘটিত হয়। মনুসংহিতার এই বিধান যথাযথ মান্যতা না পেলে ব্রাহ্মণ্য-সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে সমূহ অকল্যাণ হতে পারে।

এ সময় উদয়মান দাঁড়িয়ে আচার্যদেবের নিকট কিছু বলার অনুমতি প্রার্থনা করল। আচার্যদেব অনুমতি প্রদান করলে উদয়মান সকলকে অভিবাদন জানিয়ে নিবেদন করল- মান্যবর মহাশয়গণ, আমি এই সভায় কিছু বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়ে ধন্য। আমি বিনয়ের সঙ্গে সকলের অবগতির জন্য বলছি, আমি ব্রাহ্মণকুল-জাত নই। তবে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ আচার্য অহিরুদ্র দেব এবং গুরু ভবদেবের আশ্রমে থেকে দীর্ঘদিন শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। মগধে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের সময়কাল থেকে সমগ্র সাম্রাজ্যব্যাপী একটা ব্রাহ্মণ্য-উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে। গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর এই উন্মাদনা ভিন্ন মতাবলম্বী কিংবা অব্রাহ্মণদের প্রতি নির্যাতন-নিগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনুসংহিতায় শূদ্র ও অন্ত্যজদের পদানত রাখার নানাবিধ বিধান যুক্ত আছে। তৎসত্ত্বেও মনুর বিধানই শূদ্রসহ সকল বর্ণের স্ত্রীদের সূচিতা সমানভাবে রক্ষা করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ব্যভিচারী ব্রাহ্মণের জন্য প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশে বলা হয়েছে যে, ব্রাহ্মণ ব্যভিচারী ব্যক্তি ৩ বৎসর ভিক্ষান্নজীবী থাকবেন এবং প্রতিদিন মন্ত্র জপ করে পাপস্খালন করবেন। মনুসংহিতায় ব্রাহ্মণকে নিষ্ঠার সঙ্গে শীল পালন করার তাগিদ দিয়েছে এবং শীল-বর্জিত ব্রাহ্মণকে পতিত বলে তিরস্কার করা হয়েছে। এখানে পণ্ডিত পুলিন ভট্টসহ অনেকেই উপস্থিত আছেন। আশা করি এ সকল নির্দেশ এবং বিধান সম্পর্কে সকলেই অবগত আছেন।

এতখানি বক্তব্য প্রদান করে উদয়মান নীরবে বসে পড়ল। চতুর্দিকে মৃদু গুঞ্জন উত্থিত হলো। অনেকে উদয়মানের জ্ঞান ও সাহসী বক্তব্যের প্রশংসা করল। ইতোমধ্যে আরো দুয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি তাদের সংক্ষিপ্ত মতামত জ্ঞাপন করলেন। ইসিদাসীর পশ্চাৎ থেকে সম্মুখে এগিয়ে এসে মায়াবতী মন্তব্য করল- আমি মান্যবর গুরুজন ও ধর্মপ্রবক্তাগণের বিবেচনার জন্য বলতে চাই যে কেবল ব্রাহ্মণকুলে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মণ হওয়া যায় না। ব্রাহ্মণ বলে স্বীকৃত হওয়া যায় নিজ তপস্যা, জ্ঞানার্জন ও আচরণের দ্বারা। এ সূত্রে আমরা ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ ব্যাস, কৌশিক, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ এদের কথা স্মরণ করতে পারি।

অতঃপর আচার্য মাধবশ্রী বললেন- সমুদয় বক্তব্য শ্রবণ করে আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে চাই যে, সংক্ষুব্ধ নারীগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে। বিল্বগ্রামের গ্রামিক, ধর্মপ্রবক্তা ও অন্যান্য প্রবীণদেরকে আমি দেবপাড়ার অভিযুক্ত যুবকদেরকে পরবর্তী কোনো নির্ধারিত বিচারসভায় উপস্থিত করার সুযোগদান করছি। অন্যথায় আমরা সেই যুবকদের বিরুদ্ধে তাদের অনুপস্থিতেই কঠোর দণ্ডদান করব এবং সামন্ত মহোদয়কে দণ্ড কার্যকর করার অনুরোধ জানাব।

রায় ঘোষণা করে আচার্যদেব তার আসন ত্যাগ করে দণ্ডায়মান হলে পুলিন ভট্ট কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু মাধবশ্রী কঠোরকণ্ঠে বললেন- আপনার কথা বহুবার শ্রবণ করেছি। আপনি ভবদেবের আশ্রম ভেঙ্গে দেবার পরামর্শ দিয়েছেন, শ্রী উদয়মানকে এলাকা থেকে বহিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন, অথচ পলাশতলী-বটেশ্বর বীথি আপনার কর্ম-এলাকা নয়। আপনি এই বীথিতে নানাবিধ অশান্তি সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ আছে। আমি মনে করি আমাদের বীথি পরিচালনা-কার্যে আপনার হস্তক্ষেপ সর্বদা সর্বাংশে কল্যাণকর নাও হতে পারে। আপনি নিশ্চুপ থাকুন।

পুলিন ভট্ট অপমানিত হয়ে দ্রুত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন। প্রস্থানকালে মনোহর নাগকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত প্রদান করলেও তা উপেক্ষা করে সে সামন্ত মহোদয়ের পশ্চাতে সামরিক কায়দায় ঋজু হয়ে দণ্ডায়মান থাকল। বিচারসভা সেদিনের মতো সমাপ্ত হলে নারীগণ একযোগে উলুধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে করতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করল।

পরদিন যথানিয়মে যথাসময়ে মধুপূর্ণিমার পূজা এবং মেলা-অনুষ্ঠান শুরু হলো। ইতোমধ্যে পুলিন ভট্টের নানাবিধ ষড়যন্ত্রের কথা, অর্কদাসের অনুসন্ধানে উদ্ঘাটিত রহস্যের বিষয় এবং সর্বশেষে বিচারসভায় উদয়মানের সাহসী বক্তব্যে পুলিন ভট্ট যে মুখ লুকানোর জায়গা পান নি- এসব কথা বহু শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সর্বত্র আলোচিত হতে থাকল। এ প্রক্রিয়ায় একটা ব্যাপারে জনমত সংগঠিত হলো যে, পণ্ডিত পুলিন ভট্ট পলাশতলী-বটেশ্বর এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করছেন। তাকে অবিলম্বে এলাকা থেকে বহিষ্কার করা প্রয়োজন। পলিন ভট্ট এবং তার অনুগত লোকজন যেন কোনোপ্রকারে মেলায় গোলযোগ সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য গূঢ়পুরুষ-গূঢ়নারীগণ সদা সতর্ক ছিল; শস্ত্রধারী প্রতিহারী ও রক্ষীদলও ছিল প্রস্তুত। অর্কদাসের কঠোর এবং সতর্ক ব্যবস্থার ফলে কোনোরূপ শৃঙ্খলাবিঘ্নকারী ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে পূজা এবং মেলা সমাপ্ত হলো। 

মেলা-অনুষ্ঠানের পরপরই অর্কদাস প্রত্যাশা করছিল যে তার বিবাহ-প্রস্তাব নিয়ে সামন্ত মহোদয় এবার অগ্রসর হবেন। কিন্তু মেলার রেশ কাটতে না কাটতে সামন্ত মহোদয় আচার্য মাধবশ্রী ও গুরু ভবদেবকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন একটি কার্যকর শাস্ত্রার্থ পরিষদ অনুষ্ঠানের জন্য। পুলিন ভট্টের অপচেষ্টায় ব্রাহ্মণকুলের মধ্যে নিম্নবর্ণ এবং নারী-বিরোধী একটা উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে। এ সবের প্রতিক্রিয়ায় অন্ত্যজ ও বনবাসী গোষ্ঠীসমূহের মধ্যেও এক ধরনের চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেছে। প্রশাসন-ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে এবং সর্বস্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটা শাস্ত্রার্থ পরিষদ সহায়তা করতে পারবে বলে মান্যজনেরা বিবেচনা করছিলেন। এ উপলক্ষে প্রদোষ দেব বর্মণ একদিন আচার্য মাধবশ্রীসহ যাত্রা করলেন সম্ভারের উদ্দেশে। যাত্রার প্রাক্কালে জ্যেষ্ঠ কায়স্থ ও অর্কদাসকে বিশেষ সাবধান থাকতে বলে গেলেন। তাদের অনুপস্থিতিতে মনোহার নাগ এলাকায় যাতে কোনো দুষ্কর্মে সহায়তা করতে না পারে তজ্জন্য নিরাপত্তা বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলে তাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। এর খুব অল্পকাল পরেই শাস্ত্রার্থ পরিষদ বিষয়ে সম্ভার মহারাজের পূর্ণ অনুমতি নিয়ে তারা বটেশ্বরে ফিরে এলেন।

দীর্ঘ দুই বৎসর পর পুনরায় শাস্ত্রার্থ পরিষদের আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। অহিরুদ্র দেব আচার্য মাধবশ্রীকে পৌরোহিত্য করার নির্দেশ দান করেছেন। শাস্ত্রালোচনা করার জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছে ঢবাকা নগর পরিষদের ব্রাহ্মণ সদস্য পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মাকে, মধুপুর বীথির প্রধান ধর্মপ্রবক্তা শ্রী নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদীকে এবং অহিরুদ্র দেবের প্রিয় শিষ্য বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্রকে। পুলিন ভট্ট, উদয়মান এবং গ্রাম-পঞ্চায়েতের ব্রাহ্মণ, ধর্ম-প্রবক্তা ছাড়া গুরু ভবদেব এবং আচার্য মাধবশ্রীর আশ্রমিকগণও অংশগ্রহণ করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে। দর্শক-শ্রোতাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ন্যায়সঙ্গত যে কোনো প্রশ্নকে আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করে সমাধান দানেরও পরামর্শ গৃহীত হয়েছে। ব্রাহ্মণের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার বিচারকার্যের কীরূপ ব্যবস্থা হবে; অসবর্ণ বিবাহ, নারীর অধিকার, প্রজাকুলের অধিকার এবং সর্বোপরি সকল রাজন্যই বিষ্ণুর অবতার হিসাবে মান্য কি না; কর্মফল-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং বর্ণাশ্রমের প্রয়োগবিধি ইত্যাদি বিষয়ে শাস্ত্রসম্মত আলোচনার মাধ্যমে জনমনে ঐকমত্য সৃষ্টি করা শাস্ত্রার্থ পরিষদের লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। সবার প্রত্যাশা এরূপ খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে মানুষের মনে জমাটবদ্ধ প্রশ্ন ও ক্ষোভের উপশম হবে এবং রাজ্যশাসনে জনগোষ্ঠীর সক্রিয় সম্মতি নিশ্চিত হবে। বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণকে পরিষদ চলাকালীন শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধশ্রমণ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ তাদের ব্রত সমাপন করলেন। বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায় ভগবান কর্তৃক ভিক্ষুসংঘকে নির্দেশদান করা হলো, কঠিন চিবর দান আরম্ভ হলো। বন-উপবনে তখনও উল­সিত নরনারীর অনির্বচনীয় আনন্দের প্রকাশ, সুমধুর সঙ্গীতের মুখরতা।

অন্যদিকে গুরু ভবদেব ও আচার্য মাধবশ্রীর আশ্রমিক ও কর্মীগণের ব্যস্ততার পরিসীমা নেই। দ্বিবর্ষ পূর্বে অনুষ্ঠিত শাস্ত্রার্থ পরিষদের তুলনায় এবারের শাস্ত্রার্থ পরিষদের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা আলোচ্য বিষয়সমূহ কোনো আঞ্চলিক সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে নয়, বরং সমগ্র রাজ্যশাসনের এবং সমাজ-নিয়ন্ত্রণের মৌলিক কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে নির্ধারিত হয়েছে। তদুপরি সম্ভার রাজ্যের বিভিন্ন বীথি থেকে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রজ্ঞগণকে আলোচক হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আলোচক অতিথিগণ নির্ধারিত দিবসের এক-আধদিন পূর্বেই বটেশ্বরে উপস্থিত হবেন। সে-কারণে তাদের আহার-বাসস্থান-বিশ্রামের যথাযথ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢবাকার পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা এবং মধুপুর বীথির শ্রী নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদীর থাকার ব্যবস্থা করা হলো আচার্য মাধবশ্রীর আশ্রমে। তাদের ব্যক্তিগত সেবাদানের জন্য যে সহযাত্রীগণ আসবে তাদেরও থাকা-খাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখা হলো। বৌদ্ধশ্রমণ শ্রী চন্দ্রশেখর মৈত্রের থাকার ব্যবস্থা করা হলো গুরু ভবদেবের আশ্রমে। তার অনুষঙ্গী হয়ে আসছেন এক শৈব সন্ত এবং চার-পাঁচ জন অনুচরসহ গুপ্ত সাম্রাজ্যে কর্মরত এক সামরিক রাজপুরুষ।

এসকল ব্যবস্থাদি লক্ষ করে পুলিন ভট্ট চিন্তাকুল হলেন। তিনি নিজ বীথির সামন্ত রুহীদত্ত ও গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষের সঙ্গে ঘন ঘন মত-বিনিময়ে ব্যস্ত রইলেন। হলায়ুধ মিশ্রের বিদ্যাপীঠের বাল্যকালের সতীর্থ এবং বর্তমানের মিত্র দেবজ্যোতি শর্মার সঙ্গে কীভাবে শাস্ত্রার্থ পরিষদ অনুষ্ঠানের পূর্বেই একান্তে মত-বিনিময় করে নেওয়া যায় তাই নিয়ে নানা শলাপরামর্শ করতে থাকলেন।

শাস্ত্রার্থ পরিষদের অন্যতম বিশেষজ্ঞ-আলোচক শ্রী চন্দ্রশেখর মৈত্র। তিনি সম্ভারের টৌক বন্দর থেকে যাত্রা করে লক্ষ্যা নদীপথে ভাটিতে, অতঃপর কালী নদীর উজান বেয়ে পঞ্চবটি পৌঁছালেন দ্বিপ্রহরে। নৌযানে ভোজনপর্ব সমাধা করে অনুষঙ্গী একজন শৈবসন্ত, গুপ্ত সামাজ্যের এক রাজপুরুষসহ তিনি পদব্রজে যাত্রা করলেন পথপ্রদর্শকের সহায়তা নিয়ে। ভবদেবের আশ্রমে এসে যখন পৌঁছালেন তখন অপরাহ্ন স্তিমিত হয়ে এসেছে। তিনি ও প্রবীণ আশ্রমিকগণ অতিথিদেরকে অভ্যর্থনা করার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। ভবদেব নিজে এগিয়ে এসে সকল মান্যবর এবং গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে স্বাগত জানালেন। পরিচ্ছন্ন হয়ে আহারাদি সমাপ্ত করে অতিথিগণ যেন নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারেন সকলকে এই নির্দেশ দিয়ে তিনি নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। ইসিদাসীর নেতৃত্বে যথাযথ ব্যবস্থা গৃহীত হলো। সশস্ত্র অনুচর ও কতিপয় ভৃত্যজনকে অধিকরণগৃহ-সংলগ্ন বীথি-সামন্তের অতিথিশালায় প্রেরণ করা হলো। অতিথিগণের বিশ্রামের জন্য মাদুর পেতে শয্যার ব্যবস্থা করা হলো উদয়মান ও হিঙ্গলের গৃহে।

সন্ধ্যা-প্রদীপের অস্পষ্ট আলোতে চন্দ্রশেখর মৈত্র তার সঙ্গী দুজনকে নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। অন্যদুজন বিশেষজ্ঞ, যাদের একজন ঢবাকা থেকে অন্যজন মধুপুর থেকে, তখনও এসে পৌঁছেন নি। তারা আসছেন নৌপথে- হয়তো আগামীকাল প্রত্যুষে এসে পৌঁছাবেন। উদয়মান ও হিঙ্গলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ইসিদাসী বটেশ্বরের সর্বশেষ তথ্যাদি জ্ঞাত হবার চেষ্টা করছিলেন। শাস্ত্রার্থ পরিষদের প্রস্তুতির কথাও জিজ্ঞেস করছিলেন। মধ্যখানে মাত্র একটি দিবস।

এসব বিবিধ ভাবনা ও বাক্যালাপের এক পর্যায়ে অর্কদাস এসে উপস্থিত হলো সেখানে এবং হাস্যমুখে অতিথিদেরকে অভিবাদন জানিয়ে নিজ পরিচয় প্রদান করল। বিনয়ের সঙ্গে বলল- আমি পলাশতলী-বটেশ্বর বীথিতে কর্মরত সামান্য প্রতিহারী মাত্র। আমি খুবই গৌরববোধ করছি আপনাদের মতো শাস্ত্রজ্ঞ বুধজনকে অভিবাদন জানানোর সুযোগ পেয়ে। আজ থেকে দ্বিবর্ষ পূর্বে মাননীয় অতিথি মহাভিক্ষু মহাজ্ঞানী শ্রী চন্দ্রশেখর মৈত্র মহোদয়কে আমাদের মাঝে একবার পেয়েছিলাম। পুনরায় তিনি এই বটেশ্বরে পদধূলি দিয়েছেন এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমরা আরো আহ্লাদিত এই কারণে যে তার অনুষঙ্গী হয়ে এসেছেন একজন শৈব সন্ত এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের একজন তরুণ সামরিক রাজপুরুষ। অতঃপর উদয়মানের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে কিয়ৎক্ষণ থেমে পুনরায় বলল- এই তরুণ রাজপুরুষ, আমরা জ্ঞাত হয়েছি, আমাদের একান্ত আপনজন। তিনি এই আশ্রমের অগ্রজতূল্য বন্ধু জ্ঞানীভিক্ষু শ্রী উদয়মানের কনিষ্ঠ সহোদর।

উপস্থিত সকলের মধ্যে অকস্মাৎ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। কেবল অকম্প স্থির উপবিষ্ট থাকলেন শ্রী চন্দ্রশেখর মৈত্র। তিনি কি পূর্বেই অবগত ছিলেন যে অর্কদাস মহাসামন্ত অর্চিষ্মান ঘোষের পুত্রদ্বয়কে এরূপ আকস্মিকতার মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত করাবে- বিষয়টি অন্যদের বিশেষ ভাবনার কারণ হলো। উদয়মান নিজ আসনস্থলেই দণ্ডায়মান হয়ে অনড় দাঁড়িয়ে থাকল। তার শালপ্রাংশু দেহখানি কম্পিত হলো, নিশ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হলো। উদ্গত রোদন সংবরণ করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় সে যেন নিরত হলো। অংশুমান লম্ফ দিয়ে চিৎকার করে উঠল- দাদা! আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা! এইখানে! এইভাবে! দুই হস্ত প্রসারিত করে নিকটে এসে সে উদয়মানের পদতলে লুটিয়ে পড়ল। ক্রন্দনাবেগ সংবরণ করে ব্যক্ত করল- মাতার পদধূলি স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া অগ্রজকে খুঁজে বের করব। পেয়েছি, শিবশঙ্কর সহায় হয়েছেন। মায়ের পদস্পর্শ করে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তার আশীর্বাদে তা আজ পূর্ণ হলো।

উদয়মান পদতলে লুটিয়ে-পড়া কনিষ্ঠকে বুকে টেনে নিল। তার পরিধানে রাজসিক বেশ নাই। কিয়ৎক্ষণ পর দুজনেই অব্যাহত অশ্র“পাত সংবরণ করে একসময় কথা বলল, কুশলাদি জিজ্ঞাসা করল। উদয়মান ব্যগ্র হয়ে জানতে চাইল মাতা-পিতা কেমন আছেন, তার সন্ধানে অংশুমান এই দূরদেশে পাড়ি দিয়েছে সে-কথা মাতা-পিতা অবগত আছেন কি না, ইত্যাকার নানা বিষয়। 

এরূপ একটা নাটকীয় পরিবেশে সকলে যখন বিস্ময়াবিষ্ট তখন স্নিগ্ধ কৌতুকের সঙ্গে খানিক হেসে চন্দ্রশেখর বললেন- তোমরা সকলেই স্থিত হও। উৎকণ্ঠার কোনো কারণ নেই। অংশুমান ক্ষুদ্রাকৃতির একটি অনুচর দলসহ সম্ভার মহারাজের সম্মতি নিয়ে যখন আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছে তখনই বিশেষ দূত-মারফত পত্রযোগে তোমাদের পিতৃদেব কর্ণসুবর্ণের মহাসামন্ত শ্রী অর্চিষ্মান ঘোষকে সকল বিষয় অবগত করেছি। আমি এও জানিয়েছি যে তাদের সুযোগ্য পুত্র শ্রী উদয়মান দীর্ঘ প্রব্রজ্যা সমাপান্তে প্রথমে সম্ভার মহারাজের কুলগুরু আচার্য অহিরুদ্র দেবের আশ্রমে স্থিত হয়েছিল বৌদ্ধশ্রমণ হিসাবে। দুই বৎসর অতিক্রান্ত হলো সে বটেশ্বরে গুরু ভবদেবের আশ্রমে থেকে জ্ঞানচর্চা ও মানবসেবায় নিরত।

 

জ্ঞানচর্চা করে সে শ্রমণ থেকে নিজেকে জ্ঞানী-বুধজনে রূপান্তরিত করেছে; মানবসেবায় রূপান্তরিত হয়েছে সর্বত্যাগী ভিক্ষুতে। গৃহত্যাগের প্রাক্কালে ব্রাহ্মণদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে নির্যাতিত প্রাকৃতজনের পক্ষে আজীবন সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষাত্রধর্ম পালনের যে অঙ্গীকার সে করেছিল তা অদ্যাবধি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে।

উৎসুক হয়ে অংশুমান বলল- দাদা, আমাদের সঙ্গে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করবে না? আমিও প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার সঙ্গে আমিও একই ক্ষাত্রধর্ম পালন করব। আমাদের প্রজাহিতৈষী সম্রাট মহামতি কুমার গুপ্ত রাজকার্যে নিয়োজিত কপটাচারী ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যেসকল ব্যবস্থা নেবেন সেখানে আমরা তাকে সহায়তা দান করতে পারি। দাদা! তুমি তো জানোই বহু পূর্বেই তিনি নিজে শৈব ধর্ম গ্রহণ করেছেন। শৈবগণ ন্যায়ভিত্তিক সকল ধর্মমতের সমন্বয়ে বিশ্বাসী।

উদয়মান কনিষ্ঠ ভ্রাতার মুখপানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। সেই বিনম্র লাজুক কিশোর এখন বলিষ্ঠ যুবক। সামরিক রাজপুরুষ। কত আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে নিজের করণীয়ের কথা ব্যক্ত করছে!

উদয়মান কিছু বলতে উদ্যত হলো। কিন্তু তার পূর্বেই চন্দ্রশেখর বললেন- সে তো বৌদ্ধধর্মমত গ্রহণ করেছে, বৌদ্ধসংঘে যোগ দিয়ে ভিক্ষু হয়েছে। অংশুমান! তুমি যদি তাকে পিতৃগৃহে নিয়ে যাও তবুও সে গৃহী হতে পারবে না, শৈব হতে পারবে না। অতঃপর উদয়মানের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সহাস্যে বললেন- কী উদয়মান! তুমি কি পারবে পুনরায় গৃহী হতে?

কিয়ৎকাল নতমুখে নীরব থাকল উদয়মান। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়াবতীর চেহারা। উদয়মানকে যেন সে আবেদন করে বলছে- এসো নিজেদের মতো করে আমরাও সকল নিগৃহীত প্রাকৃতজনকে নিয়ে গড়ে তুলি শৈব ধর্মভিত্তিক এক মানবিক সভ্যতা।

পুনরায় প্রশ্ন করলেন চন্দ্রশেখর- কী ভাবছ উদয়? তুমি পারবে পুনরায় গৃহী হতে?

অকস্মাৎ উপস্থিত সকলকে বিস্মিত করে দিয়ে উদয়মান ঘোষণা করল- বেশ কদিন থেকেই ভাবছি মহাসাঙ্ঘিক বৌদ্ধমত গ্রহণ করব, না কি শৈব ধর্মমত গ্রহণ করব।

চন্দ্রশেখর যেন আকাশ থেকে পড়লেন। সোজা হয়ে বসলেন। উদয়মানের কণ্ঠনিঃসৃত বক্তব্য সঠিক শুনেছেন কি না তার সন্দেহ হলো। প্রশ্ন করলেন- বলো কী! এতদিন যে সর্বস্ব ত্যাগ করেছ- ভিক্ষুর ত্যাগ, ইন্দ্রিয়সংযম, কামনার বিলোপ এবং নির্বাণের মাধ্যমে সকল জীবের কল্যাণ- সে-সাধনার কী হবে?

এবার উদয়মান স্বাভাবিককণ্ঠে স্পষ্ট করে বলল- ওটা আত্ম-প্রবঞ্চনা মাত্র। বিচ্ছিন্নভাবে একক নির্বাণের মাধ্যমে জগতের কল্যাণ কী করে হবে? সেদিন মায়াবতীর সঙ্গে আলোচনা করে আমি বুঝতে পেরেছি- আর্যব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমে আকীর্ণ ব্যবস্থার প্রতি আমরা বৌদ্ধগণ বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছি। বৌদ্ধমত আনন্দহীনের ধর্ম। পক্ষান্তরে শিবের নাচন আনন্দসাগরে ডুব দেওয়া- শবর, মল্ল, রাজবংশী, কোচ, কর্বট, কৃষিজীবী, বনবাসী আমরা সকলে মিলে শিবের মতো নাচতে পারি। ব্রাহ্মণদের নির্যাতন থেকে বাঁচার লক্ষ্যে শৈব ধর্মভিত্তিক মানবিক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারি। বলতে বলতে সে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ল- হয়তো কোন সুদূর ভবিষ্যতের আনন্দসাগরে ডুব দিয়ে কর্বট কন্যা মায়াবতীর সাথে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে অফুরন্ত প্রাণশক্তি আকণ্ঠ পান করছিল।

 

এবার অর্কদাস বলল- বন্ধু উদয়মান! তোমার কি স্মরণে আছে আজ থেকে দুই বর্ষ পূর্বে কোনো এক শীতের অপরাহ্নে মন্দিরের পশ্চাতে সেই পনস বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে কর্বট কন্যা মায়াবতী, বনবাসী হিঙ্গল এবং কোচপুত্র আমি, আমরা এক সঙ্গে একটা ব্রত পালন করার শপথ গ্রহণ করেছিলাম। ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম পালনের যে ঘোষণা দিয়েছিলে আমাদের সঙ্গে থেকেই সে-লড়াই তোমাকে করতে হবে। মনে রেখো।

অংশুমান গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করছিল চন্দ্রশেখর মৈত্র, উদয়মান ও অর্কদাসের কথোপকথন। কী মন্ত্রণা দিয়েছিল মায়াবতী? যে-বৌদ্ধ ধর্মমত গ্রহণ করে উদয়মান ব্যক্তিজীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করেছিল, মাতা-পিতার স্নেহাশ্রয় উপেক্ষা করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে অসাধ্য সাধনের ব্রত নিয়েছিল- এই নারীর প্রভাবে সে উপলব্ধি করছে বৌদ্ধমত আনন্দহীনের ধর্ম! পক্ষান্তরে শিবের নাচন আনন্দসাগরে ডুব দেওয়া! শৈব ধর্মভিত্তিক মানবিক সভ্যতা গড়ে তুলেই ব্রাহ্মণ্য নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব!

অংশুমান একপা-দুপা অগ্রসর হয়ে অর্কদাসের হস্তধারণ করে বলল- আমিও এ লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত থাকব। অতঃপর সে জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আকুলকণ্ঠে নিবেদন করল- ভগিনী! আমাকে সেই কর্বট কন্যার নিকট নিয়ে যেতে পারেন? সেই মহিয়সী নারী যদি আমার বয়োকনিষ্ঠ না হন তাহলে তার পদস্পর্শ করে অভিবাদন করব।

 

 

একুশ

বটেশ্বর শিবমন্দির ও বিষ্ণুমন্দিরের সম্মুখে একটি নাতিবৃহৎ বেদী। মন্দিরগৃহ দুটি খুবই সাদাসিধে। একই নক্সা, একই আকৃতি, একই উচ্চতা। কোণাকৃতির মৃত্তিকা নির্মিত আচ্ছাদনের নিচে বিগ্রহ দুটি স্থাপিত। সম্মুখভাগ উন্মুক্ত, তার সামনেই অপ্রশস্ত মণ্ডপ। মন্দির দুটির পশ্চাতে দৃঢ় বংশদণ্ডের ওপর দুটি ভিন্নবর্ণের ধ্বজা উড্ডীন। শিবমন্দিরের ধ্বজা রক্তবর্ণের, বিষ্ণুমন্দিরের ধ্বজা গৈরিক।

শাস্ত্রার্থ পরিষদের আলোচনা উদ্বোধনের জন্য বেদীর চতুর্পাশ্বে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনের ব্যবস্থা করা ছিল। আচার্য মাধবশ্রী যথাসময়ে অগ্রসর হয়ে একটি মঙ্গলপ্রদীপে অগ্নিসংযোগ করলেন। তাকে অনুসরণ করলেন গুরু ভবদেব, পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা, আচার্য নারায়ণচন্দ্র চতুর্বেদী, বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র এবং পণ্ডিত পুলিন ভট্ট। আচার্য মাধবশ্রীকে মধ্যস্থ করে সকলে অর্ধাচন্দ্রাকারে বেদীতে উপবেশন করলেন। ইসিদাসীর নেতৃত্বে মায়াবতী, লহনা, খুল্লনা, কলিঙ্গা এবং মণ্ডপের বামপার্শ্বে উপবিষ্ট বহু-সংখ্যক নারী উলুধ্বনি দিল। উপস্থিত সকলের মধ্যে বিপুল প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। প্রচণ্ড উৎসাহে উপস্থিত ভক্তজন কেউ কেউ দণ্ডায়মান হয়ে যুক্তকরে মন্দিরদ্বয়কে সম্মুখে রেখে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রার্থনা করল। তাদের অন্তরের অভীষ্ট শিব নাকি বিষ্ণু তা স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই। বেদীর ডানপার্শ্বের ভূমিতলে বীথি-সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মন, শিবপুরের রুহীদত্ত, বটেশ্বরের শুকদেব ও অন্যান্য প্রবীণেরা বসে পড়লেন। শিবপুরের গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষ, পলাশতলী-বটেশ্বরের গুল্মিক মনোহর নাগ বসলেন এক প্রান্তে পাশাপাশি। উপ-গুল্মিক অর্কদাস জনাকয়েক সশস্ত্র প্রতিহারী বেষ্টিত হয়ে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকল সকলের পশ্চাতে।

মণ্ডপের সম্মুখভাগে সম্মানজনক কিছু স্থান ফাঁকা রেখে অগণিত দর্শক-শ্রোতা। সেখানে নীরবে উপবেশন করল অংশুমান ও তার সঙ্গী শৈবসন্ত, উদয়মান এবং হিঙ্গল মল­¬। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে নানা বর্ণের নানা ধরনের পোশাকে সজ্জিত। সর্বত্র একটা উৎসবের মেজাজ। অনিঃশেষ কৌতূহল।

আচার্য মাধবশ্রী দণ্ডায়মান হলেন। দুটি মন্দির থেকেই সমভাবে ঘণ্টাধ্বনি উঠল। সকলের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো মাধবশ্রীর প্রতি। তিনি অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ করলেন এবং উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দুই হস্ত উত্তোলন করে সকলকে শান্ত থাকার ইঙ্গিত করলেন। স্বল্পকথায় আলোচনার পদ্ধতি ও অবশ্য-পালনীয় বিধানাবলি ব্যাখ্যা করলেন। অতঃপর বললেন- আজকের পরিষদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজন্য ও ব্রাহ্মণ স¤প্রদায়ের মর্যাদা, প্রজাকুলের দায়িত্ব, সমাজে নারীর অধিকার এবং জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে শাস্ত্রের বিধান বিষয়ে এখানে আলোচিত হবে। এই আলোচনায় আমাদের সামনে উপস্থিত আছেন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত অত্যন্ত জ্ঞানী মান্যবর পণ্ডিত ও সাধকবৃন্দ। আছেন ঢবাকা থেকে আগত প্রবীণ ব্রাহ্মণপণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা। ইনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিখ্যাত বন্দর কর্ণসুবর্ণ নগর-পরিষদের ব্রাহ্মণ-সদস্য আচার্য হলায়ুধ মিশ্রের বিদ্যাপীঠে শিক্ষাগ্রহণ করে স্নাতক হয়েছেন এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজকার্যে দায়িত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আমি দেবজ্যোতি শর্মা মহোদয়কে দণ্ডায়মান হতে অনুরোধ করছি।

পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা দণ্ডায়মান হলে হর্ষধ্বনি ও উলুধ্বনি দিয়ে সকলে তাকে অভিবাদন জানাল।

আচার্য মাধবশ্রী অতঃপর আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদীকে দণ্ডায়মান হতে অনুরোধ করলেন এবং তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি বললেন- আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী মহোদয় বর্তমানে সম্ভার রাজ্যের সর্ববৃহৎ বীথি মধুপুরের প্রধান ধর্ম-প্রবক্তা। প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র বেদের প্রতিটি গ্রন্থই তিনি অধ্যায়ন করে আয়ত্ত করেছেন এবং তাই চতুর্বেদী উপাধি প্রাপ্ত হয়েছেন। কৈশোর এবং যৌবনকাল তিনি কাটিয়েছেন সুদূর পশ্চিমে, গান্ধারায়। পুরুষপুরে বিখ্যাত বিদ্যাপীঠে তিনি শাস্ত্রজ্ঞান লাভ করেছেন। তিনি সংস্কৃত ছাড়া আরো কয়েকটি ভাষা আয়ত্ত করেছেন। অবহট্ঠ, মৈথিলী এবং মধুপুরের প্রাকৃত ভাষায় তিনি বিশেষ পারঙ্গম। ভারতভূমির বহু অঞ্চল পরিভ্রমণ করে শেষ বয়সে তিনি সম্ভার মহারাজের অনুরোধে মধুপুরের ধর্মপ্রবক্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

আচার্য মাধবশ্রী অতঃপর বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্রকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন- মৈত্র মহোদয় দুই বৎসর পূর্বে এই মাঠে উপস্থিত হয়ে তার বক্তব্য উত্থাপন করেছিলেন। তিনি ঢবাকার এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান; কৈশোরকালে রাজগৃহে এবং নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। একসময়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধশ্রমণরূপে প্রব্রজ্যায় বেরিয়ে ভূভারতে নানাস্থান ভ্রমণ করেন এবং কৃচ্ছ্র সাধনা করে ভিক্ষুর ত্যাগ, ইন্দ্রিয়সংযম ও কামনার বিলোপ-সাধনার মাধ্যমে আত্মার মুক্তিপথের সন্ধানলাভ করেন।

সর্বশেষে তিনি পণ্ডিত পুলিন ভট্টকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন- পণ্ডিত ভট্ট মহাশয়কে আর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিশেষ প্রয়োজন নেই। তিনি শিবপুর বীথির প্রধান ধর্ম-প্রবক্তা। তবে পলাশতলী-বটেশ্বরে পৃথক বীথি স্থাপনের প্রথম দিন থেকে প্রায়শ এখানেই সময় কাটাচ্ছেন এবং নানাবিধ কর্মে নিজকে ব্যাপৃত রাখছেন। কৈশোরকালে তিনিও কর্ণসুবর্ণের আচার্য হলায়ুধ মিশ্রের বিদ্যাপীঠে শিক্ষাগ্রহণ করে স্নাতক হয়েছেন।

এ পর্যায়ে কিয়ৎক্ষণ দম নিয়ে আচার্য মাধবশ্রী পুনরায় বললেন- মঞ্চের সম্মুখে আরো দুজন বিশেষ ব্যক্তি উপস্থিত আছেন। তারা আলোচক নন, তবে বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসাবে আমি তাদেরকে মঞ্চে আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলাম। তারা বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে সম্মুখে উপবিষ্ট। এদের একজন গুপ্ত সাম্রাজ্যে কর্মরত রাজপুরুষ শ্রী অংশুমান ঘোষ এবং অন্যজন আমাদের গুরু অহিরুদ্র দেবের আশীর্বাদধন্য একজন শৈবসন্ত।

এক্ষণে আমি আজকের আলোচ্য বিষয়সমূহ উত্থাপন করে উত্থাপিত বিষয়ের ওপর সংক্ষেপে নিজস্ব মতামত জ্ঞাপন করতে অনুরোধ করছি শিবমন্দিরের পুরোহিত গুরু ভবদেবকে।

গুরু ভবদেব নিজ আসনস্থলে দণ্ডায়মান হয়ে কয়েক পলক সমগ্র সমাবেশটিতে দৃষ্টিপাত করলেন এবং করজোড়ে সকলকে নমস্কার করে তার বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেন- মাননীয় সভা-পুরোহিত, সম্মানিত অতিথিবর্গ, মাননীয় আলোচকবৃন্দ এবং উপস্থিত আমার প্রিয় ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ। সকলে আমার শুভাশিস গ্রহণ করবেন। আমার মতো উপস্থিত অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করছেন যে আমরা একটি কঠিন সংকটকাল অতিক্রম করছি। আমাদের সমাজবন্ধন এবং তার রীতিনীতি ও রাজ্যশাসন-ব্যবস্থা একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কেবল আমাদের সম্ভার রাজ্য নয়, সমগ্র গুপ্ত সাম্রাজ্য এবং তার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সকল জনপদে একই অবস্থা বিরাজমান। কী এক অস্থিরতা! সর্বত্র অশান্তি, অনিশ্চয়তা! এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান করার লক্ষ্যেই অদ্যকার শাস্ত্রার্থ পরিষদ। আমাদের সম্মুখে উত্থাপিত প্রশ্নসমূহ হচ্ছে প্রথমত, ভগবান বিষ্ণু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা। যেহেতু ইহলোকে প্রজাপালন করা রাজন্যের ধর্ম, অতএব রাজন্যবর্গ এ জগতে বিষ্ণুর অবতাররূপে গণ্য হবে কি না এবং সর্বদা অবশ্যমান্য কি না। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণগণ যেহেতু পূর্বজন্মের সুকৃতির ফলে ব্রাহ্মণ হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে অনেকে বিশ্বাস করেন, অতএব তারাও সর্বদামান্য কি না। এই দুই প্রধান আলোচ্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হবে, কোনো ব্রাহ্মণ-সন্তানের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় আচরণের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার বিচারকার্যের ব্যবস্থা কী হবে; অসবর্ণ বিবাহ, নারীর অধিকার, প্রজাকুলের অধিকার, ইত্যাকার বিষয়ে শাস্ত্রের বিধান কী এবং কতদূর পালনীয়- এসব বিষয়।

এ পর্যায়ে গুরু ভবদেব থামলেন এবং কিয়ৎক্ষণ নতমুখে নীরব থাকলেন। অতঃপর ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে উচ্চস্বরে উচ্চারণ করলেন- আনন্দাদ্ব্যেব খল­মুণি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দে সৃষ্টি, আনন্দে জীবনযাপন এবং আনন্দে মৃত্যু- পুনর্জন্ম প্রাণজ আনন্দের অনন্ত প্রবাহ মাত্র। আনন্দ স্বর্গ, আনন্দ ঈশ্বর। এই আনন্দ যেন প্রতিটি মানুষ গ্রহণ করতে পারে সে-লক্ষ্যে নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, বর্ণ-গোত্র ও আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সকলের জন্য তা সমানভাবে উন্মুক্ত করতে হবে। উন্মুক্ত করতে হবে জ্ঞানের দ্বার, তপস্যার দ্বার ও কর্মের দ্বার। আমি অদ্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রার্থ পরিষদের আলোচনাসভায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ বক্তব্য উত্থাপন করছি।

অতঃপর বসে পড়লেন ভবদেব। চতুর্দিকে প্রবল হর্ষধ্বনি উঠল, উলুধ্বনি দিল নারীগণ। পুলিন ভট্ট বেদীতে বসে মুখ কালো করলেন। তার সমর্থক ব্রাহ্মণ প্রবীণ-তরুণেরা হর্ষধ্বনি ও উলুধ্বনির উচ্চমাত্রা দর্শনে নীরব থেকে উসখুস করতে লাগল।

সভা-পুরোহিত অতঃপর ঢবাকা থেকে আগত পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মাকে আলোচ্য বিষয়ের ওপর তার বক্তব্য উত্থাপন করার জন্য অনুরোধ জানালেন।

দেবজ্যোতি নিজ আসনে দণ্ডায়মান হলেন, স্মিত হাস্য করে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবং যুক্তকরে সকলকে নমস্কার করে বললেন- সম্মানিত সভা-পুরোহিত ও উপস্থিত বুধজন। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন গ্রহণ করবেন। আমি এখানে আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হতে পেরে বিশেষ আনন্দিত। এখানকার বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত, মন্দির-সংলগ্ন বিদ্যাপীঠের আচার্য এবং বর্তমান শাস্ত্রার্থ পরিষদের মাননীয় পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রী আমার সতীর্থ বন্ধুজন। একই  সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন পূর্বে কর্ণসুবর্ণ নগরে আচার্য হলায়ুধ মিশ্রের আশ্রমে শিক্ষাগ্রহণ করেছি এবং আর্যব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণীয় সমাজব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে শাস্ত্র-শিক্ষাদানকে পবিত্র পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছি। একই বিদ্যাপীঠে আমাদের সঙ্গে পণ্ডিত পুলিন ভট্ট মহোদয়ও ছিলেন। দীর্ঘ তিন যুগ ধরে সেই লক্ষ্যে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

শাস্ত্রে আছে স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়, পরধর্মে ভয়াবহ। এটাই চতুর্বর্ণীয় ব্যবস্থার মূল কথা। আমি প্রত্যাশা করি প্রত্যেকে নিজ-বর্ণের পালনীয়-ধর্ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন। বৈশ্যগণের বর্ণ-ধর্ম স্বাধীন জীবিকাকে বৃত্তি হিসাবে গ্রহণ করা এবং রাজন্যকুলের জন্য রাজস্ব দান করে সেবা-সহায়তা করা। শূদ্রগণ নিম্নবৃত্তির মানুষ। তাদের দায়িত্ব উচ্চবর্ণের সেবাদান করা। এই সেবাদান কর্মটি বংশানুক্রমে পালন করাই তাদের স্বধর্ম। অতএব গুরু ভবদেবের বক্তব্যানুযায়ী জ্ঞানের দ্বার, তপস্যার দ্বার ও কর্মের দ্বার সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করে দিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। সে-জন্যই রাজন্যকে বিষ্ণুর অবতার হিসাবে প্রজাকুলকে তাদের নিজ-নিজ বর্ণ-ধর্ম পালনে বাধ্য করতে হবে। এটাই হবে রাজন্যের স্বধর্ম। মনুসংহিতা সেই বিধানই দিয়েছে।

পণ্ডিত দেবজ্যোতি শর্মা থামলেন। চতুর্দিকে গুঞ্জনধ্বনি উত্থিত হলো। বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে অনেকে দণ্ডায়মান হয়ে পড়ল। আলোচনাসভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা গেল। উপায়ান্তর না দেখে সভা-পুরোহিত দণ্ডায়মান হয়ে দুহস্ত উত্তোলিত করে সকলকে শান্ত থাকার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন- গুরু ভবদেব সঠিক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে শিক্ষার দ্বার, তপস্যার দ্বার এবং কর্মের দ্বার সকলের মধ্যে সমভাবে উন্মুক্ত রাখতে হবে। এ বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক। পণ্ডিত দেবজ্যোতি মহাশয় বলেছেন যে রাজন্যকে বিষ্ণুর অবতার হিসাবে প্রজাকুলকে তার স্বধর্ম পালনে বাধ্য করতে হবে। এ বক্তব্যও সঠিক। রাজধর্ম দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন। রাজধর্ম সঠিকভাবে পালনের নিমিত্তে প্রত্যেকের নিজ-নিজ বর্ণ-ধর্ম পালন করাই শ্রেয়। সুধীজন, এই দুই বক্তব্যে আপাত বিরোধের কারণ হলো একটি কুটিল ফাঁকি। জেনে রাখুন, কোনো মানবসন্তানই ব্রাহ্মণ বা শূদ্র হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। কেউ-ই পূর্বজন্মের সুকৃতি বা দুষ্কর্মের জন্য মাতৃযোনী প্রাপ্ত হন না। প্রত্যেকে জন্মগ্রহণ করেন মানবশিশু হিসাবে। অতঃপর শিক্ষা, তপস্যা ও কর্মের মাধ্যমে তিনি সঠিক বর্ণের অন্তর্গত হন; সমাজে এবং জগৎ-সংসারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন। একেই বলে স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মে ভয়াবহ। এই নীতি পালনে সমাজে কোনোই বিশৃঙ্খলা হবে না।

চতুর্দিকে পুনরায় হর্ষধ্বনি উঠল, উলুধ্বনি উঠল। আচার্য মাধবশ্রী সকলকে শান্ত থাকার ইঙ্গিত করে এবার আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদীকে তার বক্তব্যদানের পরামর্শ দিলেন। 

নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী দণ্ডায়মান হয়ে যুক্তকরে সকলকে নমস্কার করে বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেন- মান্যবর সভা-পুরোহিত এবং উপস্থিত সুধীজন। আমি খুবই আনন্দিত এরূপ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাসভায় উপস্থিত হতে পেরেছি বলে। আমার ততোধিক আনন্দ এই কারণে যে ইতোমধ্যে জ্ঞানী আলোচকগণ আমাদের সম্মুখে উত্থাপিত দুরূহ প্রশ্ন দুটির সহজ সমাধানে উপস্থিত হয়েছেন। প্রথম প্রশ্ন- রাজন্য এ জগতে বিষ্ণুর অবতার কি না এবং সর্বদা অবশ্যমান্য কি না। দ্বিতীয় প্রশ্ন- পূর্বজন্মে সুকৃতির ফলে জাত বলে ব্রাহ্মণগণও সর্বদা মান্য কি না। ইতোপূর্বের আলোচনা থেকে আমরা যে সমাধানে উপনীত হয়েছি তা হলো এই যে, হ্যাঁ, রাজন্য যতক্ষণ নিষ্ঠার সঙ্গে স্বধর্ম অর্থাৎ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেন ততক্ষণ অবশ্যই মান্য। যতক্ষণ তিনি ন্যায়পরায়ণ থাকেন এবং ন্যায়দণ্ড ধারণ করেন ততক্ষণই তিনি বিষ্ণুর অবতার বলে গণ্য হবেন। অন্যথায় বিষ্ণু তাকে প্রজাপীড়নকারী স্বৈরাচারী বলে পরিত্যাগ করেন। তেমন রাজন্যকে উৎখাত করাই প্রজাকুলের কর্তব্য।

চতুর্দিকে প্রবল হর্ষধ্বনি উত্থিত হলো। উলুধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিত হয়ে উঠল। দুহস্ত উত্তোলন করে শান্ত থাকতে ইঙ্গিত করে তিনি পুনরায় বললেন- জন্মসূত্রেই কেউ ব্রাহ্মণ হয়ে পড়েন না। মহামুনি ব্যাস, কৌশিক, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ এদের কেউ-ই ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন নি। জ্ঞানসাধনা, তপস্যা ও সাধনার মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্য-শীল অর্জন করে ব্রাহ্মণ বর্ণের অন্তর্গত হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণগণ যতদিন শুদ্ধ-হৃদয়, সংযতেন্দ্রীয় থাকেন, যতদিন তারা জ্ঞান-সাধনা ও তপস্যায় নিয়োজিত থেকে ব্রাহ্মণ্য-শীল পালন করে মানবসেবায় জীবন-উৎসর্গ করেন ততদিন তিনি অবশ্যই মান্য ব্যক্তি। কিন্তু যদি ব্রাহ্মণ্য-শীল বর্জন করেন তাহলে তিনি অবাঞ্ছিত, পরিত্যাজ্য ও পতিত বলে গণ্য হবেন।

পুনরায় চতুর্দিকে বিপুল প্রচণ্ডতায় হর্ষধ্বনি উত্থিত হলো। নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী পুনরায় বললেন- আমার দেহাবয়ব দর্শনেই হয়তো উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছেন যে আমি একজন প্রবীণ ব্যক্তি। আমি জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর পশ্চিম-গান্ধারে উপস্থিত হয়েছিলাম পঞ্চাশ বর্ষ পূর্বে। পুরুষপুর ও তক্ষশিলায় অবস্থিত শিক্ষায়তনে বহুদিন আমি গুরুদেবের পদপ্রান্তে উপবেশন করে শিক্ষাগ্রহণ করেছি। সেখানে আমি লক্ষ করেছি অসবর্ণ বিবাহে কোনো বাধা নেই, কেননা জন্মসূত্রেই কেউ ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় বর্ণের অন্তর্গত হয় না। ব্রাহ্মণেরা সেখানে পরজীবী নয়, জীবনধারণের জন্য দান কিংবা যজমানীর ওপর নির্ভরশীল নয়। বহু ব্রাহ্মণকে আমি কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত দেখেছি, ক্ষেত্রকর্ষণ করতে দেখেছি। ওরা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত হিসাবেও ছিলেন সম্মানিত এবং বিশেষ মান্য। সে-দেশে মনুসংহিতা নিয়ে ব্রাহ্মণ্য উন্মাদনা নেই, গোমাংস ভক্ষণ নিয়েও নিষেধাজ্ঞা নেই। গুপ্ত সাম্রাজ্যের কোথাও কোথাও এখন বিষ্ণু জপ করতে শেখানো হয় এই বলে “ওঁ নমো ব্রাহ্মণ্য দেবায় গোব্রাহ্মণ্য হিতায়চ”। আর্য শাস্ত্রবিধান প্রয়োগে কী হাস্যকর বৈপরীত্য! গুপ্ত সাম্রাজ্যে বিধান-প্রয়োগের বৈপরীত্য বড়ই লজ্জাকর। এ-থেকে আশু পরিত্রাণ বাঞ্ছনীয়। বাড়াবাড়ি সর্বদা পরিত্যাজ্য। সমন্বয়ই শান্তির পথ।

এরপর কিয়ৎক্ষণ নীরবে দণ্ডায়মান থেকে সহাস্যে পুনরায় বললেন- এখানে এসে, একই বেদীর উপরে পাশাপাশি দুটি মন্দির-দর্শনে, পাশাপাশি ভিন্নবর্ণের ভিন্ন দুটি ধ্বজা উড্ডীন-দর্শনে আমি বিশেষ আনন্দবোধ করছি। সকল ধর্মমতের মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসবে এবং শ্রদ্ধা করবে- এটাই সর্বোত্তম পন্থা। ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু। অস্ফুট উচ্চারণ করতে করতে তিনি বসে পড়লেন।

সভা কিয়ৎক্ষণ নীরব হলো। অতঃপর নারী-শ্রোতাগণের মধ্য থেকে গুঞ্জরণ উত্থিত হলো। সভা-পুরোহিত বিষয়টির প্রতি মনোযোগ স্থাপন করলেন এবং ইঙ্গিতে নীরব থাকার নির্দেশ দিলেন। ইসিদাসী দণ্ডায়মান হয়ে অন্য সকল নারীকে নীরব থাকতে ইশারা করে পুরোহিত মহাশয়কে অভিবাদন জানিয়ে বললেন- একটি নিবেদন করতে চাই, অনুমতি পেলে উত্থাপন করতে পারি।

আচার্য মাধবশ্রী অনুমতি দান করলে ইসিদাসী মন্তব্য করলেন- দুটি প্রশ্নের মীমাংসা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। প্রথমত, ব্রাহ্মণ-সন্তানদের অপরাধের বিচার-ব্যবস্থা। আমরা বুঝতে পারলাম জন্মসূত্রেই কেউ ব্রাহ্মণ বলে গণ্য হতে পারেন না, অতএব আমাদের বীথি-এলাকায় সংঘটিত একটি অপরাধ অর্থাৎ বিল্বগ্রামের অভিযুক্ত অপরাধীদেরকেও ন্যায়দণ্ডের আওতায় আনয়ন করতে হবে; এবং দ্বিতীয়ত, অসবর্ণ বিবাহ কোনো সমস্যা নয়। কেননা পশ্চিম ভারতে এখনও এরূপ বিবাহের প্রচলন বিদ্যমান বলে চতুর্বেদী মহাশয় জানিয়েছেন। গুপ্ত সাম্রাজ্য কিংবা তার পূর্ববর্তী ক্ষুদ্র রাজ্যের জন্য কোনো ভিন্নপ্রকার শাস্ত্রীয় বিধান থাকতে পারে না। মনুসংহিতার নামে উন্মাদনা কেবল সামাজিক অশান্তিই সৃষ্টি করবে। এখানে উপস্থিত নারী-শ্রোতাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি আপনাদেরকে অবগত করলাম। আপনাদেরকে ধন্যবাদ এবং নমস্কার।

মঞ্চে উপবিষ্ট পণ্ডিত পুলিন ভট্ট অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে ইসিদাসীর বক্তব্য শ্রবণ করলেন। অতঃপর প্রতিবাদ করার জন্য তিনি নিজেই দণ্ডায়মান হলেন- নীচকুলের এই নারীর বক্তব্য কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্র-আলোচনায় কোনো নারীরই অংশগ্রহণের অধিকার নেই। 

সভা-পুরোহিত হস্ত উত্তোলন করে পুলিন ভট্টকে থামতে নির্দেশ দিয়ে জানালেন- আমি সভা-পুরোহিত হিসাবে জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসীকে নিবেদন করার অনুমতি দান করেছিলাম। ভট্ট মহাশয় কি বিষয়টি লক্ষ করেন নি? যাহোক, এ পর্যায়ে আমি বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্রকে তার মতামত উত্থাপন করতে আহবান জানাচ্ছি।

চন্দ্রশেখর মৈত্র দণ্ডায়মান হয়ে সভা-পুরোহিতকে অভিবাদন জানালেন এবং যুক্তকরে উপস্থিত সকলকে নমস্কার করলেন। অতঃপর বললেন- আমি এই প্রাঙ্গণে কোনো নবাগত ব্যক্তি নই। দু বৎসর পূর্বেও এরূপ একটি শাস্ত্রার্থ আলোচনায় আপনাদের সম্মুখে আমি দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলাম। আমি প্রথমেই পণ্ডিত পুলিন ভট্ট মহোদয়ের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উত্থাপন করছি।তিনি একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনাসভায় পুরোহিতের অনুমতি ব্যতীত বক্তব্য উত্থাপন করেছেন। এটা রীতি-বিরুদ্ধ এবং গর্হিত আচরণ। তাছাড়া তিনি গুরু ভবদেবের আশ্রমের সর্বজনমান্য জ্যেষ্ঠাভগ্নী ইসিদাসীকে নীচুকুলজাত বলে নিন্দা প্রকাশ করেছেন। এ আচরণ অতিশয় গর্হিত। আমরা একযোগে তার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। 

এই কথা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল উলুধ্বনি উঠল এবং প্রাঙ্গণে উপস্থিত প্রায় সকলে হর্ষধ্বনি সহযোগে সমর্থন প্রকাশ করল। অবস্থা দর্শনে মঞ্চে উপবিষ্ট পুলিন ভট্ট, পার্শ্বে উপবিষ্ট বীথি-সামন্ত, রাজপুরুষগণ ও প্রবীণেরা নড়েচড়ে বসলেন। সভাপ্রাঙ্গণে উত্তেজনা ও অস্থিরতা লক্ষ করে চন্দ্রশেখর মৈত্র বক্তব্য থামিয়ে দণ্ডায়মান থাকলেন। সভা-পুরোহিত দুই হস্ত উত্তোলন করে সকলকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন।

চন্দ্রশেখর মৈত্র পুনরায় তার বক্তব্য আরম্ভ করে কণ্ঠস্বর উচ্চমাত্রায় তুলে বললেন- আমি জ্যেষ্ঠাভগ্নীর সঙ্গে ঐকমত্য ঘোষণা করে জানাতে চাই যে, অদ্যকার শাস্ত্রালোচনায় উত্থাপিত সকল প্রশ্নেরই মীমাংসা হয়ে গেছে। যতক্ষণ রাজন্যবর্গ ন্যায়দণ্ড ধারণ করবেন ততক্ষণ তিনি বিষ্ণুর অবতার বলে গণ্য এবং মান্য থাকবেন। ব্রাহ্মণগণ যতক্ষণ ব্রাহ্মণ্য-শীল পালন করে মানবসেবায় ব্রতী থাকবেন ততক্ষণ তিনি দেবতাগণ্যে মান্য থাকবেন। সর্বশেষে সকল মত-পক্ষের মানবকুল ধনী-নির্ধন, নর-নারী ও বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে পরস্পরকে ভালোবাসবে এবং শ্রদ্ধা করবে- সেটাই সর্বোত্তম পন্থা।

হর্ষধ্বনি ও কোলাহলে মন্দির-প্রাঙ্গণ কম্পিত হয়ে উঠল।

আচার্য মাধবশ্রী পুনরায় সকলকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করলেন। তিনি পণ্ডিত পুলিন ভট্টকে লক্ষ করে বললেন- এইবার আপনি আপনার মূল্যবান বক্তব্য উত্থাপন করুন। আপনিই হবেন আমাদের অদ্যকার সভার শেষ আলোচক। আপনার বক্তব্য সমাপ্ত হলে আমি সভা-পুরোহিত হিসাবে নিজ-বক্তব্য প্রদান করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করব। 

পণ্ডিত পুলিন ভট্ট দণ্ডায়মান হলেন, বিষণœবদনে করজোড়ে সকলকে নমস্কার করে বললেন- সম্মানিত সভা-পুরোহিত এবং উপস্থিত সুধীজন। প্রথমেই আমি এই কথা অকপটে ব্যক্ত করতে চাই যে আমার বিরুদ্ধে এই শাস্ত্রার্থ পরিষদের সভায় অত্যন্ত অন্যায়ভাবে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তাও উত্থাপিত হয়েছে একজন নারী কর্তৃক। অথচ শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী কোনো নারী এরূপ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেই পারে না। তদুপরি ব্রাহ্মণের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা তো দূরস্থ। এটা ব্রহ্মদূষণ! অতঃপর একজন অব্রাহ্মণ বৌদ্ধভিক্ষু, যিনি নিজেকে পণ্ডিত বলে মনে করেন, তিনি সেই নারীর বক্তব্যে ঐকমত্য ঘোষণা করে আমার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। আমি একজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। আমি এ পরিষদের কোনো সিদ্ধান্তই মেনে নিতে পারব না। পক্ষান্তরে এ দুজনের বিরুদ্ধেই আমি ব্রহ্মদূষণের অভিযোগ উত্থাপন করে ধর্ম-প্রবক্তাগণের নিকট ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি।

পণ্ডিত পুলিন ভট্টের অভিযোগ শুনে সকলে হতভম্ব এবং বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। প্রদোষ দেব, রুহীদত্ত নিজেদের মধ্যে নিম্নকণ্ঠে বাক্য-বিনিময় করলেন। মঞ্চে উপবিষ্ট সকলে সভা-পুরোহিতের মুখপানে তাকিয়ে রইলেন। মঞ্চের সম্মুখে নারী-আসনের মধ্যখানে মায়াবতী অকস্মাৎ দণ্ডায়মান হয়ে তীব্রকণ্ঠে বলে উঠল- এ সভা তো বিচারসভা নয়। যদি বিচারকার্যই করতে হয় তাহলে বিল্বগ্রামের ব্রাহ্মণ যুবকদের সর্বাগ্রে বিচারের ব্যবস্থা করা হোক।

বিল্বগ্রামের সংক্ষুব্ধ নারীদের অনেকেই সভায় উপস্থিত ছিল। তারা একযোগে চিৎকার করে বলে উঠল- তাই যেন হয়।

চতুর্দিকে উলুধ্বনি উঠল। সভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে লক্ষ করে প্রবীণেরা উদ্বিগ্ন হলেন। অবস্থাদৃষ্টে নিঃশব্দে হাসলেন চন্দ্রশেখর মৈত্র। নিজ-আসনে উপবিষ্ট থেকে উদয়মান পার্শ্বে উপবিষ্ট কনিষ্ঠভ্রাতা অংশুমানের হস্ত দূঢ়ভাবে ধারণ করল। অস্থির হলেন পুলিন ভট্ট। তিনি মায়াবতীর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন- ভণ্ডধার্মিক শুকদেবের এই কন্যাটি অদ্যাবধি অরক্ষণীয়া। অতএব মনুর বিধান অনুযায়ী বৃষলী বলে গণ্য। ব্রহ্মদূষণে তাকে পূর্বেও আমি অভিযুক্ত করেছি। তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। শুনেছি তার বিবাহের আলোচনা হচ্ছে। বিবাহের পূর্বে তাকে শুদ্ধিযজ্ঞ করে নিতে হবে …

কিন্তু চিৎকার আর প্রতিবাদে পুলিন ভট্টের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেল। কেউ কেউ ক্রুদ্ধ স্বরে বলল- এই শীল-বর্জিত পণ্ডিতকে বটেশ্বরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হোক। পেছন থেকে অকস্মাৎ দুয়েকজন সংক্ষুব্ধ নারী হুংকার দিয়ে তেড়ে এল বেদীর সম্মুখে। পুলিন ভট্ট দৃশ্যত ভয়ার্ত হয়ে পড়লেন। নিরাপদ আশ্রয় প্রত্যাশায় লম্ফ দিয়ে বেদী পরিত্যাগ করলেন এবং পৃষধ্র ঘোষ ও মনোহর নাগের সন্নিকটবর্তী হয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকলেন। চারিদিকে ভয়ানক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। সংক্ষুব্ধ নারীগণ এবং তাদের সমর্থকবৃন্দের একটি উত্তেজিত জটলার সম্মুখে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকল মায়াবতী। কম্পমান পুলিন ভট্ট দুজন গুল্মিকের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন- আমি বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ অভিশাপ দিচ্ছি। শিরচ্ছেদই এই বৃষলী নারীর সমুচিত শাস্তি। ছিন্ন করো, ছিন্ন করো!            

তৎক্ষণাৎ আদেশ প্রতিপালনে গুল্মিক মনোহর নাগ পেছন থেকে এগিয়ে এল। অকস্মাৎ অর্কদাস তাকে বাধাগ্রস্ত করে বলল- কোথায় যাচ্ছ?

রক্তচক্ষু তুলে ক্রুদ্ধস্বরে সে প্রত্যুত্তর করল- কেন, হুকুম শোনো নি? অতঃপর সে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পার্শ্ব থেকে একজন সশস্ত্র শান্ত্রীর খড়গ ছিনিয়ে নিল।

কিন্তু সম্মুখে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান অর্কদাস ততোধিক দৃঢ়তার সঙ্গে বলল- কার হুকুম মান্য করছ তুমি? সামন্তদেব তো সামনেই উপবিষ্ট!

অর্কদাসের মুখোপরি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ক্রুদ্ধ মনোহর নাগের চোক্ষে যেন অভয়কোচের মুখচ্ছবি ফুটে উঠল। দৃঢ়হস্তে তাকে ঠেলে খড়গ নিয়ে সে দু কদম সম্মুখে অগ্রসর হলো।

মায়াবতী নির্ভয়, অবিচল; মনশ্চক্ষে হয়তো তার ভেসে উঠল যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত ঋষিকন্যা গার্গীর সন্ত্রস্ত চেহারা। যাজ্ঞবল্ক্যের অভিসম্পাৎ কার্যকর করার জন্য নেপথ্যে প্রস্তুত অস্ত্রধারী উগ্রপুত্র ঘাতকদল। কিন্তু মায়াবতীর ভয় কী! তার পশ্চাতে প্রস্তুত অগণিত সংক্ষুব্ধ নারী, নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। আছে ক্ষত্রিয় বীর উদয়মান ঘোষ, কোচ বীর অর্কদাস এবং আরো অনেকে। মায়াবতী চক্ষু মুদিত করল। অনড়, নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি। পশ্চাতে অসংখ্য নর-নারীর কোলাহল, উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর।

অকস্মাৎ উপস্থিত সকলে একটি পুরুষ-কণ্ঠের হুংকার শুনল- বোম ভোলানাথ! পলকে দৃশ্যমান হলো উত্তোলিত খড়গটি মনোহর নাগের হস্তচ্যূত হয়ে পৌঁছে গেছে তার পশ্চাতে দণ্ডায়মান অর্কদাসের হাতে। ‘জয় মা কালী’ বলে দ্বিতীয় হুংকারটি পুনরায় সকলে যখন শুনতে পেল সবিস্ময়ে সবাই দেখতে পেল মনোহর নাগের ছিন্ন শির মায়াবতীর পদতলে ধূলিলাঞ্ছিত। আর রক্তাক্ত খড়গটি ডানহস্তে ধারণ করে বামহস্তে মায়াবতীকে পার্শ্বে আবদ্ধ করে রেখেছে অর্কদাস। সে অম্লানবদনে কৈফিয়তের কণ্ঠে সকলকে জানাল- গুরুজন ও সুধীজন, জেনে রাখুন, মায়াবতী আমার বাগদত্তা। তাকে রক্ষা করা আমার অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য; আমার স্বধর্মও বটে।

ততক্ষণে পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির নবনিযুক্ত গুল্মিক মনোহর নাগের মস্তকছিন্ন দেহটি ভূমিশয্যায় কিয়ৎক্ষণ ধড়ফড় কম্পমান থেকে অবশেষে অসাড় হয়ে পড়ল। একটা স্তব্ধতা নেমে এল মন্দির-প্রাঙ্গণে।

 

 

 

 

 

বাইশ.

শাস্ত্রার্থ পরিষদের ঘটনায় রাজ্যব্যাপী ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলো। সম্ভার মহারাজের সামরিক-গুল্মিককে প্রকাশ্য দিবালোকে বহুসংখ্যক প্রজাকুলের চোক্ষের সম্মুখে, এমনকি রাজপুরুষের সম্মুখে খড়গাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এটা রাজদ্রোহ বলে গণ্য। অর্কদাসের বিচারের জন্য সম্ভার রাজ্যের উচ্চপর্যায়ের রাজপুরুষগণ নানা ধরনের মন্ত্রণাসভা করলেন। রাজ্যের সমগ্র ব্রাহ্মণ পণ্ডিতও একজোট হলেন ব্রহ্মদূষণের বিচারের জন্য। ব্রাহ্মণের অভিশম্পাৎ বাস্তবায়নে বাধাদান, সেও ব্রহ্মদূষণের তূল্য। অতএব জীবন্ত পুড়িয়ে নিধন করা কিংবা জ্যান্ত মাটিচাপা দেওয়া হবে অর্কদাসের জন্য নূ্যূনতম শাস্তি। অন্যদিকে, নারী হয়ে যারা শাস্ত্রের বিধান অমান্য করে যথাসময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় নাই, কিংবা যারা শাস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছে, শাস্ত্রার্থ পরিষদে ব্রাহ্মণ আলোচকের প্রতি অঙ্গুলি তুলে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করেছে, কিংবা অন্যকোনো বক্তব্য রেখেছে তাদেরও বিচার হবে। কী শাস্তি হতে পারে সেটা জল্পনা-কল্পনার বিষয়। মায়াবতী সম্পর্কে শোনা যাচ্ছিল তাকে শুদ্ধিযজ্ঞ করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে এবং পরবর্তী জীবন কোনো মন্দিরের দেবদাসী হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

বিচারকার্য পরিচালনা করা হবে প্রকাশ্যে। এটা হবে দৃষ্টান্তমূলক। যেন এরপর অন্য কোনো প্রজা স্বপ্নেও এরূপ ব্রহ্মদূষণ, রাজদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ করতে দুঃসাহসী না হয়। রাজ্যের ব্রাহ্মণকুলে যেন একটা অভ্যুত্থান ঘটে গেছে। সকলেই ভীষণ ব্যস্ত- কী করে, কী ভাবে এই বিচারকার্যটি নির্বিঘ্নে সমাধা করা যায় এবং অভিযুক্তগণকে উপযুক্ত শাস্তি দান করা যায়। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিচারকার্যের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে শিবপুর বীথির অধিকরণগৃহের সম্মুখস্থ চত্বরে। রুহীদত্ত ও পৃষধ্র ঘোষকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দান করা হয়েছে। মধুপুর বীথির ধর্মপ্রবক্তা আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী এবং তৎসঙ্গে ধর্মপ্রবক্তা আচার্য মাধবশ্রীসহ রাজ্যের আরো পাঁচজন অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে অন্তর্ভুক্ত করে বিচারকমণ্ডলী গঠন করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে যে বিচারকার্য অনুষ্ঠানে সম্ভার থেকে আচার্য অহিরুদ্র দেব ও সামরিক-অসামরিক রাজপুরুষগণ উপস্থিত থাকবেন। উপস্থিত থাকবেন সম্ভার রাজ্যের সকল বীথি-সামন্তগণও। উদয়মান ও হিঙ্গলের সঙ্গে বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র এবং অংশুমান উপস্থিত থাকবেন। ইসিদাসী, কলিঙ্গা, খুল­না এদের সঙ্গে বিল্বগ্রামের সংক্ষুব্ধ নারীসমাজসহ অনেকেই উপস্থিত থাকবে। পলাশতলী-বটেশ্বর বীথি-সামন্তের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানে অভিযুক্ত অর্কদাস ও মায়াবতীকে বিচারানুষ্ঠানে যথাসময়ে উপস্থিত করানো হবে। গুরু ভবদেব নিজ উদ্যোগে এ সকল কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে নিজেকে যুক্ত রাখছেন। প্রতিজ্ঞা করেছেন বিচারের নামে অবিচার হতে তিনি কিছুতেই দেবেন না। অভিযুক্তদের পক্ষে জনসমর্থন দৃঢ়ভাবে রক্ষাকল্পে এবং বিচারাঙ্গনে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানের বিশেষ দায়িত্ব তিনি দিয়েছেন ইসিদাসী ও উদয়মানের ওপর। অপত্য স্নেহে আর্দ্র ইসিদাসীর মাতৃহৃদয় এবং উদয়মানের প্রেমিকহৃদয় এরূপ দায়িত্ব পেয়ে অস্থির হয়ে উঠল। গুরু ভবদেব কি সত্যিই ন্যায়বিচার রক্ষা করতে পারবেন?

অন্যদের মতো মদনিকাও উদ্বিগ্ন। বিচারানুষ্ঠানের পূর্ব-রাত্রির প্রথম প্রহরে সে নিজ উদ্যোগে মায়াবতীর গাত্রহরিদ্রা উৎসবের আয়োজন করল। ভানুপ্রসাদ বর্মণের বউ হয়ে সে যখন এ সংসারে যোগ দেয় মায়াবতী তখন শাশুড়িমাতার কোলের শিশু। সে-শিশু বড় হয়েছে; এক সময়ে সমাজের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে গুরু ভবদেবের আশ্রমে গেছে শিক্ষাগ্রহণ করতে। শুকদেব মহোদয় তাকে বৈষ্ণব ধর্মমতে আস্থাভাজন করার লক্ষ্যে বিষ্ণুমন্দিরের পুরোহিত আচার্য মাধবশ্রীর সেবাকর্মে নিযুক্ত করলেন। পিতৃ-আদেশ অলংঘন-জ্ঞান করে আচার্য মাধবশ্রীর সেবাকর্ম সম্পাদন করেছে ঠাকুরঝি। কিন্তু বিষ্ণুধর্মে তার ভক্তি আসে নি। আচার্যদেবকে নাকি জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছিল, বিষ্ণুভক্তগণ বিষ্ণুর নিকট ব্রাহ্মণ ও গোধনের হিতের জন্য প্রার্থনা করেন কেন? এটা কেমন ধর্ম? এ ধর্মে ব্রাহ্মণের কল্যাণ হতে পারে, হতে পারে গোধনেরও। কিন্তু মানবকুলের কী হবে? মদনিকা সেদিন এক নতুন মায়াবতীকে অবিষ্কার করেছিল। আর শাস্ত্রার্থ পরিষদে কুটিল পণ্ডিত পুলিন ভট্টের অভিযোগে সভাস্থ সকলে যখন হতবাক, তক্ষুনি সঠিক বক্তব্যটি যুগিয়েছিল ঠাকুরঝি। মনে হচ্ছিল যেন ঠাকুরঝিয়ের বক্তব্যের মধ্য থেকে সঠিক প্রত্যুত্তরের সন্ধান পেয়ে গেল শাস্ত্রার্থ পরিষদের সকলে। কী তুমুল হর্ষধ্বনি! কী উচ্চনাদের উলুধ্বনি! কী বিপুল জনসমর্থন! এসব ভাবতে ভাবতে আর গাত্রহরিদ্রা উৎসবের আয়োজন করতে করতে গভীর মমতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধে তার অন্তর ভরে উঠছিল। আর কী এক আশঙ্কায় তার চোখ সিক্ত হচ্ছিল মাঝে মাঝেই। কী হবে বিচারসভায়?  

অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন বেশি না থাকলেও উপস্থিত হয়েছিল ইসিদাসী, কলিঙ্গা ও আরো অনেক নারী। নানাধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নের ব্যবস্থা ছিল। পরিচারিকাগণ ছোটাছুটি করছে। যেন বিবাহ অনুষ্ঠানের পূর্বদিন। ভানুপ্রসাদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আরো কতিপয় বালক-বালিকা দৌড়াদৌড়ি করছে, চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। ভানুপ্রসাদ কেবল মাঝে-মধ্যে মদনিকাকে সাবধান করছে- আগামীকাল বিচারসভার পরিণতি কী হবে ভগবানই জানেন। এ রাতে এত বেশি বাড়াবাড়ি ঠিক হচ্ছে কি না ভেবে দেখা দরকার। শুকদেব অপরাহ্ন থেকে মৌনব্রত অবলম্বন করছেন। প্রতিবেশী কর্বট প্রবীণ কিংবা ভক্ত বনবাসী অনেকেই এসেছেন  সমবেদনা প্রকাশ করতে কিংবা একাত্মতা ঘোষণা করতে। কিন্তু শুকদেব নির্বিকার, নীরব, সমাহিত; যেন সাংসারিক বোধচেতনার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। সমস্ত দিবস উপোস থেকেছেন এবং সন্ধ্যা হতে-না-হতেই প্রার্থনাগৃহে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে বিষ্ণুর বিগ্রহ-সম্মুখে আসন গেড়ে বসে আছেন দুচোখ মুঁদে। মনে হয় জগৎ-সংসার থেকে অনন্ত দূরত্বে অবস্থান করছেন।  

রাত্রি দ্বি-প্রহরের শেষপাদে উপস্থিত হলো উদয়মান, হিঙ্গল ও অংশুমান। বিচারানুষ্ঠান উপলক্ষে বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র বটেশ্বরেই থেকে গেছেন, থেকে গেছে অংশুমানও। ইতোপূর্বেই উদয়মান স্থির করেছিল সে আশ্রম ত্যাগ করবে। অংশুমানের সঙ্গে মাতা-পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন করবে। মায়াবতীর পরামর্শ অনুসারে মহাসাঙ্ঘিক বৌদ্ধমত গ্রহণ করে গৃহী হয়ে বাকি জীবন নিজ পরিবারে থেকেই নিজব্রত পালন করবে। ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম পালনে কোনো ত্র“টি সে করবে না।

উদয়মানেরা যখন উপস্থিত হলো তখন গাত্রহলুদের প্রথম পর্যায় প্রায় শেষ। সকলেই মায়াবতীর গায়ে কাঁচা হরিদ্রার প্রলেপ দিয়েছে। অনেকে প্রার্থনা করেছে, অনেকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছে, কল্যাণ কামনা করেছে। মদনিকা উদয়মানকে দেখামাত্র আনন্দোচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। বলল- ঠাকুরঝি। আর দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোমার শিবঠাকুর এসে পড়েছেন। উদয়মানের দিকে ফিরে তাকে আহ্বান করল- এসো ঠাকুরপো, মায়াবতীর দেহে একটু হরিদ্রা লাগিয়ে দাও। এখনই স্নান করাতে নিয়ে যাব।

হিঙ্গল, অংশুমান একে একে মায়াবতীর গায়ে হরিদ্রাবাটার প্রলেপ দিল। অবশেষে দিল উদয়মান। মুখে মিষ্টান্ন তুলে দিল। হেসে মায়াবতী মন্তব্য করল- আমার শিবঠাকুর নিকটে উপস্থিত থাকলে আর কিসের ভয়! অংশুমানকে লক্ষ করে বলল- তুমি তো নিখোঁজ ভ্রাতার সন্ধান পেয়েছ?

অংশুমান জবাব দিল- ভ্রাতার সন্ধানে এসে এই যে অতিরিক্ত হিসাবে ভগ্নী পেয়ে গেছি!

অতঃপর স্নান-পর্ব শুরু হলো। মৃদঙ্গ বাজল, মাদল বাজল। দলবদ্ধ হয়ে মেয়েরা সঙ্গীতের তালে নৃত্য করল। মদনিকা, ইসিদাসী ও অন্যরা মায়াবতীকে জলাশয়ের পাড়ে আসন পেতে বসিয়ে ঘটি ভরে জল তুলে গাত্র মার্জনা করল। অবগাহনের পর সমাধা হলো স্নানপর্ব। এর পর শুরু হলো বধূসজ্জা।

উদয়মানেরা বিদায় নিল। যাবার সময়ে সে-ই বলে গেল- বৌ দিদি মণি, আপনারা মায়াবতীর সাজ-সজ্জায় মনোনিবেশ করুন। আমরাও অর্ককে প্রস্তুত করে দেব। তার সাজসজ্জা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তাকে যথানিয়মে তার পদমর্যাদানুযায়ী সামরিক পোশাকে সজ্জিত করা সমীচীন। নিজের মুখেই সে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছে যে ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে।

অতঃপর ইসিদাসী, মদনিকা ও অন্য নারীগণ গভীর মমতায় সযতনে বধূসাজে মায়াবতীকে সজ্জিত করল। পদপাতায় অলক্ত; মুখমণ্ডল, বাহুদয় ও কণ্ঠদেশে চন্দন কুমকুম; কেশরাজিতে ভেষজ সুগন্ধি; সদ্যতোলা শ্বেতশুভ্র সতেজ ফুলের মালা একটা খোঁপায়, অন্যটা কণ্ঠে। পরিধানে রক্তবর্ণ শটিকা গোড়ালি পর্যন্ত লম্বিত, ঊর্ধ্বাঙ্গ আবৃত আরেকটি বস্ত্রখণ্ড দিয়ে; পট্টবস্ত্র নির্মিত একখানা দশতি দিয়ে ঘোমটা-টানা, সেও রক্তবর্ণ। বধূসাজে প্রস্তুত করে মায়াবতীকে নিয়ে যাওয়া হলো শুকদেব মহোদয়ের নিকট আশীর্বাদের জন্য এবং যাত্রা করার অনুমতি গ্রহণের জন্য।

অবশেষে সকলে মিলে প্রত্যুষকালে মায়াবতী এবং অর্কদাসকে নিয়ে ব্রাহ্মমুহূর্তে কয়রা নদী অতিক্রম করে পদব্রজে যাত্রা করলেন শিবপুর বীথির অধিকরণ চত্বরাভিমুখে।

শিবপুর বীথির অধিকরণগৃহের চত্বরের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণটি নাতিবৃহৎ। চতুর্দিকে সযত্নে পরিচর্যা করা ফলজ বৃক্ষরাজির মধ্যখানে উন্মুক্ত চত্বর। পূর্বপার্শ্বের ঝোপঝাড় পার হয়ে পায়ে-হাঁটা সঙ্কীর্ণ রাস্তা। এটি অতিক্রম করলেই দাপুটে গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষের সামরিক স্থাপনা।

সম্মানিত বিচারকদের জন্য কাষ্ঠনির্মিত তক্তপোশ, তদুপরি আসন পাতা হয়েছে। ওরা বসবেন পাশাপাশি, অর্ধচন্দ্রাকারে দক্ষিণমুখো হয়ে। সম্মুখে আড়াআড়ি করে বংশদণ্ড দিয়ে কিছুটা স্থান ঘিরে রাখা হয়েছে। হয়তো বিচারকদের মর্যাদা বিবেচনায় বিচারপ্রার্থী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ থেকে পৃথক রাখার উদ্দেশ্যে অথবা নিরাপত্তাজনিত কারণে। বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত রাজপুরুষগণ ব্যতীত অন্য কারো ঘেরাওয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। 

বিচারসভার সম্মুখে অগণিত কৌতূহলী নর-নারী ভূমিতলে আসনগ্রহণ করে উৎসুকদৃষ্টিতে অপেক্ষমান। প্রষধ্র ঘোষের সামরিক স্থাপনায় যাওয়ার পায়ে-হাঁটা পথটিকে পেছনে রেখে দলবেঁধে উপবেশন করলেন ইসিদাসী। সঙ্গে কলিঙ্গা, মদনিকা ও অপরাপর বনবাসী নারীকুল। ওরা আসন নিয়েছে বিচারমণ্ডপের ঘেরাও-অংশের নিকটস্থ হয়ে। এপার্শ্বেই অভিযুক্ত ও অন্যান্য পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। পুলিন ভট্ট, কতিপয় প্রবীণ ব্রাহ্মণ এবং সামন্তগণ সন্নিকটেই উপবেশন করলেন।

সকলকে সাবধান করার জন্য ঘণ্টাধ্বনি হলো। মাননীয় বিচারকগণ এক্ষুনি উপস্থিত হবেন। পশ্চাদ্দিক থেকে সামরিক-কর্মকর্তা ও প্রতিহারী বেষ্টিত হয়ে বিচারকগণ বিচারমণ্ডপে উপস্থিত হলেন। উপস্থিত সকলে দণ্ডায়মান হয়ে তাদেরকে সম্মান প্রদর্শন করল। বিচারকগণ একে একে তক্তপোশে স্ব-স্ব আসন গ্রহণ করলেন। সামরিক-কর্মকর্তা ও গুল্মিকগণ বিচারকদের পশ্চাতে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান গ্রহণ করল এবং সামরিক কায়দায় দণ্ডায়মান থাকল। নিজ আসন থেকে দুই পদক্ষেপ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সম্ভার থেকে আগত প্রবীণ ব্রাহ্মণ পুরোহিত, সম্ভার মহারাজের কুলগুরু আচার্য অহিরুদ্র দেব ঘোষণা করলেন- অদ্যকার বিচারকার্যটি সম্ভার রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মহারাজ পরম ভট্টারক শ্রী প্রতাব চন্দ্র সেনের নির্দেশে রাজ্যের প্রবীণ ধর্মপ্রবক্তা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী মহাশয়কে মণ্ডলীপ্রধান করে আরো পাঁচজন বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ সমন্বয়ে অদ্যকার বিচারসভাটি গঠিত হয়েছে। প্রত্যাশা রাখি, শাস্ত্রের বিধান অনুসরণ করে ন্যায়ানুগভাবে বিচারকার্যটি সম্পন্ন হবে। এটুকু বলে তিনি বিচারকমণ্ডলীকে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

অতঃপর প্রতিহারীগণ অভিযুক্ত অর্কদাস ও মায়াবতীকে বিচারমণ্ডপের সম্মুখে উপস্থিত করল। অর্কদাসের সামরিক পরিচ্ছদ এবং মায়াবতীর রক্তবর্ণ সজ্জা দেখে অনেকে বিস্মিত হলো। চতুর্দিকে গুঞ্জরণ উঠল। আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী মহাশয় হস্ত উত্তোলন করে সকলকে নীরব থাকার ইঙ্গিত প্রদান করলেন। অভিযুক্ত দুইজন বিচারসভাকে করজোড়ে অভিবাদন জানিয়ে মঞ্চের বামপার্শ্বের নির্ধারিত স্থানে দণ্ডায়মান হলো। 

মণ্ডলীপ্রধানের নির্দেশে অতঃপর সম্ভার থেকে আগত রাজকীয় সামরিক-বাহিনী ও রক্ষীদলের প্রধানের প্রতিনিধি হিসাবে রুদ্রদামন বিচারসভাকে অভিবাদন জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ উত্থাপন করতে অগ্রসর হলেন। তার প্রধান দায়িত্ব ছিল অভিযোগ উত্থাপন করা এবং বিচারকমণ্ডলীর নির্দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তিনি মায়াবতীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ উত্থাপন করলেন। এক, সে নারী হওয়া সত্তে¡ও শাস্ত্রজ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছে; দুই, সে পঞ্চদশ বর্ষ অতিক্রম করলেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় নাই বরং অরক্ষণীয়া থেকে গেছে; তিন, সে পুলিন ভট্টের সঙ্গে একাধিকবার অসদাচরণ করে ব্রহ্মদূষণে দুষ্ট হয়েছে।

অতঃপর বিচারসভার মণ্ডলীপ্রধান মায়াবতীকে প্রশ্ন করলেন-

-তুমি কি তোমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারছ?

-হ্যাঁ, আমি মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারছি।

-তুমি কি তোমার অপরাধ স্বীকার করতে চাও?

-না। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং অন্যায়। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।

অতঃপর অর্কদাসের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ উত্থাপন করা হলো। এক, রাজকার্যে নিয়োজিত সম্ভার রাজ্যের একজন গুল্মিককে তার কর্তব্যপালনে সশস্ত্র বাধাদান করে অর্কদাস রাজদ্রোহতুল্য অপরাধ করেছে। দুই, প্রকাশ্য দিবালোকে বহু জনের উপস্থিতিতে অকারণে তাকে অস্ত্রাঘাত করে নরহত্যার অপরাধে সে অপরাধী হয়েছে। মণ্ডলীপ্রধান অর্কদাসকেও অভিযোগের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারছে কি না প্রশ্ন করলেন। প্রত্যুত্তরে অর্কদাস জানাল যে, সে মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারছে। সেও দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করল যে অভিযোগ ভিত্তিহীন, অন্যায্য এবং সে সম্পূর্ণ নিরাপরাধ।

অতঃপর সেদিনের শাস্ত্রার্থ পরিষদে উপস্থিত কতিপয় বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলো। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সামন্ত রুহীদত্ত, গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষ ও সামন্ত প্রদোষ দেব বর্মণ। সাক্ষ্য-প্রমাণ উত্থাপনের পর সকলের নিকট স্পষ্ট হলো, সেদিন শাস্ত্রার্থ পরিষদে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, কী কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কী কী বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল এবং অবশেষে কীভাবে পণ্ডিত পুলিন ভট্ট লম্ফ দিয়ে বেদী পরিত্যাগ করেছিলেন, এবং কী পরিস্থিতিতে মায়াবতীর শিরচ্ছেদের অভিসম্পাৎ দান করেছিলেন। স্পষ্ট হলো, কে সে-অভিসম্পাৎ কার্যকর করতে এগিয়ে গিয়েছিল এবং কীভাবে তার নিজেরই শিরচ্ছেদ ঘটল। সাক্ষ্যদান করতে দুয়েকজন এসে এটাও ব্যক্ত করলেন যে অদ্যকার বিচারকমণ্ডলীর একাধিক মান্যবর বিচারক সে-সকল বিষয় নিজেরাই প্রত্যক্ষ করেছেন।

সাক্ষ্য সমাপ্ত হলে পুলিন ভট্ট অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দাবি করলেন যে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি রাজরোষ ও ব্রহ্মদোষে নিপতিত। অচিরেই এরা রাজরোষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, ব্রহ্মতেজে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ওরা রৌরব নরকে নিপতিত হবে। চতুর্বর্ণীয় ব্রাহ্মণ্য-সমাজব্যবস্থা অক্ষুণ্নে রাখার স্বার্থে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দান করা একান্ত অপরিহার্য।

অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কেউ কোনো বক্তব্য দিতে চায় কি না জিজ্ঞাসা করা হলে বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র বিচারকমণ্ডলী-প্রধানের অনুমতি নিয়ে তার বক্তব্য শুরু করলেন। মণ্ডলী-প্রধান ও অন্যান্য বিচারকগণকে যথাযোগ্য অভিবাদন জ্ঞাপন করে তিনি বললেন- আমি একজন নগণ্য বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র। এখানে বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলীর সম্মুখে বটেশ্বর নিবাসী কর্বট গোত্রের অন্যতম প্রবীণপুরুষ শ্রী শ্রী শুকদেব মহাশয়ের একমাত্র কন্যা শ্রীমতি মায়াবতী দেবীর বন্ধুজন হিসাবে নিবেদন করতে চাই যে তার বিরুদ্ধে এই বিচারসভায় উত্থাপিত অভিযোগ ভিত্তিহীন, অসত্য এবং ন্যায়নীতি-বর্জিত। এখানে অনেক বেদজ্ঞ পণ্ডিত উপস্থিত আছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে বিচারকমণ্ডলী-প্রধান নিজেও বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ এবং একজন বিজ্ঞ চতুর্বেদী। আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে নারীর জন্য শাস্ত্র শিক্ষাগ্রহণ নিষিদ্ধ এ কথাটি অসত্য। শাস্ত্রে এ রূপ কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। কলিযুগে কোনো কোনো ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কিংবা রাজন্য নিজ সুবিধার জন্য এরূপ মতামত ব্যক্ত করেছেন মাত্র। প্রাচীনতম ঋকবেদে অনেক নারী মন্ত্র-রচয়িতার নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ঘোষা, বিশ্ববাবা, অপালা প্রভৃতি নাম উল্লেখযোগ্য। উপনিষদে গার্গী ও মৈত্রেয়ী নামীয় দুজন নারীর পণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষ্য বিবৃত আছে। দ্বিতীয় অভিযোগটিও সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন। ভগবান বিষ্ণুর দোহাই দিয়ে কোনো কোনো সুচতুর পণ্ডিত বলেছেন যে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিবাহ না হলে সে বৃষলী এবং অরক্ষণীয় বলে গণ্য হবে। ভগবান বিষ্ণু নিজমুখে এমন বক্তব্য দিয়েছেন শাস্ত্রে কোথাও এরূপ উল্লেখ নেই। ভগবান বিষ্ণু অবতার হিসাবে এ জগতে একাধিকবার অবতীর্ণ হয়েছেন। কোনো অবতারই এরূপ বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা নাই। এবং মায়াবতী যে অরক্ষণীয়া ছিলেন না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো ব্রাহ্মণ্য অভিশাপ বাস্তবায়নকারী পেশাজীবী ঘাতক উগ্রপুরুষ মনোহর নাগের শিরচ্ছেদের ঘটনাটি। এই বিচারসভার অপর অভিযুক্ত ব্যক্তি কোচপুত্র অর্কদাস তার বাগদত্তা স্ত্রীকে ঘাতকের হস্ত থেকে রক্ষা করে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। শ্রীমতি মায়াবতী দেবীর বিরুদ্ধে আনীত অপর অভিযোগটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বটেশ্বরে স¤প্রতি অনুষ্ঠিত শাস্ত্রার্থ পরিষদে সন্দেহাতীতভাবে এই মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে জন্মসূত্রেই কেবল কেউ ব্রাহ্মণ বলে গণ্য হতে পারেন না। এবং কোনো ব্রাহ্মণ যতদিন শুদ্ধ-হৃদয় সংযতেন্দ্রীয় থাকেন, যতদিন জ্ঞানসাধনা ও তপস্যায় নিয়োজিত থেকে ব্রাহ্মণ্য-শীল পালন করে মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করেন ততদিন তিনি অবশ্যই মান্যব্যক্তি। কিন্তু সহস্র-কার্যাপণ দানের বিনিময়ে যিনি শ্রীমান উদয়মানকে হত্যা করার জন্য উগ্রপুরুষ নিযুক্ত করতে পারেন, যিনি প্রকাশ্য বিচারসভায় বিল্বগ্রামের যুবকদের অশালীন আচরণকে সমর্থন করেন, যিনি প্রকাশ্য আলোচনাসভায় শ্রীমতি ইসিদাসীর মতো মান্য জ্যেষ্ঠাভগ্নীকে কূটবাক্যে সম্বোধন করেন এবং যিনি পলাশতলী-বটেশ্বরে কর্মরত রাজপুরুষকে অন্যায়ভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য প্ররোচিত করতে পারেন, তিনি কি শীল-বর্জিত নন? তিনি কি ব্রাহ্মণকুলের কলঙ্ক বলে বিবেচিত হবার যোগ্য নন? তাকে ন্যায়নিষ্ঠ থাকার আহ্বান জানালে কি ব্রহ্মদূষণে কেউ দুষ্ট হবেন? সুতরাং শ্রীমতি মায়াবতীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অসত্য ও ভিত্তিহীন এবং তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ প্রত্যাহার করার আদেশ দান করা হোক।

এ সময় নারীকুল থেকে উলুধ্বনি উত্থিত হলে মণ্ডলী-প্রধান ইঙ্গিতে সকলকে শান্ত হতে বললেন।

চন্দ্রশেখর মৈত্র পুনরায় তার বক্তব্য শুরু করে বলেন- অদ্যকার বিচারসভার অপর অভিযুক্ত প্রয়াত কোচবীর অভয় কোচের সুযোগ্য পুত্র শ্রীমান অর্কদাসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগও সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন। অভিযুক্ত অর্কদাস পলাশতলী-বটেশ্বর বীথির উপ-গুল্মিক হিসাবে কর্মরত। তিনি সম্ভার-রাজের সামরিক-বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা। গুল্মিক হিসাবে কর্মরত প্রয়াত মনোহর নাগ ছিলেন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যিনি সম্ভার-রাজ কর্তৃক নিযুক্ত বীথি-সামন্ত্র শ্রী প্রদোষ দেব বর্মণের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে, এবং তার নির্দেশে সামরিক কর্তব্য পালন করতে বিধানানুযায়ী বাধ্য। শাস্ত্রার্থ পরিষদে সামন্ত মহোদয় তাকে কোনো নির্দেশ দেন নাই- একথা অদ্যকার সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে। তিনি পণ্ডিত পুলিন ভট্টের নির্দেশে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। পণ্ডিত পুলিন ভট্ট অপর একটি পৃথক বীথিতে কর্মরত ধর্মপ্রবক্তা। বটেশ্বরের গুল্মিককে নির্দেশদানের কোনো এখতিয়ার তার নাই। গুল্মিক তার নির্দেশ অনুযায়ী কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটালে সেটা হতো বিধান-বহির্ভূত ও অন্যায়। অর্কদাস সামন্ত মহোদয়ের দায়িত্বশীল কর্মী হিসাবে মনোহর নাগকে বাধা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, সামন্তের নির্দেশ ব্যতিরেকে তিনি এভাবে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে পারেন না। প্রয়াত মনোহর নাগ যেহেতু উগ্রপুরুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সেহেতু অভিযুক্ত অর্কদাস তাকে নিরস্ত্র করে নিজ কর্তব্য পালন করেছেন মাত্র, এবং বাগদত্তা স্ত্রীকে রক্ষা করতে তিনি অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। তিনি কর্তব্যরত রাজ-পুরুষের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্বধর্ম পালন করেছেন। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্যায্য। অতএব, তাকে সকল অভিযোগ থেকে সসম্মানে অব্যাহতিদানের আবেদন জানিয়ে আমার বক্তব্য সমাপ্ত করলাম।

চন্দ্রশেখর মৈত্রের দীর্ঘ ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের পর বিচারপ্রাঙ্গণে গুঞ্জরণ শুরু হলো। কিছুটা চাঞ্চল্য দেখা গেলে সামরিক ব্যক্তিবর্গ শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সতর্ক হয়ে উঠল। মণ্ডলী-প্রধান মণ্ডপে উপবিষ্ট অন্যান্য বিচারকদের সঙ্গে দ্রুত পরামর্শ করে এক দণ্ডকাল সময়ের জন্য বিচারসভা মুলতবি ঘোষণা করলেন। তিনি আরো জানালেন এক দণ্ডকাল পর তারা পুনরায় বিচারসভায় উপস্থিত হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।

অতঃপর পদস্থ রাজপুরুষ ও সামরিক ব্যক্তিবর্গ বেষ্টিত হয়ে বিচারকগণ অধিকরণগৃহের একটি প্রকোষ্ঠে গমন করলেন এবং দ্রুত আলোচনায় মনোনিবেশ করলেন। বিচারকগণের মধ্যে চারজন একমত হলেন যে সমাজে শৃঙ্খলারক্ষার স্বার্থে এবং ব্রাহ্মণ্য চতুর্বর্ণীয়-ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উভয় অভিযুক্তকেই অপরাধী সাব্যস্ত করে শাস্তি প্রদান করতে হবে। অর্কদাসকে শূদ্রে পতিত করতে হবে এবং কোনো একটা নির্দিষ্ট দিনে জ্যান্ত দগ্ধ করতে হবে। রাজদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের অপরাধে তাকে অনুরূপ শাস্তি প্রদান করা না হলে রাজরোষ ও ব্রহ্মতেজ সম্পর্কে প্রাকৃতজনের মনে ভীতি ও ত্রাসের ভাব তিরোহিত হবে। এতে নিম্নবর্ণের মানুষ্যকুলকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। অপর অপরাধী মায়াবতীকেও শুদ্ধিযজ্ঞের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দান করে প্রাণভিক্ষা দেওয়া হবে এবং ব্রহ্মদূষণের শাস্তিস্বরূপ আজীবন সে বিষ্ণুমন্দিরের সেবাদাসী হিসাবে জীবনযাপন করবে এবং ব্রাহ্মণ পুরুষগণের সেবায় নিযুক্ত থাকবে। 

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন আচার্য মাধবশ্রী এবং আচার্য নারায়ণ চন্দ্র চতুর্বেদী মহাশয়। তাদের যুক্তি ছিল এই যে উপর্যুক্ত শাস্তিপ্রদান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মাত্র। বিচারকার্যে কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিবেচনা সঙ্গত নয়। শাস্ত্রের বিধান এবং ন্যায়নীতির ভিত্তিতেই বিচারকার্যের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। এ দুজনের মতে অর্কদাস রাজদ্রোহের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য। বরং সঠিক সময়ে মনোহর নাগকে নিরস্ত্র করে সে উপ-গুল্মিকের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেছে। তবে নিরস্ত্র মনোহর নাগের শিরচ্ছেদ না করেও সে মায়াবতীর প্রাণরক্ষার বিকল্প চেষ্টা করতে পারত। সে-কারণে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি তার বিরুদ্ধে কেবল আংশিকভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। অতএব তাকে কোনো লঘু দণ্ডদান করা যায়। অপরপক্ষে মায়াবতীর বিরুদ্ধে ব্রহ্মদূষণের অভিযোগ সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন। অতএব তাকে অব্যাহতিদান করাই সঙ্গত।

উভয়পক্ষ যুক্তিতর্ক উত্থাপন করে বিতর্ক করলেন। কিন্তু চারজন বিচারপতি তাদের কঠোর শাস্তিপ্রদানের পক্ষে অনড় থাকলেন। অতঃপর মণ্ডলীপ্রধান সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এ বিচারে সংখ্যাগুরুর সিদ্ধান্তই ঘোষণা দেওয়া হবে, তবে অভিযুক্তগণ পুনর্বিচারের দাবি তুললে তা গ্রহণ করা হবে এবং সম্ভার-মহারাজের নিকট উচ্চতর বিচারকমণ্ডলী গঠন করার আবেদন করা হবে। দ্বিধাবিভক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচারকমণ্ডলী পুনরায় মণ্ডপে উপস্থিত হলেন। 

 

পুনরায় ঘণ্টাধ্বনি হলো। সকলে সচকিত হলো। বিচারকগণ সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিহারী বেষ্টিত হয়ে মণ্ডপে উপস্থিত হলেন এবং স্ব-স্ব আসন গ্রহণ করলেন। সামরিক-কর্মকর্তা, গুল্মিক, অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যথাস্থানে অবস্থান গ্রহণ করল। অভিযুক্ত অর্কদাস ও মায়াবতীকে মণ্ডপের সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। অতঃপর মণ্ডলী-প্রধান সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন- আমি মণ্ডলী-প্রধান এবং অপর পাঁচজন ব্রাহ্মণ বিচারক অদ্য পূর্বাহ্ন থেকে বিচারসভার শুনানী গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছি, সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করেছি এবং সর্বশেষে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তগণের বক্তব্য শ্রবণ করেছি। সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের প্রকৃত ভিত্তি, শাস্ত্রের বিধান, ন্যায়নীতির সঙ্গে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এই বিচারকার্য কীরূপ প্রভাব ফেলবে তাও বিবেচনায় এনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। আমরা দুঃখিত যে বিচারকার্যের বায় দানের ব্যাপারে আমরা ছয়জন বিচারক ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। এমতাবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ চারজন বিচারকের মতানুযায়ী এ বিচারের রায় প্রদান করছি, এবং পলাশতলী-বটেশ্বরের বীথি-সামন্তকে বিচারের রায় কার্যকর করার নির্দেশ দান করছি।

সমগ্র বিচারচত্বর স্তব্ধ হয়ে এল। সবার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো। অধীর ঔৎসুক্য নিয়ে সকলে প্রতীক্ষা করতে থাকল। অতঃপর মণ্ডলী-প্রধান পুনরায় বললেন- বিচারকমণ্ডলীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের অভিমত এই যে অভিযুক্ত শ্রীমতি মায়াবতী দেবী তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগে অপরাধী। তাকে শুদ্ধিযজ্ঞের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে শূদ্রে পতিত করা হবে এবং অবশিষ্ট জীবন তাকে বিষ্ণুমন্দিরের সেবাদাসী হিসাবে ব্রাহ্মণের সেবায় নিযুক্ত থাকতে হবে।

বিচারসভাস্থলে শোরগোলের সৃষ্টি হলে মণ্ডলী-প্রধান হস্ত উত্তোলন করে সকলকে শান্ত হতে নির্দেশ দিয়ে পুনরায় বললেন- শ্রী অর্কদাসের বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগে তাকেও অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাকে শূদ্রে পতিত করা হবে এবং জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হবে।

বিচারচত্বরে বিপুল হট্টগোলের সৃষ্টি হলো। অকস্মাৎ মায়াবতী উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করল- উপস্থিত মান্যবর ব্যক্তিবর্গ, শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধুজন। আপনারা দেখুন এবং শুনে রাখুন।

 

আমি কর্বট প্রবীণ শুকদেবের কন্যা মায়াবতী দেবী এই মুহূর্তে স্বজ্ঞানে স্ব-ইচ্ছায় প্রয়াত অভয় কোচের পুত্র শ্রী অর্কদাসকে গান্ধর্ব মতে স্বামীত্বে বরণ করছি।

সকলে উৎসুক হয়ে সেদিকে মনোনিবেশ করলে দেখতে পেল যে, মায়াবতী পাশ ফিরে এক পদক্ষেপ অগ্রসর হয়ে হতবুদ্ধি বিমূঢ় অর্কদাসের নিকট গিয়ে নিজ কণ্ঠের শ্বেতফুলের মালাটি তার হাতে তুলে দিয়ে বলছে- আমার কণ্ঠে পরিয়ে দাও।

অর্কদাস মালাটি হস্তে ধারণ করল, ঊর্ধ্বে তুলে একবার দেখে নিয়ে প্রসন্নমুখে মায়াবতীর কণ্ঠে পরিয়ে দিল। অতঃপর মায়াবতী নিজ খোঁপার মালাটি খুলে নিয়ে সেটি অর্কদাসের কণ্ঠে পরিয়ে দিয়ে কাঁধের ওপর দশতিতে বাঁধা একটি বিল্বপত্রে মোড়ানো ঝিনুকের ছোট বাটিতে রক্ষিত সিন্দূর অর্কদাসের হাতে তুলে দিয়ে বলল- শীঘ্র আমার সিঁথিতে পরিয়ে দাও।

অর্কদাস অকম্পিত হস্তে মায়াবতীর সিঁথিতে সিন্দূর পরিয়ে তাকে বাম হস্তে নিজ দেহ-সন্নিধানে রেখে মস্তক উন্নত করে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হলো। মায়াবতী পুনরায় সুউচ্চ কণ্ঠে বলল- এ দেশের ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতকুল বিবাহ-বন্ধনের যে অষ্টপ্রকার পদ্ধতির স্বীকৃতি দিয়েছেন তন্মধ্যে গান্ধর্ব বিবাহই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে আমার স্বর্গীয় মাতা বলতেন। এ বিবাহকে ব্রাহ্মণ দ্বারা মন্ত্রপূত করার প্রয়োজন পড়ে না। প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী নিজেরা ইচ্ছা করলে মন্ত্রপাঠ করতে পারে- যদেতদ হৃদয়ং মম, তদন্তু হৃদয়ং তব।

অতঃপর সে বিচারকমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে করজোড়ে বলল- আমি আমার প্রতি প্রদত্ত দণ্ডদান রহিত করার আবেদন করছি এবং আপনাদের শাস্ত্রীয় বিধানানুযায়ী স্বামীর সঙ্গে সহমরণের অধিকার দাবি করছি। মান্যবর বিচারকমণ্ডলী, স্বামীর চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সতী হওয়ার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করার মতো গর্হিত কর্ম নিশ্চয়ই আপনারা করতে পারেন না।

চারদিকে তীব্র শোরগোল শুরু হলো। উলুধ্বনি উঠল। মায়াবতী কেন এরূপ সাজ নিয়ে বিচারসভায় উপস্থিত হয়েছিল তা যেন সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মণ্ডলী-প্রধান নিজ আসনে দণ্ডায়মান হয়ে সকলকে শান্ত থাকার আবেদন জানিয়ে বললেন- আমরা প্রদত্ত দণ্ডদান রদ করতে পারি কি না জানি না, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে পুর্নবিচারের আবেদন উত্থাপিত হলে আমরা তা গ্রহণ করতে পারি।

গুরু ভবদেব এ সময়ে নিজ আসনে দণ্ডায়মান হয়ে বললেন- আমি অভিযুক্তদ্বয়ের পক্ষ থেকে পুনর্বিচারের আবেদন করছি। অতঃপর তিনি কয়েক পদক্ষেপ অগ্রসর হয়ে নব-দম্পতিকে আশীর্বাদ করলেন। বললেন- তোমাদের যুগল-জীবন অক্ষয় হোক, কল্যাণময় হোক।

আচার্য অহিরুদ্র দেবও দণ্ডায়মান হয়ে হস্ত উত্তোলন করে বললেন- অন্তরের ভালোবাসায় মানুষের হৃদয় জয় করার তোমাদের ব্রত সফল হোক। তোমাদের দুর্জয় সাহস অক্ষয় হোক, তোমাদের জয় হোক, কল্যাণ হোক।

আচার্য অহিরুদ্র দেব এরূপ আশীর্বাণী উচ্চারণ করলে প্রদত্ত রায়ের পক্ষের কেউ কেউ অতিশয় বিচলিত হয়ে পড়লেন। রুহীদত্ত ও পৃষধ্র ঘোষের কানে কানে পুলিন ভট্ট কী সব পরামর্শ দিলেন। তৎক্ষণাৎ তারা একযোগে সম্ভার রাজ্যের রাজকীয় রক্ষীদলের উপ-প্রধান রুদ্রদামনের নিকট উপস্থিত হয়ে কিছু নিবেদন করলেন। অতঃপর একযোগে উচ্চকণ্ঠে নববিবাহিত দম্পতিকে শাপ-শাপান্ত করতে লাগলেন- রাজরোষে ধ্বংস হবে, ব্রহ্মতেজে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে- রৌরব নরকে পতিত হবে।

বিচারপ্রাঙ্গণে ব্যাপক হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। নারীকুল উলুধ্বনি দিয়ে আনন্দপ্রকাশ করল। অনেকে নিজেদের আসন ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানাতে লাগল।

অকস্মাৎ রাজকীয় রক্ষীদলের উপ-প্রধান রুদ্রদামন কর্তব্যনিষ্ঠ হয়ে পড়লেন। তিনি বীথি-সামন্ত রুহীদত্ত ও গুল্মিক পৃষধ্র ঘোষকে দ্রুত প্রতিহারী দল সন্নিবেশ করতে বললেন এবং নির্দেশ দিলেন যেন এই মুহূর্তে দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনকে গ্রেফতার করে বন্দীশালায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

তৎক্ষণাৎ গুরু ভবদেব হতভম্ব প্রদোষ দেব বর্মণকে ধরে নিয়ে ভিড় ঠেলে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বিচারকমণ্ডলীর মুখোমুখি দণ্ডায়মান হলেন এবং দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- মান্যবর মণ্ডলী-প্রধান ও বিচারকগণ। আপনাদের নিকট আমার বিনীত আবেদন এই যে রাজকীয় রক্ষীদলের উপ-প্রধানের বিধি-বহির্ভূত নির্দেশ পালন থেকে সামন্ত রুহীদত্ত এবং পৃষধ্র ঘোষকে নিবৃত্ত করুন। দণ্ডপ্রাপ্তদেরকে নিয়ে কী করা হবে বিচারকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আপনারা আপনাদের রায় দানে ইতোপূর্বে ঘোষণা দিয়েছেন যে পলাশতলী-বটেশ্বরের সামন্ত মহোদয় যথাসময়ে বিচারে-প্রদত্ত দণ্ড কার্যকর করবেন। অভিযুক্তগণের পক্ষ থেকে পুনর্বিচারের আবেদনও আপনারা গ্রহণ করেছেন। সুতরাং শিবপুর বীথির সামন্ত দণ্ডিত ব্যক্তিবর্গকে বন্দী করতে পারে না। রাজকীয় রক্ষীদলের উপ-প্রধান কিংবা প্রধানই হোন, এমনকি স্বয়ং সম্ভার-মহারাজাও বিচারকমণ্ডলীর সম্মতি ব্যতিরেকে বিচারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন না। রাজধর্ম পালনের স্বার্থে এবং প্রজাকুলের কল্যাণের স্বার্থে আমাদের সকলকেই প্রচলিত ন্যায়বিচারের বিধান মান্য করতে হবে। অনুগ্রহ করে এ অন্যায় হস্তক্ষেপ রোধ করার নির্দেশ দান করুন। নচেৎ কোনো বিশৃঙ্খলার জন্য প্রজাকুল দায়ী হবে না। এক্ষণে আমরা পলাশতলী-বটেশ্বরের বীথি-সামন্তের তত্ত্বাবধানে দণ্ডিত ব্যক্তিদেরকে নিয়ে এ চত্বর ত্যাগ করছি। পুনর্বিচারের দিনক্ষণ নির্ধারিত হলে প্রদোষ দেব বর্মণের দায়িত্বে তাদেরকে পুনরায় বিচারালয়ে উপস্থিত করা হবে।

অতঃপর গুরু ভবদেব অদূরে অপেক্ষমান ইসিদাসী ও উদয়মানকে নির্দেশ দিলেন তারা যেন সামন্ত মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে অর্কদাস ও মায়াবতীকে বটেশ্বরে পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।

উদয়মান অকস্মাৎ দুই হস্ত ঊর্ধ্বে তুলে গগনভেদী এক হুংকার ছাড়ল- বোম ভোলানাথ, জয় মা কালী কি জয়! পদস্থ কিছু কর্মকর্তা ও উচ্চবর্ণের কিছু ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত উপস্থিত জনতা বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ল। এই বিপুল জনতার তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে বর্শাধারী প্রতিহারীগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তখন বৌদ্ধভিক্ষু চন্দ্রশেখর মৈত্র গুরু ভবদেব ও প্রদোষ দেব বর্মণ সমভিব্যাহারে চত্বর ত্যাগের উদ্যোগ নিলেন। তাকে অনুসরণ করল ইসদাসীর নেতৃত্বে নারীকুল বেষ্টিত অর্কদাস ও মায়াবতী। সর্বপেছনে দৃঢ়ভাবে অপেক্ষমান থাকল উদয়মান, অংশুমান, হিঙ্গল অন্যান্য আশ্রমিকেরা।

ক্রমশ পলাশতলী-বটেশ্বর থেকে আগত সকলেই ওদের পশ্চাতে যাত্রা করল। অভূতপূর্ব আনন্দ-কোলাহল ও কলস্বর। ছেলে-বুড়ো নারী-পুরুষ মিলে যেন এক আনন্দ শোভাযাত্রা। বিল্বগ্রামে পৌঁছালে গুরু ভবদেব হাসিমুখে প্রস্তাব করলেন- শুকদেব মহাশয়, আসুন, কন্যা-সম্প্রদানটা এখানে করে নিন। বর অর্কদাসকে এবং বরকর্তা হিসাবে প্রদোষ দেব বর্মণের নিকট কনের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিন। এখান থেকেই তিনি বর-কনেকে নিয়ে নিজগৃহে চলে যান। সেখানে পরিবারের নারীগণের আচার-অনুষ্ঠান- কালরাত্রি, ফুলশয্যা, আরো কত কিছু পালন করতে হবে। এদিকে আমরা এক-দুদিনের মধ্যেই রাজরোষ ও ব্রহ্মরোষ প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করি।

অতঃপর অর্কদাস ও মায়াবতীকে লক্ষ্য করে ভবদেব বললেন- তোমাদের রাজরোষ ও ব্রহ্মরোষে ভয়ার্ত হবার কোনো কারণ নেই। কতিপয় পথভ্রষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ব্রহ্মতেজ এবং বিভ্রান্ত ক্ষত্রিয়ের ক্ষাত্রতেজ অচিরেই শূন্যে মিলিয়ে যাবে। আমরা আছি। আমরাই আয়ত্ত করব বিপুল শক্তি- জ্ঞানসাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে। আমরা শক্তির সাধনা করব মানবকুলকে নির্যাতন-নিগ্রহের জন্য নয়- মানবতার কল্যাণে। মানুষের শ্রদ্ধাভক্তি-ভালোবাসা জয় করব ত্রাসের সঞ্চার করে নয়, প্রেম ও ভালোবাসা দিয়ে।

পরিশেষে শুকদেব ও প্রদোষ দেবকে একান্তে ডেকে তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করলেন- অদ্য হতে তৃতীয় দিবসে শুকদেব মহোদয়, মদনিকা ও ইসিদাসী কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে অর্কদাসের গৃহ হতে বর-কনেকে ফিরিয়ে আনবেন। ওদেরকে তখন দূরে কোথাও প্রেরণ করব মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য। নিশ্চিতভাবেই সেটা হবে নিরাপদ ও আনন্দময়।

 

তেইশ.

নির্র্রিত দিবসে অতি প্রত্যুষকালে অর্কদাস ও মায়াবতীকে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন গুরু ভবদেব। বললেন- কোনো কোনো পলায়ন তাৎপর্যময়, যদি সেটা করা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে, যদি নিজেকে প্রত্যাহার করতে হয় যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য। তাই আমাদেরকে স্বল্পকালের জন্য ছেড়ে যাওয়াকে পলায়ন ভাববে না।

তিনি আশীর্বাদ করে বললেন- সূর্যাভিমুখে যাত্রা করো। সূর্য অপরিমেয় প্রাণশক্তির উৎস। কদম্বঘাট গ্রামের উপকূলে খাঁড়ির অদূরে অপেক্ষমান থাকবে চন্দ্রশেখর মৈত্রের পিতৃব্যের বাণিজ্যপোত। ওরা তোমাদেরকে অতিথির মর্যাদায় গ্রহণ করবে। ওরা যাবে উত্তর-পূর্ব অহোম উপকূলের বিস্তৃত সায়রে। আরো এগিয়ে জয়ন্তিয়া পাহাড়ের উৎসঙ্গে খাসপুর বন্দরে। ওখানে তোমাদের অস্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা থাকবে। তোমরা শঙ্কামুক্ত থাকবে, আনন্দে থাকবে। প্রত্যাবর্তন করবে তিন চার সপ্তাহ পরে- নবান্নের সময়ে। ইতোমধ্যে এই বীথির প্রতিটি জনপদে প্রতিটি গোত্রে এবং অরণ্যাচারী প্রতিটি জনগোষ্ঠীতে আমরা আসন্ন যুদ্ধ-সম্ভাবনার বার্তা পৌঁছে দেব। রাজরোষ ও ব্রহ্মরোষ প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে। ভেলায় চড়ে সমুদ্রযাত্রার প্রাক্কালে আমাদের পরমপিতা ও পরমমাতাকে স্মরণ করবে। ভয় নেই, আমরা আছি, আছে পরম পিতামাতার অগণিত সন্তানেরা। জয় হোক সত্যের।

অতঃপর উদয়মান, হিঙ্গল, কলিঙ্গা ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে মায়াবতী ও অর্কদাস কদম্বঘাট গ্রামের দিকে রওয়ানা দিল। কদম্বঘাট পৌঁছাতে তাদের দুদণ্ডকাল অতিবাহিত হলো। পূর্ব-দিগন্তে সূর্য উঠি উঠি করছে। ভেলায় চড়ার প্রাক্কালে পেছন দিকে মুখ করে নিজ জন্মভূমির বনাঞ্চল, নদনদী, জলাশয় ও উন্মুক্ত প্রান্তরের দিকে মুখ ফিরিয়ে করজোড়ে প্রার্থনার ভঙ্গীতে দণ্ডায়মান হলো মায়াবতী ও অর্কদাস। অর্কদাস নীরবে কিন্তু মায়াবতী উচ্চস্বরে বলল- প্রথমে গভীর ভালোবাসায় বন্দনা করি আমাদের পরমপিতা, পরমমাতা এবং সকল পূর্বপুরুষদের যারা নদনদী, জলাশয় ও জলরাশি বেষ্টিত, বৃক্ষলতা ও বনবনান্তে-ঘেরা, চন্দ্র-সূর্যস্নাত মায়াময় এ ভূখণ্ড আমাদের জন্য এবং আমাদের উত্তর-পুরুষের জন্য রেখে গেছেন।

কৃষিকর্ম আমাদের ধর্ম। প্রকৃতিকে ভালোবেসে, সর্বজনকে ভালোবেসে, সর্ব-ঋতুতে নাচে-গানে-উৎসবে জীবনযাপনেই আমাদের আনন্দ।

রাজরোষে ও ব্রহ্মরোষে আমরা নির্ভয় থাকব। বণাশ্রমে কণ্টকিত আমাদের মাতৃভূমি এবং কর্মফলের প্রতারণা-ভিত্তিক জন্মান্তরবাদের ব্রাহ্মণ্যতত্তে¡ প্রতারিত আমাদের কৌম-সমাজকে আমি ত্যাগ করে যাচ্ছি না। পলাশতলীর কোচ স্বামীকে নিয়ে আমি বটেশ্বরের কর্বট কন্যা এই ভেলা ভাসালাম। অচিরাৎ আমরা প্রত্যাবর্তন করব।

 

বর্ণাশ্রমের অমর্যাদা থেকে আর জন্মান্তরবাদের প্রতারণা থেকে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের শোষণ-নির্যাতন থেকে নিজেদেরকে অবশ্যই মুক্ত করব।

অর্কদাসের হাত ধরে মায়াবতী ভেলায় চড়ল। ভেলায় চড়ল উদয়মান, হিঙ্গল মল­¬, কলিঙ্গা ও আরো কয়েকজন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকল উপকূলে।

হিঙ্গল মল­¬ অকস্মাৎ আবেগে আকুল হয়ে সুর করে আবৃত্তি করে উঠল-

 

           আমিও মানব হেন

           সিদ্ধাচার্য মহাস্থবির ধর্মসেন যেন

           মল­¬কুলে জন্ম আমার অনার্য নিষাদ

           তবুও মনে জাগে সাধ

           তোমাদের যুগল হৃদয়ের কাছাকাছি

           অনন্তকাল কান পেতে আছি

           আমি কবি রচিব কাব্য গাহিব গান

           তোমাদের প্রেমের অমর কাহিনী হবে মহীয়ান।

 

অনতি পরেই বাণিজ্যপোতের সন্নিকটবর্তী হলো ভেলাটি। অতঃপর উদয়মান, হিঙ্গল, কলিঙ্গা ও অন্যরা মিলে দুজনকে বাণিজ্যপোতে তুলে দিল। এরপর ভেলাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাণিজ্যপোত যাত্রা শুরু করল। সকলে হাত তুলে বিদায় সম্ভাষণ জানাল।

অপসৃয়মান বাণিজ্যপোতের দিকে উদয়মান দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তার অন্তরে এক বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি হলো। সে অনুভূতি বর্ণনাতীত। সে নিশ্চিত যে তার প্রাণপ্রিয় সখী মায়াবতী একজন বিশাল-হৃদয় পুরুষের বুকে আশ্রয়লাভ করেছে, যার শক্তিধর বাহু আজীবন তাকে রক্ষা করতে সক্ষম।

 

সে কখনও অরক্ষণীয়া হবে না, নিশ্চিত কল্যাণময় জীবনলাভ করবে। ভাবতে ভাবতে অন্তরের গভীরে অভাবিতপূর্ব এক কষ্টানন্দানুভূতিতে সে আবিষ্ট হয়ে পড়ল। সে অনুভ‚তি নৈর্ব্যক্তিক, ইন্দ্রিয়াতীত, স্বর্গীয়। সে কি নির্বাণসুখ লাভ করছে? একটা পরম স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস তার জমাটবদ্ধ বুকটা যেন হালকা করে নেমে গেল। সে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলল- বোম ভোলা নাথ! জয়, মা কালী কি জয়! কিয়ৎকাল যতি দিয়ে পুনরায় ধ্বনি তুলল- মা ভৈঃ! মা ভৈঃ! সমগ্র প্রকৃতি-পরিবেশ, বিশ্ব চরাচরও যেন উদয়মানের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে ‘মা ভৈঃ মা ভৈঃ’ রবে মুখরিত করে তুলল।

 

 

 

 

সমাপ্ত

 

 

 

 

 

 

 

পরি-কথন

বছর কয়েক আগে নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার আমলাবো ইউনিয়নের বটেশ্বর গ্রামে গিয়েছিলাম উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নক্ষেত্র দেখতে। প্রত্নতত্ত্ব ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান খুবই যত্ন সহকারে প্রত্নক্ষেত্রটি আমাদেরকে ঘুরে ঘুরে দেখালেন। প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র পাড়ের পাহাড়ী বনাঞ্চল থেকে উদ্ভূত কয়রা নামে অধুনা বিলুপ্ত নদীখাতটি উয়ারী গ্রামের উত্তর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে কী ভাবে বয়ে গেছে তাও দেখালেন। খাতটি হয়তো গিয়ে পড়েছিল বর্তমান আড়িয়ল খাঁ নদীতে কিংবা কোনো বিলে। খুবই উৎসাহের সঙ্গে তিনি শোনালেন কথিত ব্রহ্মপুত্র-সভ্যতার কেন্দ্রভূমি উয়ারী বটেশ্বরের নানাবিধ ঐতিহাসিক নিদর্শনের কথা। বিদায়ের প্রাক্কালে কিঞ্চিত আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠেই তিনি উচ্চারণ করলেন- নিজেদের শেকড়-সন্ধান করা কি আমাদের কর্তব্য নয়? অতীত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হতে পারলে ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথনির্দেশ কী করে পাব? হাবিবুল্লা পাঠান বয়সে প্রবীণ, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তাঁর বিদায়কালীন বক্তব্যটি আমার নিকট স্বগতোক্তির মতো প্রতীয়মান হয়েছিল। জিজ্ঞাসাটি যেন তিনি নিজেকেই করছিলেন।

ফিরে আসার পরেও বেশ কিছুকাল তাঁর জিজ্ঞাসাটি আমার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেতে থাকল। কথিত ব্রহ্মপুত্র-সভ্যতা যাঁরা গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা ছিলেন প্রাগার্য জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কী ছিল তাঁদের নৃতাত্তি¡ক পরিচয়? কেমন ছিল তাঁদের মানস-সংস্কৃতি, তাদের ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কার? জীবন-জীবিকাই বা কী রূপ ছিল? পরবর্তীকালে পশ্চিম থেকে আগত জনগোষ্ঠীর একের পর এক তরঙ্গাঘাতের ফলে অবশ্যম্ভাবী সংঘাত-সমন্বয়েই বা কী পরিণতি হয়েছিল? এ সকল ভাবনার অস্থিরতা নিয়ে অবশেষে একদিন পুরোনো বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম; কিছু নতুন বইপত্রও সংগ্রহ করলাম। নবতর উদ্দীপনা নিয়ে প্রাচীন ইতিহাস পাঠে মনোনিবেশ করলাম। নিজেরই অতীত উদ্ঘাটন করা; বলা যায় শেকড় সন্ধানের আকুলতা, আত্মপরিচয় আবিষ্কারের প্রাণান্ত প্রয়াস। ক্রমাগত কয়েকমাস ইতিহাস পাঠে নিমগ্ন থেকে লক্ষ করলাম যে এ পর্যন্ত জানা প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি বিষয় আমার সামনে এসে হাজির হচ্ছে নতুন তাৎপর্য  নিয়ে। ঐতিহাসিক নীহার  রঞ্জন  রায়ের  ভাষায়  বলা  যায় : “বাংলাদেশের যে জন ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার প্রায় সমগ্র মূল রূপায়ণই প্রধানত আলপাইন ও আদি অষ্ট্রেলীয়, এই দুই জনের লোকদের কীর্তি। পরবর্তীকালে আগত আর্য-ভাষাভাষী আদি নর্ডিক গোষ্ঠীর রক্তপ্রবাহ ও সংস্কৃতি তাহার উপরের স্তরের একটি ক্ষীণ প্রবাহমাত্র, এবং এই প্রবাহ বাঙালির জীবন ও সমাজ-বিন্যাসের উচ্চতর স্তরেই আবদ্ধ। ইহার ধারা বাঙালির জীবন ও সমাজের গভীরমূলে বিস্তৃত হইতে পারে নাই। . . .  আর্যভাষী আদি নর্ডিকেরা এক সমন্বিত জন, ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিল। তাহার জন্মনীড় উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় প্রদেশ। তাহার বাহন আর্য ভাষা।”

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে আর্যব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রবাহ গঙ্গার পশ্চিম তীর পর্যন্ত বেগমান ছিল, কিন্তু পূর্ব ও উত্তর তীরে সে প্রবাহ ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে। বহুদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি আর্যমানসের একটা উন্নাসিকতা, ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাব সক্রিয় ছিল। বাংলার আদিম কৌমবদ্ধ মানব-সমাজ বহুদিন পর্যন্ত আর্যধর্ম-সংস্কৃতির সক্রিয় বিরোধিতা করেছে; বোঝাপড়া করে একটা সমন্বয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। এই বোঝাপড়ার ফলশ্র“তিতে বৈদিকযুগ, বৌদ্ধযুগ অতিক্রম করে হিন্দুযুগে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির চূড়ান্তরূপ হিসাবে প্রচলিত হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লক্ষণীয় এই যে বাংলাদেশে আর্যধর্ম ও সংস্কৃতি গৃহীত হওয়া সত্তে¡ও জাতিভেদ ও বর্ণভেদের বৈষম্য উত্তর-ভারত ও দক্ষিণ-ভারতের মতো কঠোর হতে পারে নাই। বাংলাদেশের আর্যীকরণ ঋকবেদীয় আর্যসমাজ-ব্যবস্থা অনুযায়ী হয় নাই। সেজন্যে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র নিয়ে যে চতুর্বর্ণ-সমাজ, বাংলাদেশে তার প্রচলন নেই। বাংলার বর্ণসমাজ আল্পীয়-আর্য সমাজ-ব্যবস্থা অনুযায়ী গঠিত। আল্পীয় আর্যভাষীরা ঋকবেদীয় আর্যভাষী থেকে পৃথক। সে-কারণে বাঙালির বর্ণবিন্যাস ব্রাহ্মণ, শূদ্র এবং অন্ত্যজ ম্লেচ্ছদের নিয়ে গঠিত। বৈদ্য-কায়স্থ ও অন্যান্য সংকর বর্ণ সমস্তই ছিল মূলত শূদ্র পর্যায়ের। বস্তুত বাংলাদেশের সমাজ-বন্ধনে তথাকথিত শূদ্র জাতির লোকজনের বিপুল সংখ্যাধিক্য ও প্রাধান্যই হয়তো এর কারণ।

একথা স্বীকৃত যে প্রাগার্য জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র-বৃহৎ বিভিন্ন কৌমে বিভক্ত ছিল। ভাব ও ভাষায় তাদের দৈনন্দিন জীবনের যেসব সুখ-দুঃখ ও সমস্যা-সংগ্রামের কথা তারা প্রকাশ করত গানে-গল্পে-বচনে-গাথায়-রূপকথায়, সেসব কারো পক্ষে লিখে রাখা সম্ভব ছিল না। কেননা ওদের কোনো লিপি ছিল না। সুতরাং আর্যব্রাহ্মণ্য সভ্যতার রাষ্ট্র ও সমাজপতিদের ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পূর্বের কোনো নির্ভরযোগ্য লিখিত ঐতিহাসিক সূত্র আমরা পাই না। ফলশ্র“তিতে প্রাচীন ইতিহাস সন্ধানে আমাদের আযর্সাহিত্য, শ্র“তি-স্মৃতি ও পুরাণ-শাস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়; অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় পরবর্তীকালে প্রাপ্ত তাম্রশাসন কিংবা শিলালিপিসমূহে।

তিন সহস্র বর্ষ পূর্বকার ঋগে¦দের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ নামে একটি দেশের প্রথম উলে­খ পাওয়া যায়। সে-দেশে বং বা বঙ নামীয় কোনো এক জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল। সেই বঙ্গদের আবাসস্থল ছিল বর্তমান পশ্চিম-বাংলার ভাগীরথী নদীর তীরে। পরবর্তীকালের ইতিহাসে বঙদেশের যে বিবরণ স্বীকৃতি পেয়েছে তার সীমানা বহুবিস্তৃত। উলি­খিত বঙ্গদেশের উত্তর দিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। পূর্ব দিকে গারো-খাসিয়া-জয়ন্তিয়া-ত্রিপুরা-শৈলশ্রেণী। লোহিত্য বা ব্রহ্মপুত্র নদ গারো-খাসিয়া-জয়ন্তিয়ার উত্তর দিয়ে পশ্চিম বাহিত হয়ে গারো পাহাড়ের পশ্চিমে মোড় ঘুরে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে মধুপুর গড়ের পার্শ্ব ঘেঁষে একটি ধারা ঢাকা জেলার পূর্বাংশ অতিক্রম করে ধলেশ্বরীতে উৎসারিত; তার শাখা নদী লক্ষ্যাও সমান্তরাল বয়ে এসে ধলেশ্বরীতে উৎসারিত। ব্রহ্মপুত্রের অন্য ধারা কিশোরগঞ্জের দক্ষিণ-পশ্চিম ঘেঁষে নানা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে অবশেষে খাসিয়া-জয়ন্তিয়া থেকে আগত একাধিক স্রোতের মিলিত ধারা কালনী নদীতে মিশে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবাহিত। এই কালনী নদী পরবর্তীকালে মেঘনা নামে পরিচিত হয়েছে। 

ভূতত্ত¡বিদ ও প্রত্নতত্ত্ব বিদগণের অনুমান এই যে, অনূর্ধ্ব পঞ্চবিংশতি সহস্র বর্ষ পূর্বে অধুনালুপ্ত আহোম উপসাগরে সঞ্চিত পলিমাটি দ্বারা বাংলাদেশের এ অঞ্চলের বিশাল পাললিক সমভূমি গঠিত হয়েছিল। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার বিশাল এলাকা জুড়ে যে জলাভূমি বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর বলে পরিচিত সেটা হয়তো সাগরেরই অবশিষ্টাংশ। বর্তমানে অপভ্রংশ হয়ে সাগর থেকে সায়র এবং সায়র থেকে হাওরে রূপান্তরিত। গারো, খাসিয়া, জয়ন্তিয়ার অব্যবহিত দক্ষিণ সানুদেশ পার্বত্যভূমি না হলেও কোথাও কোথাও গৈরিক কাদাজমানো মাটি। মধুপুর ও ভাওয়ালের বিস্তৃত এলাকা গজারি বনময় উচ্চভূমি। অবশিষ্ট এলাকা নবগঠিত ভূমি। সর্বত্র খালবিল ও জলাভূমি দ্বারা আচ্ছন্ন। হাবিবুল্লা পাঠান কথিত ব্রহ্মপুত্র-সভ্যতার কেন্দ্রভূমি সেই অংশটিতে অবস্থিত।

মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই মধ্য-গাঙ্গেয় অঞ্চলে আর্য-ব্রাহ্মণ্য জীবনপ্রণালী প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল। মৌর্য সম্রাটদের শাসনামলে পুণ্ড্রবর্ধন এবং বঙ্গভূমি পর্যন্ত প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কামরূপ ও সমতটের নরপতিগণ বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে কোনো কোনো সময়ে করদ-রাজ্যের মর্যাদা ভোগ করেছেন মাত্র। ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। মধ্য-গাঙ্গেয় জীবন-প্রবাহের পূর্বমুখী যাত্রায় বাণিজ্যিক স্বার্থে এবং প্রচারের লক্ষ্যে আর্যাবতের উদ্যোগী মানুষেরা এ অঞ্চলে অবশ্যই যোগাযোগ রেখেছে। তবে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে গুপ্ত যুগের পূর্বে কেউই এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে নি। মৌর্য আমলে প্রবেশ করেছে বৌদ্ধ, অজীবিক ও জৈন সন্তগণ। মৌর্য সম্রাট অশোক তার বিশাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কিংবা সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমায় অবস্থিত বহিঃপ্রান্ত দেশে অসংখ্য ধর্মরাজি বা কীর্তিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল ধর্মরাজি ইতিহাসের উপাদান। ধর্মরাজির অপভ্রংশ হয়তো-বা ধামরাই। ঢাকার অদূরে ধামরাই নামক গ্রাম তারই স্বাক্ষর বলে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন। তৎপূর্ব-পার্শ্বে নিকটবর্তী সম্ভার এলাকা। বর্তমান সাভার নামটি হয়তো প্রাচীন সম্ভার রাজ্যেরই স্মৃতি রক্ষা করছে। গুপ্ত সম্রাটদের রাজত্বকালে সম্ভার রাজ্য শাসন করত সম্রাটের কোনো অনুগত স্থানীয় সামন্ত নরপতি। প্রত্যক্ষভাবে শাসিত না হলেও স্থানীয় সামন্ত নরপতিগণ মগধ সাম্রাজ্যের প্রশাসন-কাঠামো অনুসরণ করেই নিজেদের শাসন-কাঠামো গড়ে তুলেছিল। রাজ্যটি ছিল ভুক্তির অন্তর্গত ‘বিষয়’ (বর্তমান জেলা-প্রশাসনের তূল্য)। মৌর্য আমলে প্রতিটি ‘বিষয়’ শাসন করতেন একজন বিষয়পতি। তার অধিকরণে নিযুক্ত থাকত ভূমি ও কর-প্রশাসনের জন্য জ্যেষ্ঠ কায়স্থ ও পুস্তপাল; সামরিক ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় মহাপ্রতিহার; বিচার বিভাগে দণ্ডনায়ক। এ সকল রাজকর্মচারীর অতিরিক্ত পরামর্শদানের জন্য থাকত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি হিসাবে ব্রাহ্মণ-ধর্মপ্রবক্তা, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, শ্রেষ্ঠী (বণিক), কুলিক (কারিগর প্রধান), মহত্তর (মান্যবর প্রবীণ প্রজা) প্রমুখ। প্রশাসনিকভাবে ‘বিষয়’ বিভক্ত ছিল মণ্ডল বা বীথিতে (বর্তমান উপজেলা)। বীথি শাসন করত নরপতি কর্তৃক নিযুক্ত মহাসামন্ত কিংবা সামন্ত। তার অধীনে বীথি অধিকরণে অনুরূপ বেতনভুক্ত রাজপুরুষ আমলা নিযুক্ত থাকত। পঞ্চায়েত শাসন করত নির্বাচিত গ্রামপতি। তার অধীনেও অনুরূপ অধিকরণ সংগঠিত ছিল। অধিকন্তু আরক্ষার জন্যে ছিল স্থানীয় প্রতিহারীদল।

ঢাকা মহানগরের উত্তরে বর্তমান গাজীপুর অঞ্চলের কোনো এক স্থানে ছিল এই রাজ্যের কেন্দ্রভূমি। পশ্চিমে অসংখ্য শাখা-উপনদী সহ বংশী নদী, পূর্বে বানার নদী এবং দক্ষিণে টঙ্গী নদী বেষ্টিত কোনো এক স্থানে হয়তো ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন সম্ভার রাজ্যের অস্তিত্বের উলে­খযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনের সন্ধান পান নি। সন্ধান পান নি রাজ-রাজড়াদের কীর্তির কোনো ধ্বংসাবশেষেরও। সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে তাদের অস্তিত্ব ও কীর্তিকলাপের নানা কথা ও কাহিনী দীর্ঘদিন টিকে ছিল স্থানীয় লোকগাথায় এবং কিংবদন্তীতে। বর্তমান ধামরাই থেকে শুরু করে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলার ভাওয়াল এবং মধুপুরের গড়, নরসিংদি জেলার উত্তরাংশের পাহাড় অঞ্চল এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ অনির্ধারিত অঞ্চল ছিল এই রাজ্যের শাসনাধীন। কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে অনির্ধারিত বলা হচ্ছে এ কারণে যে সেটা ছিল বিশাল জলাভূমির অন্তর্গত। শুষ্ক ঋতুতেই যার অধিকাংশ স্থান জলমগ্ন থাকত। সেসব এলাকায় কোনো জনবসতি ছিল না, তবে উচ্চতর ভূমি-সংলগ্ন জলাভূমিতে ধীবর সম্প্রদায়ের মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠী মৎস্য আহরণ করতে যাতায়াত করত।

এই রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমানা যেমন অনির্ধারিত ছিল তেমনি ছিল দক্ষিণ সীমানাও। প্রাচীন ঐতিহাসিক আমল জুড়ে উত্তরে কামরূপ রাজ্য এবং দক্ষিণে বঙ্গভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চল ডবাকা বা ঢবাক নামে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চল ছিল বাণিজ্য-সমৃদ্ধ। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর সংযোগ অঞ্চলে বন্দর-নগরী গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চল ইতিহাসের ধারায় একাধিকবার ক্ষমতার হাত বদল হয়ে কামরূপ রাজ্য কিংবা বঙ্গ রাজ্যের অধিকারে এসেছে। অধিকারী রাজন্যগণ বন্দর-নগরীতে প্রশাসন-প্রধান নিয়োগ করতেন। কিন্তু এই নগর-প্রধান সাধারণত শ্রেষ্ঠী, কুলিক, ব্রাহ্মণ ও মান্যবর নাগরিকদের নিয়ে নগর-পরিষদ গঠন করে তাদের সহায়তায় প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনভাবে নগর শাসন করতেন। অধিকারী রাজন্যগণের করপ্রাপ্তি ব্যতিরেকে বন্দর-ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কালক্রমে এই এলাকাটি বিভক্ত হয়ে পড়ে দুইভাগে। দক্ষিণ অংশটি সমতট এবং উত্তর অংশটি ঢবাকা নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে।

মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অবস্থিত সম্ভার রাজ্যটি ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই মগধ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন ছিল না। সম্ভার রাজ্যটি কামরূপের করদ ছিল। একাধিকবার ক্ষমতার হাত বদল হওয়া সত্তে¡ও পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তিরও অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। গুপ্ত যুগে এ রাজ্য বা এলাকাটি সম্রাটের অনুগত স্থানীয় সামন্ত-মহাসামন্ত কর্তৃক শাসিত হতো। এলাকাটি ছিল পূর্ব-প্রত্যন্ত দেশ। এ দেশে আদিবাসী কৌম-সমাজের প্রবল প্রতাপ ছিল। ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নিকটবর্তী উর্বর ভূমিতে কর্বট, পুণ্ড্র, অহোম ও কোচ জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপিত হয়েছিল বিপুল সংখ্যায়।

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আর্যব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম, জন্মান্তরবাদ ও ধর্মসংস্কৃতির বিজয়াভিযান বিনা প্রতিরোধ ও বিনা সংঘর্ষে সম্পন্ন হয় নাই।

 

আমি স্থির করলাম এই সংঘাত, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের অব্যাহত সংগ্রামে নিজেদের পূর্ব-পুরুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে লালন করার ঐকান্তিক নিষ্ঠায় নিম্নকোটি মানুষের যে অদম্য প্রাণশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় তাকে অবলম্বন করে একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করব। ভূমিসংলগ্ন সে-সকল পূর্বসূরীগণের সংগ্রামী কাহিনীর মাঝেই আত্মপরিচয়ের সন্ধান পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে বাঙালি জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্যের দিকদর্শন। আমার এ উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে তৎকালীন ঐতিহাসিক পটভূমিতে। উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রসমূহ আমার কল্পনায় নির্মিত, তবে অবশ্যই অনৈতিহাসিক নয়।

গুপ্ত সম্রাট কুমার গুপ্ত মগধ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৪৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আমার এ উপন্যাসের ঘটনাবলি ও আখ্যান কুমার গুপ্তের রাজত্বকালের শেষাংশ, আনুমানিক ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আট-দশ বৎসরকাল ব্যাপ্ত। ঘটনার স্থান গুপ্ত সাম্রাজ্যের বহিঃপ্রান্তীয় দেশ সম্ভার রাজ্য এবং তার অন্তর্গত মধুপুর, ভাওয়াল, শিবপুর, পলাশতলী, পঞ্চবটি ও বন্দর-নগরী ঢবাকা অঞ্চলসমূহ। রচনাটি পাঠকদের আনন্দ দিতে পারলে আমার শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।

 

 

সহায়ক গ্রন্থ   

১. রাহুল সাংকৃত্যায়ণ, দর্শন দিগদর্শন, চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লি., কলকাতা

২. রাহুল সাংকৃত্যায়ণ, ভলগা থেকে গঙ্গা, চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লি., কলকাতা

৩. রায়হান রাইন (সম্পাদনা), বাংলার ধর্মদর্শন, সংবেদ, ঢাকা

৪. ব্যারিস্টার মোহাম্মদ রওশন আলী, প্রাচীন বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ধর্ম, জ্যোতি প্রকাশ,

ঢাকা

৫. অতুল সুর, বাংলা ও বাঙালির বিবর্তন, সাহিত্য লোক, কলকাতা

৬. অতুল সুর, বাংলা ও বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতি, জ্যোৎস্নালোক, কলকাতা

৭. রামশরণ শর্মা, প্রাচীন ভারতে শূদ্র, কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানী, কলকাতা

৮. নীহার রঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস: আদিপর্ব, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা

৯.-, ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো

১০. কমল চৌধুরী (সম্পাদনা), ঢাকার ইতিহাস, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা

১১.-, কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, কিশোরগঞ্জ জেলা ইতিহাস প্রণয়ন কমিটি

১২. আলি নওয়াজ (ড.), খনার বচন কৃষি ও কৃষ্টি, আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা 

১৩.-, বৃহত্তর ঢাকা জেলার পুরাতত্ত¡ বিষয়ক গবেষণামূলক প্রবন্ধমালা-১

১৪. মুহাম্মদ হাবিবুল­া পাঠান, বাংলাদেশের প্রাচীনতম বন্দর নগরী উয়ারি বটেশ্বর, …

১৫. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, উয়ারী বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে, প্রথমা, ঢাকা, ২০১২

 

 

শব্দসংকেত

অজীবিক- ধর্মমত

আরক্ষা-ব্যবস্থা- পুলিশী-ব্যবস্থা

কার্ষাপণ- প্রাচীন আমলে প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রা

কুটুম্ব- গ্রাম প্রশাসনের মান্যজন

কুলিক- পদস্থ কর্মকর্তা

কুল্যবাপ- কৃষি জমির পরিমাপ, ৮ দ্রোণে এক কুল্যবাপ

খড়কি- একধরনের নিম্নপদস্থ কর্মচারী

গুল্ম- মহারাজের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রাণাধীন সামরিক স্থাপনা

গুল্মিক- গুল্মের সামরিক-প্রধান

গ্রামিক- গ্রামপ্রধান

জ্যেষ্ঠকায়স্থ- জ্যেষ্ঠ করণিক ও প্রশাসনিক পদবি

দণ্ডিক- বিশ্রামাগার

দশতি- আঁচল

দেবপাড়া- যেখানে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় কূল ব্যতীত অন্যকোন মানুষের বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ

প্রথম সার্থবাহ- পদস্থ কর্মকর্তা

বহনায়ক- একধরনের নিম্নপদস্থ কর্মচারী

বিষয়- বর্তমান জেলার সমতুল্য প্রশাসনিক অঞ্চল

 

 

 

 

 

বিষয়পতি- বিষয়-নিয়ন্ত্রক রাজন্য কিংবা অমাত্য

বীথি- উপজেলা তুল্য প্রশাসনিক অঞ্চল

বৃষলী- পতিতা

ভাগ- প্রজার জমির ওপর প্রদেয় রাজস্ব

মণ্ডল- মহকুমা তুল্য প্রশাসনিক অঞ্চল

মহত্তর- গণ্যমান্য প্রবীণ পুরুষ

শটিকা- শাড়ির অর্ধাংশসম বস্ত্র

শলাকা-গ্রহাপক- গ্রামীণ নির্বাচনী সভায় শলাকা বিতরণ ও গ্রহণের মাধ্যমে গোত্রপতি,

গ্রামিক ও অন্যান্য পদে নির্বাচন পরিচালনাকারী ব্যক্তি

সীতা- খাস জমির ওপর প্রদেয় রাজস্ব

স্বভূমি- রাজার খাস জমি

 

 

___

 

 

Advertisement Banner

Recommended

আবদুর রউফ
Uncategorized

আবদুর রউফ

April 7, 2022
Uncategorized

কর্বট কন্যা 2

April 26, 2021
Uncategorized

কাটপকটপাক

April 24, 2021

Popular Playlist

Currently Playing

Selected News. Episord-1

Selected News. Episord-1

Selected Video News

ব্যস্ততার ফাঁকে শুনে নিন, প্রকাশিত সংবাদ থেকে বাছাই করা সংবাদসমূহ–

Selected Video News

জানলে অবাক হবেন ভার্চুয়াল আইডি কার্ডধারীদের কী কী সুবিধা ঘোষণা করেছে সরকার!

Selected Video News

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য টিএসসি ভবন কি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে?

Selected Video News
  • abdullah abu sayeed front page
  • About Us
  • Abu Hasan Shahriar front page
  • Agartola mamla o amar nabik jibon
  • aktaruzzaman ilias front page
  • Anu-mahmud front page
  • begum rokeya front page
  • Contact Us
  • Demu front page
  • Hasan Azizul Haque front page
  • Home 1
  • Home 2
  • Home 3
  • Jugosondhir Surodhoni
  • Kaysar Chawdhury front page
  • muktisnan
  • Sah Alom Sarowar front page
  • Salimullah khan front page
  • Sample Page
  • selina hossain front page
  • shaukat ali front page
  • Sommanona sarok
  • sritir aloy alokiti mukh
  • Sufia Kamal front page
  • Syed Shamsul Haque front page
  • Test Page
  • ThemeNcode PDF Viewer [Do not Delete]
  • ThemeNcode PDF Viewer SC [Do not Delete]
  • Zakir-Talukder front page
  • অনুবাদ 109
  • অন্যদের দৃষ্টিতে
  • অন্যদের দৃষ্টিতে 0
  • অন্যান্য 108
  • অন্যান্য 109
  • অন্যান্য 111
  • অন্যান্য 112
  • অন্যান্য 113
  • অন্যান্য 114
  • অন্যান্য 115
  • অন্যান্য 116
  • অন্যান্য 117
  • অন্যান্য 118
  • অন্যান্য 119
  • অন্যান্য00000
  • অন্যান্য110
  • আগরতলা মামলা 101
  • আগরতলা মামলা ও আমার নাবিক জীবন
  • আত্মজীবন
  • আত্মজীবন
  • আত্মজীবন
  • আত্মজীবন
  • আত্মজীবন
  • আত্মজীবন 0
  • আবদুর রউফ
  • আমার ছেলেবেলা ও ছাত্র রাজনীতি
  • আমার ছেলেবেলা ও ছাত্র-রাজনীতি
  • আমার বাবা কমান্ডার আবদুর রউফ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং তারপর
  • আলোচনা/সমালোচনা 110
  • ইউটিউব চ্যানেল
  • ইতিহাসের দর্শন: ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমকালীন নানা প্রভাব
  • উপন্যাস
  • উপন্যাস
  • উপন্যাস 108
  • উপন্যাস 112
  • উপন্যাস 113
  • উপন্যাস 114
  • উপন্যাস 115
  • উপন্যাস 116
  • উপন্যাস 117
  • উপন্যাস 118
  • উপন্যাস 119
  • উপন্যাসিকা
  • একক ছবি 101
  • ঐতিহাসিক উপন্যাস
  • ওয়েবসাইট সম্পর্কে
  • কথাসাহিত্য 111
  • কথাসাহিত্যিক
  • কবি
  • কবি বিনয় মজুমদার
  • কবি শামসুর রাহমান
  • কবিতা
  • কবিতা
  • কবিতা 0
  • কবিতা 108
  • কবিতা 110
  • কবিতা 111
  • কবিতা 115
  • কবিতা 116
  • কবিতা 117
  • কবিতা 118
  • কবিতা 119
  • কমান্ডার আবদুর রউফ স্মরণপত্র
  • কর্বট কন্যা
  • কর্বট কন্যা
  • কর্ম-জীবন 00000
  • খাবার পানি সংকট: সমাধানের জন্য চাই সামষ্টিক স্বর
  • গবেষণা 110
  • গল্প
  • গীতালি হাসান সম্পাদিত সন্মাননা স্মারক
  • গীতালি হাসান সম্পাদিত সম্মাননা স্মারক
  • গ্যালারি
  • গ্যাস উত্তোলন চুক্তিনামা: চাই প্রাসঙ্গিক জ্ঞান ও বস্তুনিষ্ঠতা
  • চলচ্চিত্রকার
  • চারুশিল্প
  • চিত্রশিল্পী
  • ছবি
  • ছবি
  • ছবি
  • ছবি 0
  • ছাত্রজীবন 101
  • ছোটগল্প 112
  • ছোটগল্প 113
  • ছোটগল্প 115
  • ছোটগল্প 116
  • ছোটগল্প 117
  • ছোটগল্প 118
  • ছোটগল্প 119
  • ছোটগল্প 108
  • জন্ম ও শিক্ষা-জীবন 00000
  • টেস্ট পেইজ 2
  • দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও বিশ্বমন্দা: কার্যকারণ অনুসন্ধান
  • নাট্যকার
  • নাবিক জীবন 101
  • প
  • পরিবার
  • পারিবারিক
  • পারিবারিক 101
  • পারিবারিক জীবন00000
  • পেশাগত জীবন 114
  • প্রবন্ধ
  • প্রবন্ধ
  • প্রবন্ধ
  • প্রবন্ধ
  • প্রবন্ধ 0
  • প্রবন্ধ 108
  • প্রবন্ধ 108
  • প্রবন্ধ 112
  • প্রবন্ধ 113
  • প্রবন্ধ 115
  • প্রবন্ধ 116
  • প্রবন্ধ 117
  • প্রবন্ধ 118
  • প্রবন্ধ 119
  • প্রবন্ধ/নিবন্ধ 110
  • প্রবন্ধ/নিবন্ধ00000
  • প্রসঙ্গ শিল্পদর্শন
  • প্রাবন্ধিক ও গবেষক
  • ফেইসবুক পেজ
  • বই সংক্রান্ত 101
  • বক্তৃতা 00000
  • বক্তৃতা110
  • বন থেকে বন্দর
  • বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে 101
  • বাগানবিলাস
  • বাঙালি মুসলমান: ঐতিহাসিক পরম্পরা ও আজকের সম্ভাবনা
  • বাংলাদেশে অনুবাদ চর্চা
  • বাংলাদেশের পানি-প্রবাহ ভাবনা
  • বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ
  • বিবিধ
  • বিবিধ
  • বিবিধ কর্মজীবন 101
  • বিবিধ রচনা
  • বিবিধ রচনা
  • ব্যক্তিগত ও পারিবারিক
  • ব্যক্তিগত ও পারিবারিক 0
  • ভাষান্তর
  • ভিডিও
  • ভিডিও
  • ভিডিও
  • ভিডিও
  • ভিডিও 0
  • ভিডিও 101
  • ভ্রমন
  • মঈন চৌধুরী
  • মাতঙ্গী দেবী উপাখ্যান
  • মাতঙ্গীদেবী উপাখ্যান
  • মুক্তিস্নান
  • যুগসন্ধির সুরধ্বনি
  • রাজনৈতিক জীবন
  • রাজনৈতিক প্রবন্ধ
  • লেখক ও তার লেখা নিয়ে 108
  • লেখক ও তার লেখা নিয়ে 109
  • লেখককে নিয়ে 111
  • লেখককে নিয়ে 119
  • লেখককে নিয়ে112
  • লেখককে নিয়ে113
  • লেখককে নিয়ে115
  • লেখককে নিয়ে116
  • লেখককে নিয়ে117
  • লেখককে নিয়ে118
  • শিক্ষা, পারিবারিক ও ব্যক্তি জীবন
  • শিশু সাহিত্য
  • শিশু সাহিত্য 0
  • শিশু সাহিত্যিক
  • শিশু-কিশোরতোষ সাহিত্য 109
  • শিশুসাহিত্য
  • সংগঠক 112
  • সংগঠক 113
  • সংগঠক 115
  • সংগঠক 116
  • সংগঠক 117
  • সংগঠক 118
  • সংগঠক 119
  • সংগঠন
  • সংগীতজ্ঞ
  • সন্মাননা স্মারক
  • সমুদ্র-পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
  • সম্পাদকের ভূমিকা 120
  • সম্পাদনা
  • সম্পাদনা
  • সম্পাদনা 114
  • সম্মাননা 101
  • সাংগঠনিক
  • সাংগঠনিক 0
  • সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ
  • সুন্দরবন সুরক্ষা ও পর্যটন শিল্প
  • হায়দার আকবর খান রনো

Copyright© 2023 Commander ABdur Rauf. All rights reserved.

No Result
View All Result
  • সম্পর্কে
  • উপন্যাস
  • ঐতিহাসিক উপন্যাস
  • প্রবন্ধ
  • আত্মজীবন
  • সন্মাননা স্মারক
  • ছবি
    • সম্মাননা
    • পারিবারিক
    • একক ছবি
    • ছাত্রজীবন
    • নাবিক জীবন
    • বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে
    • বই সংক্রান্ত
    • বিবিধ কর্মজীবন
  • ভিডিও

Copyright© 2023 Commander ABdur Rauf. All rights reserved.